অন্তর্ভূক্তিমূলক শিক্ষা ( Inclusive Education )
উদ্দেশ্য ( Objectives )
শিক্ষার্থীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার অর্থ , উদ্দেশ্য সমূহ , উপাদান , বাধাসমূহ সম্পর্কে অবগত হবে ।
শিক্ষার্থীরা ব্যাহত দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন শিশু : অর্থ , চিহ্নিতকরণ , প্রকারভেদ , শিক্ষন পদ্ধতি সম্পর্কে জানবে ।
শিক্ষার্থীরা ব্যাহত শ্রবণক্ষমতা সম্পন্ন শিশু : অর্থ , চিহ্নিতকরণ , প্রকারভেদ , শিক্ষণপদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হবে ।
শিক্ষার্থীরা শিখনমূলক অক্ষমতা : অর্থ , চিহ্নিতকরণ , প্রকারভেদ , শিক্ষকের ভূমিকা সম্পর্কে অবগত হবে ।
প্রাক্ - কথন ( Pre - face )
বর্তমানে শিক্ষাকে সার্বজনীন করার লক্ষ্যে এবং অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার জন্য শিক্ষার অধিকার আইন ( RTE Act 2009 ) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে । কিন্তু অতি প্রাচীনকালে যে কোনোভাবে অসমর্থ শিশু সমাজে ব্রাত্য ছিল । সমাজে এই ধারণা প্রচলিত ছিল যে পূর্বজন্মের পাপের ফলে তাদের এরকম অবস্থা হয়েছে , সেজন্য সে সমস্ত শিশুদের পরিহার , নিষ্ঠুর আচরণ , এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হত , তাদেরকে বিভিন্ন নিম্নকাজ , ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদিতে বাধ্য করা হত । সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজ ব্যবস্থাও পরিবর্তিত হল । প্রতিবন্ধকতার ধরণ অনুযায়ী সমাজের মধ্যে আলাদাভাবে বিশেষ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার আয়োজন করা হল এবং সময়ের সাথে সাথে সমাজের ব্যক্তিদের মানসিকতারও পরিবর্তন হল , এই ধারণা অনুভূত হল যে রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তির শিক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে আর এটিই হল শিক্ষায় মানবতার দিক । আর এর ফলেই শিক্ষার সাথে যুক্ত হয়েছে অন্তর্ভুক্তির ধারণাটি ।
অন্তর্ভুক্তি বলতে বোঝায় একটি বিশেষ দর্শন যা বিশ্বাস করে সমস্ত মানুষ সম্মানীয় ও মূল্যবান । এর বিস্তার বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজ ও জীবনের দিকে , যেখানে প্রত্যেকটি ব্যক্তি সমান অংশীদার । সুতরাং , শিক্ষায়তনে শিশু তার জাতি , ধর্ম , সংস্কৃতি , লিঙ্গ অথবা প্রতিবন্ধকতা নির্বিশেষে একসঙ্গে পড়তে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী থাকবে বিশেষ সরঞ্জাম , বিশেষ নির্দেশনা । এই ব্যবস্থায় বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের সাহায্যও পেতে পারবে । অন্তর্ভুক্তি হল এমন একটি বিষয় যা সমস্ত শিশুকে তার সর্বাধিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে বিদ্যালয়ে পঠনকে নির্দেশ করে এবং দ্বারা সকলের কাছে শিশুর গ্রহণযোগ্যতা ও পরস্পরের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গীকে বুঝায় ।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ( Inclusive Education ) সাধারণ ও কোনো কারণে অসমর্থ সকল শিশুদের একই প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ সুনিশ্চিত করে । এই শিক্ষা , শিক্ষায় বৈষম্যহীনতা , ঐক্যকরণ , সংযুক্তিকরণ , প্রত্যক্ষভাবে বিদ্যালয় ও পরোক্ষভাবে সমাজের সার্বজনীন গঠনকে সুনিশ্চিত করতে সহায়তা করে । ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা মুলত হল এমন একটি দর্শন বা নীতি যার মূল লক্ষ্য হল যারা শিক্ষার বৃত্তের বাইরে আছে তাদের সবাইকে একত্রিত করে শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা ।
চোখ বা দর্শনেন্দ্রিয় পরিবেশের সঙ্গে শিশুর / ব্যক্তির সংযোগস্থাপনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে । দর্শনগত কোনো ত্রুটি বাধা বা অনুপযুক্ততার কারণে একজন শিশু / ব্যক্তি ব্যাহত দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন হয়ে থাকে । ব্যাহত দৃষ্টিশক্তি সম্পন্নতা জীবনে একটি গুরুতর সমস্যা । যদিও ব্যাহত দৃষ্টিশক্তি সম্পন্নতা সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সঠিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে পূর্বের চেয়ে সমাজের মূলস্রোতে এদের ফিরিয়ে আনার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে ।
মানব সমাজে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা রাষ্ট্রেরই করা একান্ত প্রয়োজন এবং এর জন্য প্রয়োজন হল উপযুক্ত শ্রবণক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি । উপযুক্ত শ্রবণ ছাড়া একটি শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভবপর নয় । বর্তমানে বেশিরভাগ শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত ; সুতরাং ব্যাহত শ্রবণক্ষমতা সম্পন্ন শিশুদের শিক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যা কোন মতেই উপেক্ষা করা সম্ভবপর নয় । অন্যান্য ব্যাহত শারীরিক ক্ষমতা বাইরে থেকে পরিলক্ষিত হলেও শ্রবণক্ষমতা নষ্ট হলে তা বাইরে থেকে পরিলক্ষিত সহজে করা যায়না যতক্ষণ না পর্যন্ত ভাষার আদান প্রদান হচ্ছে । তাই ব্যাহত শ্রবণক্ষমতা সম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।
যে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা অক্ষমতা অনেক সময় এক বা একাধিক ক্ষেত্র বা বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত । বিভিন্ন ধরনের অক্ষমতার মধ্যে শিখন অক্ষমতা হল একধরনের জ্ঞানমূলক অক্ষমতা , এটি মূলত চিন্তা করা এবং যুক্তিদানের অক্ষমতা । শিখনে অক্ষম শিশুরা নিজের বয়সি অন্য শিশু ও সহপাঠীদের মতো প্রায় একইরকম আচরণ করে , কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে তারা অন্য স্বাভাবিক শিশুদের মতো একইভাবে কাজ সম্পাদন করতে পারে না , আবার কোন ক্ষেত্রে সমান তালে চলতে পারে না এবং এই অপারগতার কারণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়ার সমস্যা । শিখন প্রতিবন্ধকতা বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের হতে পারে অর্থাৎ একজন ব্যক্তির যে সমস্ত দিকে শিখন অক্ষমতা রয়েছে , অন্য একজন ব্যক্তির সেই সমস্ত দিকে শিখনের অক্ষমতা নাও থাকতে পারে । যেমন- একজন শিক্ষার্থীর হয়তো শিখন ও পঠনের ক্ষেত্রে সমস্যা থাকতে পারে । একজন শিক্ষার্থী হয়তো অঙ্ক কষার ক্ষেত্রে সমস্যা থাকতে পারে আবার একজন শিক্ষার্থীর হয়তো উভয় ক্ষেত্রেই শিখন প্রতিবন্ধকতা বা অক্ষমতা থাকতে পারে । শিখন অক্ষমতা বুঝাতে বুঝানো হয় মনোযোগ দিয়ে শুনা , কথা বলা , পাঠ করা , লেখা , যুক্তি প্রয়োগ এবং গাণিতিক সমস্যা সমাধান করার ক্ষেত্রে বহিঃপ্রকাশিত শিখন সংক্রান্ত অক্ষমতা ; যদিও শিখন অক্ষমতা কখনোই এই মূল প্রতিবন্ধকতার ( শারীরিক , মানসিক ইত্যাদি ) প্রত্যক্ষ ক্রিয়ার ফল নয় ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন