মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভার স্পীকার এবং ব্রিটেনের কমন সভার স্পীকারের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা কর।
Make a comparative study between the speaker of the British House of Commons and the speaker of the US Representive House.
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভার স্পীকার এবং ব্রিটেনের কমন সভার স্পীকারের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা কর।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিয় আইনসভার নিম্ন কক্ষে অর্থাৎ প্রতিনিধি সভার সভাপতিকেও স্পীকার নামে অভিহিত করা হয়। বস্তুতপক্ষে মার্কিন প্রতিনিধি সভার স্পীকারের পদটি অষ্টাদশ শতাব্দীর ব্রিটিশ রীতিনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ স্পীকার যে সমস্ত কার্যগুলি সম্পাদন করেন প্রতিনিধি সভার স্পীকার যে সমস্ত কার্যাবলী সম্পাদন করেন, প্রতিনিধি সভার স্পীকারও প্রায় অনুরূপ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। কিন্তু দুই দেশীয় শাসনব্যবস্থার মধ্যে প্রকৃতিগত মৌলিক পার্থক্য থাকার ফলে ব্রিটিশ কমনসভা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি উপর স্পীকারদ্বয়ের মধ্যে ক্ষমতা কার্যাবলী নির্বাচন পদ্ধতি, পদমর্যাদা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
ব্রিটিশ স্পীকার ও মার্কিন স্পীকারের মধ্যে পার্থক্য
এই প্রারম্ভিক মন্তব্যের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পীকার ও ব্রিটেন স্পীকারের মধ্যে ক্ষমতা কার্যাবলী নির্বাচন পদ্ধতি, পদমর্যাদা সংক্রান্ত দিকগুলির পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক আলোচনা করা যায়।
(১) নির্বাচন পদ্ধতির ক্ষেত্রে পার্থক্য ব্রিটেনে দলীয় মতামতের উর্ধ্বে উঠে স্পীকার নির্বাচন করা হয়। স্পীকারের পদে কোনও ব্যক্তিকে নির্বাচনের পূর্বে সাধারণত প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের সঙ্গে পরামর্শ করে। সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন একজনের নাম স্পীকার পদের জন্য স্থির করা হয়। কমন্সসভায় সরকারের তরফে একজন সদস্য স্পীকার পদের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করেন এবং বিরোধী দলের একজন সদস্য এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। আর এভাবে সরকারী দল ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তিতে স্পীকার নির্বাচিত হন। স্পীকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্রিটেনে আরও একটি প্রথা গড়ে উঠেছে। বিগত কমন্স সভার স্পীকার সক্ষম ও সুস্থ থাকলে এবং স্পীকার নিজে যদি সংশ্লিষ্ট পদ গ্রহণে ইচ্ছুক থাকলে সাধারণত তাকেই স্পীকার পদে পুনঃ নির্বাচিত করা হয়। তিনি যাতে কমন্স সভার সদস্য হয়ে আসতে পারেন সেইজন্য সাধারণ নির্বাচনে কোনো দলই স্পীকারের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয় না।
পক্ষান্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভায় দলীয় ভিত্তিতে স্পীকার নির্বাচিত হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণের নীতি প্রচলিত থাকায় রাষ্ট্রপিত বা তার ক্যাবিনেটের কোন সদস্য প্রতিনিধি সভায় দলের নেতৃত্ব প্রদান করতে পারে না। ফলে স্পীকারকে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। বস্তুতপক্ষে প্রতিনিধি সভায় দলকে নেতৃত্ব প্রদান করাই হল তার কাজ। স্পীকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি সভার সদস্যগণ দলীয় ভিত্তিতে ভোট প্রদান করে। ব্রিটেনের মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পীকার পদে সব দল স্বীকৃত কোন প্রার্থী নির্বাচন সম্ভব নয়।
২) দলীয় নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে পার্থক্য ব্রিটেনের স্পীকার পদের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। স্পীকার হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার দলীয় সদস্য পদ এবং দলের সাথে সকল সম্পর্ক ত্যাগ করেন। তিনি কোন দলীয় সভা সমিতিতে যোগদান করেন না এবং দলীয় সমস্যা সম্পর্কে মতামত করেন না। বিতর্কমূলক কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি তার ব্যক্তিগত মতামতও ব্যক্ত করেন না। কমন্স সভার ভেতরে ও বাইরে তার বক্তব্য ও আচরণের মধ্য দিয়ে যাতে কোনও বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন না হয় সে বিষয়ে স্পীকার সম্পূর্ণ সচেতন থাকে।
পক্ষান্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি সভার স্পীকার পদে নির্বাচিত হওয়ার পরেও দলের সাথে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক বজায় থাকে। কেননা স্পীকার হলো প্রতিনিধি সভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং প্রতিনিধি সভায় দলীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য এবং দলীয় নীতি নির্ধারণ করা, দলীয় সিদ্ধান্তকে আইনের রূপে প্রয়োগ করা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে তাকে নেতৃত্ব প্রদানকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়।
৩) অর্থনীতির সংক্রান্ত বিষয়ে ক্ষমতার পার্থক্য অর্থবিল সংক্রান্ত বিষয়ে ব্রিটিশ স্পীকারের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। কোনও বিল অর্থবিল কি না সে বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিলে স্পীকারের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত হিসাবে গৃহীত হয়। তাছাড়া প্রতিটি অর্থবিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিলটি একটি অর্থবিল এই মর্মে স্পীকারকে একটি সার্টিফিকেট প্রদান করতে হয়।
পক্ষান্তরে অর্থবিল সংক্রান্ত বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পীকারের ব্রিটিশ স্পীকারের ন্যয় ক্ষমতা নেই।
৪) সভার কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে পার্থক্য ব্রিটিশ স্পীকার এবং মার্কিন স্পীকার উভয়েই নিজ নিজ সভার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন থাকেন। সভার কার্য পরিচালনা সম্পর্কিত বিধি নিয়মের ব্যাখ্যা প্রদান সদস্যদের প্রস্তাব ও বক্তব্য পেশ এবং আলোচনার অনুমতি প্রদান, সভার মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করবে প্রভৃতি দায়িত্ব উভয়েই সম্পাদন করেন। কিন্তু এই সকল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ স্পীকার সম্পূর্ণরূপে নিরপক্ষে ভূমিকা পালন করেন। সভার কার্যপরিচালনা সংক্রান্ত বিধিনিয়মের ব্যাখ্যা প্রদান এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি পূর্ববর্তী নজির অনুসরণ করেন। প্রস্তাব উত্থাপন এবং আলোচনার অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সংখ্যালঘু দলের সদস্যদের মধ্যে কোনরকম পার্থক্য করেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তিনি পেছনের সারির বক্তা সদস্যদের অধিকতর সুযোগ প্রদান করেন।
পক্ষান্তরে, সভার কার্য পরিচালনা হিসেবে মার্কিন স্পীকার সদলীয় সদস্যদের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করেন। দলীয় স্বার্থের দিকে দৃষ্টি রেখে তিনি সভার কার্য পরিচালনা সংক্রান্ত বিধিগুলিকে ইচ্ছামত ব্যাখ্যা করেন।
৫) আলোচনায় অংশগ্রহণ ও ভোটদানের ক্ষেত্রে পার্থক্য ব্রিটিশ স্পীকার কমন্স সভার আলোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন না। বস্তুতপক্ষে সভার কার্য পরিচালনার জন্য যতটুকু কথা বলার প্রয়োজন তার বাইরে একটি কথাও তিনি বলেন না। বিল উত্থাপনে তিনি যেমন অংশ নেন না, তেমনি কোন বিলের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেয় না। যদি কোন প্রস্তাবের স্বপক্ষে বিপক্ষে সম সংখ্যায় ভোট পড়ে, তাহলে স্পীকার নির্ণায়ক ভোট প্রদান করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে ও তিনি এমনভাবে তার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, যাতে বিষয়টির চুড়ান্ত মীমাংসা না হয় এবং এ নিয়ে পুনরালোচনার সুযোগ থাকে।
পক্ষান্তরে, মার্কিন স্পীকার প্রতিনিধি সভার দলীয় স্বার্থে বক্তৃতা করেন, ভোট দান এবং বিল উত্থাপন করেন। গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলি যাতে প্রতিনিধি সভায় দ্রুত গৃহীত হয় সে বিষয়ে মার্কিন স্পীকারকে দলের স্বার্থে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হয়।
৬) কমিটি গঠন সংক্রান্ত ব্যাপারে পার্থক্য কমিটির সভাপতিদের ব্রিটিশ স্পীকার নিয়োগ করেন। তিনি নিজে গুরুত্বপূর্ণ দুটি কমিটি যথা রুলস কমিটি এবং বিজনেস এডভাইজারি কমিটি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কোন বিল কোন কমিটির হবে তাও স্পীকার ঠিক করেন। ব্রিটিশ স্পীকার এসকল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে বলে এ বিষয়ে তার ক্ষমতা সংকোচনের কোন দাবি উঠে নি।
পক্ষান্তরে, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে মার্কিন স্পীকার ও এক সময় ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তিনি নিজে রুলস কমিটির সভাপতি ছিলেন। বিভিন্ন কমিটিতে সদস্য মনোনয়নের ব্যাপারে তার প্রায় সীমাহীন ক্ষমতা ছিল। কিন্তু মার্কিন স্পীকার স্বেচ্ছাচারীর মত তার সকল ক্ষমতাকে প্রয়োগ করতে থাকায় পরবর্তীকালে কমিটি গঠন সংক্রান্ত বিষয়ে স্পীকারের ক্ষমতাকে বিশেষভাবে সঙ্কুচিত করা হয়েছে।
৭) বাস্তব ক্ষমতা ও পদমর্যাদাগত ক্ষমতা সবশেষে বাস্তব ক্ষমতা এবং পদমর্যাদাগত পার্থক্যের বিচারে বলতে হয়, ব্রিটিশ স্পীকার মার্কিন স্পীকারের তুলনায় ক্ষমতাশালী। কিন্তু মর্যাদাগত বিচারে মার্কিন স্পীকারের স্থান ব্রিটিশ স্পীকারের তুলনায় কম হলেও বাস্তবে তা একটু ভিন্ন রকমের।
মূল্যায়ন মার্কিন স্পীকার সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা হিসাবে যে ক্ষমতা ভোগ করে তা সংসদীয় ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবে অনেকটা প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার ন্যায়। তিনি আইন প্রণয়ণ কার্যে নেতৃত্ব প্রদান করেন। বস্তুতপক্ষে তার রাজনৈতিক ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেহেতু মার্কিন স্পীকার রাজনৈতিক নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন সেহেতু তার সিদ্ধান্ত ও কার্যকলাপ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়বস্তু। ব্রিটিশ স্পীকারের ন্যায় মার্কিন স্পীকার প্রতিনিধি সভার সকল সদস্যদের নিকট থেকে স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য ও শ্রদ্ধা লাভ করেন না। পক্ষান্তরে, ব্রিটিশ স্পীকারের বাস্তব ক্ষমতা না থাকতে পারে, কিন্তু তিনি তার নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য সমগ্র কমন্স সভার স্বতঃস্ফূর্ত আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন। স্পীকারের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কোনা রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয় না, বা এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানানোর এমন ঘটনা ব্রিটেনে অকল্পনীয়। মর্যাদার বিচারে তাই মার্কিন স্পীকারের তুলনায় ব্রিটিশ স্পীকারের স্থান উর্ধ্বে।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন