মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলোচনা করো। অথবা সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী উচ্চকক্ষ বলা হয় কেন?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলোচনা করো।
(Discuss the powers and functions of the Senate in USA)
অথবা সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী উচ্চকক্ষ বলা হয় কেন?
(Why Senate is called the most powerful chamber of the world?)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভায় উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ জনপ্রতিনিধিসভা নামে পরিচিত। মার্কিন সিনেট প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে ২জন করে নির্বাচিত সদস্য নিয়ে মোট ১০০ জন সদস্য দ্বারা গঠিত। সিনেট সদস্য প্রার্থীকে মার্কিন নাগরিক এবং ৩০ বছর বয়স্ক হতে হবে। সাধারণভাবে সিনেট একটি স্থায়ী কক্ষ এবং কার্যকাল ৬ বছর। প্রতি ২বছর অন্তর এক তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন।
ক্ষমতা ও কার্যাবলী :
মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ হিসাবে সিনেট এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ও কার্যাবলী সম্পাদনের অধিকারী যার জন্য সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় কক্ষ বলা হয়। লীণ্ডাস রোজার্স-এর মতে, “সিনেট হল আধুনিক রাজনীতির সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় আবিষ্কার।”
১) আইন-সংক্রান্ত শুধুমাত্র অর্থবিল ছাড়া অন্যান্য সমস্ত বিল সিনেটেও উত্থাপিত হতে পারে। অর্থবিল উত্থাপন করতে না পারলেও বিলের শিরোনাম বাদ দিয়ে সমস্ত অংশের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এছাড়া সিনেটের অনুমোদন ব্যতীত কোনো বিল আইনে পরিণত হতে পারে না। সুতরাং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সিনেট গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী। ব্রিটেনে লর্ডসভা এরূপ ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করে না।
২) নিয়োগ-সংক্রান্ত ক্ষমতা সিনেটের পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতির যে কোনো নিয়োগ বাতিল হয়ে যেতে পারে। অবশ্য বর্তমানে সিনেটের সৌজন্যের জন্য রাষ্ট্রপতি পূর্বেই সিনেটের সঙ্গে পরামর্শ করে থাকেন। অবশ্য এক্ষেত্রেও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সিনেট মনে করলে সিনেটীয় সৌজন্যবোধ উপক্ষো করে রাষ্ট্রপতির যে কোনো নিয়োগকে বাতিল করতে পারে।
৩) সন্ধি, চুক্তি ইত্যাদি অনুমোদন-সংক্রান্ত ক্ষমতা দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে রাষ্ট্রপতি যে কোনো বৈদেশিক চুক্তি সম্পাদন করেন। তবে এই সমস্ত চুক্তির সম্পাদন সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষ। এছাড়া যে কোনো বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার জন্য সিনেট রাষ্ট্রপতির নিকট অনুরোধ করতে পারে।
৪) তদন্ত-সংক্রান্ত ক্ষমতা সিনেটের একটি অন্যতম ক্ষমতা হল যে, রাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত যে কোন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর কার্যাবলী তদন্ত করতে পারে। সিনেটের তদন্তের ভয়ে সরকারী কর্মচারীগণ ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকেন।
৫) বিচার-সংক্রান্ত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট আনয়ন করতে না পারলেও তা বিচার করার ক্ষমতা সিনেটের রয়েছে। এছাড়া উপরাষ্ট্রপতির নির্বাচন, বৈদেশিক সম্পর্ক ইত্যাদি ক্ষেত্রে সিনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রিটেনে লর্ডসভার এই সমস্ত ক্ষমতা নেই।
উপরিউক্ত কার্যাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় কক্ষ বলা হয়।
সিনেটের ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণ বর্তমানে সিনেটকে নিম্নলিখিত কারণেও বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় ব্যবস্থা বলা হয় :
প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিনেট জনপ্রতিনিধি সভাকে নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি থাকার ফলে রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে সিনেটই জনপ্রতিনিধি সবাকে নিয়ন্ত্রণ করে। যে কক্ষ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত ও আইন প্রণয়নকারী সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে সেই কক্ষ নিঃ সন্দেহে একটি শক্তিশালী কক্ষ। ব্রিটেনে লর্ডসভা অথবা ভারতে রাজ্যসভার অনুরূপ ক্ষমতা নেই।
দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নীতি থাকার জন্য সিনেট রাষ্ট্রপতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। রাষ্ট্রপতি ও সিনেট পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করে রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
তৃতীয়ত, সিনেট একটি স্থায়ী কক্ষ। এছাড়া এর সদস্যগণ প্রত্যক্ষভাবে জনগনের দ্বারা প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। এর ফলে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সিনেট প্রতিনিধি সভা থেকে অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
চতুর্থত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ, ডাক্তার, উকিল, আইনীজীবী সকলেই জনপ্রতিনিধি সভার সদস্য হওয়া অপেক্ষা সিনেটের সদস্য হওয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বলে মনে করেন।
পঞ্চমত, নিরপেক্ষতা সিনেটের একটি অন্যতম উপাদান হিসাবে কাজ করে। বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, রাষ্ট্রপতির দলভুক্ত সদস্যরাও রাষ্ট্রপতির কার্যাবলীর সমালোচনা ও প্রয়োজনবোধে অসম্মতি উত্থাপন করে থাকে। তত্ত্বগতভাবে সিনেটকে নিরপেক্ষ বলে মনে হলেও বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অধিক আস্থাসম্পন্ন রাষ্ট্রপতির কার্যাবলীর সমর্থন প্রকাশ করাই সিনেটের অন্যতম কাজে পরিণত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীন সঙ্কট থেকে মার্কিন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার গুরুদায়িত্ব রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সিনেটের হস্তেও অর্পিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ল্যাস্কি মন্তব্য করেন যে - - সিনেটের সহযোগিতা ছাড়া রাষ্ট্রপতি চলতে পারে না। এর ফলে সিনেট আজ একটি অদ্বিতীয় ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় কক্ষে পরিণত হয়েছে। সুতরাং উচ্চকক্ষ হিসাবে মার্কিন সিনেট ব্রিটেনের লর্ডসভার তুলনায় অধিকতর মর্যাদার অধিকারী হয়। হ্যারিস মন্তব্য করেন – Senate is the most powerful chamber of the world. আইন প্রণয়ন, শাসনবিভাগকে নিয়ন্ত্রণ, পররাষ্ট্র বিষয়ে মার্কিন সিনেট ব্রিটিশ লর্ডসভা অথবা ফরাসি সিনেটের তুলনায় ক্রমাগতভাবে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। তাই সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় কক্ষ হিসেবে অভিহিত করাহয়।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন