ত্রিপুরায় কবে পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত হয়েছিল? ত্রিপুরার প্রথম পলিটিক্যাল এজেন্ট কে ছিলেন? ত্রিপুরায় পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্তির সম্পর্কে আলোচনা কর।
When was the political agent appointed in Tripura? Who was the first political agent in Tripura? Give a brief account about the appointment of political agent in Tripura.
ত্রিপুরায় কবে পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত হয়েছিল? ত্রিপুরার প্রথম পলিটিক্যাল এজেন্ট কে ছিলেন? ত্রিপুরায় পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্তির সম্পর্কে আলোচনা কর।
১৮৭১ সালের ৩ জুলাই ত্রিপুরা রাজ্যে পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত হয়।
ত্রিপুরার প্রথম পলিটিক্যাল এজেন্ট ছিলেন এ. ডবলিউ. বি. পাওয়ার (A.W.B.POWER) ।
সার্বভৌম ব্রিটিশ সরকারের অভিপ্রায় সাধারণত দেশীয় রাজন্য বর্গকে সুশাসনের নামে, পলিটিক্যাল এজেন্টের মাধ্যমে 'Advice' রূপে জানানো হত। আসলে পলিটিক্যাল এজেন্ট নির্দিষ্ট দেশীয় রাজ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বিভিন্ন দিকের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। পলিটিক্যাল এজেন্টের দায়িত্বও কর্তব্য :- ব্রিটিশ আমলে ভারতে কেন্দ্রীয় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে দেশীয় রাজ্যের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে অবহিত রাখা ওই রাজ্যে নিযুক্ত ব্রিটিশ রেসিডেন্ট বা পলিটিক্যাল এজেন্টের দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে বিবেচিত হত। আর দেশীয় রাজ্যে ব্রিটিশ সরকারের অভিপ্রেত সংস্কার ও অপরাপর কার্যাদি বাস্তবায়িত করাও পলিটিক্যাল এজেন্টের দায়িত্ব বলে মনে করা হত।
পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্তির কারণ ভারতে ব্রিটিশ শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও অনেককাল ত্রিপুরায় কোনো ব্রিটিশ পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত ছিল না। ১৮৬০ - এর দশকে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার C. T. Buckland লুসাই কুকিদের সীমান্তে উৎপাতের পরিপ্রেক্ষিতে এবং সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে, ত্রিপুরার স্বাধীনতা বাতিল করার বা পলিটিক্যাল এজেন্ট নিয়োগ করার প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে ত্রিপুরার রাজারা মাঝে মাঝে লুসাই কুকিদের সঙ্গে সংঘাতের লিপ্ত থাকতেন। ফলে কুকিরা প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সীমান্তে হত্যা, লুঠতরাজ ও নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ করত। কিন্তু এসব সংঘর্ষের বিস্তৃত বিবরণ জানার ব্রিটিশ সরকারের কোনো এজেন্সি ছিল না। তাই কোনোও ব্রিটিশ সামরিক অফিসারকে আগরতলায় পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন।
ত্রিপুরার রাজাদের বিরোধিতা ১৮৭০ সালে তৎকালীন বাংলা সরকারের সচিব সি. ইডেন ত্রিপুরা রাজ্যের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবের সঙ্গে পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্তির বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ভারত সরকারের কাছে দাবি পেশ করেন। রাজা আগরতলায় পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্তির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ভারত সরকারকে আবেদন জানালেন যে, এটা ত্রিপুরা রাজ্যের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী কাজ। কিন্তু ভারত সরকারের কাছে রাজার আবেদনের উপর বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর বলেন যে, এতদিন ত্রিপুরায় পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত না করার কারণ ছিল – “The insignificance of Rajas teritory and the obscurity of his position” তবে ভারত সরকার ত্রিপুরার রাজাকে আশ্বাস দিলেন যে, পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্তির পেছনে ত্রিপুরা রাজ্যের ক্ষমতা বা স্বার্থ খর্ব করার কোনোও ইচ্ছা নেই বরং এতে রাজার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়বে।
পলিটিক্যাল এজেন্ট নিয়োগ অবশেষে ত্রিপুরা রাজ্যের আভ্যন্তরীণ অবস্থা বিশেষ রূপে অবহিত হওয়ার জন্য এবং রাজ্যের পূর্ব সীমান্তের লুসাই কুকিদের উপদ্রব দমন করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার ত্রিপুরায় পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়। ১৮৭০ খ্রীঃ-এর অক্টোবর মাসে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্যে পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করে। ১৮৭১ খ্রীঃ ৩রা জুলাই বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর কর্তৃক এ. ডবলিউ. বি পাওয়ার (A.W.B.POWER) ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত হন। তিনি আগষ্ট ১৮৭১ খ্রীঃ এ আগরতলায় কার্যভার গ্রহণ করেন।
পলিটিক্যাল এজেন্টের নির্দেশাবলী পলিটিক্যাল এজেন্টকে ভারত সরকারের কাছ থেকে কিছু নির্দেশাবলী দেওয়া হয়েছিল। (১) ত্রিপুরার রাজার সঙ্গে কুকি ও সীমান্তে বসবাসকারী অন্যান্য উপজাতির সম্পর্কে বিষয়ে সম্যকরূপে অবহিত হতে।
(২) পর্যাপ্ত কারণ ছাড়া কুকিদের বিরুদ্ধে যে কোনো শাস্তি মূলক অভিযান থেকে রাজাকে বিরত রাখা।
(৩) ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্য দিয়ে বেআইনি অস্ত্রপাচার বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে বন্ধ করতে।
(৪) ত্রিপুরা রাজ্যের পূর্ব সীমান্ত সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে।
(৫) রাজার রক্ষীবাহিনীর উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে।
পলিটিক্যাল এজেন্ট পদের বিলুপ্তি উপরোক্ত বিষয়ের সন্তোষজনক সমাধানের পর রাজধানী আগরতলায় পৃথক পদ হিসাবে পলিটিক্যাল এজেন্ট রাখার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব হারায়। তাই ১৮৭৭ খ্রীঃ চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আগরতলার পলিটিক্যাল এজেন্ট পদের বিলুপ্তির প্রস্তাব দেন। অবশেষে ১৮৭৮ খ্রীঃ ভারত সরকার আগরতলার পলিটিক্যাল এজেন্ট পৃথক পদতুলে দিয়ে পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ ত্রিপুরার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘এক্স ওফিসিউ' পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত করা হয় এবং তার অধীনে উমাকান্ত দাসকে ডেপুটি পলিটিক্যাল এজেন্ট নিয়োগ করা হয়। কিন্তু ১৮৯০ সালে তিনি এই পদ ত্যাগ করে রাজার মন্ত্রীপদে যোগদান করেন। ফলে ধীরে ধীরে আগরতলায় এইপদের গুরুত্ব হারায়।
পুনরায় নিযুক্তি ও নতুন নামকরণ ১৯১০ খ্রীঃ রাজার আপত্তি অগ্রাহ্য করে, সুসম্পর্ক স্থাপনের নামে, আগরতলায় পুনরায় রেসিডেন্ট পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত করা হয় এবং এ ব্যবস্থা ১৯২২ খ্রীঃ পর্যন্ত কার্যকর থাকে। ১৯২২ খ্রীঃ এর ১৫ নভেম্বর থেকে ত্রিপুরা রাজ্য সরাসরি ভারত সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার পায়। এ ব্যবস্থা ১ ডিসেম্বর ১৯৩৬ খ্রীঃ পর্যন্ত কার্যকর ছিল। শেষে ১৯৪৪ খ্রীঃ পলিটিক্যাল এজেন্সি নতুন নামকরণ করা হয় ‘রেসিডেন্সি’।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন