ব্রিটিশ সংবিধানের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা কর।
Discuss the major features of the British Constitution.
ব্রিটিশ সংবিধান কোনো একটি বিশেষ সময়ে রচিত হয় নি কিংবা কোনো কনভেনশনে এটি গৃহীত হয়নি। ব্রিটিশ সংবিধান মূলত বিবর্তনশীল। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর রাজনীতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেনের সংবিধান গঠিত ও বিবর্তিত হয়েছে। এই বিবর্তনের পথে সনদ, বিধিবদ্ধ আইন, বিচারালয় সিদ্ধান্ত, প্রচলিত আইন ও প্রথাগত বিধানের অবদান উল্লেখযোগ্য। অধ্যাপক মুনরো ব্রিটিশ সংবিধানকে, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, নীতি ও আচার ব্যবহারের এক জটিল সংমিশ্রণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ব্রিটিশ সংবিধানের বৈশিষ্ট্য সমূহ এই প্রারম্ভিক মন্তব্যের পর ব্রিটিশ সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্যগুলিকে নিম্নলিখিতভাবে আলোচনা করা যেতে পারে—
(১) অলিখিত সংবিধান ব্রিটিশ সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত কোন দলিল নয়। কারণ কোন গণপরিষদ কর্তৃক একটি নির্দিষ্ট সমূহে এই সংবিধান রচিত হয়নি, বরং তা দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর রাজনীতিক বিকাশের ফলে গড়ে উঠেছে।
(২) সংবিধানের নমনীয়তা ব্রিটিশ সংবিধান অলিখিত এবং প্রধানত আচার ব্যবহার, রীতিনীতি ও প্রথার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বলে একে খুব সহজে পরিবর্তন করা যায়। অর্থাৎ এই সংবিধান পরিবর্তন করার জন্য বিশেষ কোনো পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন হয় না। সাধারণ আইন প্রণয়ন পদ্ধতির মাধ্যমে ব্রিটিশ সংবিধানকে সংশোধন বা পরিবর্তন করা যায়।
(৩) একককেন্দ্রিক সরকার গ্রেট ব্রিটেনের শাসন ব্যবস্থা মূলত একককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা, যেখানে কেন্দ্রিয় সরকার সকল ক্ষমতার অধিকারী। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলি মত গ্রেটব্রিটেনের স্থানীয় অঞ্চলগুলি কোনো প্রকার স্বাতন্ত্র্য ভোগ করে না ।
(৪) আইনসভার প্রাধান্য গ্রেট ব্রিটেনের পার্লামেন্ট হল এমন একটি আইনসভা যা চরম ক্ষমতার অধিকারী। এই প্রসঙ্গে De Lolme এর মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তাঁর মতে “The British Parliament can do anything but make a man a woman and a woman a man."
(৫) মন্ত্রীসভা চালিত সরকার মন্ত্রীসভা চালিত সরকার হল ব্রিটিশ সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এখানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ক্যাবিনেটই হল প্রকৃত শাসন কর্তৃপক্ষ। সরকারের যাবতীয় কাজকর্মের জন্য মন্ত্রীগণ কমন্সসভার নিকট ব্যক্তিগতভাবে এবং যৌথভাবে দায়িত্বশীল থাকেন। অন্যদিকে কমন্সসভা অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে মন্ত্রীদের অপসারিত করতে পারে।
(৬) আইনের অনুশাসন আইনের অনুশাসন হল গ্রেট ব্রিটেনের শাসন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আইনের অনুশাসন তত্ত্বের মূলভিত্তি হল, কোনো ব্যক্তি বিশেষের পরিবর্তে আইনের প্রাধান্য বজায় রাখা। অধ্যাপক ডাইসির মতে, আইনের অনুশাসন তত্ত্বের তিনটি মূলনীতি হল –
(ক) স্বৈরীক্ষমতার অনস্তিত্ব, (খ) আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান, (গ) নাগরিক অধিকারের প্রাধান্য।
(৭) নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের শীর্ষে অবস্থান করেন একজন রাণী বা রাজা, যিনি নামে মাত্র সকল ক্ষমতার অধিকারী। কারণ বাস্তবে প্রকৃত ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে মন্ত্রীসভার হাতে এবং এই মন্ত্রীসভার পরামর্শেই রাজা বা রাণী পরিচালিত হয়। তাই বলা হয় যে, গ্রেট ব্রিটেনের রাজা বা রাণী রাজত্ব করেন; কিন্তু দেশ শাসন করেন না।
(৮) মিশ্র শাসন ব্যবস্থা গ্রেট ব্রিটেনের শাসনতন্ত্রে রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং গণতন্ত্রের সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। যেমন রাজতন্ত্র হিসেবে রাজা বা রাণি, অভিজাততন্ত্রের প্রতীকরূপে প্রিভি কাউন্সিল ও লর্ডসভা এবং গণতন্ত্রের প্রতীকরূপে কমন্সসভা এখানে বিরাজমান।
(৯) ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় ক্যাবিনেটের প্রাধান্য শাসনতন্ত্রকে একটি বিশেষ অভিনবত্ব প্রদান করেছে। ক্যাবিনেটের প্রাধান্যকে সাধারনভাবে ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব বলা হয়। ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব বলতে এর অপ্রতিরোধ্য এবং প্রায় নিয়ন্ত্রণ বিহীন ক্ষমতাকে বোঝায়।
(১০) ক্ষমতার ঐক্যকরণ ক্ষমতার ঐক্যকরণ হল ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কারণ, ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগ একত্রে মিলিত হয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বে আসীন রয়েছে। অন্যদিকে বিচার বিভাগও আইনসভার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
(১১) তত্ত্ব ও বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য ব্রিটিশ সংবিধানের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর সাংবিধানীক তত্ত্ব এবং ব্যবহারিক কার্যকলাপের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। এর ফলে ব্রিটেনে কার্যত যা সাংবিধানীক রীতিনীতি বলে মনে হয়, কার্যক্ষেত্রে এবং বাস্তবে তা নয়।
(১২) শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব ব্রিটিশ সংসদে ক্ষমতাশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব এবং এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কারণ ব্রিটিশ সরকারকে যেমন - 'Her Majesty's Government' বলা হয়, তেমনি বিরোধী দলকে বলা হয় 'Her Majesty's opposition'। এখানে বিরোধী দলের নেতাও প্রভূত ক্ষমতা ও মর্যাদার অধিকারী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা তাকে যথেষ্ট সমীহ করে চলেন।
(১৩) নাগরিক অধিকার ভারত কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার সমূহ কোনো একটি সুস্পষ্ট দলিলে লিপিবদ্ধ হয় নি। ব্রিটিশ নাগরিকদের বাক্ স্বাধীনতা, ধর্মাচারণ ও সভাসমিতি করার স্বাধীনতা প্রচলিত আইনের উপর প্রতিষ্ঠিত।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই কথা বলা যায় যে, গ্রেট ব্রিটেনে লিখিত অর্থে কোন সংবিধান না থাকলেও, গ্রেট ব্রিটেনের শাসন ব্যবস্থার একাধিক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলির মাধ্যমেই ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র অনুধাবন করা যায়।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন