ব্রিটিশ সংবিধানের প্রধান প্রধান উৎসগুলি আলেচনা কর।
Discuss the major sources of the British Constitution.
ব্রিটিশ সংবিধান কোন একটি বিশেষ সময়ে রচিত হয়নি কিংবা কোন কনভেনশনে এটি গৃহীত হয় নি। ব্রিটিশ সংবিধান মূলত বিবর্তনশীল। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর রাজনীতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেনের সংবিধান গঠিত ও বিবর্তিত হয়েছে। এই বির্বতেনর ক্ষেত্রে সনদ, বিধিবদ্ধ আইন, বিচারালয় সিদ্ধান্ত, প্রচলিত আইন ও প্রথাগত বিধানের অবদান উল্লেখযোগ্য। অধ্যাপক মুনরো তাই ব্রিটিশ সংবিধানকে, 'বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, নীতি ও আচার ব্যবহারের এক জটিল সংমিশ্রণ' বলে অভিহিত করেছেন।
ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস ইংল্যান্ডের সংবিধান কোনো একটি লিখিত দলিলে লিপিবদ্ধ নেই। প্রকৃতপক্ষে, ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস একাধিক। স্যার আইভার জেনিংস, মুনরো এবং আরও অনেক সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞগণ ব্রিটিশ সংবিধানের উৎসগুলিকে নিম্নলিখিত কয়েকটিভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেন –
(১) ঐতিহাসিক সনদ বা দলিল সমূহ ইংল্যান্ডের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে বিভিন্ন রাজা বা রাণীর আমলে যে সমস্ত সনদ বা দলিল সমূহ গৃহীত হয়েছিল সেগুলি ব্রিটিশ সংবিধানের অন্যতম প্রধান উৎস বলে বিবেচিত হয়। ইংল্যান্ডের রাজনীতিক জীবন বিকাশের বিভিন্ন স্তরে এই সমস্ত দলিল সমূহ রাজনীতিক সংকট সমাধানে সহায়তা করেছে এবং জনগণ এই সমস্ত চুক্তিপত্রের মাধ্যমে সুযোগ সুবিধা লাভ করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সনদ বা চুক্তি হল ১২১৫ সালের মহাসনদ, ১৬২৮ সালের অধিকারের আবেদনপত্র, ১৬৮৯ সালের অধিকারের বিল ইত্যাদি।
(২) বিধিবদ্ধ আইন ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট বিভিন্ন সময়ে আইন প্রণয়ন করে সরকারের ক্ষমতা ও কার্যবিধি পরিচালনায় সাহায্য করেছে। এই সমস্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পার্লামেন্ট রাজার ক্ষমতা সংকোচন করে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে, নাগরিকদের ভোটাধিকার সম্প্রসারণ করেছে, সরকারী কর্মচারীদের ক্ষমতা ও কর্তব্য নির্ধারণ করেছে। এই সকল আইনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল - হেবিয়াস কর্পাস আইন (১৬৭৯); সংস্কার আইন সমূহ (১৮৩২, ১৮৬৭ ও ১৮৮৪), সেটলমেন্ট আইন (১৭০১), পার্লামেন্ট আইন (১৯১১ এবং ১৯৪৯), রাজমন্ত্রী আইন (১৯৩৬) ইত্যাদি।
(৩) প্রথাগত আইন ব্রিটিশ সংবিধানের একটি গুরত্বপূর্ণ উৎস হল প্রথাগত আইন। রাজার পরমাধিকার ও পার্লামেন্টের প্রাধান্য ইত্যাদির মূল ভিত্তি হল এই প্রথাগত আইন। এছাড়া জনগণের বাক স্বাধীনতা, সভা সমিতির স্বাধীনতা, ফৌজদারী মামলাতে জুরীর বিচার ইত্যাদি প্রথাগত আইনের মাধ্যমে স্থিরীকৃত হয়েছে।
(৪) বিচারালয়ের সিদ্ধান্ত মোকদ্দমা প্রসূত আইন কিংবা বিধিবদ্ধ আইনের ব্যখ্যা ব্রিটিশ সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ইংল্যান্ডের বিচারপতিগণ বিভিন্ন মামলায় শাসনতন্ত্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান করেছে। বুসেলস মামলায় (১৯৭০) জুরীদের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা এবং হাওয়েল মামলায় (১৬৬৮) বিচারকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করণ ইত্যাদি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। অধ্যাপক ডাইসি তাই ব্রিটিশ সংবিধানকে, 'Judge made Constitution' বলে অভিহিত করেছেন।
(৫) পার্লামেন্টের নিয়ম ও প্রথা হার্ভে ও ব্যাথার এর মতে, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ নিজেদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার উদ্দেশ্যে কতগুলি বিশেষ অধিকার ভোগ করে। এইগুলি হাইকোর্ট অব্ পার্লামেন্টে কর্তৃক প্রযুক্ত হয় এবং এগুলি সংবিধানের অংশ।
(৬) ইউরোপীয় কমিউনিটি আইন ব্রিটিশ সংবিধানের একটি অত্যাধুনিক উৎস হল ইউরোপীয়ান কমিউনিটি আইন। এই আইনের ভিত্তি হল ১৯৭২ সালের 'Treaty of Rome' এবং ১৯৮৭ সালের ইউরোপীয়ান আইন, যার মাধ্যমে রোম চুক্তিটির সংশোধন হয়েছিল। এই আইনের প্রণেতা হলেন ইউরোপীয়ন কমিশন ও কমিউনিটির মন্ত্রী পরিষদ। তাছাড়া কমিউনিটির আদালত কোনো কোনো আইন স্বয়ং বলবতযোগ্য তা ঘোষণা করেন।
(৭) শাসনতান্ত্রিক গ্রন্থ সমূহ ইংল্যান্ডের শাসন ব্যবস্থার উপর বিভিন্ন পন্ডিত ব্যক্তিগণ বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছেন, সেগুলি ব্রিটিশ সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে পরিগণিত। হয়। যেমন – বেজহটের ‘ইংল্যান্ডের শাসনতন্ত্র, মে'র ‘পার্লামেন্টারী প্র্যাকটিস্, জেনিংসের ‘কুইন্স গভর্নমেন্ট' এবং 'ক্যাবিনেট গভর্নমেন্ট' ইত্যাদি গ্রন্থ এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।
(৮) শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি সমূহ ব্রিটিশ সংবিধানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অলিখিত, যাকে ডাইসি কনভেনশনস্ বা রীতিনীতি বলে অভিহিত করেছেন। ডাইসি-র মতে - রীতিনীতি বলতে বোঝাপড়া অভ্যাস ও আচরণ ইত্যাদিকে বোঝায়, যা আইনগত নিয়মকানুনের প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে।
রাজার সঙ্গে মন্ত্রীদের সম্পর্ক, মন্ত্রীদের সঙ্গে পার্লামেন্টের সম্পর্ক, পার্লামেন্টের কার্য পদ্ধতি, লর্ডসভা ও কমনস্ সভার মধ্যে সম্পর্ক, কমনওয়েলথ্ ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি ব্রিটিশ শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি সমূহের অন্তর্গত। এইগুলি আদালত কর্তৃক গ্রাহ্য না হলেও শাসন কার্যে নিযুক্ত সকলেই এইগুলি মেনে চলে এবং জনমতের ভয়ে কেউ-ই এই সমস্ত রীতিনীতিগুলিকে উপেক্ষা করতে সাহস পায় না।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই কথা বলা যায় যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট দলিলকে ব্রিটেনের সংবিধান বলে উল্লেখ করা যায় না। কারণ ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে নিহিত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন লিখিত দলিল এবং অসংখ্য অলিখিত রীতিনীতির মাধ্যমে ব্রিটিশ সংবিধান জন্ম গ্রহণ করেছে।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন