Discuss the Role of the press in Creating Cultural awakening in Assam ?
আসামে সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরিতে সংবাদ পত্রের ভূমিকা আলোচনা করো।
ভূমিকা ১৮২৬ খ্রীষ্টাব্দে ইয়ান্দাবুর চুক্তির শর্তকে উপলক্ষ্য করে আসামে ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত হয়। আসামে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিভিন্ন খ্রিষ্টান মিশনারী ও আসামে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারের জন্য উপস্থিত হয়। এরই সূত্র ধরে ব্যাপটিষ্ট মিশন ১৮৩৬ সালে শিবসাগরে একটি ছাপাখানা এবং পরবর্তিকালে মিশন প্রেস এর প্রবর্তন করে। এই মিশন প্রেস থেকেই ১৮৪৬ সালে অসমিয়া ভাষার প্রথম পত্রিকা 'অরুনোদয়' প্রকাশিত হয়। অরুনোদয়ের পাশাপাশি কোলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলায় সমাচার দর্পণ, সমাচার চন্দ্রিকা এবং পরবর্তি সময়ে মাসিক পত্রিকা (১৮৫৪-৫৮) প্রভৃতিও আসামে যথেষ্ট পরিমানে প্রচলিত ছিল।
যদিও ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত আসামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসমিয়া ভাষা চালু ছিল না। তথাপি ১৮৭২ সালে সমগ্র ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমিয়া ভাষায় তিনটি স্থানিয় পত্রিকার সন্ধান পাওয়া যায়। এই তিনটি পত্রিকার মধ্যে দুটি ছাপা হত শিবসাগর থেকে এবং একটি ছাপা হত গুয়াহাটি থেকে। ১৮৭২ সালের পরও কিছু পত্র পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু সবগুলিই ছিল ক্ষণস্থায়ী। এর প্রধান কারন ছিল স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ঊনবিংশ শতকের আসামে যে কয়েকটি পত্রিকা বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল সেগুলি হল :-
১) অরুনোদয় আমেরিকান ব্যাপটিস্ট মিশনের উদ্যোগে মূলতঃ খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ১৮৪৬ সালে অসমিয়া ভাষায় আসামের শিবসাগর থেকে অরুনোদয় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। আসামের ‘রাজা রামমোহন রায়' নামে পরিচিত আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন, অসমিয়া ভাষার ‘পানিনি' নামে খ্যাত ‘হেমকোষ' রচয়িতা হেমচন্দ্র বরুয়া, আসামের 'বিদ্যাসাগর' নামে পরিচিত গুনাভিরাম বরুয়া, Nathan Brown, Miles Bronson, Levi Nidhi প্রমুখ অরুনোদয় পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। এপ্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, অরুনোদয় পত্রিকায় অসমিয়া ভাষায় যখন বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছিল তখন কিন্তু আসামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আদালতে অসমিয়া ভাষায় পরিবর্তে বাংলা ভাষা প্রচলিত ছিল। ফলে অবদমিত অসমিয়া ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই বেশিরভাগ লেখা অরুনোদয় পত্রিকায় প্রকাশিত হোত। ফলে ভাষা ভিত্তিক সুপ্ত জাতীয়তাবাদ ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়ায় এবং এটিই ছিল অরুনোদয় পত্রিকার সবচেয়ে বড়ো অবদান। ‘আহোম বুরুঞ্জি বা ‘চুটিয়া বুরুঞ্জির’ অসমিয়া অনুবাদ সহ ‘অনেক দেশের সংবাদ' ইত্যাদি পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হত। ১৮৬৭-৬৮ সালে অরুনোদয় পত্রিকার প্রায় সাতশো গ্রাহক ছিল।
অনেকে মনে করেন যে, ১৮৪৬ সালে অরুনোদয় পত্রিকার প্রকাশনার সাথে সাথে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয়। বস্তুতঃ খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও সাধারন বুদ্ধি বা জ্ঞানের প্রচার ও অরুনোদয় পত্রিকার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
কিন্তু অরুনোদয় পত্রিকার কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। এই পত্রিকাটি যে শুধু মিশনারিদের মুখপত্র ছিল তাই নয়, এই পত্রিকাটি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গৌড়ব গাঁথা ও প্রচার করেছিল। আসামের কৃষকদের উপর উচ্চহারে রাজস্ব আরোপ, সরকারি উদ্যোগে আফিমের ব্যবসা, সাহেবদের পরিচালনাধীন চাবাগানগুলোতে দুঃসহ জীবন বা সামগ্রিকভাবে ঔপনিবেশিক শোষণ সম্পর্কে অরুনোদয় পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল পক্ষপাতপূর্ণ। এইসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১৮৪৬-১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৬ বছর অরুণোদয় পত্রিকা অসমিয়া ভাষা ও সাহিত্যিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে যে উদ্যোগ করেছিল তা চীর স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
2) Assam News ১৮৮২ সালে অরুণোদয় পত্রিকা বন্ধ হলেও ঐ বছরেই গুয়াহাটি থেকে হেমচন্দ্র বরুয়ার উদ্যোগে অসমিয়া এবং ইংরেজি ভাষায় সাপ্তাহিক Assam News পত্রিকা প্রকাশিত হয়। শুরু থেকেই পত্রিকাটি সমকালীন কিছু সমস্যা সহ আসাম সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য প্রকাশ করে পাঠকের জ্ঞান-স্পৃহা বাড়াতে এবং জনমত গঠনে বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়। অল্প সময়ের মধ্যে পত্রিকাটির গ্রাহক নয়'শো অতিক্রম করেছিল। কিন্তু ১৮৮৫ সালে মাত্র তিন বছরের মাথায় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
(৩) জোনাকি কোলকাতায় অসমিয়া ছাত্রদের প্রতিষ্ঠিত অসমিয়া ভাষা উন্নতিসভা'র মুখপত্র হিসাবে ১৮৮৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী মাসিক সাহিত্য পত্রিকা জোনাকি প্রকাশিত হয়। বাংলায় বঙ্গদর্শন পত্রিকার মত, আসামের জোনাকি পত্রিকা চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা, হেমচন্দ্ৰ গোস্বামী, লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া প্রভৃতি বরেণ্য ব্যক্তিদের সম্পাদনায় জোনাকি আসামের সাহিত্যে রেনেসাঁস এনেছিল। মূলতঃ আসামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নৈসর্গিক শোভার বর্ণনা, আসামের কাহিনি প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে জোনাকি পত্রিকায় লেখালেখি চলত। এই পত্রিকাটি বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।
এই পত্রিকা তিনটির পাশাপাশি 'অসম বিলাসিনী', 'অসম মিহির’, ‘আসাম দর্পন', 'হিত সাধিনী’, ‘অসমদীপিকা', ‘চন্দ্রোদয়', 'আসামবন্ধু', ‘মৌ’, ‘অসমতারা’, ‘বিজুলি', 'অসম', 'The Times of Assam', প্রভৃতি পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল, যদিও বেশির ভাগ পত্র-পত্রিকার আয়ুষ্কাল ছিল ক্ষণস্থায়ী।
সাংস্কৃতিক জাগরণ বা জনমত গঠনে পত্রপত্রিকার প্রভাব পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক জাগরণ বা জনমত গঠনের প্রশ্নটি আসামে প্রথমদিকে তেমন গুরুত্ব পায়নি। তাই ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গায় সংবাদ কণ্ঠ রোধ করার জন্য একাধীক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আসামের ক্ষেত্রে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। উনবিংশ শতকে আসামে যে পত্র-পত্রিকাগুলি প্রচলিত ছিল সেগুলিতে মূলতঃ সামাজিক সংস্কার, ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনকল্যান ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি হোত। পত্রিকাগুলোতে ব্রিটিশ বিরোধী কন্ঠ প্রায় ছিলনা বললেই চলে। ফলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অনেক সময়ই পত্র-পত্রিকাগুলো প্রকাশে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিল। তাই আসাম উপত্যকার কমিশনার একসময় Assam News সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, “Its tone contrasts, I think, favourably with the native press of lower Bengal ... I find nothing in this news paper calculated to foster ill-feeling between the natives and Europeans". সুতরাং উনবিংশ শতকের অসমিয়া পত্র-পত্রিকায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাব তেমন একটা পরিলক্ষিত হয়না। তবে বিংশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন