Discuss in short about the Civil Disobedience Movement in Assam.
আসামে আইন অমান্য আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
প্রেক্ষাপট ১৯২০-২২ সালে গান্ধিজীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিমন্ডল কিছুদিন শান্ত থাকলেও ১৯৩০-৩৪ সালে আইন অমান্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় রাজনীতি পুনরায় উত্তাল হয়ে ওঠে। বস্তুতঃ অসহযোগ আন্দোলনের শোচনীয় ব্যর্থতার পর হিন্দু-মুসলমান বিবাদ, ১৯২৩ সালে স্বরাজ্য দল গঠন, জাতীয় কংগ্রেসের শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের দাবী এবং ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন এর ভারত আগমন, ১৯২৯ সালে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব ও শ্রমিক ধর্মঘট, বৈপ্লবিক কর্মকান্ড, কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পুর্নস্বরাজের দাবী প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে এক অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধিজি ১৯৩০ সালের ৩১ জানুয়ারী লবন কর প্রত্যাহার, ৫০ শতাংশ ভূমি রাজস্ব হ্রাস প্রভৃতি ১১ দফা দাবী পেশ করে ব্রিটিশ ভাইসরয় আরউইনকে এক চরমপত্র দেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এই দাবীগুলি অগ্রাহ্য করলে গান্ধিজী আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেন।
আইন অমান্য আন্দোলনের প্রথম পর্যায় (১৯৩০-৩২)
(ক) ডান্ডি অভিযান এবং লবন সত্যাগ্রহ এবং আসামে তার প্রভাব লবন আইন ভঙ্গ করার জন্য ১৯৩০ সালের ১২ই মার্চ প্রায় ৭৮ জন অনুগামী নিয়ে গান্ধিজী সবরমতি আশ্রম থেকে যাত্রা করে ২৪ দিনে ২৪১ মাইল পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে ৫ই এপ্রিল গুজরাটের সমুদ্র উপকূল ডান্ডি গ্রামে পৌছে পরের দিন ৬ই এপ্রিল সমুদ্রের জল তুলে নিজ হাতে লবন তৈরি করে লবন আইন ভঙ্গ করেন এবং সমগ্র ভারতে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন। অল্প সময়ের মধ্যে এই আন্দোলন আসাম, বাংলা, বিহার, বোম্বাই প্রভৃতি স্থানে ছরিয়ে পরে।
আইন অমান্য আন্দোলনের সময়ে আসামে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল। ফলে বিদেশী বস্ত্র বয়কট, মাদকদ্রব্য বিক্রির সামনে পিকেটিং, ১৯ এপ্রিল ধুবরি সরকারি স্কুলে হরতাল ইত্যাদি সাধারন কর্মসূচীর মধ্যেই আইন অমান্য আন্দোলনের প্রথম পর্ব ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৩০ সালের ৫ই মে গান্ধিজীর গ্রেপ্তারের পর উত্তর লখিমপুর, ডিব্ৰুগর, গোলাঘাট, শিবসাগর, জোরহাট, নওগাঁও, তেজপুর, গুয়াহাটি প্রভৃতি জায়গায় প্রতিবাদ আন্দোলন ও হরতাল পালিত হয়। বিষ্ণুরাম মেধি, হেমচন্দ্র বরুয়া, অমিয় কুমার দাশ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ আসামে আইন অমান্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সত্রগুলি ও আইন অমান্য আন্দোলনে কর্মসূচী গ্রহণ করে আফিং, গাঁজা এবং মাদকদ্রব্য ব্যবহার কারীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যাকার ছাত্র সমাজ ও আইন অমান্য আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশ গ্রহণ করে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে ধুবরি, নওগাঁও, শিবসাগর প্রভৃতি স্কুলের দীর্ঘ মেয়াদী ছুটি ঘোষণা বন্ধ করে দেন। ১৪ই মে ধুবরিতে বিশাল ছাত্র বাহিনী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসলে পুলিশ ছাত্রদের উপর লাঠি চার্জ করে। এরফলে অনেক ছাত্র আহত হয়। আইন অমান্য আন্দোলনে ছাত্রদের অংশ গ্রহণ বন্ধ করার জন্য ১৯মে ব্রিটিশ সরকার কানিংহাম সার্কুলার জারি করে। কটন কলেজের ছাত্ররা এই সার্কুলার এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
১৯৩০ সালের ২১শে আগস্ট ব্রিটিশ সরকার আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি বিষ্ণুরাম মেধিকে গ্রেপ্তার করে ৬ মাস জেল ও ২০০ টাকা জরিমানা দন্ড দেয়। এরপরে একে একে হেমচন্দ্র বরুয়া, সিদ্ধিনাথ শর্মা প্রভৃতি নেতাকেও কারারুদ্ধ করা হয়। নেতৃবর্গের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সাধারন মানুষের বিশেষ করে ছাত্র সমাজের উৎসাহ-উদ্দীপনা কমেনি।
ব্রষ্মপুত্র উপত্যকার মতো আসামের সুরমা উপত্যকাতেও আইন অমান্য আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। সিলেটের স্বেচ্ছা সেবকরা ১৯৩০ সালের ৬ই এপ্রিল নোয়াখালিতে গিয়ে লবন আইন ভঙ্গ করে। গান্ধিজির গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ৭ই মে সিলেট শহরে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। মিছিলে অংশ গ্রহণকারীদের মধ্যে ১৬জন পুলিশের লাঠির আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হয়। ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী, ধীরেন্দ্র নাথ দাশগুপ্ত, বসন্ত কুমাস দাস প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ সরকারকে খাজনা না দেওয়ার জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করেন। সিলেটের মুরারী চাঁদ কলেজের ছাত্ররা আইন অমান্য আন্দোলনে ব্যাপক ভাবে অংশ গ্রহণ করে এবং কানিংহাম সার্কুলারের বিরোধীতা করে।
গান্ধি-আরউইন চুক্তি অবশেষে ১৯৩১ সালের ৯ই মার্চ গান্ধি-আরউইন চুক্তি অনুযায়ী গান্ধিজির ডাকে আইন অমান্য আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে (১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) কংগ্রেসকে আমন্ত্রন জানানো হয় এবং কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসাবে গান্ধিজী ইংল্যান্ডে যাত্রা করেন।
আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব (১৯৩২-৩৪ সাল) ১৯৩১ সালের ২৮শে ডিসেম্বর ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক থেকে গান্ধিজী শূন্য হাতে ফিরে আসেন। ইতিমধ্যে লর্ড উইলিংডন ১৭ই এপ্রিল ১৯৩১ সালে ভাইসরয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নানা অজুহাতে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন শুরু করেন। এই অবস্থায় গান্ধিজী লর্ড উইলিংডনকে বার বার টেলিগ্রাম করে দমন নীতি বন্ধ করার জন্য আবেদন জানান। কিন্তু উইলিংডন গান্ধিজীর আবেদনে কর্ণপাত না করলে ৩রা জানুয়ারী ১৯৩২ সালে গান্ধিজী পুনরায় আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেন। ফলে দলে দলে লোক আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরে। শুরু হয় সভা-সমিতি, শোভাযাত্রা, বিদেশি পণ্য ও কর বয়কট এবং আইন অমান্য। এরফলে গান্ধিজী ও বল্লভ ভাই প্যাটেল কারারুদ্ধ হন। গান্ধিজী সহ জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ব্রষ্মপুত্র ও সুরমা উপত্যকায় হরতাল পালিত হয়। ১৫ই ফেব্রুয়ারী ১৯৩২ সালে জাতীয় কংগ্রেস আসাম সেবা দল এবং আসাম যুব সংঘকে নিষীদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আসামের নাগা পাহারের রানী গৈডিনলিউসহ ১,৪৯৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সরকারী দমন নীতি ও নির্যাতন চরমে উঠলেও সমগ্র আসামে যখন আন্দোলন ধীরে ধীরে দানা বাঁধছিল ঠিক সেই সময় ব্রিটেনে ব্যাসে ম্যাকডোনাল্ড সরকার সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা নীতি ঘোষণা করে আইন অমান্য আন্দোলনকে হীনবল করে দেয়। সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা নীতির প্রতিবাদে গান্ধিজী আমরন অনশন শুরু করেন। অবশেষে পুনাচুক্তির পর গান্ধিজী অনশন ভঙ্গ করেন এবং জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৩৪ সালের ২০মে আনুষ্ঠানিকভাবে আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। ফলে সারা ভারতের সঙ্গে সঙ্গে আসামেও আইন অমান্য আন্দোলনের অবসান হয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন