When did the Reang uprising occur? Discuss the impact and nature of Reang uprising ?
রিয়াং বিদ্রোহ কখন সংঘটিত হয়েছিল? এই বিদ্রোহের কারণ ও চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা কর ।
১৯৪২-৪৩ খ্রিঃ রিয়াং বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল।
১) সূচনা ত্রিপুরায় যখন বিভিন্ন সংঘ ও সমিতির দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হয়ে উঠেছিল সেই সময় সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ও আর্থসামাজিক অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রতনমণির নেতৃত্বে রিয়াং সম্প্রদায় এই আন্দোলন শুরু করে। ত্রিপুরার ইতিহাসে এই রিয়াং আন্দোলন রিয়াং বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
২) রিয়াংদের উপর অত্যাচার ও রতনমনির আবির্ভাব রিয়াং সর্দারদের বলা হত চৌধুরী। জমিদারদের মতো তাঁরা অনেক সুযোগ সুবিধা ভোগ করতেন। তাঁদের অনেকেই ছিলেন অত্যাচারী। নানাভাবে দরিদ্র রিয়াংদের কাছ থেকে জরিমানা বা অন্যায়ভাবে অর্থ আদায় করতে তাঁরা অভ্যস্ত ছিলেন। দরিদ্র রিয়াংদের অভাব অভিযোগ এই সমস্ত চৌধুরিদের মাধ্যমেই মহারাজের কাছে পেশ করা হত। সুতরাং রিয়াংদের অত্যাচারের প্রতিকার সম্ভব হত না। চৌধুরিদের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। রিয়াংদের এই দুর্দিনে ত্রিপুরায় আবির্ভাব ঘটল রতনমণির। অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রিয়াংরা সংঘবদ্ধ হল। নেতৃত্ব দিলেন তাদের ধর্মগুরু রতনমণি।
৩) রতনমনি কে রতনমণির আদি বাসস্থান ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড় মহকুমার দেওয়ান বাজারের কাছে রামচিরা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম নীলকমল নোয়াতিয়া। তিনি লোকমান সাধু নামে পরিচিত ছিলেন। সম্প্রদায়গতভাবে তিনি নোয়াতিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। সম্ভবত রতনমণি ত্রিপুরায় আসেন ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে। তিনি অমরপুরের চেলাগং নতুন বাজারের মাঝামাঝি একছড়ি মৌজায় ‘তাওফম'-এ প্রথম আশ্রম করেন। শিষ্য সংখ্যা বাড়তে থাকলে ধীরে ধীরে অমরপুরের ডম্বুরের প্রেমতল আশ্রম, সামখুম ছড়া ও উদয়পুরের দক্ষিণ মহারানি প্রভৃতি স্থানে। আশ্রম তৈরি হতে থাকে।
৪) চৌধুরী ও রতনমনির মধ্যে বিবাদ পৌষ সংক্রান্তির সময় অমরপুরের তীর্থমুখে হিন্দু উপজাতিরা পুণ্যস্নানের জন্য সমবেত হত। তাদের মধ্যে অনেকেই ঐ সময়ে মৃত আত্মীয়জনের পূণ্য অস্থি গোমতী নদীর জলে বিসর্জন দিয়ে তাদের আত্মার সদ্গতির জন্য প্রার্থনা জানাত। এই সুযোগে পূর্ববাংলা থেকে আগত কিছু বাঙালি ব্রাহ্মণ তাদের মন্ত্রপাঠ করিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। রতনমণির শিষ্যরা রিয়াং চৌধুরিদের সহায়তায় ব্রাহ্মণদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই মন্ত্রপাঠের দায়িত্ব নেয়। সংগৃহীত অর্থ রতনমণির অনুচর ও চৌধুরিরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অর্থের বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে রতনমণির শিষ্যদের সঙ্গে চৌধুরিদের বিবাদ শুরু হয়ে যায়। তীর্থমুখের ব্রাক্ষ্মণরা এবং চৌধুরিরা রতনমণির বিরুদ্ধে মহারাজকে নালিশ জানালে রতনমণিকে গ্রেপ্তার করে আগরতলায় নিয়ে আসা হয় এবং আলং বা বন্দিশিবিরে আটক রাখা হয়। কিন্তু রতনমণি বিনিন্দিয়া বা রক্ষীদের চোখে ধূলি দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
৫) খাদ্যসংকট ও কালোবাজারী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অন্যান্য স্থানের মত ত্রিপুরাতেও খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এই অবস্থার মধ্যে সরকার পক্ষ কৃষকদের কাছ থেকে শস্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। এই সমস্ত খাদ্য শস্য সৈন্যদের জন্য মজুত করা হত। যা কিছু ভোগ্য পণ্য জনসাধারণের জন্য বরাদ্দ করা হল তা বণ্টনের দায়িত্ব চৌধুরিদের হাতে দেওয়া হয়। অন্যায় মজুতকারীর বিরুদ্ধে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও খগেন্দ্র চৌধুরি সহ কিছু চৌধুরি খাদ্যশস্য মজুত করে কালোবাজারে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করতে থাকেন। এদিকে সরকার থেকে সৈন্যদের জন্য খাদ্যশস্য মজুত করা অন্যদিকে চৌধুরিদের খাদ্যশস্য মজুত করে কালোবাজারে বিক্রির ফলে দরিদ্র রিয়াং সম্প্রদায় আরও বিপর্যস্ত হয়।
৬) খগেন্দ্র চৌধুরীকে 'রায়' পদ দান অমরপুরের দেবী সিং ছিলেন রিয়াং সম্প্রদায়ের রায়কাঞ্চন বা রাজা। বগাফার খগেন্দ্র চৌধুরি ত্রিপুরার রাজ দরবারকে প্রভাবিত করে মহারাজ কর্তৃক দেবী সিং-এর পরিবর্তে রায়কাঞ্চন মনোনীত হলেন। অথচ একজন রায়ের জীবিতকালে রিয়াং সমাজে রায় পরিবর্তনের বিধান ছিল না। এতে রিয়াং সম্প্রদায়ের অনেকেই ক্রুদ্ধ হন এবং খগেন্দ্র চৌধুরিকে রায়কান হিসাবে মানতে অস্বীকার করে। খগেন্দ্র চৌধুরী ও তাঁর সমর্থকরা প্রতিশোধ নিতে রিয়াংদের উপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বৃদ্ধি করেন।
৭) প্রতিরক্ষার জন্য রিয়াংদের সৈন্যদল গঠন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ত্রিপুরা সরকার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করার জন্য পার্বত্য প্রজাদের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে থাকেন এবং জাপানের আক্রমণ থেকে ত্রিপুরাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বিভিন্ন স্থানে সৈন্য ঘাঁটি : প্রস্তুত রাখেন। খগেন্দ্র রায়কে রিয়াংদের মধ্য থেকে সৈন্য বিভাগের জন্য যুবক সংগ্রহের অনুরোধ করা হয়। রিয়াং যুবক সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়ে খগেন্দ্র রায় মহারাজকে জানান যে রতনমণি ও তাঁর শিষ্যরা বাধা দেওয়ায় সৈন্য সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না। খবর আসতে লাগল যে রতনমণির শিষ্যরা নিজেদের মধ্য থেকে মন্ত্রী, সেনাপতি নির্বাচন করছে এবং প্রতিরক্ষার জন্য একদল সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলছে।
৮) রিয়াংদের কর্তৃক বিদ্রোহের সূচনা উৎপীড়িত রিয়াংরা বহুদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগের প্রতিকারের জন্য নিজেরাই এখন সংঘবদ্ধ হয়েছে এবং যে কোনো উপায়ে রায় ও চৌধুরিদের বিচার ও শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা নিজেরাই করেছে। যে অন্যায় অবিচার এতদিন তারা সহ্য করে এসেছে গুরু রতনমণির মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সে অন্যায়কে তারা আর সহ্য করতে প্রস্তুত নয়। তারা সমাজকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যেখানে রায় বা চৌধুরিদের অত্যাচার থাকবে না। গুরু রতনমণিকে আশ্রয় করেই তারা তাদের আন্দোলন শুরু করল। এজন্য তারা একটি সশস্ত্র দলও তৈরি করেছে। তাদের প্রধান দুটি ঘাঁটি ছিল উদয়পুরের তুইনানি এবং অমরপুরের তৈছারবুহা। রতনমণি যেসময় তৈছারবুহা ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন। মহারাজের কর্তৃত্ব তারা অস্বীকার করে নি কিন্তু মহারাজা কর্তৃক মনোনীত রায়কাঞ্চনকে অস্বীকার করে, নিজেরা মন্ত্রিপরিষদ ও সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করে, চৌধুরিদের বিচারের ভার নিজেদের হাতে নিয়ে তারা কার্যত বিদ্রোহী হিসাবে পরিচিত হয়েছে। চৌধুরিদের বাড়ি লুঠতরাজের জন্য সরকারি রিপোর্টে রতনমণির শিষ্যদের ডাকাতদল এবং রতনমণিকে দস্যু আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
৯) মহারাজা কর্তৃক আদেশ জারি সীমান্তে জাপানি সৈন্যের আগমন আর তাদের দেশের অভ্যন্তরে দক্ষিণের ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে রতনমণির নেতৃত্বে রিয়াং বিদ্রোহ মহারাজা ও ভারতবর্ষের ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে বিচলিত করল। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে জুলাই মহারাজা বীরবিক্রম আন্দোলন দমনের জন্য আন্দোলনকারীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া ও গ্রেপ্তারের আদেশ জারি করেন।
১০) বিদ্রোহ দমন উদয়পুর অঞ্চলে আন্দোলন দমনের জন্য শ্রীমনোরঞ্জন দেববর্মনকে নিযুক্ত করা হয়। একদল সৈন্য সহ ক্যাপ্টেন নগেন্দ্র দেববর্মা রাজ্যের পূর্বসীমান্তের দিকে রওনা হলেন। লেফটেন্যান্ট হরেন্দ্র-কিশোর দেববর্মার নেতৃত্বে একদল সৈন্য বিলোনিয়া বিভাগে পাঠানো হল। এছাড়াও পাঁচশত জমাতিয়া যোদ্ধা ও ছোটোখাটো আরো কয়েকটি দল বিদ্রোহ দমনে নিযুক্ত হল। বিভিন্ন অঞ্চলে খণ্ডযুদ্ধ হলেও রতনমণির শিষ্যরা সুশিক্ষিত রাজকীয় সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত হল। বেশ কিছু সংখ্যক বিদ্রোহী রাজকীয় বাহিনীর গুলিতে নিহত হল। অমরপুর, বিলোনিয়া ও উদয়পুর অঞ্চলে পঞ্চাশটি গ্রাম ভস্মীভূত করা হল। বিদ্রোহী নেতাদের মতে কুড়ি হাজার চারশো পঁচিশ জনের মতো গ্রেপ্তার হয়।
১১) তদন্ত কমিটি গঠন রিয়াং সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ ও আন্দোলনের কারণ সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসাবে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শ্রীশচীন্দ্রলাল সিংহের সময় রতনমণির অন্যতম অনুগামী তছলমফা ওরফে রাজপ্রসাদ চৌধুরি ত্রিপুরায় পূর্ণমন্ত্রী নিযুক্ত হন। বর্তমানে রতনমণির নেতৃত্বে রিয়াং বিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদা দেওয়া হয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন