বনজ সম্পদ সংক্ষরণে উপজাতি সংস্কৃতি ( Tribal culture and it's linkage with forest resources and their conservation )
উপজাতি মানুষের সঙ্গে বনের একটি বিরাট সম্পর্ক আছে । সেজন্য বন উন্নয়ন কর্পোরেশন সহ সমস্ত ব্যবস্থাপকদের প্রাথমিক কাজই হবে বন সংলগ্ন উপজাতি মানুষের উপযুক্ত জীবিকা , ধর্ম ও সংস্কৃতি বজায় রাখার ব্যবস্থা করা । তাদের উপযুক্ত জীবিকা সংস্থানের মাধ্যমে বনের রক্ষণ , পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের কাজে যুক্ত করা । এইসব সম্প্রদায়ের প্রচলিত অধিকার এবং স্বার্থ রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন বন প্রকল্পে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে । যেমন সামাজিক বনায়ন , গ্রামভিত্তিক বনায়ন ইত্যাদি ।
বনের কাছে যাঁরা বাস করেন তাঁরা চিরকালই ছোটখাট ব্যাপারে বনের উপর নির্ভর করে এসেছেন । এই চাপে বনভূমির বিশেষ কোন ক্ষতি হয় না কিন্তু বেআইনীভাবে ঠিকাদার ও তাদের মজুরদের গাছকাটা বনধ্বংসের অন্যতম কারণ । এই কাজ বন্ধ করতে ঠিকাদারের পরিবর্তে উপজাতি সম্প্রদায়ের সমবায় মজুর সমবায় , সরকারি সমবায় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিযুক্ত করা দরকার । উপজাতিদের ব্যক্তিগত মালিকানায় সরকারি সাহায্যে বৃক্ষরোপণ করা । এর উদ্দেশ্য হল গ্রামাঞ্চলের উপজাতিদের নিজস্ব চাহিদা যেমন জ্বালানী কাঠ , পশুখাদ্য , আবাস তৈরির কাঠ প্রভৃতি সেই অঞ্চলে সংস্থান করা । রাজস্বদায়ক গ্রামের মতো বনাঞ্চলের গ্রামগুলির উন্নতি সাধন করা । পরিবারভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে উপজাতি মানুষদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা । গৌণ বনজ দ্রব্যের রক্ষণ , পুনরুৎপাদন এবং উপযুক্ত সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে এই দ্রব্যের বাজারে বিক্রির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা করা ।
সার্বিক উন্নয়ন কর্মসূচীর মাধ্যমে বনসংলগ্ন এলাকার উপজাতি মানুষের অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানো । এর সঙ্গে গার্হস্থ্য জ্বালানির বিকল্প ব্যবস্থা করে বনের উপর চাপ কমানো । এইসব ব্যবস্থার মধ্যে যে সমস্যাটি সবচেয়ে প্রকট তাহল জুমচাষ বা স্থানান্তর কৃষি । সারা দেশের পাঁচ কোটি উপজাতি মানুষের মধ্যে উত্তর - পূর্ব ভারতে অধিক সংখ্যক উপজাতি এই জুম চাষ করেন । জুমিয়া সমস্যাটি মূলত অর্থনৈতিক হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুমচাষীদের বংশানুক্রমিক যাযাবর বৃত্তি প্রবণতা , ছিন্নমূল এবং স্থানান্তর গমনোচ্ছায় একটি অন্তর্নিহিত অভ্যাস । ত্রিপুরার বনদপ্তরের হিসাব থেকে জানা যায় প্রায় ৫২০০০ হেক্টর বনভূমি জুমচাষে ব্যবহৃত হয় । এই জুমচাষ পদ্ধতি বনজ সম্পদের বিরাট ক্ষতি করে । বনধ্বংস , ভূমিক্ষয় , ভূমির জল ধারণ ক্ষমতা হ্রাস করে । এর ফলে প্রতি বছর খরা অথবা বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতির শিক্ষার হয় ।
সব বিষয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বন নীতির প্রকৃত রূপায়ণ করতে হলে অন্যান্য কর্মসূচী ছাড়া প্রয়োজন বনের আশেপাশে অধিবাসীদের সহযোগিতা এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন । এই প্রসঙ্গে বনদপ্তর বিভিন্ন পরীক্ষা - নিরীক্ষা করে বিভিন্ন জায়গায় বনের পাশের অধিবাসীদের বনের অংশীদার করে বনরক্ষার কর্মসূচী রূপায়ণ করে চলেছে ।
ত্রিপুরার উপজাতি জীবন ও সংস্কৃতিতে বাঁশের ব্যবহার
বাঁশ একবীজ পত্রী ঘাস জাতিয় উদ্ভিদ । সারা পৃথিবীতে এদের প্রজাতির সংখ্যা ৫৫০ টি । ভারতে এদের প্রজাতির সংখ্যা ১৩৬ টি । ত্রিপুরার গাছপালা সম্বন্ধীয় পুস্তকে জানা যায় , এ রাজ্যের বাঁশের প্রজাতির সংখ্যা ১০ টি । মূলী এ রাজ্যের পরিবেশে প্রচুর জন্মায় । বর্তমানে জনসংখ্যার চাপে , অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে , চোরাচালানের ফলে এই সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে ।
উপজাতিদের বিভিন্ন পূজা পার্বনের বাঁশের ব্যবহার রয়েছে । রাজ্যের বিখ্যাত খার্চি পূজার শুভারম্ভ হয় লামপ্রা পূজার মাধ্যমে । এই পূজার দেব প্রতীক তৈরিতে কচি বাঁশের কাণ্ড ব্যবহৃত হয় , যা ছেঁচে ফুল তোলা হয় । আবার খার্চির চতুর্দ্দশ দেবতার মুন্ড পূজার দেবগৃহে ১৪ টি ফুল তোলা কচি বাঁশের টুকরো দেবপ্রতীক রূপে পোঁতা হয় , যা ছেঁচে ফুল তোলা হয় । কের পূজাতে দেবপ্রতীক তৈরিতে ছোট ও বড় বাঁশের খণ্ড , বাখারি , বাঁশের শলা , বাঁশ বেতের রজ্জু ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় । পূজায় ভোমরা নামক যে শব্দযন্ত্র বাজানো হয় তাও বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় । কের পূজায় পূজিত বলং মাতাই মঙ্গল দেবতা , তার দেবপ্রতীক নির্মাণেও অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে বাঁশের ব্যবহার রয়েছে । উপজাতি জীবনে বিভিন্ন নাচেও বাঁশের ব্যবহার রয়েছে ।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাঁশ ত্রিপুরার জাতি - উপজাতি জীবনে ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে , এজন্য এদের সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজন ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন