শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি বলতে কি বোঝ। এগুলির শ্রেনি বিভাজন কর। গ্রেট ব্রিটেনে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলিকে মান্য করা হয় কেন?
শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি বলতে কি বোঝ। এগুলির শ্রেনি বিভাজন কর। গ্রেট ব্রিটেনে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলিকে মান্য করা হয় কেন?
What do you mean by conventions ? Classify them. Why are they obeyed ?
ব্রিটিশ সংবিধানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল রীতিনীতি। এই রীতিনীতিগুলি কেবলমাত্র সংখ্যার দিক থেকেই বিশাল নয়, এগুলির উপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক বিধিবিধানও নির্ভরশীল। রাজার সঙ্গে মন্ত্রীসভার এবং মন্ত্রীসভার সঙ্গে পার্লামেন্টের সম্পর্ক, পার্লামেন্টের অধিবেশন, আভ্যন্তরীন কার্যপদ্ধতি, নাগরিকদের অধিকার ইত্যাদি বিষয়সমূহ শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির উপর নির্ভরশীল।
শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির অর্থ সাংবিধানিক রীতিনীতি বলতে আইনসভা প্রণীত আইনের বর্হিভূত বিধি ও নিয়মাবলীর সমষ্টিকে বোঝায় যা দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে আইনের মতন কার্যকরী। অধ্যাপক জেনিংস এর মতে, সাংবিধানিক রীতিনীতি হল প্রথা ও প্রয়োজনীয়তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নিয়মাবলীর সমষ্টি। অধ্যাপক ডাইসির মতে, সাংবিধানিক রীতি নীতি বলতে সেই সমস্ত অলিখিত নিয়মকানুন ও পদ্ধতির সমষ্টিকে বোঝায় যা দীর্ঘকালীন রাজনীতিক আচার আচরণ ও ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে গড়ে ওঠেছে কিন্তু এগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য নয়।
শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির শ্রেনিবিভাজন ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাংবিধানিক রীতিনীতিগুলিকে সাধারণত নিম্নলিখিত চারভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা:
১) রাজশক্তির ক্ষমতা ও কার্যবলী সংক্রান্ত রীতিনীতি।
২) ক্যাবিনেটের কার্যাবলী সংক্রান্ত রীতিনীতি।
৩) পার্লামেন্টীয় কার্যাবলী সংক্রান্ত রীতিনীতি।
৪) কমনওয়েলথ্ সম্পর্কিত রীতিনীতি সমূহ।
রীতিনীতিগুলিকে মান্য করার কারণ ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থায় রীতিনীতি সমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অধিকারী হলেও এগুলি কোনো আইন নয়। এই সমস্ত রীতিনীতিগুলির পশ্চাতে কোনো ধরণের আইনগত সমর্থন নেই কিংবা এগুলি আদালত কর্তৃক গ্রাহ্যও নয়। তা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সাংবিধানিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন কারণে এই সমস্ত রীতিনীতিগুলিকে মান্য করা হয়, কারণ—
১) জনমতের চাপ ব্রিটেনে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলিকে মেনে চলার মূল কারণ হল জনমতের চাপ। কারণ ব্রিটেনের জনসাধারণ সাংবিধানিক রীতিনীতিগুলিকে বাধ্যতামূলক ও পবিত্র বলে মনে করে। তাই রাজনীতিক ফলাফলের দিকে লক্ষ্য রেখে শাসক দল ও বিরোধীদল উভয়ই রীতিনীতিগুলি মান্য করে চলে।
২) রাজনীতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ অধ্যাপক জেনিংস এবং ফিলিপস্-এর মতে,রাজনীতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণে গ্রেট ব্রিটেনে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলিকে মান্য করা হয়। কারণ রীতিনীতিগুলিকে অমান্য করলে আদালতের মাধ্যমে তা বলবৎ করা যায় না কিংবা অমান্য কারীর কোনো শাস্তি না হলেও রাজনীতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৩) ইংরেজ জাতির রক্ষণশীলতা ব্রিটিশ জাতি সাধারণভাবে রক্ষণশীল এবং ঐতিহ্যের প্রতি অত্যন্ত রক্ষণশীল। অতীতের সমস্ত রীতিনীতি, প্রতিষ্ঠান, পদ্ধতি ইত্যাদি সংরক্ষণের মাধ্যমে ইংরেজ জাতি অতীতের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই রক্ষণশীল ব্রিটিশ জাতি এই সমস্ত রীতিনীতিগুলিকে সংরক্ষণের ব্যাপারে অতিমাত্রায় আগ্রহী।
৪) সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে গ্রেট ব্রিটেনের সাংবিধানিক ইতিহাস পর্যালোচনা। করলে দেখা যায় যে, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি সমূহ শাসনকার্যের অতীতের সঙ্গে বর্তমানে এবং বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের সংযোগ সাধন করে শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ সাংবিধানিক ব্যবস্থায় রীতিনীতিগুলির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা হয়।
৫) সরকারী ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখে গ্রেট ব্রিটেনের সাংবিধানিক ব্যবস্থার শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলি শাসনব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই রীতিনীতিগুলিকে অমান্য করলে ব্রিটিশ সাংবিধানিক ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে। এবং তার ফলে ব্রিটেনের সরকারী কাঠামো গতিহীন হয়ে ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।
৬) সংবিধানকে নমনীয় ও গতিশীল করে গ্রেট ব্রিটেনে শাসনব্যবস্থায় শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি সমূহ আইনের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা দূর করে সরকারী যন্ত্রকে গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ এই সমস্ত রীতিনীতিগুলি সাধারণভাবে নমনীয় ও গতিশীল। ফলে এই সমস্ত শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি সমূহের মাধ্যমে ব্রিটিশ সংবিধানের নমনীয়তা ও গতিশীলতা বজায় থাকে।
(৭) জনসমর্থন গ্রেট ব্রিটেনের শাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকার কারণে তা দেশবাসীর রাজনীতিক জীবন ধারার সাথে অত্যন্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এই সমস্ত রীতিনীতিগুলির পশ্চাতে জনসাধারণের নীরব সম্মতি ও সমর্থন সতত বৰ্তমান। এইগুলিকে অমান্য করা হলে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই কারণে এই সমস্ত রীতিনীতিগুলিকে মান্য করা হয়।
৮) বাস্তব উপযোগিতা অধ্যাপক ফ্রীম্যান-এর মতে, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলির গুরুত্বকে যেহেতু কোনো ভাবেই অস্বীকার করা যায় না, সেহেতু এগুলিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মান্য করা হয়। কারণ ব্রিটেনের জনজীবনে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলির উপযোগিতা অনস্বীকার্য। আর এই বাস্তব উপযোগিতা উপলব্ধির কারণে রীতিনীতিগুলিকে মান্য করা হয়।
৯) ক্যাবিনেট ব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য ব্রিটেনে কমন্সসভার সংখ্যা গরিষ্ঠদলের সদস্যদের নিয়ে ক্যাবিনেট গঠিত হয়। ক্যাবিনেটের পরামর্শক্রমে রাজা বা রাণী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, কমন্সভার আস্তা হারালে ক্যাবিনেটের পতন ঘটে এবং লর্ডসভার উপর কমন্সভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই সমস্ত রীতিনীতিগুলিকে অমান্য করা হলে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট ব্যবস্থার মূল বুনিয়াদই ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এই সমস্ত রীতিনীতিগুলির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা হয়।
১০) আইনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা অনেকের মতে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলিকে অমান্য করা হলে তা আইনে পরিণত হবে এই আশঙ্কা থেকেও গ্রেট ব্রিটেনে রীতিনীতিকে মান্য করা হয়। যেমন ১৯০৯ সালে লর্ড সভা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে কমন্সসভা কর্তৃক অনুমোদিত রাজস্ববিল প্রত্যাখান করে। এর ফলে লর্ডসভার ক্ষমতা হ্রাস করে ১৯১১ সালে পার্লামেন্ট আইন প্রণিত হয় এবং এই আইনের মাধ্যমে অর্থবিল সংক্রান্ত লর্ড সভার ক্ষমতা খর্ব করা হয়।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটিশ সংবিধানের অন্যতম উৎস হিসেবে পরিচিত শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির পশ্চাতে কোনো ধরণের আইনের সমর্থন না থাকলেও কিংবা এগুলি আদালত কর্তৃক গ্রাহ্য না হলেও এগুলি বাস্তব উপযোগিতার প্রতি লক্ষ্য রেখেই গ্রেট ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় শাসনতান্ত্রিক নীতি সমূহের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন