মার্কিন সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
(Discuss the salient features of the USA Constitution.)
মার্কিন সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য সমূহ
মার্কিন সংবিধানের সঠিক রূপ জানতে হলে এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করা প্রয়োজন।
১) ক্ষুদ্র ও লিখিত সংবিধান মার্কিন সংবিধান হল বিশ্বের প্রাচীনতম লিখিত সংবিধান। এই সংবিধান ১৭৮৭ সালে ফিলাডেলফিয়ার সম্মেলনে গৃহীত হয় এবং ১৭৮৯ সালে কার্যকরী হয়। মার্কিন সংবিধান হল অন্যতম সংক্ষিপ্ত সংবিধান। শুরুতে মাত্র ১২ পৃষ্ঠা ছিল। এখানে. শুধুমাত্র শাসনব্যবস্থার মূল নীতিগুলির আলোচনা রয়েছে। মার্কিন শাসনতন্ত্র লিখিত হলেও অলিখিত রীতি-নীতির ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মার্কিন ক্যাবিনেট, মার্কিন দলব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়গুলি অলিখিতভাবে গড়ে উঠেছে।
২) দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান মার্কিন সংবিধান হল দুষ্পপরিবর্তনীয় সংবিধান। সংবিধান সংশোধনের জন্য কেন্দ্রীয় আইনসভা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন এবং অঙ্গরাজ্যগুলির তিন চতুর্থাংশের সমর্থন প্রয়োজন। অতিমাত্রায় জটিল হওয়ার জন্য মার্কিন শাসনতন্ত্র আজ পর্যন্ত মাত্র ২৬ বার সংশোধিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র অলিখিত হওয়ার দরুন সংবিধান হল সুপরিবর্তনীয়।
৩) জনগণের সার্বভৌমিকত্ব জনগণের সার্বভৌমিকতা মার্কিন সংবিধানে বিশেষভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মার্কিন সংবিধানে শুরুতে আমরা মার্কিন জনগণ (We the people of 1 the United States...) কথাটির মধ্য দিয়ে গণসার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি পেয়েছে। এর অর্থ হল মার্কিন সংবিধানের উৎস এবং আইনগত ভিত্তি হল মার্কিন জনগণ ।
৪) সংবিধাংনের প্রাধান্য সংবিধানের ৬ নং ধারায় মার্কিন সংবিধানকে দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে বর্ণনা করাহয়েছে। এর অর্থ হল যে, দেশের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন সংবিধানের গণ্ডির মধ্যে কাজ করবে। আইনবিভাগ প্রণীত কোনো আইন সংবিধান-বিরোধী হলে তা বাতিল হবে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব পালন করে।
৫) যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মার্কিন সংবিধান হল যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান। এখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার বন্টন, লিখিত ও দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান, সংবিধানের প্রাধান্য এবং যুক্তরাষ্ট্রীয়। আদালত ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলি পাওয়া যায়। অধ্যাপক স্ট্রং মন্তব্য করেন মার্কিন সংবিধান হল বিশ্বের সর্বাপেক্ষা আদর্শ যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান ।
৬) ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি হল মার্কিন সংবিধানের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে সরকারের তিনটি প্রধান ক্ষমতা যথাক্রমে আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের হস্তে অর্পণ করা হয়েছে। আইন প্রণয়ণের দায়িত্ব কংগ্রেসের হাতে, শাসন ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে, বিচার-সংক্রান্ত ক্ষমতা বিচার বিভাগের হাতে অর্পিত হয়েছে।
৭) নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের নীতি ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের নীতি লক্ষ করা যায়। এই নীতিকে Theory of Checks and Balances বলা হয়। সরকারের তিনটি বিভাগের মধ্যে কোনো বিভাগ যাতে অধিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ব্যক্তি-স্বাধীনতা খর্ব করতে না পারে সেই উদ্দেশ্যে এই নীতিটি গ্রহণ করা হয়েছে। এই নীতি অনুযায়ী এক বিভাগ অন্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারসাম্য রক্ষা করে।
৮) রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতির হাতে শাসন বিভাগের যাবতীয় ক্ষমতা ন্যস্ত। তিনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। সম্পাদিত কার্যাবলীর জন্য তিনি কংগ্রেসের নিকট দায়িত্বশীল নন। মন্ত্রীসভার সদস্যগণ রাষ্ট্রপতির অধস্তন কর্মচারী মাত্র।
৯) মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি মার্কিন সংবিধানই সর্বপ্রথম নাগরিকের জন্য লিপিবদ্ধ মৌলিক অধিকারের রীতি গড়ে তুলেছেন। সংবিধান প্রবর্তনের পর প্রথম দশটি সংশোধনে মৌলিক অধিকারগুলি সংযুক্ত করা হয়। এই অধিকারগুলি হল – বাক্ স্বাধীনতা, মুদ্রাযন্ত্রের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার, আইনের দৃষ্টিতে সাম্য ইত্যাদি।
১০) সরকারী ভাগবাটোয়ারা পদ্ধতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে রাষ্ট্রপতি দলের সমর্থকগণকে নিযুক্ত করেন। পূর্বের রাষ্ট্রপতির সময়ে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের পদত্যাগ করতে হয়। সরকারী ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও এই ভাগবাটোয়ারা পদ্ধতিকে 'Spoil System' বলা হয়।
১১) বিচার বিভাগের প্রাধান্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বিভাগের প্রাধান্য স্বীকার করা হয়েছে। শাসনবিভাগের নির্দেশ অথবা আইনবিভাগের আইন সংবিধানসম্মত না হলে বিচারবিভাগ তা অবৈধ ঘোষণা করতে পারে। সংবিধানের কোনো বিষয় সম্বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত।
১২) দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা ব্রিটেনের ন্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুটি প্রধান দল হল (১) গণতান্ত্রিক দল (২) সাধারণতন্ত্রী দল। এই দুটি দলের আদর্শ ও কর্মসূচীর মধ্যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য নেই। তাই একে অস্পষ্ট দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা বলা হয়।
মার্কিন সংবিধানের উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলির পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, এখানে উদারনৈতিক রাষ্ট্র দর্শনের সমাবেশ ঘটেছে। রাজনৈতিক সাম্য, একাধিক দলব্যবস্থা, প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকার, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলি বর্তমান। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন সংবিধানের রচয়িতাগণ টমাস পেইন, জন লক প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের উদারনৈতিক দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হন।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন