রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ত্রিপুরায় কতবার পদার্পন করেন। ত্রিপুরা এবং ত্রিপুরার রাজাদের সাথে সম্পর্কিত কয়েকটি বই এর নাম লিখ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ত্রিপুরার বিভিন্ন রাজাদের সম্পর্ক আলেচনা কর।
How many times Rabindranath Tagore came to Tripura? Name some books related to Tripura and kings of Tripura? Give a brief account about the relations between Rabindra nath Tagore and various Kings of Tripura ?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ত্রিপুরায় কতবার পদার্পন করেন। ত্রিপুরা এবং ত্রিপুরার রাজাদের সাথে সম্পর্কিত কয়েকটি বই এর নাম লিখ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ত্রিপুরার বিভিন্ন রাজাদের সম্পর্ক আলেচনা কর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ত্রিপুরায় ৭ বার আসেন। তার ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার রাজাদের বিষয়ক গ্রন্থাবলী হল রাজর্ষি, মুকুট, প্রেম মরিচিকা, অকাল কুসুম, বিসর্জন।
ত্রিপুরা একটি সুপ্রাচীন সংস্কৃতি সম্পন্ন রাজ্য। এর সভ্যতার সঙ্গে বহু মনীষীর ত্যাগ ও সাধনা বিজড়িত রয়েছে। ত্রিপুরার মহারাজা যযাতির বংশধর। বঙ্গ সংস্কৃতি ত্রিপুরার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। গুরুদের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের আত্বিক সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে রচিত হয়েছে ত্রিপুরার বন্ধনের ইতিহাস।
ত্রিপুরার সাথে যোগসূত্র বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে চারজন মহারাজা এবং পাঁচ-ছয়জন মনীষী গভীর বন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বিকাশোন্মুখ প্রতিভার প্রথম স্বীকৃতি প্রদান করেন মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুর। জীবন সায়াহ্নে তিনি ত্রিপুরার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যানুরাগী মহারাজা বীরবিক্রম কর্তৃক সম্মানিত ও অভিনন্দিত হন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তৎকালীন মহারাজাদের শিক্ষা – সংস্কৃতি, সংগীত, নৃত্যকল্যা প্রসারে শুভ-সৎপরামর্শদাতা।
রবীন্দ্রনাথ ও বীরচন্দ্র মাণিক্য মহারাজী বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের দূত রাধারমন ঘোষ রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাত প্রার্থী হয়ে জানালেন যে, মহারাজা রবীন্দ্রনাথকে কবিরূপে অভিনন্দিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বালক কবির বিস্ময়ের সীমা রইল না। প্রসঙ্গত যে, রাজমহিষী ভানুমতী দেবীর অকাল মৃত্যুতে মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য তখন অত্যন্ত শোকাকুল হয়ে পড়েছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথের ভগ্নহৃদয় কাব্যটি পড়ে মহারাজা মনে সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ও রাধাকিশোর মাণিক্য রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বীরচন্দ্রের পুত্র মহারাজা রাধাকিশোর মিলন অনন্যসাধারণ। রাধাকিশোরের রাজত্বকালে নানা সংকটে কবি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মহারাজার পাশে থেকে সাহস ও সমর্থন জুগিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় স্থাপনে বার্ষিক অর্থদান, জাতীয় শিক্ষা পরিষদ এর অন্তর্গত যাদবপুর Bengal Technical Institute-এ অর্থ সাহায্য, কবিবর হেমচন্দ্রকে মাসিক বৃত্তি প্রদান, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজকে অর্থদান, জগদীশ চন্দ্রবসুকে বিজ্ঞান সাধনায় অর্থ প্রদান ইত্যাদি প্রতিটি কল্যাণকর কাজের পেছনে ছিল রবীন্দ্রনাথের শুভকামনা।
রবীন্দ্রনাথ ও বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোরের আমলেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার যোগাযোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। এই কাজে কবির স্নেহধন্য ‘রাজপুত্র’ ব্রজেন্দ্র কিশোরের নাম স্মরণীয়। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাবার পর তাকে বিশেষভাবে সংবর্ধনা জানাতে আগরতলায় এক মহতী সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ওই সভার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন লালু কর্তা এবং পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য বাহাদুর স্বয়ং। মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোর ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বহুবার পত্র বিনিময় হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ও বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য কবিগুরুর শেষবারের মতো আগরতলায় শুভ পদার্পণ করেছিলেন ১৯২৬ খ্রিঃ। মহারাজা বীরবিক্রম কিশোরের রাজত্বকালে ত্রিপুরার সঙ্গে কবিগুরুর যোগাযোগ আরও দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৯ খ্রীঃ কবিগুরুর আমন্ত্রনে সপারিষদ মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুর শান্তিনিকেতনে যান। ত্রিপুরায় একটা উৎসবের আয়োজন করা হয়, উৎসবের মুখ্য অনুষ্ঠানরূপে উজ্জয়ন্ত রাজপ্রাসাদে এক বিশেষ দরবার আহ্বান করে ত্রিপুরাধিপতি মহারাজ বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুর কবিকে 'ভারত ভাস্কর' অর্থাৎ ‘ভারত-সূর্য' উপাধি দ্বারা সম্মানিত করেন (১৯১৪ খ্রিঃ)। বিশেষভাবে স্মরণীয় যে, বিকাশমান রবীন্দ্র প্রতিভাকে সর্বপ্রথম অভিনন্দিত করেছিলেন মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য। মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য কবির জীবনের আন্তিম লগ্নে শেষ অর্ঘ্যটি নিবেদন করলেন ‘ভারত ভাস্কর' উপাধি প্রদান করেন।
শান্তিনিকেতনে ত্রিপুরাবাসীর শিক্ষাগ্রহণ কবিগুরু শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলে মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য বাৎসরিক একহাজার টাকা সাহায্য প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন এবং তা পালন করেন। তাঁর ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ে মহিম কর্ণেলের বাড়ির সকলে এবং অনেক বাঙালি ভদ্রঘরের ছেলেরা অধ্যয়ন করেন। তাঁদের মধ্যে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মন, শৈলেশ দেববর্মন, সোমেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মন, নরসিংহ দেববর্মন, সুখময় দেববর্মন, সত্যরঞ্জন বসু প্রমুখ বিখ্যাত।
উপসংহার মহারাজা বীরচন্দ্র বাংলার বিক্রমাদিত্য। তাঁর আমল থেকে ত্রিপুরার সাথে কবিগুরুর যোগসূত্র শুরু হয় এবং মহারাজা বীরবিক্রম পর্যন্ত অর্থাৎ কবির তিরোধান পর্যন্ত তা অটুট ছিল। রবীন্দ্রধন্য ত্রিপুরার সাহিত্য ক্ষেত্রে অনন্য কৃতিত্বের দাবিদার। ত্রিপুরার সঙ্গে কবিগুরুর আত্মীয়তা, নাড়ির সম্পর্ক, গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর ত্রিবেনী সংগম। এ মিলন শ্বাশ্বত - স্বর্গীয় অনবদ্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন