গ্রেট ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকার কারণগুলি আলোচনা কর।
Discuss the reasons responsible for the survival of Monarchy in Great Britain.
রাজতন্ত্র হল ব্রিটেনের রাজনীতিক জীবন ও রাজনীতিক সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য। অঙ্গ। গ্রেট ব্রিটেনের সামাজিক অর্থনীতিক ও রাজনীতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে রাজতন্ত্র বর্তমান শতকেও নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে।
রাজতন্ত্রটিকে থাকার কারণ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত গ্রেট ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকার মূল কারণগুলি হল নিম্নরুপ—
(১) সাংবিধানিক সুযোগ সুবিধা ব্রিটেনে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ফলে রাজতন্ত্রের অবস্থিতি অপরিহার্য্য হয়ে পড়েছে। কারণ সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় একজন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রধানের প্রয়োজন। ব্রিটেনের রাজতন্ত্র এই নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রধানের ভূমিকা পালন করে।
(২) ইংরেজ জাতির রক্ষনশীলতা ও ভাবালুতা ব্রিটেনে রাজতন্ত্রটিকে থাকার একটি অন্যতম কারণ হল ইংরেজ জাতির রক্ষণশীলতা ও ভাবালুতা। কারণ ইংরেজ জাতি প্রকৃতগতভাবে রক্ষণশীল হওয়ায় তারা সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য মন্ডিত এই রাজনীতিক প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করতে চায় না। এই কারণে ব্রিটেনে এখনও রাজতন্ত্র টিকে আছে।
(৩) সামাজিক ভূমিকা ব্রিটিশ সমাজ জীবনের উপর রাজতন্ত্রের প্রভাব সুগভীর। রাণীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন ব্রিটিশ সমাজে আদর্শ স্থানীয় বলে গণ্য হয়। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ সমাজে রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠানের আদর্শ হল রাণী বা রাজ পরিবার।
(৪) গণতন্ত্র বিকাশে রাজশক্তি অন্তরায় নয় ব্রিটেনের রাজশক্তি টিকে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল, রাজশক্তি কখনও গণতন্ত্রের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন নি। এই প্রসঙ্গে ল্যাস্কি বলেছেন – 'রাজশক্তি নিজেকে গণতন্ত্রের নিকট আত্ম সমর্পণ করেছেন'।
(৫) কমনওয়েলথ্ ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন ব্রিটেনের সঙ্গে কমনওয়েলথ্ -এর অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলির যোগসূত্র রক্ষা করেন রাণী। তিনি হলেন কমনওয়েলথ্-এর প্রধান। সুতরাং কমনওয়েলথ্ ভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে ব্রিটেনের জনসাধারণ অতীতের অবলুপ্ত স্মৃতির গৌরব অনুভব করতে পারে।
(৬) ক্লান্তিকর জনজীবনে বৈচিত্র আনে ইংল্যান্ডের সাধারণ মানুষ ক্লান্তিকর, বৈচিত্রহীন ও নিরানন্দময় জীবন যাপন করে। রাজা বা রাণীর সমারোহে সিংহাসনে আরোহন, রাজপরিবারের জাক জমকপূর্ণ বিবাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠান জনসাধারণের জন্য নতুনত্ব আনয়ন করে।
(৭) জাতীয় ঐক্যের প্রতীক রাজতন্ত্র রাষ্ট্রের ও জাতির জীবন্ত প্রতীক। রাণী দেশাত্মবোধের কেন্দ্রবিন্দু এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। তিনি হলেন জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং গৌরবময় সাফল্যের জাতির ধারাবাহিকতা ও জীবন্তরূপ।
(৮) আর্থিক সুবিধা অনেকের মতে রাজতন্ত্র তুলে দিলে অর্থের সাশ্রয় হবে। কিন্তু রাজতন্ত্রের সমর্থকগণ মনে করেন, ব্রিটেনের বাজেটের যে অর্থ ধরা হয় তাতে রাজপরিবারের জন্য খুব কম বরাদ্ধ থাকে। তদুপরি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির পেছনে কম অর্থ ব্যয়িত হয় না।
(৯) রাজনীতি নিরপেক্ষতা রাজা বা রাণীর সর্বদা রাজনীতিক দলাদলীর উর্ধ্বে অবস্থান করেন এবং দল নিরপেক্ষভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। রাজা বা রাণীর এই নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতাই ব্রিটেনের রাজতন্ত্রটিকে থাকার অন্যতম কারণ।
(১০) মন্ত্রী পরিষদকে পরামর্শ প্রদান ইংল্যান্ডের সুদীর্ঘকালের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনো জটিল বিষয়ে রাজা বা রাণী মন্ত্রী পরিষদকে যে পরামর্শ দান করেন মন্ত্রীপরিষদ তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তত্বগতভাবে মন্ত্রীপরিষদ এই পরামর্শকে উপেক্ষা করতে পারলেও তারা সহজে তা করেন না। বিশেষ জরুরী অবস্থার ক্ষেত্রে এই সমস্ত ভূমিকা পালনের জন্য ব্রিটেনের রাজতন্ত্র আজও টিকে আছে।
(১১) শাসক শ্রেণীকে রক্ষা করে রাজতন্ত্র রাজতন্ত্রের সমালোচকদের মতে, রাজতন্ত্রের অস্তিত্ব ও স্থায়ীত্বের মূল কারণ হল শাসক শ্রেণীর সংরক্ষক হিসেবে রাজতন্ত্রের বিশেষ ভূমিকা। অধ্যাপক বার্কার এই প্রসঙ্গে বলেছেন বিপ্লবের স্বপ্ন ও চাঞ্চল্যকর পরিবর্তনকে বাধা দিতে সাহায্য করে রাজতন্ত্র।
(১২) মনস্তাত্ত্বিক কারণ ব্রিটেনের রাজতন্ত্র টিকে থাকার অন্যতম কারণ হল মনস্তাত্ত্বিক কারন। রাণী বা রাজপরিবারের প্রতি ইংরেজ জাতির শ্রদ্ধা, ভালবাসা, অনুরক্তি ইত্যাদি কেবলমাত্র ব্যক্তিগত নয়, বংশানুক্রমিকও বটে। ব্রিটেনের রাজা বা রাণীকে ইংরেজ জাতি পিতাও মাতার মত অভিভাবক কিংবা ঈশ্বরের মত পরিত্রাতা বলে মনে করে।
(১৩) রাজতন্ত্র টিকে থাকার কারণ হিসেবে বামপন্থীদের বক্তব্য :- সবশেষে রাজতন্ত্র টিকে থাকার প্রকৃত কারণ হিসেবে মার্কসবাদী এবং অন্যান্য বামপন্থী লেখকদের বক্তব্য হল, ব্রিটেনের অর্থনীতিক ও রাজনীতিক জীবনে প্রাধান্য বিস্তারকারী বুর্জোয়া শ্রেণী নিজেদের স্বার্থে রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছে। তাদের মতে, ব্রিটিশ শাসক শ্রেণীর অংশ হিসেবে রাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, সামাজিক স্তরবিন্যাস, শ্রেণী ব্যবস্থা ও রক্ষণশীল মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করে রাজতন্ত্রের অন্তরালে থেকে প্রকৃত শাসক গোষ্ঠীই দেশ শাসন করে।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এই কথা বলা যায় যে, গ্রেট ব্রিটেন গণতন্ত্রের পীটভূমি তথা ধারক ও বাহক হওয়া সত্ত্বেও রাজতন্ত্র সেখানে কখনও গণতন্ত্রের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় নি; বরং সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে রাজতন্ত্র গণতন্ত্রের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করে তুলেছে, যার ফলে ব্রিটেনে আজও রাজতন্ত্র নিজের ভূমিকাকে টিকিয়ে রাখতে সামর্থ হয়েছে।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন