জল সংরক্ষণ ও পরিচালনের প্রয়োজনীয়তা
( Need for conservation and Management of Water )
জল হল আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ । এটি শুধু জীবনদায়ী ও স্বাস্থ্যকর পানীয়ই নয় , কৃষি , শিল্প ও দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয় । বিজ্ঞানীরা কোন গ্রহ বা উপগ্রহে প্রাণের সন্ধান করতে প্রথমে জলের খোঁজ করেন । জল থেকে জীবনের উৎপত্তি । এখনও মানুষের দেহ ওজনের প্রায় ৭০ ভাগ জল রয়েছে । পৃথিবীর তিন চতুর্থাংশ হচ্ছে জল । জলের অভাব ও প্রাচুর্য্যই বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিজের মত করে রূপ পেয়েছে ।
পৃথিবীর সিক্ততম দেশগুলির মধ্যে আমাদের ভারতবর্ষ একটি । জল সম্পদে প্রকৃতির আশীর্বাদ হলেও ভারতবর্ষ সে জল ধরে রাখতে পারে না ।
বাস্তবিক পক্ষে পৃথিবীর মোট জলের পরিমাণ ১৪০ কোটি ঘনমিটার , তার মধ্যে মানুষ ব্যবহার করে ৩০০০ ঘন কিলোমিটার । বাকিটা ব্যবহার অনুপযোগী বা নোনা জল । আমাদের জীবমন্ডলে মোট জলের শতকরা ৯৭ ভাগ রয়েছে সমুদ্রে এবং ২ ভাগ রয়েছে বরফ আকারে , দুই মেরুপ্রান্তে , কেবলমাত্র ১ ভাগ রয়েছে নদী , নালা , ঝরণা প্রভৃতিতে । দেখা যায় মানুষের ব্যবহৃত জলের উৎস দুটি । ভূস্তরের উপরিতলের জল এবং ভূগর্ভস্থ জল । বিশেষজ্ঞদের ধারণা যে , জলের স্তর ক্রমশ নেমে যাচ্ছে , আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পানীয় জলের সঙ্কট আরো তীব্র হবে । আজ যেমন বিশ্বে তেলের জন্য লড়াই কয়েক বৎসর পর হয়ত জলের জন্যই সেই লড়াই , বাস্তব পরিস্থিতি সেই দিকেই মোড় নিচ্ছে । জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জলের যে চাহিদা বাড়ছে মনে হয় এই জলসঙ্কট আগামী ২০ বৎসরের মধ্যেই তীব্র আকার ধারণ করবে ।
আমাদের প্রত্যেকের বাঁচার স্বার্থে জল সংরক্ষণের সুষ্ঠু সদ্ব্যবহারের ব্যাপারে সকলকে যত্নবান হতে হবে । এজন্য প্রয়োজন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আশ্রয় নেওয়া এবং জল সংরক্ষণে নতুন নীতি গ্রহণ করা । তাছাড়া জলের অপচয় রোধ করা , বৃষ্টির জল ধরে রাখা , ভূগর্ভস্থ জলস্তরের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা এবং জলবিভাজিকা প্রকল্প গ্রহণ করা ।
জল সংরক্ষণে জলবিভাজিকা উন্নয়ন প্রকল্প
ভূ - পৃষ্টের উপর সঙ্কীর্ণ ও দীর্ঘায়িত উচুভূমি যার উপর পতিত বৃষ্টির জল দুই দিকে ভাগ হয়ে যায় এবং নিকাশী ধারায় নীচু অঞ্চলের দিকে গড়িয়ে পরে তাকে ওয়াটার শেড বা জলবিভাজিকা রেখা বলে ।
ক্ষুদ্র জলবিভাজিকাকে ভিত্তি করে ভূমি , জল , বনসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও যথাযথ ব্যবহার এবং অন্যান্য কর্মসূচীকে যুক্ত করে সার্বিক জল বিভাজিকা প্রকল্প উন্নয়ন করাই এই কর্মসূচীর উদ্দেশ্য । তাছাড়া জলবিভাজিকার মাধ্যমে মানুষের জীবনের গুণগত মান বাড়ানো এবং পরিবেশের উন্নতিসাধন করাও এই কর্মসূচীর মূল লক্ষ্য ।
জলবিভাজিকার শ্রেণী বিভাগ ( Classification of Watershed )
ভূ - খন্ডের ক্ষেত্রফলের উপর নির্ভর করে জলবিভাজিকাকে প্রধানত চারভাগে ভাগ করা হয় । যথা- ১ ) জলবিভাজিকা ( WaterShed ) : 800০ থেকে ৪০,০০০ হেক্টর অঞ্চল । ২ ) মধ্যম জলবিভাজিকা ( Sub - WaterShed ) : ২০০০-৪০০০ হেক্টর অঞ্চল । ৩ ) ক্ষুদ্র জলবিভাজিকা ( Mini Water Shed ) : ৪০০-২০০০ হেক্টর পর্যন্ত এবং ৪ ) অতিক্ষুদ্র জলবিভাজিকা ( Micro Water Shed ) : ১ থেকে ৪০০ হেক্টর পর্যন্ত অঞ্চলকে বলে ।
জলবিভাজিকা ভিত্তিক উন্নয়নের উদ্দেশ্য
আমাদের দেশের অনেক রাজ্যেই বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা , অনুপযোগী আবহাওয়া , বৃষ্টি নির্ভর কৃষিতে খাদ্য শস্য উৎপাদনে ব্যাপক তারতম্য ঘটায় । এই প্রকল্প এই সমস্যাগুলি দূর করে শস্য উৎপাদনে স্থিতাবস্থা আনতে সাহায্য করে । তৈলবীজ , ডালজাতীয় শস্য সমেত অন্যান্য উপযোগী ফসলের উৎপাদন বাড়ানো , দেশেব ভূমি ও জলসম্পদসহ সবুজ আস্তরণকে সংরক্ষণ করা । বর্ষার জলকে ধরে রেখে বন্যা প্রতিরোধ করা , একই সঙ্গে গ্রীষ্মকালে এই জল ব্যবহার করে অধিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব । সুতরাং কৃষি উন্নয়ন , খরা ও বন্যা মোকাবিলা , কর্মসংস্থানের সুযোগসহ সেচপ্লাবিত এলাকার সাথে বৃষ্টি নির্ভর এলাকার কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি সাধন করাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য । রাজ্যস্তরে জলবিভাজিক কর্মসূচী প্রণয়নে কর্নাটক প্রথম স্থান দখল করে আছে ।
জলবিভাজিকা প্রকল্পের মাধ্যমে জল সংরক্ষণের বিভিন্ন উপায় বা কৌশল :
১ ) সাধারণত ৫-১৫ ইঞ্চি একর প্রতি কম জলের প্রয়োজন এমন ফসলগুলি হল , যেমন— গম , বাদাম , সরিষে , ডালশয্য চাষ করলে ফলন ভাল হয় এবং জল কম লাগে ।
২ ) জল বিভাজিকার দ্বারা ভূ - গর্ভস্থ জলের ব্যবহার কমিয়ে ভূ - পৃষ্ঠের জল ব্যবহার বাড়ানো যায় ।
৩ ) জল বিভাজিকার মাধ্যমে বৃষ্টির জলকে ধরে রেখে জলসংরক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন জলাধারে সঞ্চিত করে সেচের কাজে ব্যবহার করলে মাটি লবণাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে ।
৪ ) ভূ - পৃষ্ঠের জমিতে আল দিয়ে রাখলে অনেকটা জল আটকে রাখা যায় এবং মাটির নীচে ভূ - গর্ভস্থ জলের পরিমাণও বৃদ্ধি পায় ।
৫ ) জলবিভাজিকার মাধ্যমে মাটির জলধারণ ক্ষমতা বাড়ে , ভূমিক্ষয় রোধ হয় এবং জল সংরক্ষণও করা যায় ।
অন্যান্য প্রকল্প থেকে জলবিভাজিকা প্রকল্পের তফাৎ এই যে— এই প্রকল্পে কৃষি , বন , পশুপালন , মৎস্য , রেশম , তাঁত , কুটিরশিল্প ও অন্যান্য বিভাগগুলি একত্রে বৃষ্টি জল সংরক্ষণ মিলেমিশে কাজ করতে পারে । পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে ব্যয়বহুল প্রযুক্তিগত বিস্তার প্রয়োগের চেয়ে সারা বিশ্বে এই কম খরচের ব্যবস্থা অনেক বেশী উপযুক্ত এবং কার্যকরী ।
সুসংহত জল ব্যবহার পরিচালনা ( Integrated watershed management ) :
জলাধারের মাধ্যমে নীচু জায়গায় জল সংরক্ষণের কৌশলকে ‘ সুসংহত জল ব্যবহার ব্যবস্থা ’ বলে । জলাধারে সংরক্ষিত জল চাষের কাজে , মৎস্যচাষে এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যবহার করা যায় । এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভুগর্ভস্থ জলস্তর পুণর্নবীকরণের পাশাপাশি বন্যা কিংবা খরারর মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব । সুসংহত জল ব্যবহার ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান জল সমস্যা ও জল সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্কট দূর করা যায় ।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন