Discuss the History of the rise and development of Assamese literature in Assam.
আসামে অসমিয়া সাহিত্যের উত্থান এবং উন্নতির ইতিহাস আলোচনা করো।
ভূমিকা উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ বাংলার সীমানা পেরিয়ে বাংলার প্রতিবেশী রাজ্য আসামেও প্রবেশ করেছিল। এরফলে একদিকে যেমন আসামে পাশ্চাত্য সভ্যতা, সংস্কৃতি, সাহিত্য প্রভৃতির উপর আসামের মানুষের এক নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি হল অন্যদিকে অসমিয়া ভাষাকে কেন্দ্র করে এক ভাষাভিত্তিক দেশপ্রেমের সৃষ্টি হয়। এর একটি প্রধান কারন ছিল যে ব্রিটিশ কর্তৃক আসাম অধিগৃহিত হওয়ার পর ১৮৩৬ সালে আসামে অসমিয়া ভাষার স্থলে বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বাংলা ভাষাকে জোর করে আসামের মানুষদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার ফলে আসামের সর্বত্র এক চাপা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
অসমিয়া সাহিত্যের উত্থান ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৩৬ সালে আসামে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করলে আমিরিকান ব্যাপটিস্ট মিশন এর তীব্র বিরোধীতা করে। ফলে আমিরিকান ব্যাপটিস্ট মিশনারী Nathan Brown, Miles Bronson প্রমুখ ১৮৩৬ সালে শিবসাগরে ছাপাখানা প্রবর্তন করে অসমিয়া ভাষায় বাইবেল প্রকাশ করেন। পরবর্তিকালে ১৮৪৬ সালে ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা অসমিয়া ভাষায় অরুনোদয় নামে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে। ১৮৪৮ সালে নাথান ব্রাউন প্রথম অসমিয়া ব্যাকরণ লেখেন। এরই সূত্র ধরে মাইলস্ ব্রনসন ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে দীর্ঘ ১২ বছর পরিশ্রম করে ১৪,০০০ শব্দ বিশিষ্ট ‘অসমিয়া আরু ইংরাজি অভিধান' প্রকাশ করেন। ব্যাপটিস্ট মিশনারীদের প্রদর্শিত পথধরে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কোলকাতায় শিক্ষিত একঝাঁক যুবক আসামে ফিরে এসে অসমিয়া ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে মনোনিবেশ করেন। এইসব অসমিয়া ছাত্রদের উদ্যোগেই ১৮৭২ সালে কোলকাতায় Assamese Literary Society প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৮৮ সালে পদ্মনাথ গোঁহাই বরুয়া কোলকাতায় অসমিয়া ছাত্রদের সংগঠিত করে ‘অসমিয়া ভাষা উন্নতি সাধিনী সভা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সভার মুখপত্র হিসেবে ১৮৮৯ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারী মাসিক সাহিত্য পত্রিকা 'জোনাকি' প্রথম আত্মপ্রকাশ করে।
অসমিয়া সাহিত্যের জোনাকি যুগ অসমিয়া সাহিত্যে জোনাকি যুগ ১৯০৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ি হয়েছিল। ‘জোনাকি' পত্রিকা চন্দ্র কুমার আগরওয়ালা, হেমচন্দ্র গোস্বামী, লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া প্রভৃতি বরেণ্য ব্যক্তিদের দ্বারা সম্পাদিত হয়ে আসামের সাহিত্যে ‘রেনেসাঁস' এনেছিল। জোনাকির লেখক ও কবিরা মাইকেল মধুসুদন দত্ত, বিহারীলাল চক্রবর্তী, বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নবীন চন্দ্র সেন প্রমুখের লেখনিতে প্রভাবিত হয়েছিলেন। হিতেশ্বর বরবরুয়া আসামের বিষয়বস্তুকে মাইকেল মধুসুজন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দে লিখেছিলেন এবং রজনীকান্ত বরদোলাই বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতই ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছিলেন।
অসমিয়া সাহিত্যে নব জাগরনের অগ্রদূত ছিলেন লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া (১৮৬৮-১৯১৮ সাল)। সৃজনশীল প্রবন্ধ, নাটক, গল্প, কবিতা, গান ও উপন্যাসের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল পর্যন্ত বেজবরুয়া অসমিয়া সাহিত্যে এক অপ্রতিহত প্রাধান্য বজায় রেখেছিলেন। একারনে অসমিয়া সাহিত্যে এটি বেজবরুয়া যুগ নামে অভিহিত। তিনি ছিলেন জোনাকি যুগের মধ্যমনি। রঙ্গ রসে ভরা হাস্যাত্মক রচনাগুলির জন্য তাকে রসরাজ বলে অভিহিত করা হয়। বেজবরুয়ার লেখা হাস্যরসাত্মক ‘বরবরুয়ার ভাবর বুড়বুড়ানি, শিশু সাহিত্য - ‘বুড়ি আইর সাধু’, ‘কাকাদেউতা আরু নাতিলরা’, ‘জুনুকা' সমালোচনাত্মক ও গবেষণা মূলক জীবনী ‘শ্রীকৃষ্ণ কথা', শ্রীশংকর দেব’, নাটক – ‘জয়মতি কুঁওরি, বেলিমার, চক্ৰধ্বজ সিংহ, সঙ্গিত – ‘ও মোর আপুনর দেশ’ ও মোর চিকুনি দেশ' প্রভৃতি অসমিয়া সাহিত্য ও সঙ্গিতকে সমৃদ্ধ করেছে। বেজবরুয়া ছিলেন অসমিয়া সাহিত্যের মুকুটহীন রাজা। জোনাকি যুগের আর এক নক্ষত্র ছিলেন চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা (১৮৬৭-১৯৩৮)। তাঁর দুটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হল- প্রতিমা ও বীন - বোরাগি। জোনাকি যুগের আর একজন পন্ডিত হেমচন্দ্ৰ গোস্বামী (১৮৭২-১৯২৮) অসমিয়া ভাষার প্রথম সনেট ‘প্রিয়তমার চিঠি' রচনার কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। হেমচন্দ্র গোস্বামীর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কয়েকটি খন্ডে প্রকাশিত অসমিয়া সাহিত্যের বিশিষ্ট সংকলন Typical selections from Assamese Literature এবং A Descriptive Catalogue of Assamese Manuscripts যেগুলি গবেষকদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বস্তুত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া, চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা এবং হেমচন্দ্র গোস্বামী ছিলেন জোনাকি যুগের বিখ্যাত ‘ত্রিমূর্তি'। এই তিন জনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন পদ্মনাথ গোহাই বরুয়া, সত্য নাথ বোরা, কনকলাল বরুয়া, হেমচন্দ্র বরুয়া প্রমুখ।
আসাম সাহিত্যসভা অসমিয়া ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ১৯১৭ সালে অসমসাহিত্য সভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সভার প্রথম সভাপতি পদ্মনাথ গোহাই বরুয়া আসামে সাহিত্য জগতের পিতামহ নামে পরিচিত। তাঁর রচিত জীবনী সংগ্রহ, লহরী, ভানুমতি, শ্রীকৃষ্ণ প্রভৃতি অসমিয়া সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
পদ্মনাথ গোহাই ছারাও আসাম সাহিত্য সভার সদস্যদের যে লেখাগুলি অসমিয়া সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এগুলি হল অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরীর লেখা বেদনার উল্কা, কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা-চিন্তানল, কালিরাম মেধির লেখা- অসমিয়া ব্যাকরণ আরু ভাষাতত্ব, কৃষ্ণকান্ত হ্যান্ডিকের লেখা শ্রীহর্ষের নিষাধচরিত প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
সাহিত্য এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে অসমিয়া জাতীয় চেতনা বিকাশে আসাম সাহিত্য সভার ভূমিকা অপরিসীম। আগে প্রতিবছর আসামের বিভিন্ন স্থানে আসাম সাহিত্য সভার সম্মেলন হত কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে বার্ষিক সম্মেলনের পরিবর্তে দ্বিবার্ষিক সম্মেলন চালু হয়েছে। আসাম সাহিত্য সভা ৫০০-র বেশী সাহিত্য প্রকাশ করে অসমিয়া সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন