সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ত্রিপুরা রাজ্য কিভাবে স্বাধীন ভারতের সাথে যুক্ত হয় ?

 How did Tripura Join as a State of Independent India? ত্রিপুরা রাজ্য কিভাবে স্বাধীন ভারতের সাথে যুক্ত হয় ? ভূমিকা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর ৩৯ বছর বয়সে পরলোক গমন করলে তার পুত্র কিরীট বিক্রম কিশোর দেববর্মন মানিক্য বাহাদুর ত্রিপুরা রাজ্য ও চাকলা রোশনাবাদের জমিদারি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হন। তিনি নাবালক থাকায় ভারত সরকারের পরামর্শ অনুযায়ি রাজমাতা মহারাণি কাঞ্চনপ্রভা দেবীর নেতৃত্বে রাজপ্রতিনিধি শাসন পরিষদ বা কাউন্সিল অব রিজেন্সি গঠিত হয়। মহারাণি কাঞ্চনপ্রভা দেবী এই পরিষদের প্রেসিডেন্ট এবং রাজকুমার ব্রজেন্দ্র কিশোর দেববর্মন বাহাদুর ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। মেজর বঙ্কিম বিহারী দেববর্মন ও মন্ত্রী রাজরত্ন সত্যব্রত মুখার্জি এই পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন। (২) পাকিস্তানের ত্রিপুরা আক্রমনের ষড়যন্ত্র ভারত স্বাধীনতা লাভের অল্পদিনের পরেই ত্রিপুরা রাজ্য এক গভীর সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। ত্রিপুরা সীমান্তস্থিত কুমিল্লার মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের উদ্যোগে ও আগরতলার কতিপয় ব্যক্তির সহযোগিতায় পাকিস্তান ত্রিপুরা আক্রমনের পরিকল্পনা করে। ত্রিপুরার রা...

চার্বাক দর্শন , জৈন দর্শন ( Charvaka Darshan , Jain Darshan )

চার্বাক দর্শন , জৈন দর্শন ( Charvaka Darshan , Jain Darshan )

 ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ( Preliminary Concept about Indian Philosophy )

 প্রথম এককে ‘ দর্শন ’ এবং ‘ Philosophy’- র ব্যুৎপত্তিগত অর্থ সম্পর্কে অবগত হওয়া গেছে । এই আলোচনার মধ্য দিয়ে দর্শনের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে দুটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়া সম্ভবপর হয়েছে । একটি হচ্ছে ভারতীয় দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অপরটি হল পাশ্চাত্য দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি । এই এককে ভারতীয় দর্শন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা হবে ।

 ভারতীয় দর্শনের আবির্ভাব সঠিক কবে ঘটেছে তা বলা মুশকিল । তবে ভারতীয়দের মধ্যেই প্রথম দর্শন চিন্তার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় । প্রায় দু - হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের কণ্ঠে বিশ্ববাসী নানা উপনিষদীয় বাণী শুনেছিলেন । ঋষিরা তাদের কঠোর সাধনার দ্বারা যেসকল তত্ত্বের সন্ধান পেয়েছিলেন সেগুলিকেই সাধারণ মানুষের কাছে বাণীরূপে উপস্থাপিত করেছিলেন । তাঁরা বলেছেন জগৎ ও জীবনের প্রকৃত স্বরুপকে জানা যায় যে মূলতত্ত্বের সাহায্যে তাকেই সত্য বলা হয় । আর ভারতীয় দর্শনে সত্যের মর্ম উপলব্ধি , সত্যের সাক্ষাৎকারই হল দর্শন ।

 ভারতীয় দর্শন হল তত্ত্বদর্শন । এই দর্শন হল আধ্যাত্মিক প্রত্যক্ষণ । আত্মচেতনায় এর বিকাশ । সত্য , শিব ও সুন্দরের উপলব্ধির মধ্য দিয়ে এর সার্থকতা । অধিকাংশ ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য । ‘ আত্মাকে জানো ’ ( আত্মানাং বিদ্ধি ) এবং পরমাত্মার রূপ উপলব্ধি করা । তাই ঈশ্বর সাধনা হতে হবে মানুষের পরমব্রত ।

 ভারতীয় দার্শনিক চিন্তার উদ্ভব ও বিকাশ বেদ ও উপনিষদ কেন্দ্রিক । বেদ শব্দের অর্থ পরমজ্ঞান । পার্থিব জ্ঞানের অতীত অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের নামই পরমজ্ঞান , যা বেদ থেকে লাভ করা যায় । আর উপনিষদ শব্দের অর্থ আত্মা বিষয়ক অপরোক্ষ জ্ঞান । বেদ হল অপৌরষেয় । কোনো ব্যক্তির দ্বারা রচিত নয় । বেদ হল স্বয়ং ব্রষ্মের শাশ্বত বাণী । ভারতীয় যোগীগণ যোগ সাধনা বলে বৈদিক বাক্যসমূহের সত্যতা উপলব্ধি করেন এবং পরবর্তীকালে তা লিপিবদ্ধ করেন ।

 বেদ ও উপলব্ধি অবলম্বনে উদ্ভব হয় সূত্র দর্শনের সূত্র ’ শব্দের সাধারণ অর্থ সূতো । ধুষ্প যেমন সুত্র গ্রথিত হয়ে মাল্য রচনা করে , তেমনি খণ্ড খণ্ড তত্ত্বসমূহ সূত্রের দ্বারা সংঘবদ্ধ হয় । বিভিন্ন জটিল দার্শনিক তত্ত্বের স্মারক বাক্যগুলিই সুত্র । আর এই সূত্র গ্রন্থগুলিই বিভিন্ন দর্শনের উৎসগ্রন্থ ।

 যে গ্রন্থে সূত্রের প্রতিটি পদ অবলম্বন করে সূত্রের অর্থ ব্যাখ্যা করা হয় এবং যে গ্রন্থে রচয়িতা নিজের পদের তাৎপর্যও ব্যাখ্যা করেন সেই গ্রন্থকেই ভাষ্যবিদগণ ভাষ্য বলে অভিহিত করেন সূত্রগ্রন্থে ব্যবহৃত বাক্যসমূহের দুর্বোধ্যতাকে প্রাঞ্জল করার জন্য ভাষ্যগ্রন্থ রচিত হয় অর্থাৎ ভাষ্য হল সূত্রের ব্যাখ্যা ।

 পরবর্তীকালে ভাষ্যের উপর বার্তিক বা টীকা নামে একপ্রকার ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ রচিত হয় । যে গ্রন্থে সূত্র ও ভাষ্যে উল্লিখিত সকল বিষয়ের তাৎপর্য বর্ণনা করা হয় এবং এর কাজ হল ভাষ্যোক্ত বিষয়কে সহজ সরলরূপে প্রকাশ করা ।

 ভারতীয় দর্শন কেবল একটি বিষয় নয় , এ হল একপ্রকার ‘ শাস্ত্র ' । শাস্ত্র পৌরষেয় ও অপৌরষেয় উভয়ই । বেদ অপৌরষেয় , আর বিভিন্ন সূত্র , ভাষ্য ও টীকাগ্রন্থ পৌরষেয় । দর্শনশাস্ত্রের বিভিন্ন সূত্র , ভাষ্য ও টীকা থেকে ভারতীয় দর্শনের কতকগুলি সাধারণ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় যেমন

 ১ ) ভারতীয় দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে প্রধানত আধ্যাত্মিক এবং আধ্যাত্মিক চিন্তা হচ্ছে ভারতীয় দর্শনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য । শ্রবণ , মনন এবং নিদিধ্যাসনের দ্বারা আত্মার উপলব্ধিই হচ্ছে ভারতীয় দর্শনের মূল লক্ষ্য ।

 ২ ) ভারতীয় দর্শন কেবল তত্ত্বালোচনা নয়— এ হল ব্যবহারিক জীবনে তত্ত্বের প্রয়োগ বা সংক্ষেপে জীবনদর্শন । ভারতীয় দর্শন জীবনের সঙ্গে নিগূঢ়ভাবে সম্পর্কিত ।

 ৩ ) ভারতীয় দর্শন বিচারবাদী দর্শন এখানে আধ্যাত্মিক চিন্তা ও ধর্মীয় চিন্তা মিশ্রিত হয়ে থাকলেও স্বাধীন যুক্তি ও বিচার বিশ্লেষণের ভূমিকাকে অস্বীকার করা হয়নি । প্রতিটি দার্শনিক সম্প্রদায় তত্ত্বগুলিকে নিজ নিজ যুক্তিপদ্ধতি ও বিশ্লেষণরীতিতে বিচার করে উপস্থাপিত করেছে ।

 ৪ ) ভারতীয় দার্শনিকদের মতে মানুষের সকল প্রকার দুঃখের কারণ হল কামনা বাসনা । এরজন্য প্রায় সকল ভারতীয় দর্শনেই আত্মসংযম ও সাধনার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । তারা বলেছেন আসক্তি বা প্রবৃত্তি নয় , নিরাসক্তি বা নিবৃত্তিই জীবনের আদর্শ হওয়া উচিত ।

 ৫ ) প্রায় সকল ভারতীয় দার্শনিকই মনে করে যে অবিদ্যা হল বন্ধনের মূল কারণ । আর অবিদ্যার অর্থ হল জগৎ ও জীবনের স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞানতা । তাঁদের মতে সংসার অস্থির , জগৎ ও জীবন দুঃখময় । মানুষ জরা , ব্যাধি ও মৃত্যুর নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেনি । সুতরাং জগৎ ও জীবনের যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারলে তবেই ভবচক্র থেকে নিষ্কৃতি ঘটবে এবং পরিণামে দুঃখেরও বিনাশ ঘটবে ।

 ৬ ) শাস্ত্রে চার প্রকার পুরুষার্থের উল্লেখ আছে । ধর্ম , অর্থ কাম ও মোক্ষ । ভারতীয় দর্শনে মোক্ষকেই পরম পুরুষার্থরূপে গ্রহণ করা হয়েছে । মোক্ষ বলতে বোঝায় মুক্তি । মানুষের বিভিন্ন প্রকার কর্মের মধ্যে বিশেষত সকাম কর্মকে বাদ দিয়ে নিষ্কাম কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে মুক্তিলাভ সম্ভব হয় । তবে মোক্ষকে কোনো দর্শনশাস্ত্রে কৈবল্য , কোনো দর্শনশাস্ত্রে নিঃশ্রেয়স , কোনো দর্শশাস্ত্রে নির্বাণ ইত্যাদিরূপে অভিহিত করা হয়েছে । কিন্তু সকল ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায়েরই দর্শনালোচনার মূল লক্ষ্য মোক্ষ বা মুক্তির পথ অন্বেষণ ।

 ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন শাখা

 ভারতীয় দর্শন প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত— ১ ) বৈদিক দর্শন ২ ) অবৈদিক দর্শন ।

 বৈদিক দর্শন : যে দর্শনে বেদের প্রামাণ্য স্বীকৃত হয় এবং বেদকে অভ্রান্ত বলে গণ্য করা হয় তাকে বৈদিক দর্শন বলে ।

 ভারতীয় অবৈদিক দর্শন : যে দর্শনে বেদের প্রামাণ্য স্বীকৃত হয়না এবং বেদকে অভ্রান্ত বলে গণ্য করা হয়না তাকে অবৈদিক দর্শন বলে ।

 আবার বৈদিক দর্শনকে আস্তিক এবং অবৈদিক দর্শনকে নাস্তিক দর্শনরূপেও অভিহিত করা হয় । সাধারণভাবে আস্তিক বলতে বোঝায় যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে এবং নাস্তিক বলতে বোঝায় যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না সাংখ্য , যোগ , ন্যায় , বৈশিষিক , মীমাংসা ও বেদান্ত— এই ষড়দর্শন হল বৈদিক বা আস্তিক দর্শন আর চার্বাক , জৈন ও বৌদ্ধ— এই ত্রয়ী দর্শন অবৈদিক বা নাস্তিক দর্শন নামে পরিচিত এই এককে তিনটি অবৈদিক দর্শনের মধ্যে চার্বাক দর্শন ও জৈন দর্শন সম্পর্কে আলোচনা করা হবে ।

 চার্বাক দর্শন ( Charvaka Darshan )

 ভূমিকা ( Introduction )

 ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে চার্বাক দর্শন ভারতীয় দর্শনের একমাত্র জড়বাদী সম্প্রদায় । জড়বাদ অনুসারে জড়ই একমাত্র তত্ত্ব এবং জড় থেকেই অচেতন , চেতন— যাবতীয় জাগতিক বিষয়ের উৎপত্তি , ভারতীয় দার্শনিক চিন্তাধারায় আধ্যাত্মিকতার আধিপত্য থাকলেও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও বৈদিক ক্রিয়াকর্মের সমালোচনা করে আধ্যাত্মিকতার বিরুদ্ধ মতবাদরূপে চার্বাক জড়বাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ।

 চার্বাক নামের তাৎপর্য

 চার্বাক দর্শনের নামকরণ প্রসঙ্গে পণ্ডিতগণের মতবৈষম্য লক্ষণীয় । কেউ কেউ মনে করেন চার্বাক শব্দটি ‘ চারু ’ ও ‘ বাক্’— এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত । চারু ’ মানে মধুর এবং ‘ বাক ’ মানে কথা । এরা মনে করেন , যে দার্শনিক সম্প্রদায় লোকায়ত তত্ত্বের শ্রুতিমধুর কথা বলেন , তাঁরাই চার্বাক । ভিন্নমতে ‘ চ ’ ধাতু থেকে চার্বাক শব্দের উৎপত্তি । চর্ব ’ মানে চর্বন করা বা ঔদরিক ভোগকে বোঝায় অর্থাৎ এই মতানুসারে যাঁরা স্থূল ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রচারক তাঁরাই চার্বাক ।

 কেউ কেউ মনে করেন , লোকপুত্র বৃহস্পতিই জড়বাদের প্রবর্তক । ' চার্বাক ’ শব্দের মূল অর্থ যাই হোক না কেন , বর্তমান যুগে চার্বাক বলতে জড়বাদী নাস্তিককেই বোঝানো হয়ে থাকে । সাধারণ মানুষের চিন্তা ও ভাবধারা এই মতবাদের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে বলে এই দর্শনকে ‘ লোকায়ত দৰ্শন ' নামেও অভিহিত করা হয় ।

 বিভিন্ন চার্বাক সম্প্রদায়

 চার্বাকগণ তিনটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত— ১ ) বৈতন্ডিক সম্প্রদায় , ২ ) ধূর্ত সম্প্রদায় , ৩ ) সুশিক্ষিত সম্প্রদায় ।

 ১ ) বৈতন্ডিক চার্বাক সম্প্রদায়

 বৈতন্ডিকরা ছিলেন সংশয়বাদী ও কূট তার্কিক । স্বমত প্রতিষ্ঠা নয় , পরমত খণ্ডনই ছিল এদের একমাত্র কাজ । ঈশ্বর , পরলোক , এমনকী প্রত্যক্ষ প্রামাণের প্রমাণ্যও এঁরা স্বীকার করেন না ।

 ২ ) ধূর্ত চার্বাক সম্প্রদায়

 এই সম্প্রদায় ধূর্ত বা উচ্ছেদবাদী বা দেহাত্মবাদী নামে পরিচিত । এঁরা কেবল প্রত্যক্ষের প্রামাণ্য স্বীকার করেন । ঈশ্বরের অস্তিত্বে তারা বিশ্বাস করেন না । এরা জড়কেই পরম সত্য বলেন । এদের মতে কেবল ইন্দ্রিয় সুখই কাম্য , দৈহিক সুখই স্বর্গসুখ । দেহের অবসান বা বিনাশই মুক্তি বা মোক্ষ সাধারণত চার্বাক বলতে এই ধূর্ত সম্প্রদায়কেই বুঝায় ।

 ৩ ) সুশিক্ষিত চার্বাক সম্প্রদায়

 সুশিক্ষিত চার্বাক সম্প্রদায় অর্থশাস্ত্র , কামশাস্ত্র , অথর্ববেদ , দণ্ডনীতি , গান্ধর্ববিদ্যা প্রভৃতি লৌকিক শাস্ত্রের প্রামাণ্য স্বীকার করেন । আর অনুমান হিসাবে সেগুলিকেই মানে যেসব অনুমানের বিষয়গুলি ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষগোচর হয় । যেমন মেঘ থেকে বৃষ্টির অনুমান , ধোঁয়া দেখে আগুনের অনুমান ইত্যাদি । এই সুশিক্ষিত চার্বাকরা আবার কেউ প্রণাত্মবাদী , কেউ মনাত্মবাদী কেউ বা ইন্দ্রিয়বাদী ছিলেন ।

 উপরোক্ত সম্প্রদায়গুলির মধ্যে ধূর্ত চার্বাক সম্প্রদায়ের মতামতগুলিই সর্বাধিক পরিচিত ও আলোচিত । বিভিন্ন আস্তিক দর্শনে এই চার্বাক সম্প্রদায়ের মতামতগুলিই বিশেষত প্রতিষ্ঠিত ও খণ্ডিত হতে দেখা যায় ।

 চার্বাক জ্ঞানতত্ত্ব

 চার্বাকদের দার্শনিক চিন্তা , বিশেষভাবে তাদের জ্ঞানতত্ত্বের ( Epistemology ) উপর প্রতিষ্ঠিত । জ্ঞানতত্ত্বে , জ্ঞানের স্বরূপ , শর্ত , প্রকার ইত্যাদি আলোচিত হয় । সাধারণভাবে জ্ঞান দুই প্রকার— স্মৃতি ও অনুভব ইন্দ্রিয় নিরপেক্ষভাবে কেবল সংস্কার থেকে উৎপন্ন জ্ঞানকে স্মৃতি বলে । আর স্মৃতিভিন্ন ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানকে অনুভব বলে । অনুভব যথার্থ ও অযথার্থ হতে পারে ।

 যথার্থ অনুভবকে প্রমা এবং অযাথার্থ অনুভবকে অপ্রমা বলা হয় ) কোনো বস্তু প্রকৃতপক্ষে যা , তাকে সেইরূপে জানাকে প্রমা বলে এবং কোনো বস্তু প্রকৃতপক্ষে যা নয় তাকে সেইরূপে জানাকে অপ্রমা বলে । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় , রজ্জুকে রজ্জুরুপে জানা প্রমা এবং সৰ্পৰূপে জানা অপ্রমা ।

 চার্বাকমতে প্রমা বা যথার্থ অনুভব হল সত্য , সংশয়রহিত ও অনধিগত বিষয়ক জ্ঞান আর যে প্রণালীতে প্রমা উৎপন্ন হয় তাকে প্রমাণ বলে প্রমাণের সংখ্যা বিষয়ে ভারতীয় দার্শনিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে ।

 বৌদ্ধ ও বৈশেষিক দর্শন মতে প্রমাণ দুই প্রকার প্রত্যক্ষ ও অনুমান । জৈন , সাংখ্য ও যোগ দর্শন মতে প্রমাণ তিন প্রকার— প্রত্যক্ষ অনুমান ও শব্দ । নৈয়ায়িকগণ চারটি প্রমাণের কথা বলেছেন— প্রত্যক্ষ , অনুমান , উপমান ও শব্দ । চার্বাক মতে প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ বা জ্ঞান আহরণের উপায় ।

 সাধারণভাবে বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সন্নিকর্ষের ফলে যে জ্ঞান উৎপন্ন হয় তাকে প্রত্যক্ষ বলে । চক্ষু , কর্ণ , নাসিকা , জিহ্বা , ত্বক ও মন— এই ইন্দ্রিয়গুলির দ্বারা সাক্ষাৎভাবে যে জ্ঞান লব্ধ হয় সেই জ্ঞান এবং জ্ঞান লাভের পদ্ধতি উভয়কেই প্রত্যক্ষ বলা হয় চার্বাক দার্শনিকগণও প্রত্যক্ষ বলতে অন্তরেন্দ্রিয় মন এবং পঞ্চইন্দ্রিয়ের সাহায্যে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকে বুঝিয়েছেন । প্রত্যক্ষ জ্ঞান সংশয় ও বিপর্যয় রহিত । তাই চার্বাক মতে প্রত্যক্ষের সাহায্যেই যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায় ।

 তাঁদের মতে প্রত্যক্ষ হল সমস্ত প্রমাণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ । চার্বাক ব্যতীত যেসকল ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায় অনুমানাদি প্রমাণ স্বীকার করেন তারাও প্রত্যক্ষকে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ বলে স্বীকার করেন । প্রত্যক্ষ প্রমাণই একমাত্র সঠিক ও অভ্রান্ত । যে বস্তু প্রত্যক্ষ দ্বারা জ্ঞাত , তাই হল সবস্তু । চার্বাকগণ ভ্রান্ত প্রত্যক্ষের সম্ভাবনা যে একেবারে অস্বীকার করেছেন , তা নয় , তবে তাদের মতে ভ্রান্ত প্রত্যক্ষের সম্ভাবনা প্রত্যক্ষের প্রামাণ্য বিনষ্ট করেনা । বিশুদ্ধ প্রত্যক্ষের দ্বারা নির্ভুল জ্ঞান সম্ভব হয় ।

 চার্বাক দর্শনে অনুমানের প্রামাণ্য স্বীকৃত হয়নি । তাঁদের মতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুমান প্রমাণ হিসাবে গ্রাহ্য নয় । অনুমান থেকে যে জ্ঞান লাভ করা যায় তা সংশয়মুক্ত প্রকৃত জ্ঞান নয় । অনুমানের পাশাপাশি শব্দকেও চার্বাকগণ প্রমাণ হিসাবে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না । তাঁদের মতে শব্দ হল আপ্তবাক্য অর্থাৎ সত্যদ্রষ্টা , সত্যভাষী ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি আপ্ত পদবাচ্য । কিন্তু কোনো ব্যক্তি আপ্ত কিনা তা জানার জন্য অনুমানের সাহায্য নিতে হয় , যেহেতু অনুমান বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নয় , সেখানে অনুমানের উপর নির্ভরশীল শব্দ যথার্থ প্রমাণ হিসাবে গণ্য হতে পারেনা ।

 চার্বাকগণ বৈদিক বাক্যের প্রামাণ্যও অস্বীকার করেন । তাঁদের মতে বেদের ভাষা বোঝা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার । আবার বেদে পরস্পর বিরোধী উক্তিও রয়েছে । বেদের বচনও বিশ্বাসযোগ্য নয় । কেননা বেদ ধূর্ত ও ভণ্ড ব্যক্তিদের দ্বারা সৃষ্ট ।

 চার্বাক জড়বাদ বা ভূতচতুষ্টয়বাদ

 জড়বাদ অনুসারে জড়ই একমাত্র মূলতত্ত্ব । জড় যাবতীয় জাগতিক বস্তুর উৎপত্তি এবং জড়তেই তাদের চরম নিষ্পত্তি । জড়বাদ অধ্যাত্মবাদের বিপরীত মতবাদ । চার্বাক মতে প্রত্যক্ষই যথার্থ জ্ঞানলাভের একমাত্র উপায় যা প্রত্যক্ষগ্রাহ্য নয় তার অস্তিত্ব স্বীকার অযৌক্তিক । ঈশ্বর , আত্মা , অদৃষ্ট , পরলোক প্রভৃতি অতীন্দ্রিয় হওয়ায় চার্বাকগণ তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করেননা । চাবার্কগণ ক্ষিতি , অপ , তেজ এবং মরুৎ এই চারটি ভূতের অস্তিত্ব স্বীকার করেন ।

 পঞ্চভূতের মধ্যে ‘ ব্যোম ’ প্রত্যক্ষগ্রাহ্য নয় , তাই অগ্রাহ্য । এই চতুর্ভূতের সমন্বয়ে বস্তুজগতের সৃষ্টি । এমনকি প্রাণ এবং মনও এই চতুর্ভূতের সমন্বয়ে সৃষ্ঠ । চার্বাকগণ পার্থিব বস্তুসমূহের উৎপত্তিতে উপাদান কারণ মেনেছেন , কোনো নিমিত্তকারণ মানেননি । ভূতচতুষ্টয় হল এই উপাদান । উপাদানগুলি তাদের স্বভাব বা প্রকৃতিবশত পরস্পর পরস্পরের সাথে মিলিত হয় ।

 এমনকি বস্তুর বিনাশও ঘটে ভূতচতুষ্টয়ের স্বভাবধর্মের জন্যই । জগৎ ও জাগতিক বস্তুনিচয়ের উৎপত্তি ও বিনাশ উদ্দেশ্যমূলক নয় । এই দুই ক্ষেত্রেই ঈশ্বর বা অদৃষ্টের কোনো কোনো ভুমিকা নাই চতুর্ভূতের সংযোজন তাদের নিজস্ব স্বভাব বা প্রকৃতির ভিত্তিতে হয় বলে একে স্বভাববাদ বা প্রকৃতিবাদ বলা হয় ।

 চার্বাকগণ কার্যকারণ সম্পর্কে বিশ্বাস করেন না । দুটি ঘটনা পাশাপাশি ঘটেছে বলে একটি অপরটির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একথা বলা যায়না । জগতের কোনো ঘটনাই কার্যকারণ নিয়মানুসারে ঘটেনা , ঘটে আকস্মিকভাবে । তাই একে আকস্মিকতাবাদও বলা হয় ।

 ভূতচৈতন্যবাদ বা দেহাত্মবাদ

 চার্বাকদের মতে দেহাতিরিক্ত ‘ আত্মা ’ বলে কিছু নেই ; চৈতন্যবিশিষ্ট দেহই আত্মা । চৈতন্য মানব দেহেরই একটি গুণ । চতুর্ভূতের সমন্বয়ে যখন মানবদেহ সৃষ্টি হয় ; তখনই এই গুণের আবির্ভাব হয় । চতুর্ভূতে চৈতন্য নেই ; কিন্তু তাদের বিশেষ সমন্বয়ে চৈতন্য নামে নতুন গুণের উদ্ভব হয় । চার্বাকগণ আরো বলেছেন ; সংসারে সবকিছুই ভঙ্গুর ও মরণশীল । মৃত্যুর সংগে সংগে চৈতন্য নামক গুণের বিনাশ হয় এবং দেহ চতুৰ্ভূতে পরিণত হয় অর্থাৎ মৃত্যুর পরে আর জীবন থাকেনা এবং পরলোক বলে কিছু নাই ।

 ঈশ্বরতত্ত্ব

 বেদানুসারী বিভিন্ন ভারতীয় দর্শনতন্ত্রে পরমসত্তারূপে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয়েছে । কিন্তু বেদবিরোধী চার্বাকগণ নিরীশ্বরবাদী । তাঁদের মতে প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ । অপ্রত্যক্ষগ্রাহ্য অতীন্দ্রিয় সত্তার কোনো অস্তিত্ব নাই । ঈশ্বর প্রত্যক্ষগ্রাহ্য না হওয়ায় তার অস্তিত্ব স্বীকার নিষ্প্রয়োজন ।

 চার্বাকমতে ধূর্ত পুরোহিতবর্গ সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে ঈশ্বর নামক ধারণার সৃষ্টি করেছে । সুতরাং ঈশ্বর পুরোহিতবর্গের কল্পলোকের বাসিন্দা হতে পারেন , কিন্তু জন্মান্তরে সুখলাভের আশায় তার পূজা অর্চনা নিছকই সংস্কার । সত্যই যদি ঈশ্বর অস্তিত্বশীল হতেন তবে তিনি স্বয়ং জগতে অবতীর্ণ হয়ে প্রতিটি মানুষের নিকট বিশ্বস্ত হতে সচেষ্ট হতেন । কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি । সুতরাং ঈশ্বরের অস্তিত্ব নাই । চার্বাক মতে রাজাই ঈশ্বর কেননা রাজা প্রত্যক্ষযোগ্য ।

 চাবার্ক নীতিতত্ত্ব

 চাবার্কগণ জন্মান্তরবাদ ও কর্মবাদ অস্বীকার করেন । তাদের মতে ইহজীবনই একমাত্র জীবনরূপে পরিগণিত হয় । মৃত্যুতেই মানুষের মুক্তি । মৃত্যুতেই চৈতন্যবিশিষ্ট দেহের বিনাশ । কোনো কোনো দর্শনতত্ত্বে স্বর্গসুখলাভকেই পরম পুরুষার্থ বলা হয়েছে । আবার কোন কোন দর্শনতত্ত্বে মোক্ষ বা মুক্তিকেই পরম পুরুষার্থ বলা হয়েছে ।

 কিন্তু চার্বাকদের মতে মোক্ষ বা মুক্তি অবান্তর বিষয় । চার্বাক মতে সুখই মানবজীবনের পুরুষাৰ্থ অর্থাৎ সুখের দ্বারাই মনুষ্য আচরণের ভালোত্ব বা মন্দত্ব নির্ণীত হয় । যে কর্ম সুখজনক তাই যথোচিত । কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সুখলাভ কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয় । কারণ সংসারে দুঃখ , শোক , বিরহ , মৃত্যু সবই আছে কিন্তু মানুষ চায় সুখ ও আনন্দ কারণ সুখ ও আনন্দই তার জীবনের কাম্য ।

 তাদের মতে সুখের সঙ্গে দুঃখ মিশে থাকে বটে , কিন্তু সেই কারণে সুখ অন্বেষণ থেকে বিরত হওয়া মুখতারই সামিল । ধান ছাড়িয়ে চাল করতে হয় বলেই কি ভাত না খেয়ে পারা যায় ? কাঁটা আছে বলে কি লোকে মাছ খাবেনা । সুখের জন্যই মানুষ দুঃখকে স্বীকার করে । অন্ধকার না থাকলে যেমন আলোর রূপ বোঝা যায় না তেমনি দুঃখ না থাকলে সুখকে বোঝা যায় না । দুঃখের পরেই সুখানুভূতি মধুর হয়ে উঠে ।

 চার্বাক মতে এই সুখ ব্যক্তি মানুষের আত্মগত সুখ । তাঁরা অসংযত আত্মসুখবাদের প্রচারক । তাদের মতে মানুষের সেই কর্মই সম্পাদন করা উচিত যে কর্ম তার নিজের পক্ষে সুখকর বা কল্যাণকর । এই আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁরা বলেন ‘ যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ , ঋনং কৃত্বা ঘৃতং পীবেৎ ' অর্থাৎ যতদিন বাঁচবে সুখে বাঁচো , ঋণ করে ঘি খাও ।

 ' চার্বাকমতে বৈদিক ক্রিয়াকর্মের অনুষ্ঠান অর্থহীন , কেননা বৈদিক ক্রিয়া সম্পাদন করেও ফল পাওয়া যায়নি এরূপ দৃষ্টান্ত বিরল নয় । তাদের মতে স্বর্গ , নরক প্রভৃতির অস্তিত্ব অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয় । বেদবিহিত কর্মের সমালোচনা করে চাবকগণ বিভিন্ন কথা বলেন । জ্যোতিষ্টোম যজ্ঞে বলি প্রদত্ত পশু স্বর্গলাভ করলে , পুরোহিত তাঁর পিতাকে বলি দিয়ে স্বর্গে পাঠান না কেন ? এইভাবে বৈদিক কর্মের কঠোর সমালোচনা করে চার্বাকগণ বলেন , ' ন স্বর্গো নাপবর্গো বা নৈবত্মো পারলৌকিক ; স্বর্গ , অপবর্গ বা মুক্তি , আত্মা , পরলোক— এসব কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই ।

 আধুনিক শিক্ষায় চার্বাক দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা ( Relevance of Charvaka Darshan in Modern Education )

 বিভিন্ন বৈদিক দর্শনে এই মতবাদের সমালোচনা করা হলেও চার্বাক দর্শন পরোক্ষে বিভিন্ন দিক থেকে আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বকে প্রভাবিত করেছে এবং তা হল নিম্নরূপ :

 ( ১ ) আধুনিক শিক্ষা শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা । শিশুর অন্তর্নিহিত সত্ত্বার স্বতঃস্ফুর্ত ও সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধনই হল শিক্ষা । এই স্বতঃস্ফুর্ত বিকাশ ' প্রক্রিয়া শিশুকে তার বর্তমান পরিবেশে সর্বাধিক সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার জন্য প্রতিনিয়ত প্রতিবর্ত ক্রিয়ার ( Reflex Action ) সাহায্যে তার প্রয়োজন ও চাহিদা মেটাতে থাকে অর্থাৎ দেখা গেল প্রথম থেকেই শিশুর কাম্য সুখভোগ । চার্বাক দর্শনে , মানুষের জৈবিক চাহিদাগুলির পরিতৃপ্তির মধ্য দিয়ে যে সুখানুভূতি হয় , সেই অভিমতই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অর্থাৎ শিক্ষাসংক্রান্ত আধুনিক ধারণা অনেকাংশে চার্বাক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত একথা স্বীকার করতে হয় ।

 ( ২ ) আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য হল ব্যক্তি ও সমাজের উন্নতিসাধন করা যে সমস্ত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ব্যক্তিকে সুখস্বাচ্ছন্দ্য দিতে সক্ষম হবে এবং যে সমস্ত বিষয়ের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সামাজিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে , সেগুলিই শিক্ষার দিক থেকে কাম্য । চার্বাক দর্শনেও অনুরূপ মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে । চার্বাক দর্শন যেহেতু বস্তুবাদে বিশ্বাসী সেইজন্য এই দর্শনে , অভিজ্ঞতার উপযোগিতা মূল্যের উপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করা হয়েছে , আধুনিককালে তা অনেকাংশে চার্বাক দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গীরই প্রতিফলন বলা যায় ।

 ( ৩ ) চাবকি দর্শনে বলা হয়েছে , যা প্রত্যক্ষ তাই একমাত্র সত্য অর্থাৎ যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তা সত্য । আর যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় তা অসত্য । আধুনিক শিক্ষানীতিতেও জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । বর্তমানে শিক্ষাবিজ্ঞানে ' ইন্দ্রিয় পরিমার্জনা ’ এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে । কারণ একমাত্র ইন্দ্রিয়ের দ্বারাই জ্ঞান আহরণ করা হয়ে থাকে । কারো কারো মতে এই ইন্দ্রিয়গুলি ব্যক্তির জ্ঞানের এক একটি দ্বার । এইক্ষেত্রে চাবকি দর্শনের জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত বক্তব্যের সমর্থন আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে মেলে ।

 ( ৪ ) চার্বাক দর্শনে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । তাদের মতে জীবনের প্রয়োজনই সবার উপরে । তাই মানুষকে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব অভিজ্ঞতাই সংগ্রহ করতে হবে । আধুনিককালে শিক্ষার পাঠ্যক্রমে , শিশুর জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল রকম অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় অর্থাৎ আধুনিক শিক্ষার পাঠ্যক্রম রচনার নীতিগুলি চার্বাক দর্শনের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী খুবই প্রাসঙ্গিক ।

 ( ৫ ) আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর আত্মতৃপ্তি , আনন্দদায়ক অনুভূতি , আত্মশৃঙ্খলা ইত্যাদির উপর বিশেষ গুরত্ব দেওয়া হয়েছে , অপরদিকে চার্বাক দর্শনের মূল কথাও হল সুখ ও আনন্দ । সুতরাং বলা যায় আধুনিক বস্তুতান্ত্রিকতার যুগে , শিক্ষার বহুবিধ নীতি সম্পূর্ণভাবে না হলেও আংশিকভাবে চার্বাক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে ।

 উপসংহার ( Conclusion )

 চার্বাক দর্শন হল স্বাধীন চিন্তার দর্শন চার্বাকরা জড়বাদী , দৃষ্টবাদী , স্বভাববাদী , আত্ম - সুখবাদী নাস্তিক দার্শনিক । তবে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে কৃত্রিম ভেদাভেদ চার্বাকরা মানতেন না । এদিক দিয়ে তারা ছিল মানববাদী ও সাম্যবাদী । কিন্তু বিভিন্ন দিক থেকে চার্বাক দর্শন সমালোচিতও হয়েছে । চার্বাক দর্শন কতগুলো নতুন দার্শনিক সমস্যার সৃষ্টি করে দর্শনকে সমৃদ্ধ করেছে ; আবার বিভিন্ন দার্শনিকদের নির্বিচার চিন্তার মূলে আঘাত করে যুক্তিবাদী হতে সাহায্য করেছে ; তথাপি দার্শনিক মতবাদ হিসাবে চার্বাক দর্শন যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আগামী' কবিতাটি 'ছাড়পত্র' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

আগামী Class 12 Bengali Question 2023 সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো (MCQ)  প্রশ্নমান ১ class 12 bengali mcq question answer ১. “ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই”-বক্তা কে ? (ক) বৃক্ষ শিশু (খ) বনস্পতি (গ) বটবৃক্ষ (ঘ) সদ্য অঙ্কুরিত বীজ উত্তর: (ঘ) সদ্য অঙ্কুরিত বীজ। ২. অঙ্কুরিত বীজের ক্ষুদ্র শরীরে বাজে— (ক) ঝড় (খ) বৃষ্টি (গ) ভূমিকম্প (ঘ) তুফান উত্তর: (ক) ঝড়। ৩. অঙ্কুরিত বীজের শাখায় প্রত্যাহত হবে— (ক) পত্রমর্মর (খ) মর্মরধ্বনি (গ) পাখির কূজন (ঘ) বিচিত্রধ্বনি উত্তর: (খ) মর্মরধ্বনি । ৪. অঙ্কুরিত বৃক্ষশিশু অরণ্যের বিশাল চেতনা অনুভব করে— (ক) পত্রে (খ) পুষ্পে (গ) শিকড়ে (ঘ) শাখায় উত্তর: (গ) শিকড়ে। ৫. “জানি তারা মুখরিত হবে”—কীভাবে ? (ক) নব শতকের গানে (খ) নতুন দিনের গানে (গ) নব তারণ্যের গানে (ঘ) নব জীবনের গানে উত্তর: (গ) নব অরণ্যের গানে। ৬. অঙ্কুরিত বৃক্ষশিশু নব অরণ্যের গানে মিশে যাবে— (ক) বসন্তে (খ) বর্ষায় (গ) গ্রীষ্মে (ঘ) শীতে উত্তর: (ক) বসন্তে। ৭. অঙ্কুরিত বীজ কোথায় মিশে যাবে ? (ক) অরণ্যের দলে (খ) বৃহতের দলে (গ) ক্ষুদ্রের দলে (ঘ) মহীরুহ-র দলে উত্তর: (খ) বৃহতের দলে। ৮. অঙ্কুরিত বীজ নিজেকে বলেছে— (ক) ভ...

বীরচন্দ্র মানিক্য থেকে বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য পর্যন্ত ত্রিপুরার আধুনিকীকরণ সম্পর্কে আলোচনা কর।

 Discuss the modernization of Tripura from Birchandra Manikya to Bir Bikram Kishor Manikya. বীরচন্দ্র মানিক্য থেকে বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য পর্যন্ত ত্রিপুরার আধুনিকীকরণ সম্পর্কে আলোচনা কর।  ত্রিপুরায় আধুনিক যুগের সূচনা হয় মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্যের শাসনকালে। তিনি ব্রিটিশ ভারতের শাসন পদ্ধতির অনুকরণে ত্রিপুরার শাসন ব্যবস্থার সংস্কার করেণ এবং লিখিত আইন কানুন প্রনয়নের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থাকে সুসংবদ্ধ ও সুসংগঠিত করেণ। মোটের উপর বীরচন্দ্রমানিক্য (১৮৬২-১৮৯৬ খ্রি:) তাঁর আমলে ত্রিপুরা রাজ্য এক নতুন রূপ লাভ করে। ১) মিউনিসিপ্যালিটি গঠন তিনি ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে আগরতলা মিউনিসিপ্যালিটি গঠন করেন। তবে নাগরিক জীবনের সুযোগ সুবিধা বিধানে কিংবা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসাবে দীর্ঘকাল কোনো কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহণে আগরতলা মিউনিসিপ্যালিটি ছিল ব্যর্থ। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুলাই ডবলিউ. বি. পাওয়ার সাহেব ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত হন।  ২) বিচার সংক্রান্ত সংস্কার প্রাচীনকাল হতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি সংক্রান্ত বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি মহারাজ স্বয়ং সম্পাদন করতেন। ১৮৭২ খ্রিস্টা...

বীরচন্দ্র মানিক্যের পূর্ববর্তী সময়ে ত্রিপুরার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর।

 Discuss the social and economic condition of Tripura before the accession of Birchandra Manikya. বীরচন্দ্র মানিক্যের পূর্ববর্তী সময়ে ত্রিপুরার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর। ভূমিকা ত্রিপুরার মাণিক্য উপাধিকারী রাজন্যবর্গের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন আত্মমর্যাদাজ্ঞানহীন, ক্ষমতালোভী ও ষড়যন্ত্রী। এসব ক্ষমতালোভী ও ষড়যন্ত্রীরা মুঘল ফৌজদারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অধিক সংখ্যক হাতি, নিয়মিত উচ্চ হারে খাজনা, নজরানা ইত্যাদি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজত্বের সনদ লাভ করতেন। এটা ত্রিপুরার দুর্বল অর্থনীতির উপর এক বিরাট আঘাত ও স্থায়ী ক্ষতস্বরূপ ছিল। তবে এ সময়ের শুভদিক হল ত্রিপুরায় ব্রিটিশ ভারতের অনুকরণে আইন প্রণয়নের সূত্রপাত, প্রশাসনিক বিধিব্যবস্থার প্রবর্তন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের উন্মেষ ও সামাজিক সংস্কার। Economic Condition ১) চাষাবাদ ও কৃষি ত্রিপুরার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা হল কৃষি। কৃষিজ উৎপাদনের মধ্যে ধান, গম, আলু, আখ, সরিষা, ডাল জাতীয় শস্য, কার্পাস, তুলো, কচু, আদা, তরমুজ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিকার ও পশুপালন করেও তারা জীবিকা নির্বাহ করত। এখানকার চাষযোগ্য সমতল জমির সাথে ...