Discuss the history of the rise of the Tea Industry in Assam. What were its results.
চায়ের জন্ম সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত পৃথিবীতে কোথায় এবং কখন প্রথম চাগাছের উৎপত্তি হয়েছিল সে সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত প্রচলিত আছে। তবে সাধারণভাবে মনে করা হয় পানীয় হিসাবে চা চাষের প্রচলন প্রথম চিন দেশেই হয়েছিল। চিনের রুপকথা অনুযায়ী প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে সম্রাট Shennong (সিন্নোংগ) জঙ্গলে ভ্রমন শেষ করে যখন গাছের নীচে জল ফোটাচ্ছিলেন তখন কয়েকটি পাতা ঐ গরম জলে পরে যায়। অনুসন্ধিৎসু সম্রাট পাতাসহ জলে চুমুক দিয়ে ঐ জলের স্বাদ ও গন্ধে বিস্মিত হলেন। চিনা লেখক লু-উ (Lu-Yu) এর মতে এইভাবেই চিন দেশে চা পানীয় হিসাবে প্রচলিত হয়।
আবার চিনা বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী বোধিধর্ম নামে এক বৌদ্ধভিক্ষু ধ্যানের সময় হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েন। অসময়ে ঘুম আসার কারনে বোধিধর্ম উত্তেজিত হয়ে নিজের চোখের মনি কেটে মাটিতে নিক্ষিপ্ত করেন। যে জায়গাতে চোখের মণিটি পরেছিল সেখান থেকেই নাকি চা গাছের জন্ম হয়।
অন্যদিকে কিছু পন্ডিত মনে করেন রামায়নে রাবনের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে লক্ষ্মণ আহত হলে রামচন্দ্র হনুমানকে যে সঞ্জীবনী গাছ আনতে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই সঞ্জীবনী গাছটি ছিল প্রকৃতপক্ষে চা গাছ। এই কারনে ঐ সমস্ত পন্ডিত ভারতবর্ষকেই চাগাছের জন্মস্থান বলে প্রচার করেন। তবে মতামত যাইহোকনা কেন চায়ের জন্মবৃত্তান্ত আজও রহস্যাবৃত।
আসামে চা শিল্পের প্রতিষ্ঠা আসামে কে সর্বপ্রথম চা এর প্রবর্তন করেছিলেন সে সম্পর্কে বিতর্ক আছে। তবে সূর্যকান্ত ভূঁইয়া তাঁর ‘Anglo- Assamese Relations 1771-1826 গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে স্কটিশ বণিক ও পর্যটক রবার্ট ব্রুশ উত্তর আসামে আহোম রাজধানী রংপুরে (বর্তমানে শিবশাগরের নিকটে) বর্মীদের হাতে বন্দি অবস্থায় ১৮২৩ সালে সিংফো সর্দারের কাছ থেকে বুনো চা গাছের সন্ধান পান। আবার অনেকে রবার্ট ব্রুশ এর ভাই আলেকজান্ডার ব্রুশ এবং কেউ কেউ মণিরাম দেওয়ানকে আসামে চা শিল্পের জনক বলে দাবী করেন।
তবে আসামে চাশিল্পের উদ্ভাবক সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকলেও আসামে চাশিল্পের প্রসারে ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমিকা সম্পর্কে কোন দ্বিমতের অবকাশ নাই। বস্তুতঃ ১৮৩৪ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিনের সাথে চায়ের একচেটিয়া ব্যবসা হারানোর পর ভারতে চা শিল্প প্রসারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ফলে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক (১৮২৮-৩৫) নিজে উদ্যোগ নিয়ে ১৮৩৪ সালে ভারতে চা শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে Tea Committee গঠন করেন। এই কমিটির সম্পাদক জর্জ জেমস্ গর্ডন ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষের সর্বত্র সার্কুলারের মাধ্যমে জানতে চাইলেন ভারতবর্ষের কোন অঞ্চল চা চাষের জন্য উপযুক্ত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সে সময় আসামে অবস্থিত ক্যাপ্টেন এফ.জেনকিনস্ চা চাষের জন্য আসামকে বেছে নেওয়ার জন্য দাবী জানান। ফলে জেনকিংস এর সহযোগী লেফটেন্যান্ট চালটন আসামের কিছু বনজ চা কোলকাতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেন। যেহেতু সেই সময় ভারতবর্ষে চায়ের চর্চা ব্যাপকভাবে ছিলনা সেই কারনে কোম্পানির Tea Com- mittee এর উদ্যোগে চাবাগান শিল্প সম্পর্কে হাতে কলমে জ্ঞান লাভ করার উদ্দেশ্যে কমিটির সম্পাদক জর্জ হেমস্ গর্ডনকে চিনে পাঠানো হয়। গর্ডন চিনের চাগাছের কিছু প্রজাতি এবং চা শিল্পের কিছু দক্ষ শ্রমিককে ভারতবর্ষে নিয়ে আসেন। কিন্তু বিশেষতঃ জলবায়ুগত কারনে গর্ডনের নিয়ে আসা চিন প্রজাতির চা চিনা পদ্ধতিতে আসামে উৎপাদন করতে গিয়ে নানা রকম বিপর্যয় দেখা দেয়। এইরূপ পরিস্থিতিতে চার্লস্ আলেকজান্ডার রুশ সাদিয়া অঞ্চলে একটি নার্সারি তৈরি করে একটার পর একটা পরীক্ষা অব্যহত রাখেন। অবশেষে দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত আসামের তথাকথিত বনজ চা উৎকৃষ্টমানের বলে প্রমাণিত হয়। ১৮৩৮ সালের ৮ই মে ১৫৯ কেজি আসামের চা ইংল্যান্ডে পাঠানো হয় এবং ১৮৩৯ সালের ১০ই জানুয়ারী ইন্ডিয়া হাউসে সেগুলি দ্রুত বিক্রি হয়। এইভাবে আসামে চা ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যে পাশ্চাত্য দেশগুলিতে আসামের চা 'Black Tea' হিসাবে সুনাম অর্জন করে।
আসাম কোম্পানির প্রতিষ্ঠা এবং উদ্যোগ আসামে চাবাগান শিল্পকে ব্যাপকভাবে প্রসারের উদ্দেশ্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮৩৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারী লন্ডনে আসাম কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। আসাম কোম্পানি চা বীজ ও চারার উন্নয়নের জন্য ব্যাপকভাবে নার্সারি প্রতিষ্ঠা করা, মাটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, মিশ্রণের মাধ্যমে উন্নত স্বাদ সৃষ্টি গবেষণা করা, বিশ্ববাজারে চা নিলাম ও বিক্রির নিয়মকানুন তৈরী করা প্রভৃতির ক্ষেত্রে অগ্রনি ভূমিকা গ্রহণ করে। ফলে ১৮৪০ সালের মধ্যেই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রনাধীনে পরীক্ষা মূলকভাবে তৈরী করা বাগানগুলির দুই-তৃতিয়াংশ আসাম কোম্পানিকে প্রত্যার্পণ করা হয়। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার পাশাপাশি ১৮৫৫ সালের মধ্যে আসামের কাছার এবং বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত শ্রীহট্ট ও চট্টগ্রামেও চা বাগান গড়ে ওঠে। ক্রমেই ত্রিপুরা, দার্জিলিং, দেরাদুন, গাড়োয়াল প্রভৃতি পার্বত্য এলাকায় চা-বাগান প্রসারিত হয়। ১৮৭২ সালে আসামের ৫৬ হাজার একর জমিতে চা চাষ আরম্ভ হয় যা ১৯০১ সালে ৩৩৮ হাজার একরে পরিণত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৮৮ সালে ভারত চিনের থেকে বেশি পরিমান চা ইংল্যান্ডে রপ্তানি করতে সমর্থ হয়।
আসামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চা বাগান প্রতিষ্ঠা আসাম কোম্পানির সাথে ইউরোপের স্বচ্ছল সম্প্রদায়ের একাংশ আসামে চা বাগানের মালিক হওয়ার উদ্দেশ্যে আসাম কোম্পানির উমেদারি শুরু করেন। সেই সঙ্গে আসাম কোম্পানির সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে আসামের অনেক বিত্তবান ব্যক্তি আসামে চা বাগান প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে আসেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মণিরাম দেওয়াম, রসেশ্বর বড়ুয়া প্রমুখ।
আসামে চা শিল্পের প্রভাব
প্রথমত আসামের চা বাগানগুলি থেকে উৎপাদিত চা যাতে সহজে নিকটবর্তী বন্দরে নিয়ে যাওয়া যায় এবং সেখান থেকে জাহাজে ইউরোপে পাঠানো যায় সেই উদ্দেশ্যে আসামের দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে রেল পথ প্রসারিত হয়। ১৮৮১-১৯০৩ সালের মধ্যে আসামের অভ্যন্তরে ৭১৫ মাইল রেলপথ প্রসারিত হয়। রেলপথের সূত্রধরে রাস্তা, সেতুসহ সামগ্রিক পরিকাঠামো সবই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত শুধুমাত্র চা বাগানগুলিকে লক্ষ্য রেখে রেললাইন নির্মাণ করায় গোয়াল পাড়া, বরপেটা, শিবশাগরের মত পুরনো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো যোগাযোগের অভাবে ক্রমশঃ নির্জীব ও নিষ্প্রাণ হয়ে পরে।
তৃতীয়ত চা বাগানকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষক, শ্রমিক, কারিগর, ছুতোর প্রভৃতি বিভিন্ন পেশার লোক দলে দলে আসামে প্রবেশ করে। ১৯১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী সেইসময়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় মোট জনসংখ্যা ছিল ৩১, ০৮, ৬৬৯ যার মধ্যে ৬, ৩১, ৫৫২ জন ছিলেন আসামের বাইরে থেকে আগত। এত বিপুল পরিমান মানুষ বাইরে থেকে রার ফলে আসামের জন বিন্যাসে এক কঠিন জটিলতার সৃষ্টি হয় যার সমাধান আসামে প্রবেশ করার আজও হয়নি।
চতুর্থত আসামের চা বাগানগুলি থেকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমান অর্থন উপার্জন করে বাগান কর্তৃপক্ষ একদিকে শৌখিন এবং বিলাস বহুল জীবন যাপন শুরু করে অন্যদিকে বঙ্গদেশ, উড়িষ্যা, বিহারসহ হিন্দিবলয়ের বিভিন্ন অঞ্চল এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি থেকে হতদরিদ্র মানুষগুলোকে বিভিন্নভাবে প্রলোভিত করে আসামের চা বাগানগুলোতে নিয়ে এসে অতি অল্পবেতনে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। বাগান গুলোতে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, কলেরা ইত্যাদির প্রকোপে পরে বিনা চিকিৎসায় শ্রমিকদের মৃত্যু ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। জ আসামের চা-বাগান গুলো থেকে অর্জিত পাহাড় প্রমাণ মুনাফা বিদেশে চলে যাওয়ার ফলে আসাম এবং আসামের মানুষ যে তিমিরে দাড়িয়ে ছিল তার কোন পরিবর্তন হলনা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন