Discuss in short about the Quit India Movement in Assam.
আসামে ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
প্রেক্ষাপট ১৯৩৯ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কোন আলোচনা না করেই ব্রিটিশ সরকার ভারতকে যুদ্ধরত দেশ বলে ঘোষণা করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে ভারতীয় রাজনীতি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে ১৯৪১ খ্রীষ্টাব্দে জাপান অক্ষশক্তির পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে এবং দ্রুত ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়দের সাহায্য লাভের আশায় ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার সদস্য স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস একগুচ্ছ প্রস্তাব নিয়ে ভারতে আসেন। কিন্তু ক্রিপশ মিশন ব্যর্থ হলে সারা ভারত চরম হতাশা ও ক্ষোভে ফেটে পরে। এই অবস্থায় গান্ধিজী দাবী জানান যে জাপানি আক্রমন থেকে ভারতকে রক্ষা করার জন্য ব্রিটেনকে অবিলম্বে ভারত ত্যাগ করতে হবে এবং ভারতকে পূর্ন স্বাধীনতা দিতে হবে। সুতরাং ব্রিটিশ সরকারকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী মানতে বাধ্য করার জন্য ৮ই আগস্ট ১৯৪২ সালে গান্ধিজীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ভারতছাড়ো আন্দোলনের ডাক দেয়। গান্ধিজী জাতির উদ্দেশ্যে বলেন, “পূর্ন স্বাধীনতা অপেক্ষা কম কোনো কিছুতেই আমি সন্তুষ্ট হবনা ... করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে”। এউভাবে গান্ধিজির ডাকে সমগ্র ভারতে স্বাধীনতার শেষ সংগ্রাম শুরু হয় যা আগস্ট আন্দোলন বা ভারতছারো আন্দোলন নামে পরিচিত।
ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং অগ্নিগর্ভ আসাম ১৯৪২ সালের ৮ই আগস্ট ভারতছারো আন্দোলন ঘোষিত হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে গান্ধিজী, জওহর লাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল, আজাদ থেকে শুরু করে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করা হয়। কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ৯ই আগস্ট থেকে আন্দোলনের দাবানল সর্বত্র ছরিয়ে পরে। ৯ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে আসাম কংগ্রেসের অগ্রনী নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মহঃ তায়েবুল্লা, গোপীনাথ বরদলোই, বিষুরাম মেধি প্রমুখ।
প্রাথমিকভাবে গান্ধিবাদী অহিংস পথে সত্যাগ্রহ, মিছিল, হরতাল, সরকারী ভবনে কংগ্রেস পতাকা উত্তোলন ইত্যাদির মধ্যদিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। কিন্তু অনতিবিলম্বে এই আন্দোলন সহিংস রূপ ধারন করে। বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারীরা সরকারি ভবনে অগ্নি সংযোগ করে, পোষ্ট ও টেলিগ্রামের লাইন ছিন্নভিন্ন করে, রেল লাইন উড়িয়ে দেয়, থানা আক্রমন করে এবং সামরিক বাহিনির সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আসলে প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ কারাবন্দি থাকার ফলে এবং অধিকাংশ স্থলে ছাত্র যুবকরা নেতৃত্ব দখল করায় আসাম সহ অন্যান্য জায়গায় হিংসাত্মক ঘটনাকে নিয়ন্ত্রন করার মতো উদ্যোগ তেমন ছিলনা।
আসামে ভারত ছারো আন্দোলনের বিস্তার ও প্রকৃতি ভারতছারো আন্দোলন আসামের কামরুপ, নওগাঁও, দরং, শিবসাগর, গোয়ালপারা, লখিমপুর, সিলেট প্রভৃতি স্থানে ব্যাপক আকার ধারন করে ছিল। ১৯৪২ সালের ১৫ আগস্ট থেকে কামরুপে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে বরপেটা মহুকুমায় সরকারী সম্পত্তি, মৌজাদার, সরকারী উকিল প্রভৃতির ঘরবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। ব্রজনাথ শর্মার নেতৃত্বে একদল আন্দোলনকারী ২৬শে আগস্ট সরভোগে নির্মিয়মান সপনা বিমানবন্দরে হানা দিয়ে সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করে দেয়। কামরুপ জেলার বজালি, নলবারি, তিহু, পট্টটারকুচি প্রভৃতি স্থানে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম শুরু হয়। কৃষকরা খাজনা প্রদান বন্ধ করে দেয়। পান্ডু, গুয়াহাটি, নলবারি প্রভৃতি স্থানে বোমা বিস্ফোরন করা হয়। ১৯৪২ সালের ২৪শে নভেম্বর পানি-খাতি-পানবাড়ি বিভাগে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য বিশেষ একটি ট্রেনে অন্তর্ঘাতের জন্য ৪জন মারা যায় এবং ৪১ জন আহত হয়।
নওগাঁও-এ আন্দোলনকারীরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সামরিক সরঞ্জাম ও কেন্দ্রগুলির উপর আক্রমন করে ফলে পুলিশ গুলিচালালে কয়েকজন আন্দোলনকারীর জীবনহানী ঘটে। ১৯৪২ সালের ২৫শে আগস্ট নওগাঁও জেলার কামপুরে আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে মিছিল করে পোস্ট অফিস, রেল স্টেশন এবং সার্কেল অফিসে ভাঙচুর করে সরকারি অফিসারদের মাথায় গান্ধিটুপি পরিয়ে দিয়ে বন্দেমাতরম ধ্বনি দিতে বাধ্য করেছিলেন। পুলিশের গুলিতে কোলাই কোচ, হেমোরাম বোরা, তিলক ডেকা, লক্ষিকান্ত হাজারিকা, ভোগেশ্বরী ফুকনানি প্রভৃতি আন্দোলন কারীর মৃত্যু হয়। মহেন্দ্রনাথ হাজারিকার মৃত্যু বাহিনীর দাপটে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী নওগাঁওয়ে চরম বিভিষিকার সম্মুখীন হয়েছিল।
তবে ভারতছারো আন্দোলনের করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে ধ্বনি সবথেকে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল দরং জেলাতে। দরং জেলার সুতিয়া ও জামগুরিতে কিছুদিনের জন্য জনগনের রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই জেলাতেই সবথেকে বেশি মহিলা পিকেটিং এবং মিছিলে অংশ গ্রহণ করেছিল। ২০ সেপ্টেম্বর কমলাকান্ত দাস এর নেতৃত্বে পাঁচ হাজার মানুষের জঙ্গি মিছিল ঢেকিয়াজুলি থানা দখল করার চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে ১১ জন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। একই দিনে গোহপুর থানায় কংগ্রেসের পতাকা উত্তোলন করতে গিয়ে ১৮ বছরের মেয়ে কনকলতা বরুয়া পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
আসামের শিবসাগর জেলাতে ভারতছারো আন্দোলন অহিংস এবং সহিংস উভয়পথেই পরিচালিত হয়েছিল শান্তিবাহিনী এবং মৃত্যুবাহিনীর নেতৃত্বে। ১৯৪২ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর ৫০০ জন আন্দোলনকারী একত্রিত হয়ে ডেরাগাঁও থানায় কংগ্রেসের পতাকা উড়িয়ে দিয়ে সাব-ডেপুটি কালেক্টরের মাথায় গান্ধিটুপি পরিয়ে দিয়েছিল। লখেশ্বর বরুয়া জোরহাটের চারিগাঁও মৌজায় কিছুদিনের জন্য স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪২ সালের ১০ অক্টোবর গভীররাতে গোলাঘাটের সরুপাথর স্টেশন থেকে কিছুটা দুরে মৃত্যুবাহিনীর সদস্যরা রেললাইন উপরে ফেললে প্রায় ১০০০ ব্রিটিশ সেনার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় যুক্ত থাকার সন্দেহে কুশল চন্দ্ৰ কুঁত্তরকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
উপসংহার এই ভাবে দেখা যায় প্রায় সমগ্র আসামে ভারতছারো আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। ভারতছারো আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করতে গিয়ে ২২ জন প্রাণ হারান, ৩৫৩১ জন বন্দি হন, এবং কমপক্ষে ৮০ জন মহিলা পুলিশের বর্বর অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন। সরকারী দমননীতির ব্যাপকতার ফলে সমগ্র দেশের সঙ্গে সঙ্গে আসামেও ভারতছারো আন্দোলন ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের মধ্যেই হীনবল হয়ে পরে। যে উদ্দেশ্যগুলোকে সামনে রেখে ভারত ছারো আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার একটিও আদায় করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে ভারতে তাদের দিন ফুরিয়ে এসেছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন