Discuss in short about the Non-Cooperation Movement in Assam.
আসামে অসহযোগ আন্দোলনের ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করো।
প্রেক্ষাপট ১৯১৮ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর রাওলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড, মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার সংক্রান্ত বিতর্ক প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্থানের মতো আসামেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। এই রুপ পরিস্থিতিতে ১৯২০ সালের ১৭ এপ্রিল গান্ধিজি সর্বভারতীয় খিলাফৎ সম্মেলনে সর্বপ্রথম সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালত বর্জন এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও মৈত্রীর ডাক দিয়েছিলেন। তবে বিভিন্ন কারনে সেই সময় সুরমা উপত্যকায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক তিক্ত ছিল। কিন্তু খিলাফৎ আন্দোলনের ঢেউয়ে উভয় সম্প্রদায়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে আরম্ভ করে। আব্দুল গফুর, নবীন চন্দ্র বরদোলই, তরুনরাম ফুকন, চন্দ্ৰনাথ শৰ্মা, সৈয়দ সাদুল্লাহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ আসামে সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে আসামে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পথ প্রশস্ত করেন।
অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী নেতিবাচক ও ইতিবাচক ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লালা লাজপতরাই এর সভাপতিত্বে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলনের খসরা কর্মসূচী পেশ করা হয় এবং ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে এটি গৃহিত হয়। আন্দোলনের নেতিবাচক কর্মসূচীর অন্তর্গত ছিল ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত উপাধি, খেতাব, পদ, ইত্যাদি ত্যাগ করা, সরকারি সভা-সমিতি, আদালত, বিদ্যালয় কলেজ বর্জন এবং বিদেশি দ্রব্য বয়কট করা। আর ইতিবাচক কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গঠন, হস্ত চালিত তাঁত ও চরকায় উৎপাদিত খাদি বস্ত্র পরিধান, অস্পৃশ্যতা দুরীকরন, হিন্দু-মুসলমান ঐক্য প্রতিষ্ঠা, বিবাদ-মীমাংসার জন্য সালিশি বোর্ড গঠন এবং সর্বোপরি স্বরাজ প্রতিষ্ঠা।
আসামে অসহযোগ আন্দোলনের প্রকৃতি অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রাক্কালে ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত Assam Association ছিল আসামের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। অসহযোগ আন্দোলনে যোগদানের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে Assam Association এর সদস্যদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছিল। অবশেষে ১৯২০ সালের ২৬-২৮শে ডিসেম্বর তেজপুরে অনুষ্ঠিত Assam Association এর সম্মেলনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদানের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। অসহযোগ আন্দোলনে যোগদানের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে বিতর্ক থাকলেও সুরমা উপত্যকাতে কিন্তু কোন বিতর্ক ছিলনা। সুরমা উপত্যকায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে স্বতস্ফুর্ত ভাবে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করে।
অসহযোগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আসামে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছিল। বাগ্মী চন্দ্রনাথ শর্মা, হেমচন্দ্র বরুয়া, অমিয়কুমার বরুয়া, মুহবুদ্দিন আহমেদ প্রমুখ ব্ৰহ্মপুত্র উপত্যকার ছাত্র এবং যুবকদের সংগঠিক করে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরেন। কটন কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও বহু ছাত্র পড়াশোনায় ইতি টেনে বিনাদ্বিধায় অসহযোগ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে। একইভাবে সুরমা উপত্যকার মুরারীচাঁদ কলেজ সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও অসংখ্য ছাত্র বেড়িয়ে এসে অসহযোগ আন্দোলনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগদিয়ে স্বরাজ প্রতিষ্ঠার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার গুয়াহাটি, নলবাড়ি, জোড়হাট, তেজপুর, শিবসাগর, নওগাও-এ এবং সুরমা-বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ, শিলচর, রাজনগর, মৌলভীবাজার, প্রভৃতি স্থানে অসহযোগ আন্দোলনের ইতিবাচক কর্মসূচীর অঙ্গ হিসেবে বহু জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। প্রখ্যাত তরুন আইনজীবী চন্দ্রনাথ শর্মা, নবীনচন্দ্র বরদোলই, কৃষ্ণনাথ শর্মা, কুলধর চালিহা, তরুনরাম ফুকন প্রমুখ ব্রিটিশ আদালত বর্জন করে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন। একইভাবে সুরমা উপত্যকার মহেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস, কামিনি কুমার চন্দ প্রমুখ আইন ব্যবসা পরিত্যাগ করে কংগ্রেস দলের সর্বক্ষণের কর্মি হিসেবে যোগ দেন।
আসাম প্রাদেশিক কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা, গান্ধিজির আসাম সফর এবং অসহযোগ আন্দোলনের গতি প্রকৃতি ১৯২১ সালের ৫ই জুন Assam Provincial Congress Committee গঠিত হয়। এরফলে আসাম এ্যাসোসিয়সিন কংগ্রেসের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় এবং আসাম কংগ্রেসের উদ্যোগে সর্বভারতীয় অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আছরে পরে। ১৯২১ সালের ১৮-৩০ আগষ্ট গান্ধিজি আসাম সফরে আসেন এবং গৌহাটি, নওগাঁও, তেজপুর, জোরহাট, ডিব্রুগর প্রভৃতি শহরে বক্তৃতা দেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা এবং বাধাদান, ১৪৪ ধারা জারি ইত্যাদি সত্ত্বেও গান্ধিজির ডাকে প্রতিটি জনসভায় হাজার হাজার লোক উপস্থিত হতেন এবং সভাশেষে বিদেশী দ্রব্য ও বস্ত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে দিতেন। তেজপুর, জোরহাট, ডিব্ৰুগর প্রভৃতি জায়গার জনসভায় চাবাগানের শ্রমিকরাও কাতারে কাতারে উপস্থিত হয়ে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি তাদের সমর্থন জানান। গান্ধিজির আসম সফরের প্রভাবে নুরউদ্দিন আহমদ খানবাহাদুর উপাধি পরিত্যাগ করেন, ১৯ জন আইনজীবি আইন ব্যবসা পরিত্যাগ করেন এবং গুয়াহাটির অনেক ব্যবসায়ী বিলাতি বস্ত্রর ব্যবসা বন্ধ করেন।
অসহযোগ আন্দোলনের তুমুল ঝর স্তিমিত করার জন্য প্রিন্স-অফ-ওয়েলস্ ভারতে আসেন। সমগ্র দেশের সাথে তালমিলিয়ে ১৯২১ সালের ১৭ নভেম্বর গুয়াহাটিতে হরতাল পালিত হয়। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন আসামের কিছু কিছু জায়গায় ব্রিটিশ সরকারকে ভূমি রাজস্ব প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। নওগাও, জোড়হাট, তিনসুকিয়া, যমুনামুখ প্রভৃতি এলাকাতে আন্দোলন কারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
অসহযোগ আন্দোলনের সূত্র ধরে করিমগঞ্জ মহকুমার চারগোলা ও লংগাই উপত্যকার ১৩টি চাবাগানের ৮,৭৯৯ জন শ্রমিক ১৯২১ সালের ২রা মে “মহাত্মা গান্ধিকি জয়” ধ্বনি দিয়ে চাঁদপুর স্টেশনে সমবেত হয় নিজগৃহে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু পুলিশের অত্যাচার এবং কলেরার আক্রমনে প্রায় ৩০০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা ইতিহাসে ‘চাঁদপুর ট্রাজেডি’ নামে পরিচিত। এই ঘটনার প্রতিবাদে সিলেটে চার দিন হরতাল পালিত হয় এবং আসাম-বেঙ্গল রেল এবং স্টিমার সেবা বেশ কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
উপসংহার অসহযোগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আসামের মানুষ সর্বভারতীয় সংগ্রামের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। আসামের বহু মানুষ মদ, আফিং এবং বিলাতি দ্রব্য বর্জন করে খাদি বস্ত্র পরিধান শুরু করে। অসহযোগ আন্দোলনের ফলে গুয়াহাটি, বরপেটা প্রভৃতি স্থানে খাদি বস্ত্র তৈরির কেন্দ্র গড়ে ওঠে, সমগ্র আসামে ১৯২১-২২ সালে ৩৮টি জাতীয় বিদ্যালয় গড়ে ওঠে এবং এক বিশাল সংখ্যক ছাত্র অসহযোগ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেছিলেন যাদের মধ্যে প্রায় ১৫০০০ ছাত্র আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসেনি। গান্ধিজির ডাকে আসামের মহিলারাও ব্যাপকভাবে অংশ গ্রহণ করেছিলেন যাছিল আসামের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
কিন্তু স্বরাজের লক্ষ্যের দিকে দেশ যখন ক্রমশঃ এগোচ্ছিল সেই সময় ১৯২২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারী উত্তর প্রদেশের চৌরিচৌরায় আন্দোলনকারীরা ২৫ জন পুলিশ ও ১ জন দারোগাকে আগুনে পুরিয়ে হত্যা করে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধিজি ১৯২২ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। অসহযোগ আন্দোলনের প্রত্যাহারের পর ব্রিটিশ সরকার আসামে চরম দমন পীরন শুরু করে। একটি বেসরকারী হিসাব অনুযায়ী ১৯২২ সালের ২২ মার্চ অবধি ব্রষ্মপুত্র উপত্যকা থেকে ৯৯৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্দোলনের সময় যেসব এলাকা থেকে রাজস্ব কম আদায় হয়েছিল যেমন বোকো, পাথারুঘাট, বরনগর ইত্যাদি থেকে আবার নির্মমভাবে রাজস্ব আদায় শুরু হয় এবং কৃষককুলকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন