শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়সমূহ ( Some Issues of Education )
উদ্দেশ্য ( Objectives )
শিক্ষার্থীরা সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীর অর্থ , উদ্দেশ্যসমূহ , প্রকারভেদ , শিক্ষামূলক উপযোগিতা সম্পর্কে জানবে ।
শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলা এবং স্বাধীনতার অর্থ , প্রকারভেদ এবং শিক্ষায় এর গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত হবে ।
শিক্ষার্থীরা মূল্যবোধের শিক্ষার অর্থ , প্রয়োজনীয়তা , শিক্ষার মাধ্যমে মূল্যবোধ বিকাশের উপায় সমূহ সম্পর্কে জানবে ।
শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংহতি ও আন্তর্জাতিকতাবোধের শিক্ষার অর্থ , এদের জাগরণে শিক্ষার ভূমিকা সম্পর্কে অবগত হবে ।
প্রাক্ - কথন ( Pre - face )
শিক্ষার মৌলিক তত্ত্বগুলোর সংস্কার ও ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে । সার্থক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে বর্তমানে কেবলমাত্র মানসিক শক্তিগুলোর উৎকর্ষতা সাধনের ব্যবস্থা থাকবে না । থাকবে শিক্ষার্থীর দেহ , প্রক্ষোভ , সামাজিক আচরণ প্রভৃতি সমস্ত দিকগুলোরই সমানভাবে উন্নতি সাধনের ব্যাপক আয়োজন । তাই বিদ্যালয়ে জ্ঞানমূলক কার্যাবলি যেমন লিখন , পঠন ছাড়াও খেলাধূলা , অভিনয় , শিক্ষামূলক ভ্রমণ ইত্যাদি নানা কাজ ধীরে ধীরে স্থান পেতে শুরু করল । শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে শিক্ষাবিদগণ এই কাজগুলোর মূল্য ও সার্থকতা উপলব্ধি করতে শুরু করলেন । সেই জন্য এই কাজগুলোর নাম দেওয়া হল সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলি ( Co - Curricular Activities ) অর্থাৎ এই কাজগুলোকে বিদ্যালয় অনুমোদিত পাঠ্যক্রমের বাইরে কোনো কাজ বলে মনে করা হবে না । এক কথায় বই পড়া , লেখা , অঙ্ক কষা ইত্যাদি কাজগুলো সম্পন্ন করা যেমন শিক্ষার্থীর পক্ষে অপরিহার্য , তেমনি খেলাধূলা , নাচগান , আবৃত্তি , বক্তৃতা , সম্মেলন ইত্যাদি কাজগুলোও সম্পন্ন করা তার সঙ্গে সমানভাবে প্রয়োজনীয় । তাই সহ পাঠ্যক্রমিক কাজগুলোকে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সমান মর্যাদা দেওয়া হল ।
শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করতে গিয়ে বিদ্যালয়ে বিভিন্ন পরস্পর বিরোধী ভাবধারার সম্মুখীন হতে হয় । এই বাধাঘটিত দ্বন্দ্বের সুষ্ঠু সমাধান করতে না পারলে শিক্ষাকার্যে ব্যাঘাত ঘটে । এই রকম একটি সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী বিষয় হল শৃঙ্খলা এবং স্বাধীনতার ধারণা । আপাত দৃষ্টিতে দেখা যায় , শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা করেন , তখন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা খর্ব হয় । আবার যখন শিক্ষক শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যস্ত , শিক্ষার্থীরা তখন খেলার স্বাধীনতা পেতে অধীর হয়ে উঠে । কিন্তু স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা এই দুই - এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় অন্তর্জাত শৃঙ্খলায় ব্যক্তি শৃঙ্খলার আরোপিত সমস্ত নিয়ম - কানুন মেনে চলে নিজের আগ্রহ অথবা প্রয়োজনের তাগিদে , যেমন- খেলার সময় শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে নিজেদের উপর কতগুলো বিধিনিষেধ নিজেরাই আরোপ করে নেয় এবং সকলে স্বেচ্ছায় সেগুলো মেনে চলে । সুতরাং দেখা যায় খেলার মধ্যে শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটতে দেখা যায় । অতএব শিক্ষাকে সার্থক ও কার্যকর করে তুলতে হলে শিক্ষার্থী যাতে একাগ্রতা , আনুগত্য , নিয়মানুবর্তিতা এই গুণগুলির অধিকারী হয় তা দেখাই শিক্ষার কাজ ।
সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবনযাপনের ধারার মধ্যে এক বিরাট পরিবর্তন এসেছে । কৃষি , শিল্প , ধর্ম , সামাজিক বিন্যাস , শিক্ষা ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তনের প্রভাব এসে পড়েছে । এই সার্বিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে বলা হয় আধুনিকতা । কিন্তু এই আধুনিক ধারার সবকিছুই ব্যক্তি জীবনে আশীর্বাদ নয় । জীবন পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষ যদি সেই পরিবেশের সঙ্গে সার্থকভাবে অভিযোজন করতে না পারে তাহলে সম্পূর্ণ সমাজ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে । যে সমাজে কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধের কাঠামো নেই সে সমাজের সংগঠনটিই দুর্বল হয়ে পড়ে । তাই প্রত্যেক সমাজের প্রথম কর্তব্য হল যে আগামীদিনের নাগরিকদের সমাজে প্রচলিত মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত করা এবং সেগুলো যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে তাদের শিক্ষা দেওয়া । সামাজিক আচরণের দিক দিয়ে কতগুলো কাম্য মূল্যবোধ হল সুনাগরিকতা , বিশ্বস্ততা , সহযোগিতা , স্বার্থত্যাগ ইত্যাদি । এই মূল্যবোধগুলো সমাজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক । মূল্যবোধ সমাজের স্থায়িত্ব ও গতিশীলতা বজায় রাখে । শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধ বিকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসাবে দেখা হচ্ছে ।
সৃষ্টির আদিযুগ থেকেই মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করছে । ভারতবর্ষের সকল মানুষ কোনোদিন একই » ভাষায় কথা বলেনি । একই ধর্ম অনুসরণ করেনি , তা সত্ত্বেও যুগ যুগ ধরে তাদের মধ্যে মানসিক প্রক্রিয়ার সমতা দেখা গেছে । এর একটাই কারণ , জাতীয় সংহতি এবং জাতীয় আনুগত্য । প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে যখন ঐক্যের অনুভূতি জাগরিত হয় তখন তাকে জাতীয় সংহতি বলে । আধুনিককালে এই মনোভাবের সম্প্রসারণ একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে । বিজ্ঞানের আবিষ্কার ব্যক্তিদিগকে অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছে । তাই এক রাষ্ট্রের অন্তর্গত ব্যক্তির চিন্তা অন্য রাষ্ট্রের ব্যক্তিদের খুব সহজে প্রভাবিত করেছে । তাই অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিকতাবোধ অর্থাৎ পৃথিবীর অন্যান্য সমাজ ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের সমাজকে উপলব্ধি করা এবং বিশ্ব - মানব সমাজে নিজের সমাজের অবদান সম্পর্কে সচেতন হয়ে বিশ্বশান্তি ও মৈত্রীর জন্য চেষ্টা করাই হল আন্তর্জাতিকতাবোধ । পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ যেদিন ভাবতে শিখবে পৃথিবীর যা কিছু ভাল তার অধিকারী সে এবং যা কিছু খারাপ তার জন্যও দায়ী সে । সেদিন থেকেই সকলের মধ্যে পৃথিবীকে সুন্দর করার মনোভাব জাগরিত হবে । শিক্ষার মধ্য দিয়েই সার্থকভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এইভাব জাগ্রত করা যেতে পারে ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন