মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্যের সাধারণ পরিচয় দাও।
মহাকাব্য : ইংরেজি সাহিত্যের এপিক (Epic)-ই হল বাংলার বীররসাত্মক মহাকাব্য। এটি বস্তুনিষ্ঠ তন্ময় কাব্য, যার মধ্যে লেখকের আন্তর অনুভূতির প্রকাশ থাকে না, থাকে বস্তুপ্রধান ঘটনাবিন্যাসের প্রকাশ। এতে থাকে না গীতিকাব্যোচিত সুরের মূর্ছনা, বদলে থাকে যুদ্ধসজ্জার তূর্য নিনাদ। মহাকাব্যের আখ্যানবস্তু হবে পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক। গ্রন্থারম্ভে আশীর্বচন (নমস্কার) অথবা বস্তুনির্দেশ থাকবে। এর নায়ক হবে ধীরোদাত্ত গুণসম্পন্ন এবং সর্গসংখ্যা হবে আর্ট-এর অধিক। পটভূমি হবে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালপ্রসারী। শৃঙ্গার, বীর ও শান্ত—এই তিনটি রসের মধ্যে একটি প্রাধান্য পাবে। ভাষা হবে ওজস্বী ও গাম্ভীর্যপূর্ণ। মহাকাব্যের সমাপ্তি হবে নায়কের জয়লাভ বা আত্মপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
পৃথিবীতে মোট যে-চারটি সুপ্রাচীন মহাকাব্যের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, সেগুলি হল-সংস্কৃতে রচিত বাল্মীকির 'রামায়ণ' ও বেদব্যাস রচিত 'মহাভারত' এবং হোমারের ইলিয়ড' ও 'ওডিসি'। যদিও এরপর অলংকারশাস্ত্র অনুসারী কিছু মহাকাব্যের নিদর্শনও মেলে। সেগুলি হল-কালিদাসের 'রঘুবংশম', ভার্জিলের ‘ঈনিড', দাস্তের দিভিনা কেম্মেদিয়া', মাইকেল মধুসূদন দত্তের আলংকারিক মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য' ও ইংরেজ কবি টমাস হার্ডির ঐতিহাসিক মহাকাবা 'The Dynasty"।
আখ্যানকাব্য : আখ্যানকাব্য কোনো বিশেষ একটি কাহিনিকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়। কিছু আখ্যানকাব্য পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, বাস্তব, ক্লাসিক রূপের প্রতীককে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়। এই আখ্যানের পরিসর বিস্তৃত নয়, স্বপ্ন । এতে কাহিনির ব্যাপ্তি ও রসের গভীরতা বেশি থাকে না। এমন সাহিত্যিক নিদর্শনগুলিই হল আখ্যানকাব্য। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়-এর 'পদ্মিনী উপাখ্যান', বলদেব পালিতের 'কর্ণার্জুন কাব্য', দীননাথ ধরের 'কংসবিনাশ' প্রভৃতি এর কিছু উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
* ধ্বনিতত্ত্ব
সমীভবন কাকে বলে ? উদাহরণ সহ বুঝিয়ে দাও ।
সমীভবন : পদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি বা যুক্ত অবস্থায় থাকলে, উচ্চারণের সুবিধার জন্য পূর্ববর্তী ধ্বনি পরবর্তী ধ্বনিতে রূপান্তরিত করে, অথবা পরবর্তী ধ্বনি পূর্ববর্তী ধ্বনিকে রূপান্তরিত করে অথবা পরস্পর রূপান্তরিত হয়, তাকে সমীভবন বলে। যেমন—গল্প > গল্প, পক্ > পক্ক।
সমীভবন তিন প্রকার— (১) প্রগত সমীভবন — পদ্ম > পদ্দ, (২) পরাগত সমীভবন-তর্ক > তক্কো, (৩) অন্যোন্য
সমীভবন— কুৎসা > কুচ্ছা।
বর্ণবিপর্যয় বলতে কী বোঝো ?
বর্ণবিপর্যয় বা ধ্বনিবিপর্যয়: শব্দ উচ্চারণের ক্ষেত্রে বাগ্যন্ত্রের কোনো অসুবিধা, অজ্ঞতা বা দ্রুত উচ্চারণের কারণে শব্দ মধ্যস্থ দুটি ধ্বনি উলটে পালটে গিয়ে অর্থাৎ, স্থান পরিবর্তন করে উচ্চারিত হয়। ধ্বনি পরিবর্তনের রীতি অনুযায়ী, ধ্বনিবিজ্ঞানে একেই বলা হয় 'বর্ণবিপর্যয়'। অনেকে একে বিপর্যাসও বলে থাকেন। যেমন— 'BOX' কথাটি থেকে বাংলায় ‘বাকসো' কথাটি এসেছে। কিন্তু অনেকেই আমরা উচ্চারণ করে থাকি ‘বাসকো'। তেমনি—রিক্সা > রিকা, মুকুট > মুটুক, আহ্লাদ > আল্হাদ ইত্যাদি।
অপিনিহিতির সংজ্ঞা ও উদাহরণ দাও।
অপিনিহিতি : ‘অপিনিহিতি' শব্দের ‘অপি’-র অর্থ হল 'আগে' বা 'পূর্বে' এবং ‘নিহিত' শব্দের অর্থ হল 'সন্নিবেশ'। সুতরাং, ‘অপিনিহিতি' শব্দের অর্থ ‘পূর্বে সন্নিবেশ। অর্থাৎ, শব্দের মধ্যে যে স্থানে 'ই' বা ‘উ’-কার আছে, সেই জায়গায় আগেই “ই” বা “উ” ধ্বনিগুলি উচ্চারণ করা হয়। ধ্বনি পরিবর্তনে পূর্বে নিহিত এই ‘ই' বা 'উ' ধ্বনি শব্দের ধ্বনিগত যে-পরিবর্তন ঘটায়, তাকে অপিনিহিতি বলে। ওই 'ই' বা 'উ' ধ্বনি হল অপিনিহিত ‘ই’ বা ‘উ’। এই ধ্বনি পরিবর্তনকে অনেকে স্বরধ্বনিগত ধ্বনিবিপর্যয় বলে থাকেন। অপিনিহিতিতে “ই” বা “উ” ধ্বনি নির্দিষ্ট স্থানের আগেই উচ্চারিত হলে পরে আর উচ্চারিত হয় না। যেমন—ধরিয়া (ধ + অ + র্ + ই + য়্ + আ) > ধইরা (ধ + অ + ই + র + য + আ), জলুয়া > জউলা, সাধু > সাউধ, কাব্য > কাইব্য, লক্ষ > লইকক্ষ ইত্যাদি।
বিষমীভবনের সংজ্ঞা ও উদাহরণ দাও ।
বিষমীভবন : কোনো শব্দে একই ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি থাকলে উচ্চারণ করবার সময় তাদের মধ্যেকার কোনো একটি ধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে যায়। ধ্বনিবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকেই বিষমীভবন বলে।
পদমধ্যস্থ দুটি সমব্যঞ্জনধ্বনির মধ্যে বিষমীভবনের ক্ষেত্রে একটি বদলে যায়। এই পরিবর্তন কেন হয়, তার কারণ সঠিকভাবে নির্দেশ করা যায় না। হয়তো-বা অজ্ঞতাজনিত কারণে অথবা উচ্চারণের সুবিধার জন্য কিংবা দ্রুত উচ্চারণের উদ্দেশ্যে এই পরিবর্তন ঘটে। সমীভবনের মতো বিষমীভবনে ধ্বনিগুলি পরস্পর ঘনিষ্ঠ সংযোগে থাকে না। যেমন—“লাল” শব্দটির প্রথম 'ল' উচ্চারণে 'ন' হয়ে গিয়ে শব্দটি হয় 'নাল'। উদাহরণ: শরীর > শরীল ।
বর্ণদ্বিত্ব বলতে কী বোঝো ?
বর্ণদ্বিত্ব: আমরা সকলে যে-সমস্ত কথা নানা প্রসঙ্গে নানা শ্রেণির মানুষ বলে থাকি, তার মধ্যে কিছু শব্দ আছে যেগুলির মধ্যবর্তী কোনো ধ্বনি অর্থের গুরুত্ব অনুযায়ী উচ্চারণে দ্বিত্ব হয়ে যায়। এই উচ্চারণগত দ্বিত্ব বানানেও প্রকাশ পায়। ধ্বনিবিজ্ঞানে একেই বলে বর্ণদ্বিত্ব। যেমন— সকলে > সককোলে, সকাল > সক্কাল, মুলুক > মুল্লুক।
বাংলা ব্যাকরণে স্বরসংগতি বিষয়টির তাৎপর্য ও বিশিষ্টতা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
‘স্বরসংগতি' শব্দের অর্থ হল বিভিন্ন ধরনের স্বরের মধ্যে সংগতি বা সমতাবিধান। এই সংগতিবিধান একটি রীতি অনুযায়ী সংগঠিত হয়ে থাকে। শব্দের মধ্যে ব্যবহৃত স্বরধ্বনিগুলির উচ্চারণ স্থান যদি একরকম না হয়ে কোনোটি উচ্চে বা কোনোটি নিম্নে অবস্থিত হয়, তবে উচ্চারণ স্থানের এই অসমতার জন্য শব্দের উচ্চারণে বারবার জিভকে ওঠানামা করতে হয় ও জিভের অতিরিক্ত পরিশ্রম হয় আর উচ্চারণ কঠিন হয়ে পড়ে। উচ্চারণকালে জিভের এই পরিশ্রম লাঘবের কারণে স্বরের উচ্চারণ স্থানের মধ্যে একটি সংগতি স্থাপনের চেষ্টা চলে। এই চেষ্টার ফলে অসম স্বরগুলি একরকম হয়ে যেতে পারে। আবার যে-স্বরগুলির উচ্চারণ স্থান অসমান স্বরগুলির মাঝামাঝি, সেই অসমান স্বরগুলি মাঝামাঝি একটি স্বরের চেহারা পায়, যেমন—বিলাতি (ব্ + ই + ল + আ + ত্ + ই) > বিলিতি (ব্ + ই + ল্ + ই + ত + ই)—এখানে ‘ব’ ও ‘ত’-এর সঙ্গে যুক্ত ‘ই’ ধ্বনি মাঝের 'আ' ধ্বনির অসাম্য দূর করে সংগতি- স্থাপন করে। স্বরসংগতির ফলে ‘ল্’ ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত ‘আ’ ধ্বনি, ‘ই' ধ্বনিতে পরিণত হয়ে উচ্চারণের কষ্ট কিছুটা লাঘব করে। যেমন—হিসাব > হিসেব, কুড়াল > কুড়ুল, মিথ্যা > মিথ্যে। তবে ব্যতিক্রমও আছে অর্থাৎ, নিম্নাবস্থিত স্বরের প্রভাবেও স্বরধ্বনিজনিত সংগতিবিধান ঘটে। যেমন— গেল > গ্যালো (উচ্চারণ), মেলা > ম্যালা, কিতাব > কেতাব ইত্যাদি।
ছন্দ
স্বরবৃত্ত ছন্দ কাকে বলে ? (বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।)X
ছন্দের যে-রীতিতে দলের সংখ্যা ও মাত্রার সংখ্যা সমান সমান অর্থাৎ, দল-এর সংখ্যার হিসেবেই মাত্রা গণনা করা হয়, তাকেই দলবৃত্ত রীতির ছন্দ বলে। এই ছন্দকে আবার অনেকে স্বরবৃত্ত ছন্দ, ছড়ার ছন্দ, লৌকিক ছন্দও বলে থাকেন। ছন্দের এই রীতি বহুল প্রচলিত। বাংলার লোকসাহিত্যের অনেক উপাদান এই ছন্দরীতিতেই রচিত। এই ছন্দের প্রতিটি পর্বের প্রথমেই প্রস্বর বা প্রবল শ্বাসাঘাত পড়ে বলে একে আবার শ্বাসাঘাত প্রধান ছন্দও বলে।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন