বনের অধিকার বিল ২০০৬
বর্তমানে আমাদের দেশে মোট অরণ্যের পরিমাণ ৭ কোটি হেক্টরের কাছাকাছি , যা গোটা দেশের আয়তনের ২২ শতাংশ মাত্র । আবার আমাদের দেশে এই বনাঞ্চলের বন্টন এতটাই বিষম যে , পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক । আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার নয় শতাংশ হল উপজাতি জনগোষ্ঠী । স্বাধীনতার পর অরণ্যের বসবাসকারী উপজাতি সম্প্রদায় যে ন্যায্য অধিকার পাবে , তা ভাবা খুবই স্বাভাবিক ছিল । কিন্তু স্বাধীনতার পরও প্রজন্মের পর প্রজন্ম অরণ্যে বসবাস করলেও সেই অরণ্যের সম্পদ বা জমির ওপর উপজাতি সম্প্রদায়কে এতদিন কোনও আইনি অধিকার দেওয়া হয়নি । যে কোনও অজুহাতে বা উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ - এর বন্দোবস্ত ছাড়াই তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে । অরণ্যে বসবাসকারী উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রতি ক্রমাগত হয়ে চলা এই ঐতিহাসিক অবিচার দূর করার জন্যই গত ১৮ ডিসেম্বর ২০০৬ অরণ্যের অধিকার বিল , | ২০০৬ সংসদে অনুমোদন পায় । প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশনের পরে আইটি কার্যকর হয়েছে ১ জানুয়ারী , ২০০৮ তারিখ থেকে ।
এই আইনের সুবাদে চার ধরণের অধিকার অর্জন বা ' অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে । এগুলি হল : ( ১ ) নাম সত্ব অধিকার ( Title Rights ) ( ২ ) উপযোগিতা ব্যবহারের অধিকার ( Use Rights ) ( ৩ ) খয়রাতি ও উন্নয়নের অধিকার ( Relief and Development Right ) এবং ( ৪ ) বনভূমি তদারকির অধিকার ( Forest Management Rights ) । এই অরণ্যের অধিকার আইনে বলা হয়েছে স্বীকৃত তপশীলি উপজাতি গোষ্ঠীর সদস্য হতে হবে অথবা সংশ্লিষ্ট বনাঞ্চলে ৭৫ বছরে বাসিন্দা হতে হবে । দ্বিতীয়ত , দাবিদারের মূল বাসভূমি হতে হবে সংশ্লিষ্ট বনাঞ্চল এবং জীবিকা । অর্জনের জন্য যে সর্বতোভাবে অরণ্য ও অরণ্য জমির ওপরেই নির্ভরশীল । এই বনভূমি আইনের প্রয়োগ , দাবির মীমাংসা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়েছে একটি যৌথ ধরণের কমিটির ওপরে , যেখানে শরিক হিসাবে থাকবে সংশ্লিষ্ট গ্রামসভা , তিনজন সরকারী আধিকারিক ও সংশ্লিষ্ট স্তরের তিনজন নির্বাচিত পঞ্চায়েত বা স্থানীয় সদস্য । সর্বোপরি , এই আইনি অধিকারকে তৃণমূল স্তরে রূপায়ণের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত তথা ‘ গ্রামসভা'কে দেওয়া হয়েছে প্রায় সর্বাত্মক ক্ষমতা।
অরণ্যে বসবাসকারী জনসম্প্রদায়কে অরণ্য ভূমির ওপর অধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বন সংরক্ষণ , তথা দেশের জৈব বৈচিত্র্য সংরক্ষণের কাজে তাদের সামিল করাই এই আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য । অরণ্যের অধিকার সম্পর্কিত এই আইন সদ্য কার্যকর হয়েছে । এই আইনের রূপায়ণ প্রসূত সুফল বা কুফল সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি । তবে , এই মুহূর্তে এই আইন যে দেশের লক্ষ লক্ষ অন্তেবাসী অরণ্যবাসী মানুষদের কাছে স্বাধিকার ও আত্মমর্যাদার আলো দেখাতে সক্ষম হয়েছে , তার মূল্যও কিন্তু অপরিসীম ও অসাধারণ ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন