Discuss the background, extent, causes of failure and conse- quences of the Revolt of 1857 in Assam.
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রেক্ষাপট, বিস্তার, ব্যর্থতার কারন এবং ফলাফল আলোচনা করো।
ভূমিকা এতদিন পর্যন্ত ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহকে মূলত উত্তর ও মধ্যভারতীয় ঘটনা হিসেবেই চিত্রিত করা হোত। গাঙ্গেয় উপত্যকাকেই উত্তেজনার প্রাণকেন্দ্র মনে করা হোত এবং ব্রহ্মপুত্র বা বরাক উপত্যকাকে নিস্তরংগ বা ‘Stagnent backwater' বলেই অভিহিত করা হত। ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতে বিশেষ করে আসামে ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের সময়ে ব্রিটিশ শক্তি যে কত আতংকের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছিল সেই সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা এতদিন হয় নি। যদিও ১৯৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে অসমিয়া ঐতিহাসিক বেনুধর শর্মা এবং পরবর্তী সময়ে H.K. Barpujari 'Assam in the Days of the Com - pany' গ্রন্থে আসামে মহাবিদ্রোহের বিস্তার সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করেছেন। পরবর্তিকালে ২০০৭ সালে মহাবিদ্রোহের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতে মহাবিদ্রোহের বিস্তার এবং প্রকৃতি চর্চার ক্ষেত্রে নতুন করে আগ্রহ দেখা দেয়। কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতের মহাবিদ্রোহের প্রকৃত মূল্যায়ন আজও হয়নি।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রেক্ষাপট ১৯২৮ সালে ইয়ান্দাবুর সন্ধির শর্তের সূত্র ধরে আসামে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই আসাম তথা উত্তরপূর্ব ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি হতে থাকে। আর এই ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতার প্রকাশ ঘটে ১৮২৮ খ্রীষ্টাব্দে গোমধর কুত্তর এর বিদ্রোহ, ১৮২৯ সালে খাসি নেতা ইউ তিরোট সিং এর বিদ্রোহ ১৮৩৯ সালে খামতি বিদ্রোহ, রেইজমিলের নেতৃত্বে বিভিন্ন কৃষক বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালে Assam Light Infantry এর বিদ্রোহ প্রভৃতির মধ্য দিয়ে।
বস্তুত ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রাক্কালে ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন নীতিকে কেন্দ্ৰ করে ভারতের অন্যান্য অংশের মতো উত্তর-পূর্ব ভারতেও ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতা স্বক্রিয় হয়ে উঠেছিল। স্বত্ববিলোপ নীতির অজুহাতে ব্রিটিশ কর্তৃক গোবিন্দ চন্দ্রের কাছার রাজ্য দখল, রামসিং এর জয়ন্তিয়া রাজ্য দখল, পুরন্দর সিংহের পদচ্যুতি, কন্দপেশ্বর সিংহকে আহোম সিংহাসন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মণিরাম দেওয়ানের সংগ্রাম প্রভৃতি আসামে এক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। এইরুপ পরিস্থিতিতে এনফিল্ড রাইফেলকে কেন্দ্র করে বেঙ্গল আর্মির সিপাহি মঙ্গল পান্ডে ১৮৫৭ সালের ২৯শে মার্চ কোলকাতার সন্নিকটে ব্যারাকপুরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে বেঙ্গল আমির পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত 1st Assam Light Infantry আসামেও বিদ্রোহের ধ্বজা তুলে ধরে।
বিদ্রোহের বিস্তার ১৮৫৭ সালের ২৯শে মার্চ ব্যারাকপুরে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর ক্রমেই তা আগ্রা, এলাহাবাদ, আম্বালা, মিরাট, অযোধ্যা, কানপুর, ঝাঁসি, আরা প্রভৃতি জায়গায় ছরিয়ে পরে। ১৮৫৭ সালের ১১ই মে মীরাট থেকে দিল্লি চলো আওয়াজ তুলে বিদ্রোহীরা সমগ্র ভারতের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে।
মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে সামনে রেখে সিপাহীদের এগিয়ে যাওয়ার কাহিনী মণিরাম দেওয়ানকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করল। তিনি কন্দর্পেশ্বর সিংহকে আহম সিংহাসনে বসানোর এক সুবর্ন সুযোগ দেখতে পান। সুতরাং সময় নষ্ট না করে মণিরাম দেওয়ান কোলকাতায় মধুমল্লিকের বাড়ী থেকে সাংকেতিক বার্তার মাধ্যমে নাবালক কন্দপেশ্বর সিংহকে উত্তেজিত করে জোড়হাট, ডিব্ৰুগর, গুয়াহাটি এবং গোলাঘাটের হিন্দুস্তানি সিপাহিদের সাহায্য নিয়ে বিদ্রোহের ধ্বজা উড়িয়ে দিতে বলেন। কারন আসাম বাহিনীর অধীনে কর্মরত হিন্দুস্তানি সৈনিকের অনেকেই মহাবিদ্রোহের নেতা কুনওয়ার সিং এর অঞ্চল থেকে এসেছিলেন এবং তাদের মনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চাপা অসন্তোষ ছিল।
মণিরাম দেওয়ানের নির্দেশ মতন কন্দপেশ্বর সিংহ সুবেদার নূর মহম্মদ, ভিকুন শেখ প্রভৃতির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। ইতিমধ্যে উত্তর ভারতের বিদ্রোহীদের একটা অংশ গুয়াহাটির মধ্যদিয়ে আসামে ঢুকে সিপাহীদের উত্তেজিত করে তোলে। ফলে গোলাঘাটের দক্ষিণে প্রায় ১২ কিমি দুরে Nogora গ্রামের কাছে জামুগুড়ি ও বরপাথর সেনা ছাউনিতে আসামে মহাবিদ্রোহের প্রথম অগ্নিশিখা জ্বলে ওঠে। অনতিবিলম্বে আসামের ইউরোপীয় চাবাগানের ঠিকাদারদের অধীনস্ত শ্রমিকরা সিপারিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বাগানের কাজ বন্ধ করে দেয়। ক্রমেই বিদ্রোহ আসামের বরাক উপত্যকায় ছড়িয়ে পরে এবং খাসি জয়ন্তিয়া পাহাড়েও চাপা উত্তেজনার সৃষ্টি করে। আসামে মহাবিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর মণিরাম দেওয়ান পরিকল্পনা করেন যে, দুর্গাপূজার সপ্তমিতে তিনি কোলকাতা থেকে আসামে ফিরে গিয়ে কন্দর্পেশ্বর সিংহকে স্বৰ্গদেও (রাজা) হিসেবে ঘোষণা করবেন। কিন্তু Assam Light Infantry এর সিপাহীদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং হরনাথ পার্বতিয়া বরুয়ার ষড়যন্ত্রের ফলে মণিরামের সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ সরকার কন্দর্পেশ্বর সিংহ ও তার সহযোগীদের আসাম থেকে এবং মণিরাম ও তার সহযোগীদের কোলকাতা থেকে গ্রেপ্তার করে। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কন্দর্পেশ্বর সিংহকে কারাবাস এবং মণিরাম ও তার সহযোগী পিয়ালি বরুয়াকে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়। ১৮৫৮ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী মণিরাম দেওয়ান ও পিয়ালি বরুয়ার ফাঁসি আসামের মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।
ব্যর্থতার কারণ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতন আসামের বিদ্রোহও ব্রিটিশ সরকার কঠোর হাতে দমন করে। বিদ্রোহ দমনের কঠোরতা এতো বেশি ছিল যে, ডিব্ৰুগড় সহ আসামের অন্যান্য অংশের লোকেরা সাহেব সেনাদের নাম শুনেলই আতংক গ্রস্ত হয়ে উঠত। তবে দমননীতির কঠোরতার পাশাপাশি আসামে সিপাহি বিদ্রোহের ব্যার্থতার অপর কারন ছিল আহোম রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের অনাস্থা। বস্তুতঃ বর্মী আক্রমণে বিধ্বস্ত আসামে ব্রিটিশরা যেভাবে শান্তি শৃংখলা ফিরিয়ে এনেছিল তাতে অনেকেই স্বস্তি ফিরে পেয়েছিল। ফলে ব্রিটিশ বিরোধী এই বিদ্রোহ মূলতঃ আপার আসামের কিছু অভিজাত, সিপাহীদের একাংশ এবং কিছু চাবাগানের ঠিকাদার এবং স্থানীয় শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে এই বিদ্রোহের ব্যার্থতা ছিল অনিবার্য।
ফলাফল প্রথমত ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ সরকার বেঙ্গল আর্মি এবং Assam Light Infantry কে ভেঙ্গে দেয়। এর পরিবর্তে যে সব জনগোষ্ঠীরা বা জাতি কোম্পানির পক্ষনিয়ে বা কোম্পানির অনুগত হয়ে বিদ্রোহ দমনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল তাদের যেমন গোর্খা, শিখ ইত্যাদিকে যোদ্ধা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে নতুন রেজিমেন্ট তৈরি করা হয়।
দ্বিতীয়ত ১৮৫৭ সালের পর আসামের অভিজাত শ্রেণি নীরব হয়ে যায় এবং কেউ কেউ ব্রিটিশের অনুগত ভৃত্যে পরিণত হয়।
তৃতীয়ত ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে যে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি দেখা দিয়েছিল তা ধ্বংস করার জন্য ব্রিটিশ সরকার 'Divide and Rule' নীতি গ্রহণ করে। এরফলে আসাম সহ ভারতের অন্যত্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আত্মপ্রকাশ করে।
চতুর্থত ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রতি আসামের চা বাগানের স্থানীয় শ্রমিকরা সমর্থন জানিয়েছিল। এরফলে স্থানীয় শ্রমিকদের পরিবর্তে বাইরে থেকে হাজার হাজার শ্রমিক এনে চাবাগানগুলোতে নিয়োগ করা হয়েছিল। এরফলে আসামের জনবিন্যাষে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যার সমাধান আজও হয়নি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন