Discuss the relation of the British with chakla roshanabad and hill Tripura.
চাকলা রোশনাবাদ ও পার্বত্য ত্রিপুরার সাথে ব্রিটিশদের সম্পর্ক আলেচনা কর।
ত্রিপুরা রাজ্যের পশ্চিম সীমান্ত সংলগ্ন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালি, ত্রিপুরা ও শ্রীহট্ট জেলার ৫৭০ বর্গমাইল পরিমিত সমতল ভূমি নিয়ে এক বিস্তৃর্ণ অঞ্চল ‘চাকলা রোশনাবাদ' জমিদারি নামে পরিচিত ছিল। এক সময়ে যা ছিল ত্রিপুরা রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ, মির হাবিরের আক্রমণের পর তা পরিণত হল এই রাজ্যের জমিদারিতে। আবার, ভারত স্বাধীন হওয়ার পর একেবারে হাতছাড়া হয়ে এই চাকলা রোশনাবাদ তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। চাকলা রোশনাবাদের ইতিহাস আজ নিছক অতীতের কথা মাত্র।
মুসলমান শাসকদের লোলুপ দৃষ্টি সোনার গাঁও এ বাংলার রাজধানী স্থাপিত হওয়ার উপর থেকে মূল্যবান হাতিও মনি-মাণিক্য সম্পদে সমৃদ্ধ ত্রিপুরার উপর মুসলমান শাসকদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। সেজন্য তাঁরা কারণে অকারণে ত্রিপুরায় আক্রমণ করে বসতো। এভাবে সতের শতকের মধ্যভাগ থেকে আঠার শতকের প্রথমদিকে ত্রিপুরার রাজ্যের অন্তর্গত এক বিস্তীর্ণ সমতলভাগ মুসলমান অধিকারভুক্ত হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম আধিপত্য নিয়ে মতবিরোধ চট্টগ্রামের আধিপত্য নিয়ে আরাকান রাজ্যের সঙ্গে বিরোধ, পর্তুগীজ জলদস্যুকে উপকূলবর্তী অঞ্চলে লুঠতরাজ, পার্বত্য কুকিদের উপদ্রব প্রভৃতি নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের পরিবেশ তখন ছিল দুর্যোগপূর্ণ। এ সুযোগে সমতল ত্রিপুরার চৌধুরী ও তালুকদারগণ ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনতামূলক হওয়ার জন্য সচেষ্ট হন। ফলে দেখা দিল আভ্যন্তরীণ। গোলযোগ ও রাজপরিবারের বিরোধ। যে অনৈক্য ছিল সে যুগে ভারতের সর্বত্র, সকল অমর্যাদার মূলে, সেই অনৈক্যের বশবর্তী হয়ে ত্রিপুরার রাজপরিবারের জগৎগ্রাম ঠাকুর, বলদাখালের জমিদার আকা সাদেক ও ঢাকা নেয়াবতের দেওয়ান মির হাবিবের সাহায্যে বাংলার তদানীন্তন নবাব সুজাউদ্দিন খাঁর অনুমোদন নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্য আক্রমণ করেন।
চাকলা রোশনাবাদ নামের উৎপত্তি ত্রিপুরার রাজা ধর্মমাণিক্য কুমিল্লার নিকটে সংঘটিত এক যুদ্ধে পরাজিত হন এবং পার্বত্য ত্রিপুরায় আশ্রয় নেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এই যুদ্ধে সমগ্র ত্রিপুরা মুসলমানদের অধিকারে এসে পড়ে, তবে তার কোনো প্রমাণ নেই। ত্রিপুরা রাজ্যের পশ্চিম পার্শ্ববর্তী সমতলভূমি বাংলার নবাবের অধীনে চলে গিয়েছিল। ফলে ত্রিপুরার মূল ভূখন্ডে জগৎমাণিক্যকে বাংলার নবাব বার্ষিক ৯২,৯৯৩ টাকা কর দেওয়ার পরিবর্তে রাজা উপাধি দেন। এদিকে মুর্শিদকুলি খাঁকে 'বাহাদুর' উপাধি দেন এবং মির হাবিবকে অভিজাত সম্প্রদায়ের তালিকাভুক্ত করেন এবং ত্রিপুরার এই সমতল অঞ্চলকে 'চাকলা রোশনাবাদ' নামে অভিহিত করে জমিদারিতে পরিণত করেন।
রাজ্যে দুটি মর্যাদার সূত্রপাত মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করে জগৎমানিক্য বেশীদিন শাসন করেনি। এদিকে ধর্মমাণিক্য জগৎশেঠের সাহায্যে নবাবের কাছে সমস্ত বিষয় উত্থাপন করেন এবং নবাব বার্ষিক রাজস্ব দানের প্রতিশ্রুতিতে তাঁকে চাকলার জমিদারি স্বত্ব প্রদান করেন। এভাবে চাকলা রোশনাবাদ ত্রিপুরার শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পৃথক জমিদারিতে পরিণত হয়। ফলে ত্রিপুরার রাজ্যের দুটি পদমর্যাদার সূত্রপাত হয়েছিল – পার্বত্য অংশে স্বাধীন নৃপতি এবং চাকলা রোশনাবাদে বাংলার নবাবের অধীনে জমিদার।
সমসের কর্তৃক চাকলা অধিকার অকর্মন্য ও ষড়যন্ত্রপ্রিয় শাসকের শাসনের দুর্বলতার সুযোগে সমসের গাজী, চাকলা রোশনাবাদ অধিকার করে এবং পরে ত্রিপুরায় আধিপত্য বিস্তার করেন। এই ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করে বাংলার নবাব, কারন তিনি নবাবকে মোটা অঙ্কের টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দান করেন এবং মুর্শিদাবাদের নবাবেরও টাকার প্রয়োজন বেশি ছিল। সমসের গাজীর যুগ ছিল বাংলাদেশে বর্গি হাঙ্গামা ও সিরাজউদ্দৌল্লার আমলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের যুগ। এদিকে সমসের গাজী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নবাবের দরবারে মোটা অঙ্কের অর্থের যোগানের জন্য প্রায়ই হিন্দু-মুসলমান ধনী প্রজাদের অত্যাচার করে, ডাকাতি করে সব নিয়ে যেত।
রাজস্ব নিয়ে বিরোধ ইহা কিছুকাল চলার পর বাংলার নবাবের সহিত ত্রিপুরার রাজা কৃষ্ণমাণিক্যের পুনরায় বিরোধ দেখা দেয়। এইবার বিরোধের কারণ ছিল, চাকলা রোশনাবাদের রাজস্ব পরিশোধের বিষয়ে। নবাব ত্রিপুরায় আক্রমণের জন্য তার সামরিক ব্যবস্থার প্রস্তুতির কথা বললেন। এদিকে ১৭৬০ খ্রীঃ ৮ নভেম্বর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী চট্টগ্রামে তাদের স্থানীয় প্রশাসন গড়ে তুলেছিলেন এবং ঐ সময়ে চট্টগ্রামে কোম্পানীর প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন মিঃ ভেরেলেস্ট।
ব্রিটিশের হস্তক্ষেপ ও জমিদারি দখল মিঃ ভেরেলেস্ট ১৭৬১ খ্রীঃ ফেব্রুয়ারি মাসে ২০৬ জন পদাতিক সৈন্য ও দুটি তোপসহ লেফটেন্যান্ট মেফুজকে ত্রিপুরা আক্রমনের জন্য নবাবের সৈন্যের সাথে পাঠান। ত্রিপুরাধিপতী কৃষ্ণমাণিক্য মেফুজের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। ফলে কোম্পানির সাথে মীমাংসা হল, তাতে পার্বত্য বা মূল ত্রিপুরা রাজ্যের স্বাধীনতা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উঠেনি। কেবলমাত্র চাকলা রোশনাবাদ বা ত্রিপুরা রাজ্যের সমতল ভূ-খন্ডের অধিকার ত্রিপুরাধিপতি হারালেন এবং নির্দিষ্ট পরিমানে বার্ষিক রাজস্ব প্রদানের পরিবর্তে চাকলা রোশনাবাদে জমিদারি লাভ করলেন। তবে তাহা নবাবের কাছ থেকে নয়, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিকট থেকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন