Discuss the social and economic condition of Tripura before the accession of Birchandra Manikya.
বীরচন্দ্র মানিক্যের পূর্ববর্তী সময়ে ত্রিপুরার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর।
ভূমিকা ত্রিপুরার মাণিক্য উপাধিকারী রাজন্যবর্গের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন আত্মমর্যাদাজ্ঞানহীন, ক্ষমতালোভী ও ষড়যন্ত্রী। এসব ক্ষমতালোভী ও ষড়যন্ত্রীরা মুঘল ফৌজদারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অধিক সংখ্যক হাতি, নিয়মিত উচ্চ হারে খাজনা, নজরানা ইত্যাদি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজত্বের সনদ লাভ করতেন। এটা ত্রিপুরার দুর্বল অর্থনীতির উপর এক বিরাট আঘাত ও স্থায়ী ক্ষতস্বরূপ ছিল। তবে এ সময়ের শুভদিক হল ত্রিপুরায় ব্রিটিশ ভারতের অনুকরণে আইন প্রণয়নের সূত্রপাত, প্রশাসনিক বিধিব্যবস্থার প্রবর্তন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের উন্মেষ ও সামাজিক সংস্কার।
Economic Condition
১) চাষাবাদ ও কৃষি ত্রিপুরার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা হল কৃষি। কৃষিজ উৎপাদনের মধ্যে ধান, গম, আলু, আখ, সরিষা, ডাল জাতীয় শস্য, কার্পাস, তুলো, কচু, আদা, তরমুজ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিকার ও পশুপালন করেও তারা জীবিকা নির্বাহ করত। এখানকার চাষযোগ্য সমতল জমির সাথে রয়েছে টিলা বা উঁচু জমি। ত্রিপুরায় টিলা জমির পরিমাণ বেশি।
২) ভূমির প্রকৃতি :- ভূমি ব্যবহার প্রণালীর দিক থেকে ত্রিপুরার ভূমিকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায় ।
১। উঁচু জমি 1 - এগুলি হল টিলা ও পাহাড়। এখানে সাধারণত 'জুম' চাষ হয়। এ ছাড়া আছে সংরক্ষিত বনায়ন।
২। মাঝারি জমি এগুলি হল উঁচু টিলার পাদদেশ ও ছোটো ছোটো টিলা জমি। এগুলিতে বৃষ্টিনির্ভর ধান, পাট, পেস্তা, তিল, সরিষা, চা ইত্যাদি চাষ হয়ে থাকে।
৩। নিচু জমি — এগুলি ত্রিপুরা রাজ্যের আদর্শ চাষের জমি। এগুলিতে প্রধানত ধান চাষ হয়ে থাকে। তবে জলাধার তৈরি করে মৎস্য চাষও করা হয়।
৩) মৃত্তিকা মৃত্তিকার শ্রেণিভেদের দিক থেকে ত্রিপুরার মাটি সাধারণত তিন প্রকারের, যথা
(ক) টিলার মৃত্তিকা,
(খ) সমতল জমির মৃত্তিকা এবং
(গ) লুঙ্গা জমির পিট মৃত্তিকা। অন্যদিকে আবার মাটির প্রথন, গঠন ইত্যাদি উপর নির্ভর করে ত্রিপুরার মাটিকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :
(১) বেলে-দোআঁশ মাটি ক্ষমতাও বেশি। 1 উঁচু টিলার উপর দেখা যায়। এদের উর্বরাশক্তি কম ও জলধারণ
(২) এঁটেল-দোআঁশ মাটি – সমতল লুঙ্গা জমিতে পাওয়া যায়। এদের উচ্চতর উর্বরাশক্তি, জলসাধারণের ক্ষমতা বেশি এবং অম্লতার পরিমাণ কম বলে উৎপাদন ক্ষমতা বেশি।
(৩) দোআঁশ মাটি এদের সাধারণত পলিমাটি বলা হয়ে থাকে। উর্বরাশক্তি ও জলধারণ ক্ষমতা বেশি বলে চাষ ভালো হয়।
৪) রাজস্ব ভূমিরাজস্বের হার খুব বেশি ছিল না। গোবিন্দ মাণিক্য কানি প্রতি চার আনা রাজস্ব ধার্য করে তা স্মরণীয় করে রাখার জন্যই নাকি সিকি মুদ্রার প্রচালন করেন। পার্বত্য অঞ্চলের প্রজারা মুদ্রার পরিবর্তে বনজ সামগ্রী ও জুমের ফসল দিত বা আদেশ মতো কায়িক শ্রম দিতে বাধ্য থাকত। স্থায়ী কৃষিক্ষেত্র না থাকায় জুমিচাষি প্রজাদের কাছ থেকে কৃষি খাজনার পরিবর্তে পরিবার পিছু ঘরচুক্তি কর বা গৃহকর আদায় করা হত।
৫) শিল্প ত্রিপুরার আদিবাসীদের বয়ন ও হস্তশিল্পের বিশেষ প্রসিদ্ধি ও গৌরব রয়েছে। প্রথমে রাজপ্রাসাদে এসব শিল্পের সূত্রপাত ঘটেছিল এবং পরে তা সমগ্র ত্রিপুরায় পরিব্যাপ্ত হয়। গভীর অরণ্যবাসী কুকি ও ত্রিপুরি জনসমাজের প্রত্যেকের বাড়িতেই দু-চারখানি তাঁত ছিল। ত্রিপুরায় বৃদ্ধা হতে বালিকা পর্যন্ত প্রত্যেক রমণীই তাঁত বয়নে সিদ্ধহস্ত ছিল। বয়নশিল্প ব্যতীত কাষ্ঠশিল্পে, বাঁশ ও বেতের কাজ ত্রিপুরার খ্যাতি সুবিদিত। সাধারণত যন্ত্রপাতি দিয়ে বাঁশ, বেত, তালপাতা ও সাধারণ সুতোর কাজে ত্রিপুরার রমণীগণ ছিল সিদ্ধহস্ত।
৬) মুদ্রা ত্রিপুরায় প্রথম মুদ্রা পাওয়া যায় মহারাজা রত্ন মাণিক্যের আমলের। তাঁর পরবর্তী রাজাদের মধ্যে কয়েকজন বাদে প্রায় সব রাজার আমলের মুদ্রা পাওয়া গেছে। মুদ্রাগুলি দু-প্রকার - সাধারণ মুদ্রা ও স্মারক মুদ্রা। সাধারণ মুদ্রা নির্মিত হত রাজ্যাভিষেক উপলক্ষ্যে, আর স্মারক মুদ্রা নির্মিত হত রাজ্যজয়, তীর্থস্থান ও তীর্থদর্শন প্রভৃতি ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে। ৭) যাতায়াত ঃ- রাজ আমলে ত্রিপুরায় যাতায়াত ব্যবস্থা বলতে যা বোঝাত তা মোটেই উন্নত ধরনের ছিল না। দেশি নৌকা ও ভেলা, হাতি ও অশ্ব প্রভৃতি ভারবাহী পশু, গো-যান ইত্যাদি ছিল যাতায়াতের প্রধান বাহন। তবে রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন সমতল অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত ছিল।
৮) বনজ সম্পদ ত্রিপুরার তিন-চতুর্থাংশই ছিল বন এবং এসবই ছিল প্রকৃতির দান। জনসংখ্যা ছিল সীমিত, মৃত্তিকা ছিল উর্বর এবং বৃষ্টিপাত হত প্রচুর। ত্রিপুরা থেকে প্রচুর বাঁশ, বেত, ছন, জ্বালানি কাঠ পূর্ববঙ্গে রপ্তানি করা হত। তা ছাড়া, শাল, গামাই, চামল, সুন্দ্রি, জারুল, নাগেশ্বর, কালীবক্কল, পিতরাজ প্রভৃতি মূল্যবান কাঠও রপ্তানি করা হত।
ত্রিপুরার অরণ্য ছিল আকর্ষণীয় নানাবিধ বন্যপশুর বিচরণক্ষেত্র। এদের মধ্যে হরিণ, গন্ডার, হাতি, বাঘ, মহিষ, শূকর, কৃয়-ভল্লুক, বন্য বেড়াল, বন্য কুকুর প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ত্রিপুরার পাহাড়ে যে হাতি পাওয়া যেত তার উপর বাংলার নবাবের লোলুপ দৃষ্টি ছিল। খেদা, পরতালা ও ফাঁসি এই তিন প্রকারে হাতি ধরা হত। ত্রিপুরার অরণ্যে প্রাপ্ত টিয়া, ময়না, চন্দনা প্রভৃতি পাখি পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা, নোয়াখালি এবং শ্রীহট্টের বাজারে বিক্রি করা হত।
Social Condition
১) উপজাতি সমাজ ত্রিপুরার উপজাতিদের মধ্যে রয়েছে ত্রিপুরি বা তিপরা, রিয়াং, চাকমা, মগ, জমাতিয়া, নোয়াতিয়া, হালাম, কলই, উচাই, চাইমল, গারো, খাসিয়া, ভূটিয়া, সাঁওতাল, লেপচা, ভীল, কুকি, ওরাং, মুন্ডা – এই উনিশটি জনগোষ্ঠী। এদের মধ্যে তিপ্পা বা ত্রিপুরিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ত্রিপুরার রাজপরিবার ও শাসকশ্রেণি ত্রিপুরি উপজাতিভুক্ত ছিল। ত্রিপুরিরা দু-ভাগে বিভক্ত পুরোনো বা রাজবংশী এবং দেশি বা নতুন ত্রিপুরি। রাজপরিবার ও শাসকশ্রেণি ছাড়া পুরোনো ত্রিপুরিরা সাধারণত পাহাড়ে বাস করত। দেশি বা নতুন ত্রিপুরিরা সমতল অঞ্চলে বাস করত।
২) ভাষা বিভিন্ন উপজাতির নিজস্ব কথ্য ভাষা রয়েছে। উপজাতিদের ভাষা ‘ককবরক' ভাষা নামে সাধারণত পরিচিত। 'ককবরক' ভাষায় লিখিত কোনো হরফ নেই। বর্তমানে তা বাংলা বা রোমান হরফে একটি লিখিত ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। তবে আবহমানকাল থেকে ত্রিপুরায় রাজকার্যে বাংলা ভাষার প্রচলন দেখা যায়। ত্রিপুরার উপজাতীয় মাণিক্য রাজাদের হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগের প্রতিফলন ঘটে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণে এবং প্রশাসনিক কাজে বাংলা ভাষার প্রচলন ও দরবারি সাহিত্যরূপে বাংলা কাব্যসাহিত্যের চর্চা ও আনুকূল্য প্রদর্শনে।
৩) ধর্মীয় আচার-আচরণ ও রীতিনীতি উপজাতিদের অধিকাংশই হিন্দুধর্মাবলম্বী হলেও তারা কৌলিক দেবদেবীর পূজার্চনা ত্যাগ করেনি। চাকমা ও মগরা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, আবার কুকি, গারো, লুসা প্রভৃতির অনেকেই খ্রিস্টধর্মাবলম্বী। উপজাতিদের অধিকাংশই মৃতদেহ অগ্নিসংযোগে সৎকার করে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃতদেহ কবরও দেওয়া হয়। মৃতের আত্মার সৎগতির উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ ও তর্পণাদি করা হয়। উপজাতিদের নানা সামাজিক সংস্কার রয়েছে। প্রেতলোকে ও পুনর্জন্মে বিশ্বাস ইত্যাদির জন্য ‘অছাই’ বা পুরোহিতের সামাজিক মর্যাদা খুব বেশি।
৪) সামাজিক বিধিবিধানে রাজ-নিয়ন্ত্রণ আদিবাসী সম্প্রদায়ের সামাজিক বিধিবিধানে রাজ-নিয়ন্ত্রণ বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল ছিল। ঠাকুর (রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত ও অভিজাত) সমাজের সামাজিক, সাংসারিক ও পারিবারিক আচার-আচরণ এবং বিধিবিধান রাজাদেশে গঠিত ঠাকুর সমিতি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হত। মণিপুরি সম্প্রদায়ের সামাজিক কর্তব্যও রাজা নির্ধারণ করতেন। জমাতিয়া সম্প্রদায়, ত্রিপুর ক্ষত্রিয় সমাজ, হালাম ও রিয়াং সম্প্রদায়ের সামাজিক অনুষ্ঠানও রাজাদেশে নিয়ন্ত্রিত হত।
৫) শারীরিক গঠন ও বাসগৃহ শারীরিক গঠনের দিক থেকে তিপ্রাগণ তথা আদিবাসীরা সবল। তাদের গায়ের রং গৌরবর্ণ, নাসিকা চাপা, চিবুক শ্মশ্রুহীন। তাদের স্বভাব মধুর এবং জীবনযাত্রা সুন্দর, সরল ও অনাড়ম্বর। পাহাড়ের গায়ে জমি থেকে উঁচুতে বাঁশের কাঁচা গৃহ বা টং-ঘর নির্মাণ করে তারা বাঁশের মাচায় বাস করত, আর ঘরের নীচে শুয়োর ইত্যাদি পালিত পশু ও পাখি রাখত। তাদের এক-একটি বাড়ি মূলত এক-একটি পাড়াবিশেষ।
৬) সর্দার প্রথা প্রত্যেক পাড়ার একজন সর্দার থাকত। সর্দারের নাম অনুসারে গ্রামের বা পাড়ার নামকরণ করা হত। সর্দারের ক্ষমতা ছিল ব্যাপক। সর্দার সাধারণ অপরাধ ও সামাজিক বিরোধের বিচার করতেন। বিচারপদ্ধতি ছিল অনেকটা আজকের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মতো।
৭) বিবাহ ‘হিনানানী’ এবং ‘কাইজানী' – এই দু-প্রকার বিবাহ প্রচলিত আছে। - ‘হিনানানী’ হল যুবক-যুবতির পরস্পর পছন্দের বিবাহ। 'কাইজানী' প্রথায় অভিভাবকের মত অনুসারে বিয়ের আগে বরকে ভাবী শ্বশুরবাড়িতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকতে হয় এবং জুম চাষ ও অন্যান্য কাজ করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে যদি পাত্রের কার্যকলাপে ভাবী শ্বশুর সন্তুষ্ট হন এবং পাত্র ও কন্যার মধ্যে সদ্ভাব দেখা যায় তবে নির্দিষ্ট সময় শেষে 'লাম্ৰা’ দেবতার পূজা দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। আর বিয়ে না হলে পাত্রকে কাজের জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে বিদায় দেওয়া হয়, এই পদ্ধতির বিবাহ ‘জামাই খাটা' বা ‘জামাই উঠা' নামেও পরিচিত।
৮) পোশাক-পরিচ্ছদ ও অলংকার পোশাক-পরিচ্ছদে কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও মোটামুটিভাবে নিজেদের হাতে তাঁতে বোনা ‘রিয়া’ ও ‘পাছড়া' নামে দু-প্রস্থ কাপড়ের ব্যবহার সব উপজাতির মেয়েদের মধ্যে প্রচলিত আছে। স্ত্রী— পুরুষ উভয়ের অলংকার খুব প্রিয়। তবে ধাতব অলংকারাদির চাইতে উপজাতি মেয়েরা ফুলের ও সুন্দর পত্র-পল্লবাদির গয়না ব্যবহার বেশি পছন্দ করে।
৯) ক্রীতদাসপ্রথা ও সতীদাহপ্রথা ক্রীতদাসপ্রথা ত্রিপুরা রাজ্যে বহুকাল প্রচলিত ছিল। এ ছাড়াও ‘জোলাই' নামে এক শ্রেণির ক্রীতদাস রাজপরিবারের বিভিন্ন ব্যক্তির অধীনে কাজ করতে বাধ্য ছিল। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যে ক্রীতদাস কেনাবেচা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সতীদাহ বা সহমরণপ্রথা ত্রিপুরায় প্রাচীনকাল হতেই প্রচলিত ছিল। 'রাজমালা'য় রানিদের সহমরণের বিবরণ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ ভারতে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সতীদাহপ্রথা নিষিদ্ধ হলেও ত্রিপুরা রাজ্যে তা আরও অনেকদিন পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। অবশেষে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্যে সতীদাহপ্রথা আইনগত নিষিদ্ধ ও দন্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষিত হয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন