সাম্য Equality
সাম্যের ধারণা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন ?
সাম্য কী ?
সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে সাম্য
প্রাকৃতিক ও সামাজিক বৈষম্য
সাম্যের তিনটি দিক—রাজনৈতিক সাম্য, সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক সাম্য
নারীবাদ সমাজবাদ
কীভাবে আমরা সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারি ?
আনুষ্ঠানিক সাম্য প্রতিষ্ঠা
স্বতন্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্য প্রতিষ্ঠা
সদর্থক কার্যকলাপ
সাম্যের ধারণা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
শতাব্দী প্রাচীনকাল থেকে গোটা বিশ্বের মনুষ্য সমাজকে সাম্যের মতো একটি শক্তিশালী আদর্শ যা নৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে আসছে। সাম্যের আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত বিশ্বের সকলেই ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজেদের ভগবানের সৃষ্ট জীব এই বিশ্বাসে ব্রতী হয়েছে। সাম্যের আদর্শ একটি বহুল আলোচিত বিষয়। সাম্যের আদর্শকে বাদ দিয়ে প্রাচীন গ্রিক দর্শন থেকে শুরু করে অধুনা রাষ্ট্রদর্শনের আলোচনা অসম্পূর্ণ। বিগত অধ্যায়ে আমরা স্বাধীনতার আদর্শ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। সাম্যের আদর্শকে বাদ দিলে স্বাধীনতার আদর্শ অর্থহীন হয়ে পড়ে। ফরাসি বিপ্লব (1789 খ্রিস্টাব্দ) ও আমেরিকার স্বাধীনতার সংগ্রামের ঘোষণা (1776 খ্রিস্টাব্দ) মূলত সাম্য ও সমানাধিকারের দাবির সম্বলিত ঘোষণা। এই ঘোষণানুসারে, জন্মসূত্রেই সকলে স্বাধীন ও মানবাধিকার সম্পন্ন।
সাম্যের আদর্শ অনুসারে, সমাজের সকল মানুষের ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে অধিকার সমান। ধনী-দরিদ্র, অভিজাত- অনভিজাত সকলেই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান অধিকার পেয়ে থাকে। সাম্যের মতো এই শক্তিশালী রাজনৈতিক আদর্শ এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত করে। বর্তমান সমাজে সাম্যের আদর্শকে মুক্তকণ্ঠে প্রচার করা হয় এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র যারা অসাম্যের নীতিকে প্রশ্রয় দেয় তাদের বিরোধিতা করা হয়। সমাজের এই বিরোধ শুরু হয়েছে ঊনবিংশ শতক থেকে যখন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। আর আজও এই সোচ্চার বিরোধ চলছে, কখনও দলিত সম্প্রদায়ের অধিকার ফেরানোর দাবিতে, আবার কখনো সমাজে নারীদের অবস্থান নিয়ে।
সাম্য কী?
সাম্যের আদর্শের কথা সোচ্চার কণ্ঠে প্রচারের পরেও সমাজে অসাম্য সবসময়ই চোখে পড়ে। কখনও শহরে ধনীদের বাসস্থানের পাশে বস্তি এলাকার সহাবস্থান দেখে। আবার কখনও শহরের বুকে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামোগত পার্থক্য দেখে। শুধু তাই নয়, গ্রাম এবং শহরের জীবনযাত্রাতেও সমতার নেতিবাচক অর্থে সাম্য হল বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতি। এর অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ল্যাস্কি বলেছেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ প্রভৃতির কোনোরকম পার্থক্য বা বিভেদ না করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, সাম্য হল নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী যে-কোনো সরকারি পদে আসীন হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি। অর্থাৎ, আমার চেয়ে রাষ্ট্রে অন্যজনের অধিকার বেশি নয়। অধিকার সকলের সমান। সরকারি চাকুরির পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা যাদের থাকবে তারাই পরীক্ষায় বসার সুযোগ বা অধিকার পাবে, সেখানে কেউ বাধা দিতে পারবে না। ল্যাস্কির ভাষায়, এই হল সমতা বা সাম্যের অধিকার। এ প্রসঙ্গে ল্যাস্কির একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। উনি সাম্যের প্রকৃতি বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, 'সমতা হল অসমান অংশকে সমান করার একটি প্রক্রিয়া।
ইতিবাচক অর্থে সাম্য হল সকলকে যথোপযুক্ত সুযোগসুবিধা প্রদান। ল্যাস্কি ইতিবাচক ধারণাটি সম্পর্কে বুঝিয়েছেন যে, প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাসের জন্য যথোপযুক্ত বা উপযোগী সুযোগ- সুবিধা। অর্থাৎ, সব ধরনের মানুষের প্রয়োজনীয়তা যেমন সমান নয়, ঠিক তেমনই তাদের প্রচেষ্টাও সমান নয়, তাই আত্মবিকাশের জন্য সুযোগসুবিধাও অভিন্ন হবে না, ভিন্ন হবে পরিস্থিতির নিরিখে। এক্ষেত্রে সকলকে তার প্রয়োজন অনুপাতে যথাযথ সুযোগ বা সমতা প্রদানই হল সাম্যের নীতি।
সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে সাম্য
সাম্যের ধারণাটি একটি অতি প্রাচীন ধারণা। প্রাচীনকাল থেকে আজ অবধি সাম্যের বহুল প্রচলন। সাম্যের আদর্শের বিশ্ব সমাজে প্রয়োজনীয়তা কী? পৃথিবীর ইতিহাস দেখলে বারংবার অসাম্য বা বৈষম্যের নজির চোখে পড়ে। সপ্তদশ শতকে আফ্রিকায় দাসপ্রথার প্রচলন থেকে শুরু করে, ঊনবিংশ শতকে ঔপনিবেশিক । এ সাম্রাজ্যের বিরোধিতা করতে বারংবার সাম্যের আদর্শকে সোচ্চার কণ্ঠে প্রচার করতে হয়েছে।
যদিও সাম্য কথার অর্থ সমতা হলেও অভিন্নতা নয়। অর্থাৎ, সমাজে সকলকে সমান চোখে দেখার অর্থ সকলের সঙ্গে সকল ক্ষেত্রে একই আচরণ করা নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অর্থে সাম্য কথার অর্থ অভিন্নতা নয়। মানুষের জন্মগত এবং সহজাত যে সমস্ত ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে সাম্যের প্রয়োগও ঠিক তেমনই হবে। অর্থাৎ, যোগ্যতা ও দক্ষতার নিরিখে ব্যক্তি নিজ স্বার্থের জন্য প্রাপ্যটুক পাবে, যেমন—রাজমিস্ত্রি এবং চিকিৎসকের প্রাপ্য বা পুরস্কার সমান হবে না। যার ঠিক যতটা পাওয়া দরকার সে তার ন্যায্য পাবে, আর তাই হল সমতার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা। রাজমিস্ত্রি নিশ্চয়ই চিকিৎসকের সমান চাহিদা করতে পারে না। এই ক্ষেত্রে সমতার প্রয়োগ যোগ্যতার নিরিখে হবে। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে সাম্যের প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য অন্যায়। যেমন-দরিদ্রের ঘরে জন্মের কারণে শিশুর অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়া সমাজে অসাম্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সাধারণ অর্থে সাম্য বলতে বোঝায়, সমাজে সকল মানুষই সমান। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ ভেদে সকলেই সমান অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় সাম্যের অর্থ সমতা বা অভিন্নতা নয়। ল্যাস্কির ভাষায় সাম্য বলতে বোঝায়, [3] বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতি এবং [II] সকলকে যথোপযুক্ত সুযোগসুবিধা প্রদান । প্রথম ধারণাটি হল সাম্যের নেতিবাচক ধারণা এবং দ্বিতীয়টি হল ইতিবাচক ধারণা। সাম্যের অর্থ প্রসঙ্গে বার্কার বলেছেন, সাম্য মানে সমজাতীয়তা নয়।
প্রাকৃতিক ও সামাজিক বৈষম্য
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি পার্থক্য করা হয়, সামাজিক অসাম্য এবং স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক অসাম্যের মধ্যে। স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক বৈষম্য ব্যক্তির মধ্যে যোগ্যতা ও দক্ষতাজনিত পার্থক্য তৈরি করে। এই ধরনের অসাম্য, সমাজসৃষ্ট অসাম্য থেকে পৃথক প্রকৃতির হয়। সমাজসৃষ্ট অসাম্যের কারণে সমাজে ব্যক্তিদের মধ্যে সুযোগ জনিত কারণের বৈষম্য তৈরি করে বা সমাজে সংখ্যালঘুরা বঞ্চনার শিকার হয়। প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক বৈষম্য মূলত জন্মগত। সামাজিক বৈষম্য সমাজসৃষ্ট। তাই স্বাভাবিক অসাম্যকে দূরীভূত করা সহজ নয়। অন্যদিকে, সমাজসৃষ্ট অসাম্যকে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা থাকলে সহজেই দূরীভূত করা সম্ভব। যেমন—অনেক সময় বহু রাষ্ট্রে দেখা যায় ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গভেদে ব্যক্তির সঙ্গে ভিন্ন আচরণ প্রদর্শন করছে। অনেক সময় এই ধরনের বঞ্চনা, বৈষম্যমূলক আচরণ বারংবার পাওয়ার ফলে মানুষ এই ধরনের আচরণেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। যেমন—নারীদের সমাজে দুর্বল শ্রেণি বা অবলা বলা হয়ে আসছে আদি অনন্তকাল থেকে। নারীরা একসময় এই আচরণেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করে, আসলে তারা পুরুষদের থেকে সবদিক দিয়েই অনুন্নত এবং দুর্বলও বটে। সমাজের বাকিরাও নারীদের দুর্বল ভাবতে থাকে। অন্যদিকে, আফ্রিকার সমাজে সপ্তদশ শতকে দাসপ্রথার উদ্ভব হয়। আফ্রিকায় কালো চামড়ার মানুষদের নির্বোধ ভাবা হত। তাদের কায়িক পরিশ্রমের কাজেই ব্যবহার করার প্রথা চালু করে তৎকালীন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী সাদা চামড়ার মানুষরা। আফ্রিকার ভূমি করায়ত্ত করে সাদা চামড়ার মানুষরা আমেরিকায় চাষের কাজে পাঠানো শুরু করে কালো চামড়ার মানুষদের। এইভাবে আফ্রিকায় ক্রীতদাস প্রথার উদ্ভব হয়। এই সবই গেল সমাজসৃষ্ট অসাম্যের কথা যা সমাজ তথা রাষ্ট্র চাইলে দূর করতে পারে। অন্যদিকে, স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক কারণে যে বৈষম্য থাকে যেমন—কোনো ব্যক্তি জন্মগত অন্ধ বা বিকলাঙ্গ । বর্তমান সমাজে বিজ্ঞানের উন্নতিহেতু আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে এই বৈষম্যও দূর করা সম্ভব হয়েছে অনেকাংশে।
সাম্যের তিনটি দিক-রাজনৈতিক সাম্য, সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক সাম্য
ল্যাস্কি সাম্যের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেন, সমাজে বিশেষ সুযোগ- সুবিধার অনুপস্থিতি এবং পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদানই হল সাম্য। মার্কস সাম্যের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেন, সমাজের বুক থেকে শ্রেণিবিভাজন লোপ করার কথা। 'সাম্য মানে সমজাতীয়তা নয়’—একথা বলেছেন বার্কার। প্রত্যেকের সংজ্ঞাকে বিশ্লেষণ করলে সাম্যের তিনটি ধরন দেখতে পাই—[aj রাজনৈতিক সাম্য, [b] সামাজিক সাম্য ও [c] অর্থনৈতিক সাম্য ।
[a] রাজনৈতিক সাম্য: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্যের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্রের সকল সদস্য রাজনৈতিক সাম্যের অধিকার ভোগ করে থাকেন। রাজনৈতিক সাম্যের অধিকার-এর অর্থ হল—রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিক রাজনৈতিক কার্যকলাপে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করাকেও রাজনৈতিক সাম্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, ভোটদান থেকে নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করা। পর্যন্ত সবটাই রাজনৈতিক সাম্যের অন্তর্ভুক্ত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সাফল্যমণ্ডিত করতে রাজনৈতিক সাম্য বাঞ্ছনীয়। হ্যারল্ড ল্যান্ধি এবং বার্কার উভয়েই একথা স্বীকার করেছেন।
[b] সামাজিক সাম্য: রাজনৈতিক সাম্য বা আইনের চোখে সামা হল সাম্যের প্রথম ধাপ। যদিও সাম্য স্থাপনের কাজে এর প্রয়োগ সর্বদা হয় না। সামাজিক সাম্য বলতে সমাজ- জীবনে সকলের প্রতি সমান আচরণকেই শুধু বোঝায় না, এর দ্বারা সমাজে প্রত্যেকের জন্য সুযোগসুবিধার সাম্যকে বোঝায়। সমাজে যখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, জন্মস্থান এবং নারীপুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের জন্য সমান মর্যাদা ও সুযোগসুবিধা স্বীকৃত হয়, তখন তাকে সামাজিক সাম্য বলে। যদিও সামাজিক ক্ষেত্রে বহু সময় নারীরা বৈষম্যের শিকার হন। তাঁরা অনেকসময় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান না। এইসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কড়া পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এ ছাড়া, নারীরা রাস্তাঘাটে বা কর্মস্থলে বহু সময়ে বঞ্চনা বা লাঞ্ছনার শিকার হন। এইসমস্ত ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সচেতন হয়ে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সঠিক অর্থে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।
[e] অর্থনৈতিক সাম্য: অর্থনৈতিক সাম্য বলতে বোঝায় সকল নাগরিকের আর্থিক সুযোগসুবিধা ভোগের ক্ষমতা। আর্থিক সাম্যের দ্বারা সমৃদ্ধ না হলে অন্য সকল প্রকার সাম্য উপহাসে পরিণত হয়। কিন্তু ধনবৈষম্যমূলক সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র শ্রেণিহীন সমাজেই তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ল্যাস্কির মতে, অর্থনৈতিক সাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার।
অর্থনৈতিক সাম্যের স্বীকৃতির পরেও সমাজে দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা কমেনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়নি। ধনী-দরিদ্রের যে ব্যবধান তা নির্মূল করতে রাষ্ট্রের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং কাজের বিনিময়ে উপার্জন—এই ব্যবস্থাকে সুনির্দিষ্টকরণ করা এবং তা সঠিকভাবে তৃণমূলস্তরে মেনে চলা হচ্ছে কিনা সেদিকে প্রশাসনের কড়া নজর রাখা অবশ্যকর্তব্য। বরাবর যারা দারিদ্র্যের জীবন কাটায়, তাদেরকে সেই অবস্থা থেকে উন্নত জীবনের দিকে উন্নীত করার দায়ও রাষ্ট্রের। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে সবটুকু সম্ভব। সাম্যের এই তিনটি রূপ ছাড়াও স্বাভাবিক সামা, আইনগত সাম্যকে বাদ দেওয়া যায় না।
নারীবাদ
সাম্যের আদর্শ তথা অধিকার নিয়ে কথা হলে সমাজে নারীদের অধিকার প্রসঙ্গে কথা উঠেই আসে। সমাজে নারী ও পুরুষদের সমান অধিকার নিয়ে যে আলোচনা হয় তাকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় নারীবাদ বলা হয়। যাঁরা এই আলোচনা করেন তাঁদের নারীবাদী আখ্যা দেওয়া হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণেই সমাজে নারী ও পুরুষদের মধ্যে অধিকারগত বৈষম্য তৈরি হয়েছে বলে নারীবাদীরা মনে করেন। সমাজের গোড়াপত্তন থেকে নারীরা হল কম মেধা ও বুদ্ধি সম্পন্ন দুর্বল শ্রেণির অংশ। নারীদের এই ধরনের তকমা আজকের নয়, দীর্ঘদিন ধরে এই দুর্বলশ্রেণির মতো ব্যবহার পেয়ে তারাও করে থেকে যেন নিজেদের এমনটাই ভাবতে বসেছেন এবং রাষ্ট্রও এর যথার্থ ব্যবস্থা নেয়নি। নারী ও পুরুষদের মধ্যে সমতাগত বৈষম্যকে দূর করতে রাষ্ট্রকেই ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। অনেকদিন ধরেই এমন দাবি উঠেছে মাতৃত্বকালীন ছুটির সঙ্গে পিতৃত্বকালীন ছুটি চালু হোক, তাহলে মায়েরা তাদের বাইরের কাজ শুরু করতে পারবেন এবং পিতারা সদ্যজাত শিশুদের দেখভাল করবেন সমান গুরুত্ব ও যত্নসহকারে। এই দাবির কথায় রাষ্ট্রের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সমাজবাদ
মার্কসীয় মতে, সমাজতন্ত্র হল সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে শ্রেণিবৈষম্য এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলুপ্ত করা। তবেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ভারতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ১টি জিনিসের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ওই পাঁচটি বৈষম্য হল—(a) নারী- পুরুষে বৈষম্য, [b] বর্ণবিদ্বেষ, [c] জাতি-বিদ্বেষ, [d] অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং [e] ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা। এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয় স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতবর্ষে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গান্ধিজি সত্যাগ্রহের আদর্শ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন।
কীভাবে আমরা সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারি?
সাম্যের আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠা বাঞ্ছনীয়। সাম্য একটি বিষয়। বিশ্বসমাজে সাম্যের অধিকার প্রায় সর্বত্রই স্বীকৃত। তথাপি সমাজ-ব্যবস্থায় প্রকৃতির ভিন্নতাহেতু সাম্যের প্রকৃতিও ভিন্ন হয়। দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তত্ত্ব, যথা— মার্কসীয় ও উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সাম্যের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন ।
মার্কসীয় ব্যবস্থায় সাম্যের আদর্শ বলতে কেবল অর্থনৈতিক সাম্যের কথা বলা হয়। মার্কসের মতে, সমাজতান্ত্রিক সমাজ- ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে আয় ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে বৈষম্য দূরীভূত হয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপসাধনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে শ্রেণি- বৈষম্য বিলুপ্ত হয়। ফলে এই ধরনের সমাজব্যবস্থায় প্রকৃত অর্থেই অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাম্যের প্রকৃতি ভিন্ন। এই ধরনের সমাজব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সাম্যকে অবহেলা করা হয়। পরিবর্তে রাজনৈতিক ও সামাজিক সাম্যের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যের অর্থ হল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই সমান, কোনো ভেদাভেদ করে না। আইনের চোখে সকলেই সমান ও আইনের দ্বারা সংরক্ষিত। পরিবার গঠন, ধর্মীয় আচরণ তথা সামাজিক ক্ষেত্রে সকলেই সমান সুযোগ পায়। নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, নির্বাচিত হওয়ার অধিকার থেকেও কেউ বঞ্চিত হয় না। অর্থাৎ, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। উদারনৈতিক ধ্যানধারণা অনুসারে সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যের ভিত্তিতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে এইরকম সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্যের উপস্থিতি এবং অর্থনৈতিক সাম্যের অনুপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
আনুষ্ঠানিক সাম্য প্রতিষ্ঠা
সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের আদর্শকে সমাজে প্রয়োগ করতে এই আদর্শগুলিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ভারতীয় সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের আদর্শকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের তরফ থেকে। রাষ্ট্র বা কেউ এই আদর্শ বা অধিকার লঙ্ঘন করলে আদালতে তা বিচারযোগ্য।
মৌলিক অধিকার হিসেবে সাম্যের আদর্শটি স্বীকৃত হওয়ার মানে সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাম্য দূর করা সম্ভব হয়। যেমন— পূর্বে বহু ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত, কিন্তু বর্তমানে অনেকক্ষেত্রেই নারীরা অংশগ্রহণ করছেন। দরিদ্রদেরও তাদের রাজনৈতিক অধিকার তথা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় না ইত্যাদি। পৃথিবীর বেশিরভাগ আধুনিক সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক সরকার সাম্যের নীতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে এবং ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গভেদে সকলের সঙ্গে আইনের দ্বারা সমান আচরণ প্রদর্শন করেছে।
স্বতন্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্য প্রতিষ্ঠা
আইনের দৃষ্টিতে সাম্য বা আনুষ্ঠানিক সাম্যের আলোচনা করলেই সাম্যের নীতিকে উপলব্ধি করা যায় না। অনেক সময় সাম্যের অধিকারকে সুনিশ্চিত করার জন্য ব্যক্তির সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করার প্রয়োজন হয়। সাম্যের অধিকার প্রয়োগে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকে। যেমন—যখন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিশেষ ছাড় থাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা দীর্ঘ লাইন অতিক্রম না করার ক্ষেত্রেই হোক বা ভিন্ন কিছু। এই ধরনের ব্যতিক্রম আচরণের মাধ্যমে ওই প্রতিবন্ধী মানুষটিকে সমান সুযোগ পাওয়ার অবস্থা তৈরি করে দেওয়া হয়।
সদর্থক কার্যকলাপ
সমাজে সমতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। বহুক্ষেত্রে বেশ কিছু অসাম্য সমাজের গভীরে শিকড় বিস্তার করেছে। সাম্যের আদর্শ তথা অধিকারও সেক্ষেত্রে কাজ করে না। তাই এই ধরনের অসাম্যকে নির্মূল করতে রাষ্ট্রকে কড়া ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এই ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ বিভিন্নভাবে নেওয়া যেতে পারে। সমাজের বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলি যে ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়, তাদেরকে সেই অবস্থা থেকে মুক্ত করা, যেমন—তাদেরকে স্কলারশিপ-এর ব্যবস্থা করে দেওয়া বা হস্টেলে থাকার খরচের বিষয়টি বিবেচনা করে এদের সাহায্য করা। অন্যদিকে, পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী বা যারা সমাজে বরাবরই বঞ্চিত শ্রেণি, যেমন—তপশিলি জাতি ও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত মানুষকে চাকুরি হোক বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভরতির বিষয় হোক, তাদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে রাষ্ট্র।
যদিও সমালোচকরা সংরক্ষণের নীতিকে নিয়ে বিরূপ মত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, পিছিয়ে পড়া শ্রেণি তথা তপশিলি জাতি, উপজাতি ও সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের সমাজের মূলস্রোতের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাষ্ট্র করেছে তাকে সমালোচকরা অনুচিত বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ, তাঁদের মতে, এই সংরক্ষণহেতু সমাজের অন্যান্য অংশের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়।
সাম্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন সমাজে সকলকে সমান চোখে দেখা হবে, সকলের সঙ্গে সমান আচরণ করা হবে। এই প্রসঙ্গে বিতর্ক যাই হোক না-কেন রাষ্ট্রে প্রতিটি ব্যক্তির সঙ্গে সমান আচরণের উপর জোর দিতে হবে, যাতে সাম্যের নীতিটি যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পাশাপাশি এটাও রাষ্ট্রকে নজর দিতে হবে যাতে শিল্প এবং স্বাস্থ্য—এই দুটি ক্ষেত্রে ব্যক্তি নাগরিকরা সমান সুযোগ পায়। কারণ একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা—এই দুটি = বিষয়ই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটি বিষয়ের ওপর একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যত নির্ভর করে। তাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক ক্ষেত্রে সাম্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য যদি কোনো রাষ্ট্রের ভিত্তি হয় তাহলে কাঠামো হল সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্য। এই দুটি সামা ছাড়া বাকি সব ধরনের সাম্য অর্থহীন।
সাম্যের আদর্শকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া, ব্যক্তি- নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে লিপিবদ্ধ করে সাম্যের আদর্শকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের নাগরিকরা সাম্যের অধিকার সম্পর্কে যতক্ষণ না নিজেরা সচেতন হচ্ছেন এবং নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়া নিয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত না সচেষ্ট হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সাম্যের অধিকার অর্থহীন। এ ছাড়া সমতার অর্থ শুধু সমান নয়, বিশেষ সুযোগের অনুপস্থিতিও বটে, সেক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তি এই ধরনের সুযোগের শরণাপন্ন হওয়ার নিজেরা চেষ্টা করবেন না এবং অন্য কেউ এমন চেষ্টা করলেও প্রতিবাদ করতে হবে, তবেই সাম্যের অধিকারের যথার্থতা প্রতিপন্ন হবে।
অনুশীলনীর প্রশ্নোত্তর
1. সমাজে কিছু মানুষ মনে করেন বৈষম্য হল প্রকৃতি নির্দিষ্ট, আবার কিছু মানুষ মনে করেন সাম্যই হল স্বাভাবিক, সমাজে যে বৈষম্য দেখা যায় তা সমাজ কর্তৃক সৃষ্ট। কোন যুক্তিকে তুমি সমর্থন করো এবং কেন, তার কারণ দর্শাও ?
> অসাম্য বা বৈষম্য হল স্বাভাবিক কারণ—
[i] জন্মগতভাবে মানুষ সমান নয়, প্রতিটি মানুষই প্রতিভা, দক্ষতা ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের। প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু পার্থক্য থাকবে।
[ii] প্রতিটি মানুষই শারীরিক, মানসিক এবং বৌদ্ধিক শক্তির দিক থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।
[iii] সমাজের মধ্যে কর্মবিভাজনের নীতিটি বাস্তবায়িত হওয়া দরকার। কারণ, সব মানুষ কখনোই একই কাজ করতে পারে না। প্রতিটি ব্যক্তি, যে বিশেষ কাজে পারদর্শী বা দক্ষ তাদের একই ধরনের কাজে নিযুক্ত করা দরকার।
2. একটি ধারণা মতে, চূড়ান্ত অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা কখনো সম্ভব নয় এবং এটি কাম্যও নয়। তাদের যুক্তি হল একটি সমাজ খুব বেশি হলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিরাজমান ব্যবধান ক্রমশ হ্রাস করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারে। তুমি কি এই মত সমর্থন করো ?
> হ্যাঁ, আমি এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত যে চরম অর্থনৈতিক সমতা সম্ভব নয় এবং আকাঙ্ক্ষিতও নয়। একটি সমাজ বড়োজোর যেটা করতে পারে তা হল — সমাজের মধ্যে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্যকে হ্রাস করার চেষ্টা করতে পারে। প্রতিটি ব্যক্তি তার দক্ষতা অনুযায়ী সমাজের মধ্যে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে থাকে। সমাজের মধ্যে ব্যক্তির কার্যাবলি অনুসারে বা ব্যক্তির কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়ে থাকে এবং কাজের জন্য পুরষ্কৃত করা হয় ক্ষমতার নীতিকে মান্য করেই। তবুও চরম অর্থনৈতিক সাম্যের নীতিকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সমাজব্যবস্থা একটি পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে, তা হল সকলকে সমান সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। কিছু প্রাথমিক বিষয়গুলিতে, যেমন—স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলিতে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বা পরিপ্রেক্ষিত ছাড়াই সকলকে সমান সুযোগসুবিধা প্রদান করতে পারে।
3. নীচে দেওয়া ধারণাগুলির সঙ্গে যথাযথ উদাহরণগুলি মেলাও—
সদর্থক কাজ (a) প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার রয়েছে।
সুযোগের ক্ষেত্রে সাম্য (b) বয়স্ক নাগরিকের জন্য ব্যাংক বেশি সুদ প্রদানের ঘোষণা করে।
সমান অধিকার (c) প্রত্যেক শিশুর জন্য অবৈতনিক শিক্ষালাভের ব্যবস্থা থাকা উচিত
[1] => [b]; [2] => [c]; [৩] => [a]
4. সরকারি একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা বাজার থেকে তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় না। সুতরাং, ওই প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সরকার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে ফসলের পর্যাপ্ত মূল্য প্রদানের ব্যবস্থা করবে। এই সুপারিশ কি সাম্য নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ?
> হ্যাঁ, সরকারের সুপারিশের প্রতিবেদনটি সাম্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, অন্তত এই বিষয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা প্রভাবিত হয়। যেহেতু আমাদের দেশের গ্রামীণ জনগণের একটি বড়ো অংশই কৃষিকাজ করে উপার্জন করে, তাই তাদের স্বার্থরক্ষা করা উচিত। কারণ, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের যথেষ্ট সম্পদ যেমন থাকে না, তেমনি বাজারে খাদ্যশস্যগুলির প্রকৃত মূল্যগুলি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাও থাকে না।
5. নীচে দেওয়া কোন্ বক্তব্যগুলি সাম্য নীতির পরিপন্থী ?
[a] বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রত্যেক শিশু পালা করে নাটকের অংশটি পাঠ করবে।
[b] কানাডার সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে 1960 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের সে দেশে স্থানান্তর হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছে।
[c] রেল বিভাগ কর্তৃক বয়স্ক নাগরিকদের জন্য পৃথক সংরক্ষিত কাউন্টারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
[d] কিছু কিছু বনাঞ্চলে প্রবেশের অধিকার নির্দিষ্ট কিছু উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকেদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে।
> [a] এই বক্তব্যের মধ্যে যেহেতু প্রতিটি শিশুই বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে সুতরাং সাম্য নীতির কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না।
[b] দেহের চামড়ার রঙের ভিত্তিতে সাদা চামড়ার ইউরোপীয়দের দেশান্তরিত হয়ে বসবাস করার জন্য উৎসাহিত করার নীতিটি সাম্যের নীতিকে লঙ্ঘন করেছে।
[c] বক্তব্যটি সমতার নীতিকে লঙ্ঘন করে না। কারণ, বয়স্ক নাগরিকদের বিশেষ প্রয়োজন ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিতেই হবে। অন্যান্যদের সঙ্গে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।
[d] বক্তব্যটিতে সাম্য নীতির কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না। কারণ, বনাঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতি গোষ্ঠীগুলির জীবন-যাত্রার অধিকার ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার।
6. নীচে মহিলাদের ভোটাধিকারের সপক্ষে কিছু যুক্তি দেওয়া হয়েছে। এগুলির মধ্যে কোনটি সাম্যনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ? তোমার উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দেখাও ?
[a] মহিলারা হল মাতৃজাতি, সুতরাং ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে আমরা তাদের অসম্মান করব না।
[b] সরকারি সিদ্ধান্তগুলি পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদেরও প্রভাবিত করে। সুতরাং সরকার গঠনে তাদেরও নিজস্ব মতামত থাকা উচিত।
[c] মহিলাদের ভোটাধিকার না দেওয়া হলে পারিবারিক সংহতি বিনষ্ট হবে।
[d] মানবজাতির অর্ধেক হল মহিলা, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে সুদীর্ঘকাল ধরে তুমি তাদের দমিয়ে রাখতে পারো না।
> [a] এই বক্তব্যটি সাম্যের নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। এই বক্তব্যটির ভিত্তি হল আমাদের আবেগ।
[b] এই বক্তব্যটি সাম্যের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, এই বক্তব্যটির সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন জড়িত আছে, সেটি পুরুষ ও নারী উভয়কেই প্রভাবিত করে থাকে।
[c] এই বক্তব্যটি সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, কারণ, ভোটাধিকারের সঙ্গে সংসারের কোনো যোগ নেই।
[d] এই বক্তব্যটি সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ, এই বক্তব্যটি নৈতিক চিন্তার সঙ্গে জড়িত মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হল নারী। সুতরাং, নারীদেরও ভোটাধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব ও সুযোগ দেওয়া দরকার।
পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত কার্যাবলি এবং উৎসভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
1 পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে এমন কতগুলি পঙ্কি বা শ্লোক সংগ্রহ করো যেগুলিতে সাম্যের আদর্শকে তুলে ধরা হয়েছে। এই সমস্ত পঙক্তিগুলি নিয়ে শ্রেণি- কক্ষে মতামত বিনিময় করো।
> বৌদ্ধধর্ম: একটি মোমের শিখায় হাজার মোমের শিখার প্রজ্জ্বলন সম্ভব। তাতে ওই একটি মোমের জীবন কমে যায় না। ঠিক তেমনই খুশির বণ্টনে আনন্দ কমে যায় না। তাই সবসময় পরোপকারী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে চলা উচিত।
> খ্রিস্টধর্ম: বিশ্বাসই সব। সুতরাং, বিশ্বাসকে ভালোবাসো এবং বিশ্বাসকে অনুসরণ করো।
> মুসলিম ধর্ম: যদি আল্লায় বিশ্বাস রাখো, তাহলে কোনো বিপদই তোমায় ছুঁতে পারবে না।
> হিন্দুধর্ম: হিন্দুধর্ম একটিমাত্র বিশ্বাস নয়, এটি একটি যুক্তিরও প্রতিষ্ঠান, যা অভিজ্ঞতার নিরিখে গড়ে ওঠে। হিন্দুধর্মে অপদেবতা বা শয়তানই শেষ কথা নয়। এখানে নরক বা এমন কোনো স্থান নেই যেখানে ভগবান নেই এবং এখানে এমন কোনো পাপ বা পাপী নেই, যা ভগবানের ভালোবাসার থেকে ওপরে।
উপরিউক্ত চারটি ধর্মের মূল বক্তব্য দেখলে বোঝা যায় যে, বিভিন্ন ধর্মের বক্তব্য ভিন্ন। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে মানুষের সেবা, খ্রিস্টধর্মে মানুষকে বিশ্বাস, ইসলাম ধর্মে ভগবানকে বিশ্বাসের মধ্যদিয়ে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পাওয়া যায়। আবার, হিন্দুধর্ম অশুভের ওপরে শুভ-এর জয় ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসকে গড়ে তুলতে চেয়েছে। প্রত্যেকেই মঙ্গলের কথা বলেছে, যার ফলে মানুষ তথা সমাজের মঙ্গল সাধিত হবে। ধর্মের মাধ্যমে ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে চেয়েছে। এইভাবে সব ধর্মের বক্তব্য পৃথক হলেও একটি সমতার সুর রয়েছে তা হল—সবার উপরে মানুষ সত্য। মানুষ চাইলে সব পারে এবং নিজের আরাধ্য দেবতাকে বিশ্বাসের মধ্যদিয়ে নিজের ওপরে বিশ্বাস রাখে। যার দ্বারাই সমাজের কল্যাণ সাধন সম্ভব।
2. সমাজে প্রতিটি মানুষেরই কোনো-না-কোনো ধর্ম বা বিশ্বাস রয়েছে। প্রত্যেক ধর্মই সাম্য নীতিকে উর্ধ্বে তুলে ধরে। তাহলে সমাজে এত বৈষম্য কেন ?
> আপাতদৃষ্টিতে সাম্য বলতে বোঝায় সকলেই সমান। সমাজবদ্ধ প্রতিটি মানুষই সমান সুযোগসুবিধা ভোগের অধিকারী হবে, নিজ নিজ ধর্ম পালনের মাধ্যমে সাম্যের নীতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে এটিই অভিপ্রেত। বিশেষত ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ দেশের প্রতিটি মানুষেরই এ অধিকার রয়েছে। = তবুও আমরা সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় ভেদাভেদের স্বীকার হই এবং এর মাধ্যমেই সামাজিক বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণ বিদ্যমান যথা—
[i] যখনই কোনো ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়, তখনই সামাজিক বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে।
[ii] বিভিন্ন ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ রয়েছে। এক ধর্মের মানুষ যখন অন্য ধর্মের ধর্মীয় মতাদর্শ মানতে রাজি হয় না তখনই বৈষম্যের সৃষ্টি হয়।
[iii] প্রতিটি ধর্মের মানুষকে তাদের ধর্মীয় নিয়মনীতি পালনের সুযোগ এবং স্বাধীনতা প্রদান থেকে বিরত করলে সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপট রচিত হয়।
বস্তুতপক্ষে, সাম্যের চেয়ে বৈষম্যের পরিবেশই বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এবং আমাদের সমাজে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। ধর্মীয় বৈষম্য সেগুলির মধ্যে অন্যতম। সেক্ষেত্রে আমাদের সকলকে অপরের ধর্মের প্রতি সমান সহানুভূতিশীল হতে হবে এবং আমাদের প্রত্যেককে প্রত্যেকের ধর্মাচরণ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলেই বৈষম্যের ঊর্ধ্বে আমরা সাম্যের নীতিকে তুলে ধরতে পারবো।
3. বৈশ্বিক কিংবা জাতীয় ক্ষেত্রে বৈষম্যের কথা বলে কী লাভ যখন আমাদের চারপাশে এত বঞ্চনা অথচ এর প্রতি কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। শুধু আমার বাবার দিকে তাকাও যিনি আমার থেকে আমার ডাইকে বেশি প্রাধান্য দেন।
> প্রাচীনকালের মাতৃতান্ত্রিক কাঠামো থেকে সমাজ বহুদিনই মুক্ত হয়েছে। মধ্য যুগের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সমাজ পিতৃতান্ত্রিক চেহারা নেয়। সমাজে মাতৃতান্ত্রিক অবস্থা থেকে এই রূপান্তর প্রক্রিয়া আজ সমাপ্ত। সমাজকে একবাক্যে আমরা পুরুষতান্ত্রিক বা পিতৃতান্ত্রিক বলতে পারি। পরিবার থেকে, অফিস থেকে গোটা সমাজ পুরুষশাসিত।
তাই উপরিউক্ত বক্তব্যটিতে সঠিকই বলা হয়েছে। গোটা বিশ্ব যখন পিতৃতান্ত্রিকতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে নারী আন্দোলনে শামিল হয়েছে, সমাজে যখন নারীরাও পুরুষদের মতো সমান অধিকারে সোচ্চার হয়েছে, পুরুষদের ঠিক পাশের অবস্থানটিতে নিজেদের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে জোর লড়াই চালাচ্ছে ঠিক তখনই নিজের বাড়িতে বা নিদেনপক্ষে পাশের বাড়িতেই দেখা যাচ্ছে পিঠোপিঠি দুই ভাইবোনের মধ্যে সবার মা-ই বৈষম্য তৈরি করছে।
সুতরাং, সমাজ বদলের আগে নিজের মন বদলের প্রয়োজন অনেক বেশি। পরিবার হল সমাজের প্রাথমিক এবং ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান। সমাজকে বদলের আগে নিজের পরিবারেও সেই বদল আনতে হবে। অর্থাৎ, পরিবারের 'কর্তা' এই শব্দের প্রয়োগ বন্ধ করে কর্তা এবং কর্ত্রী উভয়ের সমান গুরুত্বকে যেমন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, ঠিক তেমনই ঘরে বোন এবং ভাই থাকলে বাবা- মাকে বোন এবং ভাইয়ের প্রতি অর্থাৎ, ছেলে এবং মেয়ের প্রতিও সমান আচরণ করতে হবে। পরিবারের ভিতরে যদি এই বৈষম্যকে মুছে ফেলা যায়, সমাজেও সেই বৈষম্য দূর হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য
4. নীচের সারণিতে দেওয়া শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে যে পার্থক্য বর্তমান তা কি গুরুত্বপূর্ণ ? এই সমস্ত পার্থক্যগুলি কি সমাজে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়েছে ? নাকি এই সমস্ত পার্থক্যগুলি সমাজে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথার ফল ? এই জাতিভেদপ্রথা ছাড়া আর কী কী উপাদান এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বলে তুমি মনে করো ?
জাতি/সম্প্রদায় | |
তপশিলি জাতি | |
ওপরের সারণিতে দেওয়া শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য বর্তমান যুগেই বিদ্যমান। কিন্তু সামাজিক অগ্রসরতার নিরিখে বিচার করলে এই ধরনের পার্থক্য একেবারেই অনভিপ্রেত এবং গুরুত্বহীন।
বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে পার্থক্যের যে তথ্য আমরা পাই তা সমাজে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা এই ধরনের প্রেক্ষাপট বহুকাল ধরে রচনা করেছে।
হ্যাঁ, এই সমস্ত পার্থক্যগুলি বহুকাল ধরে সমাজে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। নিন্দনীয় জাতিভেদপ্রথা শিক্ষা গ্রহণকেও করালভাবে গ্রাস করেছে।
জাতিভেদপ্রথা ছাড়া, যেসমস্ত উপাদানগুলি এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বলে আমার মনে হয় তা নিম্নরূপ—
[i] সামাজিক অনগ্রসরতা।
[ii] শিক্ষাগ্রহণে বিমুখতা।
[iii] জাতির যথার্থ বৌদ্ধিক বিকাশ প্রকটিত না হওয়া।
[iv] ধর্মীয় বেড়াজাল ।
[v] শিক্ষাগ্রহণের সঠিক সুযোগ ও পরিবেশের অভাব।
[vi] সরকারি ঔদাসিন্য ।
[vii] পারিবারিক বিধিনিষেধ।
5. মহিলাদের সামরিক বাহিনীর সম্মুখ সমর ইউনিটে যোগদান এবং সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া উচিত।
> সাম্যের অধিকার যে-কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। সাম্যের অধিকারের অর্থ সমাজে ধনী- দরিদ্র, স্ত্রী-পুরুষ, জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে মানুষে-মানুষে বৈষম্য না করা। সুতরাং, কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার। আর সেইহেতু, সৈন্যবাহিনীতে মহিলাদের প্রবেশের অধিকার আছে এবং উচ্চপদে আসীন হওয়ার অধিকারও আছে।
1914 খ্রিস্টাব্দ থেকে সৈন্যবাহিনীতে নারীদের যোগদান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মহিলারা যুদ্ধক্ষেত্রে একজন পুরুষের মতোই সমান সাহসের সঙ্গে লড়াই করতে পারেন। নিজের বাহিনীকে সমান দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারেন। সুতরাং, মহিলা বলে অবলা এমন ভাবনাকে সম্পূর্ণ অতিক্রম করে মহিলারা সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করেন। মহিলা বলে শারীরিক বা মানসিকভাবে দুর্বল তাই সৈন্যবাহিনীতে তারা সুযোগ পান এমনটাও নয়। একজন পুরুষের মতোই নারীরা সুযোগ পান, এটা তার বেশি কিছু নয়।
কিন্তু মহিলাদের এই পেশার বিপক্ষেও কিছু মত আছে। মহিলারা সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করতে পারেন একজন পুরুষের মতোই, বিভিন্ন ধরনের ধাপে ধাপে কঠিন প্রশিক্ষণের মধ্যদিয়ে তারাও সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু সৈন্য শিবিরে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ শিথিল, সৈন্য শিবিরে জুনিয়ার মহিলাদের সিনিয়র পুরুষ আধিকারিকদের দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা কম নয়। বরং এই ধরনের ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বোপরি, এই সমস্যার সমাধানও বেশ কঠিন। কারণ, যাঁরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন তাঁরা নিজেদের লাঞ্ছনা বা বঞ্চনার কথা জানাবার সুযোগ পান না। তাই এই ধরনের সমস্যা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থাকে।
তথাপি এই ধরনের সম্মানজনক পেশায় যোগদানে মহিলারা পিছিয়ে নেই। সুতরাং, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে শিথিলতা সঠিক নয়। বিষয়টিতে যত্নবান হওয়া উচিত। দেশরক্ষার মতো কাজে পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও সমানভাবে যখন অগ্রসর হচ্ছেন তখন তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে অবহেলা করার অর্থ দেশরক্ষার মতো মহান কাজকে অবমাননা করা। তাই সার্বিকভাবে তাদের নিরাপত্তার বিষয়কে সুনিশ্চিত করলে দেশ ও দশের মঙ্গল সাধন সম্ভব।
> 1968 খ্রিস্টাব্দ থেকে 2006 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ন্যূনতম মজুরির প্রায় 35% হ্রাস পায়।
> 10 লক্ষ আফ্রো-আমেরিকান পুরুষ বিভিন্ন জেলে বন্দি যাদের বয়স 40-এর নীচে।
> 13% কৃয়াঙ্গ পুরুষ ভোট দানের অধিকার হারিয়েছেন।
> আয় বৈষম্য: উচ্চবর্ণের 20% লোক মোট সম্পদের 83%-এর মালিক। সর্বনিম্ন 20% লোকের কোনো সম্পদ নেই।
হ্যাঁ, আমাদের দেশে এখনও বহু সম্প্রদায়ের মানুষ (দলিত, তপশিলি) আমেরিকার মতো বৈষম্যবাদের শিকার। ভারতের মতো প্রগতিশীল দেশে বৈষম্যবাদের ছায়া অত্যন্ত প্রকট। বৈদিকযুগে, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে স্বাধীনত্তোর যুগে এমনকি আধুনিক ভারতবর্ষেও বৈষম্যবাদ জাঁকিয়ে বসে আছে। হয়তো তুলনামূলক বিচারে শতাংশের মাত্রা অনেক কমেছে তবুও তা নিশ্চিহ্ন নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—ব্রাক্ষ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের বর্ণ বিভাজন সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপট রচনা করে। একাসনে বসে খাদ্যগ্রহণ না করা, দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের কুয়ো থেকে জল তুলতে না দেওয়া, তপশিলি জাতিকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার প্রয়াস— বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে। বর্তমানকালের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে নারীজাতিকে অবদমিত করার অদম্য প্রয়াস। তথা নারী নির্যাতন, কন্যাভ্রূণ হত্যা, শিশুকন্যাকে বিদ্যালয়ে না পাঠানোর মতো নারী বিদ্বেষের অজস্র উদাহরণ তুলে ধরা সম্ভব।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা আমেরিকার দীর্ঘ ইতিহাসে বর্ণবাদ-কেন্দ্রিক সহিংসতার বহু নজির বিদ্যমান। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করতেই হবে,
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান বর্ণবৈষম্য
6. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বর্ণবাদ বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করো। আমাদের দেশে কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা কি আমেরিকার মতো বৈষম্যবাদের শিকার ? এই সমস্ত বৈষম্য দূর করার জন্য মার্কিন সরকার কী ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে ? মার্কিনিদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে কি শিক্ষণীয় কিছু আছে ? তারা কি আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শিক্ষা নিতে পারে ?
> বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আমেরিকায় বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী এবং বর্ণের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় আছে যা সামাজিক স্থিতিশীলতার চিত্র তুলে ধরে। তবে 2015 খ্রিস্টাব্দে চার্লস্টন শহরে কৃষ্ণাঙ্গদের গির্জায় শ্বেতাঙ্গদের গুলিবর্ষণের মাধ্যমে আবারও সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এই ধরনের আরও বহু বিক্ষিপ্ত ঘটনা আমেরিকায় ইতিমধ্যে ঘটেছে। যাইহোক, মার্কিন সরকার এই ধরনের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সচেতন হয়েছে এবং যাতে বৈষম্যমূলক ঘটনা প্রতিরোধ করা যায় সেই সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।
মার্কিনি জনগণ নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে বর্তমানে অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠেছে। তারা বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের দাবি অনেকাংশে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মতানুযায়ী, গত পঞ্চাশ বছর ধরে যা চলেছে, তা আর চলতে দেওয়া যায় না। মার্কিন নাগরিকরা যেভাবে নিজেদের সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে বহুলাংশে সক্ষম হয়েছে, তেমনই এই বিশ্বের প্রতিটি সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষের নিজেদের অধিকারবোধ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন এবং নিজেদের দাবি তুলে ধরে সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন ।
অবশ্যই, ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে দেখা যাবে ভারত সরকার সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উদ্যোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ভারত সরকার ইতিমধ্যে শুরু করেছে। যেমন—কৃষক শ্রেণির উন্নতিবিধানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কৃষিপ্রকল্প গ্রহণ করেছে। মেয়েদের শিক্ষার বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করতে সমগ্র ভারতব্যাপী ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও' কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। তপশিলি, অনগ্রসর জাতি-উপজাতিদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগসুবিধা প্রদান করা হচ্ছে ইত্যাদি।
সুতরাং, আমাদের এইসব উন্নয়নমুখী অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে তারাও তাদের আশু সমস্যার অনেকখানি সমাধান করতে পারবে বলে আমার মনে হয়।
7. সকল ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য যা তোমার বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে লক্ষ করা যায় সেগুলির একটি তালিকা প্রস্তুত করো।
> সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের স্কুল সমাজে দেখতে পাওয়া যায়। বেসরকারি স্কুলে মূলত সমাজের বিত্তশালীরা পড়তে যায়, যেখানে নিম্ন মধ্যবিত্তরা এবং দরিদ্র বাড়ির পড়ুয়াদের ঠাঁই হয় সরকারি বিদ্যালয়ে। সরকারি বিদ্যালয়গুলি সমাজের সকলের জন্য। এখানে সমাজের সকল শ্রেণির পড়ুয়ারা আসে ফলে স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য চোখে পড়ে।
[i] এই ধরনের স্কুলে সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল যেমন ফেরিওয়ালা, ফলের ব্যবসায়ী বা গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করে এমন বাড়ির পড়ুয়ারা পড়াশোনা করে।
[ii] আবার সরকারি অফিসে কর্মরত বাড়ির পড়ুয়ারাও সরকারি স্কুলে পড়তে আসে।
[iii] এ ছাড়াও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সন্তানরাও এই সমস্ত বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে।
সুতরাং উপরের তালিকা থেকেই স্পষ্ট সরকারি বিদ্যালয়- গুলিতে আগত পড়ুয়াদের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকবেই যা বেসরকারি স্কুলে স্বভাবত দেখা যায় না।
[i] সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া পরিবারের বাচ্চারা পড়তে আসায় বেশিরভাগ সময়ে স্কুল ছুটের সমস্যায় পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে পরিবারের বাবা মা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং যাদের সন্তান প্রথম বিদ্যালয়ে যাচ্ছে সেই বাড়ির পড়ুয়াদের মধ্যে স্কুল ছুটের সমস্যা বেশি।
[ii] আবার অনেক ক্ষেত্রে যেসব পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম স্কুলে আসছে, অর্থনৈতিক অবস্থাও এতটা অনুন্নত নয়, তাদের সঙ্গে উপরিউল্লিখিত বাচ্চাটির মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট বৈষম্য চোখে পড়ে।
8. বিভিন্ন ধরনের দিব্যাঙ্গ শিক্ষার্থীরা যাতে স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের মতো শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় সেজন্য তাদের কী কী সুবিধা থাকা প্রয়োজন ? তার একটি বিশদ তালিকা প্রস্তুত করো। তোমার বিদ্যালয়ে এই সুবিধাগুলির মধ্যে কোটি রয়েছে ?
> বর্তমানে ভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়। ব্যাহত, অক্ষম এবং প্রতিবন্ধী শব্দগুলি তিনটি ভিন্ন ধর্মীয় প্রতিশব্দ হলেও ধারণাগত কিছু পার্থক্য দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে Physical Handicaped বা দিব্যাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী কথার অর্থ হল—
অক্ষমতার ফলে কোনো ব্যক্তি বা শিশু যখন পরিবেশের সঙ্গে স্বাভাবিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে অনতিক্রম্য বাধার সম্মুখীন হয় তখনই তাকে প্রতিবন্ধী বলে। যেমন—কোনো শিশু বা ব্যক্তি যদি বধির হয়, সেক্ষেত্রে দৈহিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রে তার কোনও অসুবিধা হয় না। কিন্তু সে সমস্ত কাজে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে তাকে খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। সুতরাং মূক ও বধির শিশুদের পঠন পাঠনের সুবিধার জন্য সে ব্যবস্থাগুলি দরকার—
[i] এদের শিক্ষার উদ্দেশ্য হল বাহ্যিক ক্ষমতার বিকাশে সহায়তা করা। যথাযথ ভাষাশিক্ষা দেওয়া, বিশেষ করে ভাষা বুঝতে পারা এবং নিজে বলতে পারার বিষয়ে এদের শিক্ষণ দেওয়া হয়।
[ii] এদের শিক্ষার অপর উদ্দেশ্য হল তাদের সামাজিক বিকাশে সহায়তা করা। তাই অন্যদের ভাষা বোঝাতে সাহায্য করা।
[iii] মূক ও বধির ছেলেমেয়েরা যেহেতু শুনতে পায় না, তাই তাদের শ্রবণমূলক প্রশিক্ষণ দরকার।
[iv] অভিভাবকদেরও প্রশিক্ষণ দরকার যাতে তারা তাদের সন্তানদের সঠিকভাবে শেখাতে পারে। সুতরাং,
[a] ঠোঁট নড়াচড়া অর্থাৎ ওষ্ঠ পঠনের বা বাক পঠনের ব্যবস্থা বিদ্যালয়ে রাখতে হবে।
[b] যারা সম্পূর্ণ বধির তাদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য আঙুল সঞ্চালনার মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের অক্ষর, শব্দ, বাক্য ও বানান লেখা সহজে শেখানো যায়।
[c] এই ধরনের শিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও অভিজ্ঞা শিক্ষক প্রয়োজন যাতে তারা স্পর্শ করে শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে।
[d] উচ্চশক্তি সম্পন্ন শ্রবণ সহায়ক যন্ত্রের সাহায্যে আংশিক বধিরদের বধিরতা অনেকটা দূর করা যায়।
[e] মূক ও বধির ছেলেমেয়েদের দর্শনাভিত্তিক পদ্ধতিতেও মনের ভাব প্রকাশের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মূক ও বধির শিশুদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা প্রয়োজন। সাধারণ বিদ্যালয়ে এমন প্রশিক্ষিত শিক্ষক খুব কমই থাকে। এই ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকাটা জরুরি।
তবে বিশেষ ব্যবস্থাসম্পন্ন বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম হলে সাধারণ স্কুলে ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের দ্বারা মূক ও বধির ছেলেমেদের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের স্কুলে দুজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছেন এবং মূক ও বধির শিক্ষার্থীদের উপর উল্লিখিত পদ্ধতির সাহায্যে পড়ানো হয়।
9. চিত্রটি ব্যাখ্যা করো। এই চিত্র থেকে সাম্যের কোন্ নীতিটি বোঝা যাচ্ছে ?

> সাম্য কথার অর্থ হল সকলের প্রতি সমান ব্যবহার। সামাজিক পরিবেশে স্বচ্ছন্দে বসবাস করার ক্ষমতা অর্জনকেও সাম্য বলা হয়। নিজের পরিবেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য এবং নিজে স্বচ্ছন্দে বসবাস করার জন্য যে ন্যূনতম রোজগার প্রয়োজন রাষ্ট্র নাগরিকদের সে অধিকার প্রকাশ করে। সুতরাং সকলেই তার যোগ্যতা এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সুযোগের ভিত্তিতে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করাই হল সাম্য।
চিত্রটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীদের একটি কাজ করার কথা বলা হয়েছে এবং সকলকে সমান সুযোগ প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। ছবিটি একটি জঙ্গলের, কাজটি গাছে চড়া। ছবির সকল প্রাণী গাছে চড়তে সক্ষম হলেও হাতি গাছে চড়তে পারে না। সেক্ষেত্রে হাতির সকলের মতো ওই সুযোগ পাওয়া এবং না পাওয়া দুই সমান। হাতি তার দৈহিক গঠনের জন্য গাছে চড়তে পারে না, সুতরাং যে প্রাণীরা গাছে চড়তে সক্ষম তাদের সঙ্গে এই ধরনের প্রতিযোগিতায় হাতির থাকার কথা নয়।
ছবিটি একটি প্রতীকি। আসলে ছবিটার মাধ্যমে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিশেষ সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের একই প্রতিযোগিতায় একই সারিতে প্রতিবন্ধী মানুষদের রাখাটা সমীচীন নয়। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাষ্ট্রের করা উচিত। আর এই ভাবনা থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কর্ম প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই রাষ্ট্র প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে।
10. তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভরতির ক্ষেত্রে সদর্থক কার্যকলাপ দ্বীপে গ্রহণ করা উচিত।
> বিপক্ষে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলি বেশিরভাগ সময়ে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত হয় না। যেহেতু সরকারি সাহায্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলি পরিচালিত হয় না তাই সরকারি নিয়মাবলি মেনে চলতে তারা বাধ্য নন। যদি কোনওভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অথচ সরকারি সাহায্য খানিকটা হলেও পান, তাহলে সরকারি নিয়ম মানতে তারাও বাধ্য থাকেন । এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি সাহায্য ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেগুলি মূলত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান, তারা নিজেদের নিয়মাবলি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভরতি বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দেন এবং তারা সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে অস্বীকার করেন, তাহলে কিছু করার থাকে না। কিন্তু এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি সামান্য হলেও সরকারি সাহায্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়, সেক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম তাদের মানতে হবে।
» সপক্ষে: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি মূলত ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠী গড়ে তোলেন কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থে। সরকারি সাহায্য ছাড়া তাকে গড়ে তুললে সরকারি নিয়ম মানতে তারা দায়বদ্ধ নয়, সুতরাং সংরক্ষণ ব্যবস্থা তারা মেনে চলতে চাইবেন না নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই। সংরক্ষণের জন্য, তাদের ভরতির জন্য যে অর্থের পরিমাণ, তার পরিমাণও কম করতে হবে এবং আসনও সংরক্ষণ করতে হবে। ফলে সংরক্ষিত আসনের জন্য তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হবে। কোনো শুভানুধ্যায়ী মালিক যদি ব্যবসায়িক লাভের বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দেন এবং সমাজে পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে খানিক সুযোগ করে দিলে যদি সমাজের আরও কিছু শতাংশ শিক্ষার হার বাড়বে—এইভাবে ভাবেন, তাহলে তপশিলি জাতি ও উপজাতিরাও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পায়। তপশিলি জাতি-উপজাতিদের পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টিকে নিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের ইতিবাচক ভাবতে হবে।
11. নীচের অবস্থাগুলি বিবেচনা করো। নিম্নোজ কোন্ অবস্থাতে বিশেষ কিংবা ভিন্ন আচরণ যুক্তিসংগত বলে মনে হয় ?
[a] কর্মরত মহিলাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়া উচিত।
[b] একটি বিদ্যালয়ের উচিত দু-জন দৃষ্টিগত দিব্যাঙ্গ বিদ্যার্থীর জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি ক্রয় করার নিমিত্তে অর্থ ব্যয় করা।
[c] গীতা বাস্কেট বল খেলতে দক্ষ। সুতরাং বিদ্যালয়ের উচিত একটি বাস্কেট বল কোর্ট নির্মাণ করা যাতে সে তার দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে পারে।
[d] জিৎ-এর বাবা-মা চায় সে বিদ্যালয়ে পাগড়ি পরিধান করুক এবং ইরফানের বাবা-মা চায় সে শুক্রবারে বিশেষ নামাজ বা প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করুক। সুতরাং, ক্রিকেট খেলার সময় হেলমেট পরার জন্য জিৎকে বাধ্য করা উচিত নয় এবং ইরফানের শিক্ষকের উচিত নয় শুক্রবারে অতিরিক্ত ক্লাসে অংশগ্রহণ করার জন্য তাকে বাধ্য করা।
> বিশেষ কিংবা ভিন্ন আচরণগত ব্যাখ্যা
[a] এই বক্তব্যটি ন্যায্য। একজন সদ্যজাত মায়ের অবশ্যই মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়া উচিত। সদ্যজাত শিশুর দেখাশোনা তার মা ছাড়া আর কেউই করতে পারবে না। ওই শিশুর নতুন জগতে আসার মুহূর্ত থেকে শিশু তার মাকেই ভরসা করে। শিশুর দেহ ও মনের বিকাশের জন্য তার মাকেই তার কাছে থাকতে হয়। তাই প্রতিটি মায়ের মাতৃত্বকালীন ছুটির চাহিদা ন্যায্য।
[b] শিক্ষার অধিকার সকল ছাত্রদের আছে। সকলেই শিক্ষার অধিকার ভোগ করবে। 2002 খ্রিস্টাব্দে শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী 8-14 বছর বয়স্কদের অবৈতনিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সুতরাং, এই অধিকার থেকে কোনো ছাত্রকেই বঞ্চিত করা যাবে না। তাই বলা যেতেই পারে, মাত্র দু-জন ছাত্র তথাপি তাদের দৃষ্টিহীনতার জন্য বিদ্যালয়ের উচিত তাদের পড়াশোনার সুবিধার্থে সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা।
[c] গীতা ভীষণ ভালো বাস্কেট বল খেলে, তাই স্কুলের উচিত ওর জন্য বাস্কেট বলের কোর্ট তৈরি করা, যাতে সে তার দক্ষতাকে বৃদ্ধি করতে পারে।
স্কুলের নিজস্ব কিছু নিয়ম থাকে। যা শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের পাঠক্রম ও সহপাঠক্রম। খেলাধূলার বিষয়টি সহপাঠক্রমের বিষয়। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাগ্রহণের অধিকার আছে, আর এই শিক্ষাগ্রহণ সম্পূর্ণ হয় পাঠক্রম ও সহপাঠক্রমের মধ্যদিয়ে।
কিন্তু গীতা খুব ভালো খেলে তার জন্য বিদ্যালয় যত্নবান হতেই পারে। তবে যদি সেই খরচসাপেক্ষ ব্যবস্থা স্কুলের বহু ছাত্রদেরকে সাহায্য করে তাহলে ফলপ্রসূ হয়, কিন্তু সেই ব্যবস্থা যদি শুধু গীতার জন্য হয় তাহলে ফলপ্রসূ হয় না। কারণ, গীতার জন্য নেওয়া ব্যবস্থা অন্যকে সাহায্য করে না। স্কুলের পরিকাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। তাই কোনো খরচসাপেক্ষ পরিকাঠামো প্রতি ছাত্রভিত্তিক করা সম্ভব নয়।
[d] জিৎ-এর বাবা-মা তার ছেলেকে স্কুলে পাগড়ি পরিয়ে পাঠাতে চায় এবং ইরফানকে তার বাবা-মা শুক্রবার বিকেলে নামাজ পড়াতে চায়। সুতরাং, স্কুল জিৎ-কে ক্রিকেট খেলার সময় হেলমেট পরতে জোর করবে না এবং ইরফানকেও শুক্রবার অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য আটকাবে না। ভারত হল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র । এইখানে প্রতিটি ধর্মেরই সমান কদর করা হয়, সমান শ্রদ্ধা করা হয়। কখনোই নিজের ধর্মাচারণে বাধা দেওয়া হয় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকেও ভীষণভাবে ধর্মীয় সেবা থেকে মুক্ত রাখা হয়। স্কুলকে সব সময়েই ধর্মনিরপেক্ষ রাখা হয়। অর্থাৎ, কোনো ধর্মকেই বিশেষ প্রাধান্য যেমন দেওয়া হয় না, তেমনই অশ্রদ্ধাও করা হয় না।
কিন্তু ক্রিকেট খেলার সময় মাথায় হেলমেট পরা বাধ্যতা মূলক, কারণ, এতে জীবনহানির সম্ভাবনা থাকে। তাই ধর্মের পরিবর্তে জীবনকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে স্কুল জিৎ-কে হেলমেট পরতে বলবে।
স্কুলে যেহেতু কোনো ধর্মকেই প্রাধান্য দেওয়া যায় না। তাই অতিরিক্ত ক্লাসকে বাতিল করার অর্থ প্রথমত, স্কুলের নিয়মাবলিকে লঙ্ঘন করা এবং দ্বিতীয়ত, শিক্ষা শিক্ষার্থীর বিকাশকে ত্বরান্বিত করে এবং জীবনের মানোন্নয়ন করে। আর স্কুল তার কারিগর। উপরোক্ত দুটি কারণের জন্য ইরফানকে শুক্রবারের অতিরিক্ত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে স্কুল নির্দেশ দিতে পারে।
অন্যান্য সম্ভাব্য প্রশ্নোত্তর
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 1
Class 11 Political Science mcq Chapter 3
1. সাম্যের জন্ম—
A. গ্রিসে
B. রোমে
C. ফ্রান্সে
D. ব্রিটেনে
2. আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়—
A. 1776 খ্রিস্টাব্দে
B. 1775 খ্রিস্টাব্দে
C. 1774 খ্রিস্টাব্দে
D. 1773 খ্রিস্টাব্দে
3. ফরাসি সংবিধান সভায় মানবাধিকার সম্পর্কিত ঘোষণা হয়—
A. 1790 খ্রিস্টাব্দে
B 1789 খ্রিস্টাব্দে
C. 1788 খ্রিস্টাব্দে
D. 1787 খ্রিস্টাব্দে
4. সমতা হল, ‘অসমান অংশকে সমান করার এক প্রক্রিয়া’ —কথাটি বলেছেন—
A. বার্কার
B. রুশো
C. হবস
D. হ্যারল্ড ল্যাঙ্কি
5. সোশ্যাল কনট্র্যাক্ট গ্রন্থের লেখক—
A. হবস
B. লক
C. বার্কার
D. রুশো
6. 'পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদানই হল সাম্য'—বলেছেন—
A. হ্যারল্ড ল্যাস্কি
B. মার্কস
C. গ্রিন
D. জে এস মিল
7. 'সাম্য মানে সমজাতীয়তা নয়'—বলেছেন—
A. হ্যারল্ড ল্যাস্কি
B. বার্কার
C. জেমস মিল
D হবস
8. 'স্বাভাবিক সাম্যের' কথা বলেছেন—
A. রুশো
B. লক
C. হবস
D. মার্কস
9. আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণায় যে তত্ত্ব প্রচার করা হয়, তা হল—
A. স্বাভাবিক সাম্যের
B. আইনগত সাম্যের
C. অর্থনৈতিক সাম্যের
D. রাজনৈতিক সাম্যের
10. বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতি হল সাম্য'—কথাটি বলেছেন—
A. ফ্রাঙ্ক ঠাকুরদাস
B. ল্যাস্কি
C. বার্কার
D. রুশো
11. সমাজের বুক থেকে শ্রেণিবিভাগ লোপের কথা বলেছেন—
A. ল্যাস্কি
B. মার্কস
C. পিটার্স
D বার্কার
12. বৈষম্যমূলক সমাজে কখনোই সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না'—উক্তিটি করেছেন—
A. মার্কস
B. লেনিন
C. হবস
D. লক
13. আইনগত সাম্যের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন—
A. মার্কসবাদীরা
B. ভাববাদীরা
C. উদারনৈতিক গণতান্ত্রিকরা
D. পুঁজিবাদীরা
14. 'সাম্য হল মূলত একটি আনুপাতিকতার সমস্যা'—কথাটি বলেছেন—
A. ল্যাস্কি
B. মিল
C. বার্কার
D. অ্যারিস্টটল
15. অর্থনৈতিক সাম্য হল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার'- উক্তিটি করেছেন—
A. ল্যাস্কি
B. অ্যারিস্টটল
C. বার্কার
D. গ্রিন
16. অর্থনৈতিক সাম্য হল আইনগত সাম্যের আপেক্ষিক' —কথাটি বলেছেন—
A. বার্কার
B. অ্যারিস্টট্স
C. মিল
D. মার্কস
17. অর্থনৈতিক সাম্য ছাড়া রাজনৈতিক সাম্য অর্থহীন'— কথাটি বলেছেন—
A. হ্যারল্ড ল্যাস্কি
B. গ্রিন
C. হবস
D. রুশো
18. সমান কাজের জন্য সমান মজুরিই অর্থনৈতিক সাম্যের মূল কথা—বলেছেন—
A. কার্ল মার্কস
B. হেগেল
C. অস্টিন
D. বার্কার
19. মানুষের অভাব, যোগ্যতা ও প্রয়োজনের মধ্যে যতদিন পার্থক্য থাকবে। ততদিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে না। একথা বলেছেন—
A. মার্কস
B. লেনিন
C. স্তালিন
D. ল্যাস্কি
20. সাম্য বলতে ব্যক্তির স্বতন্ত্র প্রয়োজন এবং জীবনকে সমান করে দেওয়া বোঝায় না' বলেছেন—
A. বেন ও পিটার্স
B. মার্কস
C. বার্কার
D. ল্যাস্কি
21. সাম্য হল শুরু, সমাপ্তি নয়'—বলেছেন—
A. অ্যারিস্টট্স
B. মার্কস
C. রুশো
D. বার্কার
22. শারীরিকভাবে অক্ষম পৃথিবীর বিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন—
A. স্টিফেন হকিন্স
B. আইনস্টাইন
C. আইজ্যাক নিউটন
D. সি ভি রমন
23. ইতিবাচক সাম্য বলতে প্রত্যেকের আত্মবিকাশের উপযোগী যথাযথ সুযোগসুবিধাকেই বোঝায়—বলেছেন—
A. বেন ও পিটার্স
B. ল্যাস্কি
C. বার্কার
D. মার্কস
24. সাম্য ও ন্যায় অঙ্গাঙ্গিভাবে—
A. জড়িত
B. জড়িত নয়
C. সামঞ্জস্য রক্ষা করে
D. কোনোটিই নয়
25. সাম্য একটি পরিবর্তনশীল ধারণা—মতটি হল—
A. অ্যারিস্টটলের
B. বোদাঁরের
C. লেনিনের
D. বার্কারের
26. আইন হল সার্বভৌমত্বের আদেশ—উক্তিটি করেছেন—
A. জন অস্টিন
B. প্লেটো
C. রুশো
D. লক
27. সাম্য ছাড়া স্বাধীনতার অস্তিত্বই সম্ভব নয়—বলেছেন—
A. হবস
B. রুশো
C. লক
D. ল্যাস্কি
28. সাম্যের ধারণাকে একটি 'বহুমাত্রিক ধারণা' বলে চিহ্নিত করেছেন—
A. বার্কার
B. ল্যাস্কি
C. ফ্রাঙ্ক ঠাকুরদাস
D. কোনোটিই নয়
29. সিসেরো যে-ধরনের সাম্যের প্রবক্তা ছিলেন, তা হল—
A. স্বাভাবিক সাম্য
B. সামাজিক সাম্য
C. আইনগত সাম্য
D. অর্থনৈতিক সাম্য
30. সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠাকে 'সামাজিক সাম্য' বলে অভিহিত করেছেন—
A. বার্কার
B ল্যাস্কি
C. বেণ্থাম
D. অস্টিন
31. আইন বৈধ বলেই তা মান্য করা হয় না, আইন মান্য করা হয় তার মূল্য আছে বলেই—বলেছেন—
A. আর্নেস্ট বার্কার
B. গ্রিন
C. হবস
D. জে এস মিল
32. স্বাধীনতা সমস্যার একটিমাত্র সমাধান আছে এবং তা হল সাম্য—বলেছেন—
A. ল্যাস্কি
B. ব্রাইস
C. পোলার্ড
D. বার্কার
33. ভারতের সংবিধানে আইনের চোখে সমতা সুরক্ষিত হয়েছে যে ধারায়—
A. 14নং
B. 15নং
C. 16নং
D. 17নং
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 1
Class 11 1 mark Question Answer Political Science
1. সাম্য কী ?
> সাম্য হল একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শ যা গোটা বিশ্বের মনুষ্য সমাজকে এই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করে যে, তাঁদের সকলের সৃষ্টিকর্তা একজন ভগবান ।
2. সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার আদর্শের স্লোগান কোথায় প্রথম শোনা যায় ?
> ফরাসি বিপ্লবের মূল স্লোগান ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। এই স্লোগানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয় এবং ঐক্যবদ্ধ করা হয় সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে।
3. সাম্যের ধারণার উৎপত্তি প্রথম কোথায় ঘটেছিল ?
> সাম্যের ধারণার উৎপত্তি প্রথম গ্রিস দেশে ঘটেছিল।
4.সাম্যের ধারণার উৎপত্তি হয়েছিল কখন ?
> সাম্যের ধারণার উৎপত্তি হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের সময় ।
5. সাম্যের ধারণাটি একমাত্রিক না বহুমাত্রিক ধারণা ?
> সাম্যের ধারণাটি একটি বহুমাত্রিক ধারণা।
6. সাম্যের যে-কোনো দুটি রূপ উল্লেখ করো।
> সাম্যের যে কোনো দুটি রূপ হল- [a] সামাজিক সাম্য এবং [b] আইনসম্মত সাম্য।
7. স্বাভাবিক সাম্য কী ?
> জন্ম থেকেই মানুষ স্বাধীন এবং সমান সুযোগসুবিধা পাওয়ার অধিকারী। একেই বলে স্বাভাবিক সাম্য।
8. স্বাভাবিক সাম্যের কথা প্রথম কে বলে ?
> ফরাসি দার্শনিক রুশোর কথায় এবং আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাভাবিক সাম্যের আদর্শ মূর্ত হয়ে ওঠে।
9. স্বাভাবিক সাম্যের যে-কোনো দুজন প্রবক্তার নাম করো।
> স্বাভাবিক সাম্যের দুজন প্রবক্তা হলেন সিসেরো (Cicero) ও পলিবিয়াস (Polybius)।
10. স্বাভাবিক বৈষম্য কী ?
> স্বাভাবিক বৈষম্য বলতে জন্মগতভাবে মানুষের মধ্যে যে দক্ষতা ও প্রতিভার পার্থক্য তাকেই বোঝায়। স্বাভাবিক বা প্রকৃতিদত্ত বৈষম্যকে মেনে নিতে কেউই আপত্তি করে না।
11. সামাজিক অসাম্য বা বৈষম্য বলতে কী বোঝো ?
> সামাজিক বৈষম্য হল সমাজের মধ্যে থেকে সৃষ্ট কৃত্রিম বৈষম্য। সমাজের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে থেকেই এই বৈষম্যের উৎপত্তি ঘটে।
12. রাজনৈতিক সাম্যের আদর্শ কী?
> ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই সমান— এই বিশ্বাসই হল রাজনৈতিক সাম্যের আদর্শ। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সমস্ত বিষয়ে সকলেই সমান অধিকার পেয়ে থাকে বা রাষ্ট্র সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে সাম্য প্রদান করে।
13. আইনের দৃষ্টিতে সাম্য কোন্ দেশের অনুকরণে রচিত ?
> আইনের দৃষ্টিতে সাম্য ইংল্যান্ডের অনুকরণে রচিত।
14. আইনের দৃষ্টিতে সাম্য কাকে বলে ?
>আইনের দৃষ্টিতে সাম্য বলতে বোঝায় আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান।
15. নৈতিক সাম্য—কথাটি কে বলেছেন ?
> নৈতিক সাম্য—কথাটি বলেছেন বার্কার।
16. নারীবাদ কী ?
> সমাজে নারী ও পুরুষদের মধ্যে সমান অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যে আলোচনা হয়, তাকে নারীবাদ বলে।
17. গণপ্রজাতন্ত্রী চিনে কোন ধরনের সাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে ?
> গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের মতো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিতে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
18. নেতিবাচক সাম্য কী ?
> নেতিবাচক সাম্য বলতে বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতিকে বোঝায়।
19. ইতিবাচক সাম্য বলতে কী বোঝো ?
> ইতিবাচক অর্থে সামা বলতে পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদানকে বোঝায়।
20. সাম্যের অধিকার কোন্ প্রকার অধিকার ?
> সাম্যের অধিকার হল পৌর অধিকার।
21. মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে সাম্যকে কীভাবে সঞ্চালিত করা হয়েছে ?
> সামা বলতে মার্কস ব্যক্তির স্বতন্ত্র প্রয়োজন এবং জীবনকে সমান করে দেওয়ার কথা বলেননি। সাম্য বলতে তিনি সমাজের শ্রেণিবিভাগ বিলোপের কথা বলেছেন।
22. Utopia গ্রন্থটি কার রচিত ?
> Utopia গ্রন্থটি হল টমাস মুর-এর রচিত।
23. Spirit of the Laws গ্রন্থটির লেখক কে ?
> Spirit of the Laws গ্রন্থটির লেখক হলেন মন্তেস্কু।
24. Rule of Law-এর প্রবক্তা কে ?
> Rule of Law এর প্রবক্তা অধ্যাপক এ ভি ডাইসি।
25. Democracy and Liberty গ্রন্থটির লেখক কে ?
> Democracy and Liberty গ্রন্থটির লেখক হলেন। হেনরি লেকি ।
26. City of God গ্রন্থের লেখক কে ?
> City of God গ্রন্থের লেখক হলেন সেন্ট টমাস অগাস্টাইন।
27. City of the Sun গ্রন্থটির লেখক কে ?
> City of the Sun গ্রন্থটির লেখক হলেন সমাজতন্ত্রী লেখক টোমমাসো কাম্পানোল্লা।
28. প্রিন্সিপলস অব্ সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল থিয়োরি গ্রন্থটি কার রচনা ?
> প্রিন্সিপলস অব সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল থিয়োরি গ্রন্থটি আর্নেস্ট বার্কারের রচনা।
29. কোন্ গ্রন্থে বার্কার স্বাধীনতা ও সাম্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন ?
> Principles of Social and Political Theory গ্রন্থে স্বাধীনতা ও সাম্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বার্কার আলোচনা করেছেন।
30. 'স্বাধীনতার সঙ্গে সাম্যের সামঞ্জস্যবিধান আবশ্যক' —কথাটি কার ?
> ‘স্বাধীনতার সঙ্গে সাম্যের সামঞ্জস্যবিধান আবশ্যক'- কথাটি বার্কারের।
31. ‘সাম্য অর্জনের আগ্রহ স্বাধীনতার আশাকে ব্যর্থ করে —বক্তব্যটি কার ?
> 'সাম্য অর্জনের আগ্রহ স্বাধীনতার আশাকে ব্যর্থ করে —বক্তব্যটি লর্ড অ্যাক্টন-এর।
32. 'সাম্য স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়, স্বাধীনতার স্বার্থে একান্ত প্রয়োজন'—উক্তিটি কার ?
> উক্তিটি টনির। তিনি সাম্য ও স্বাধীনতাকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
33. কে সাম্য ব্যতীত স্বাধীনতার ধারণাকে বাগাড়ম্বর বলে মন্তব্য করেছেন ?
> হবহাউস সাম্য ব্যতীত স্বাধীনতার ধারণাকে বাগাড়ম্বর বলে মন্তব্য করেছেন।
34. 'সাম্য ব্যতীত স্বাধীনতার অস্তিত্ব সম্ভব নয়।'—কথাটি কার ?
> 'সাম্য ব্যতীত স্বাধীনতার অস্তিত্ব সম্ভব নয়।'—কথাটি দার্শনিক রুশোর ।
35. “সাম্য ও স্বাধীনতাকে পরস্পরবিরোধী বলে বর্ণনা করেছেন'—এমন দুজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর নাম লেখো।
> টকভিল এবং লর্ড অ্যাক্টন 'সাম্য ও স্বাধীনতাকে পরস্পর- বিরোধী' বলে বর্ণনা করেছেন।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 2
Class 11 Political Science Question Answer 2 Mark
1. সাম্যের অর্থ কী ?
> সকলের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশসাধনের জন্য উপযুক্ত সুযোগসুবিধাই সাম্য বা সমতা। রাষ্ট্র কারোর প্রতি কোনোরূপ পক্ষপাতিত্ব না করে প্রত্যেককে সমান সুযোগসুবিধা ও অধিকার প্রদান করবে। ফলে প্রত্যেকে তাদের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশসাধনে সক্ষম হবে। অর্থাৎ, কেউ যেমন বিশেষ সুযোগসুবিধা পাবে না, ঠিক তেমনই প্রত্যেকের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা থাকবে। রাষ্ট্রে বা আইনের দৃষ্টিতে সকল ব্যক্তিই সমান। এই অর্থে সাম্য একটি আইনগত ধারণাও বটে।
2. সমতা বা সাম্যের জন্য সোচ্চার হওয়ার কয়েকটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত দাও ।
> ঊনবিংশ শতকে এশিয়া ও আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করে এবং সাম্যের আদর্শ প্রচার করে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা হয়। ফ্রান্স ও আমেরিকার স্বাধীনতা বিপ্লব হল এর উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
3. ল্যাঙ্কির ভাষায় সাম্যের সংজ্ঞা প্রদান করো।
> সাধারণভাবে সাম্য বা সমতা বলতে বোঝায় সকলেই সমান। যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় সাম্যের অর্থ বিষয়ে অভিন্নতাকে বোঝায় না। মানুষের জন্মগত এবং সহজাত যে পার্থক্য তা কখনও অস্বীকার করা যায় না। আর এই পার্থক্যহেতু মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিজনিত পার্থক্য তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা সমান সুযোগসুবিধা দাবি করতে পারে না। এই প্রসঙ্গে ল্যাস্কি সাম্যের যে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। ল্যাস্কি বলেছেন, সকলের জন্য অভিন্ন সুযোগসুবিধার অস্তিত্বকে সাম্য বলে না। সাম্য বলতে সকলের প্রতি একইরকম আচরণকে বোঝায় না। সকলের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশসাধনের জন্য উপযুক্ত সুযোগসুবিধার সমতাই হল সাম্য ।
3. ল্যাস্কির সংজ্ঞাকে ভিত্তি করে সাম্যের দুটি দিক সম্পর্কে বলো।
> ল্যাঙ্কি সাম্যের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে যে বিশেষ দুটি দিকের কথা বলেছেন, সেগুলি হল—
[a] বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতি এবং
[b] সকলকে পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদান।
প্রথমটি সাম্যের নেতিবাচক দিক এবং দ্বিতীয়টি হল সাম্যের ইতিবাচক দিক।
5. সামাজিক সাম্য বলতে কী বোঝো?
> সামাজিক সাম্য বলতে সামাজিক ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে মানুষের সমতাকে বোঝায়। যখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বংশ- মর্যাদা, অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রভৃতির ভিত্তিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য নির্ধারণ করা হয় না, তখন তাকে সামাজিক সাম্য বলে আখ্যা দেওয়া হয়। অনেকে আবার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠাকে সামাজিক সাম্য বলে থাকেন।
6. রাজনৈতিক সাম্য কী ?
> রাজনৈতিক সাম্য বলতে সরকার গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের অধিকারকে বোঝায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, অর্থ, লিঙ্গ প্রভৃতি নির্বিশেষে সকলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সরকারি চাকুরি অর্জন, সরকারের নিকট অভাব-অভিযোগ পেশ ও সরকারি কার্যের সমালোচনা করার সমান অধিকারকে রাজনৈতিক সাম্য বলা হয়। রাজনৈতিক সাম্য না থাকলে গণতন্ত্র তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
7. অর্থনৈতিক সাম্য কাকে বলে ?
> সাধারণত আয় ও সম্পত্তির অধিকারের সমতাকে অর্থনৈতিক সাম্য বলা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক সাম্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। সমান কাজের জন্য সমান বেতন প্রদানকে 'আয়ের ক্ষমতার নীতি' বলা হয়। এ ছাড়াও সকলের সমপরিমাণ সম্পদ রাখার অধিকারের ওপর অনেকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাই অর্থনৈতিক সাম্য বলতে সকলের জন্য পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধাকেও বোঝায় ।
৪. সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে সাম্য বলতে কী বোঝায় ?
> সাম্য বলতে সাধারণত সকল মানুষের প্রতিভা, দক্ষতা, উন্নতি, তাদের লক্ষ্য ইত্যাদিকে উন্নত করার জন্য একই অধিকার ও সুযোগসুবিধার প্রদানকে বোঝায়। কিন্তু ব্যক্তিভেদে সকলের একই দক্ষতা, প্রতিভা থাকে না। তাই ব্যক্তির দক্ষতা, প্রতিভার তারতম্যভেদে সুযোগসুবিধার তারতম্য থাকবে। সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে সকলে যে-যার প্রয়োজনমতো দক্ষতার ও প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে।
9. স্বাভাবিক ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে প্রধান পার্থক্যটি কী?
> স্বাভাবিক বৈষম্য বলতে বোঝায় মানুষের সঙ্গে মানুষের দৈহিক সামর্থ্য, বুদ্ধি, মেধা, গুণ, যোগ্যতা প্রভৃতির ক্ষেত্রে যে পার্থক্য। এই পার্থক্য জন্মগত, এখানে মানুষের বা সমাজের কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু সামাজিক বৈষম্য হল কৃত্রিম বৈষম্য। সমাজের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে অর্থাৎ, মানুষের দ্বারা সৃষ্ট যে বৈষম্য তাকে সামাজিক বৈষম্য বলা হয়। স্বাভাবিক বৈষম্য হল প্রকৃতদত্ত বৈষম্য। একে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু সামাজিক বৈষম্য যেহেতু সমাজ ও মানুষের দ্বারা সৃষ্ট সেহেতু এই বৈষম্যকে পরিবর্তন করা যায়।
10. সামাজিক অসাম্য বলতে কী বোঝো ?
> সামাজিক অসাম্য তৈরি হয় সমাজেই, সমাজের দ্বারাই। অনেক সময় দেখা যায়, সমাজে যারা উন্নত বুদ্ধিবৃত্তির ব্যক্তি তারাই সমাজ কর্তৃক অধিক স্বীকৃতি পায়। সমাজে যারা কায়িক পরিশ্রমের দ্বারা নিজেদের জীবিকানির্বাহ করে তাদের প্রতি রাষ্ট্রের ব্যবহার ভিন্ন হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, সমাজে কৃতী মানুষদের বিভিন্ন উপাধির দ্বারা ভূষিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্র সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষদের সঙ্গে কৃতী মানুষদের সামাজিক অসাম্য তৈরি করে।
11. আইনের চোখে সাম্য কী ?
> সংবিধানের 14 নং ধারা অনুসারে ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির 'আইনের দৃষ্টিতে সাম্য” অথবা “আইন- সমূহের দ্বারা সমভাবে সংরক্ষিত হওয়ার অধিকার'-কে অস্বীকার করতে পারবে না। এই ধারাটিতে দু-ধরনের সাম্যের কথা বলা হয়েছে[a] আইনের দৃষ্টিতে সাম্য এবং [b] আইনের সমান সংরক্ষণ।
12. সমাজে নারীদের সমতা বলতে কী বোঝো ?
অথবা, সমতা প্রসঙ্গে নারীবাদ বা Feminism বলতে কী বোঝো ?
> সমাজে যে-কোনো ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমানাধিকারই হল সমাজে নারীদের সমতা বা নারীবাদ। অন্যভাবে বললে, নারীবাদ হল একটি রাষ্ট্রতত্ত্ব যেখানে সমাজে নারী ও পুরুষের সমানাধিকার নিয়ে কথা বলে। তবে নারীবাদীদের মতে, নারী ও পুরুষদের মধ্যে বৈষম্যই সমাজে পিতৃতন্ত্রের কারণ। তাঁদের মতে, সমাজে সর্বদাই পুরুষদের গুরুত্ব নারীদের অপেক্ষা অধিক এবং পুরুষরা অধিক ক্ষমতার অধিকারীও। শারীরিক ও মানসিকভাবে সমাজে নারীদের দুর্বলতর শ্রেণি ভাবার ফলই হল পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, সেখানে নারী ও পুরুষদের মধ্যে বৈষম্যগত পার্থক্য প্রকট।
13. দাস ব্যবস্থা বলতে কী বোঝো ?
> দাস ব্যবস্থা আফ্রিকায় শুরু হয়। আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যবসায়ীরা ক্রীতদাস করে রাখার প্রক্রিয়া থেকেই ষোড়শ শতকে আফ্রিকায় আফিম ব্যাবসার সূত্রপাত। মূলত আফ্রিকায় ওই সময় কালো চামড়ার লোকেদের ক্রীতদাস করে কাজের জন্য আমেরিকায় পাঠানো হত। পঞ্চদশ- ষোড়শ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিনি, ডাল, কফি, তুলো, তামাক প্রভৃতি চাষের জন্য প্রচুর লোকজন প্রয়োজন ছিল। ওই সময় আফ্রিকার ব্যবসায়ীরা কৃষ্ণাঙ্গদের ক্রীতদাস করে আমেরিকায় পাঠানো শুরু করে এবং এইভাবে ধীরে ধীরে ক্রীতদাস প্রথা এবং ব্যাবসা গড়ে ওঠে।
14. সাম্যের সাংবিধানিক অবস্থান কী ?
> সাম্যের আদর্শ প্রচার করে বারংবারই অসাম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে সমাজ। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সর্বত্রই সাম্যের জয়গান ধ্বনিত হয়েছে। আজও সমাজে নারীর অবস্থান থেকে শুরু করে দলিতদের অবস্থান সর্বক্ষেত্রেই সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে। এই ধরনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে ভারতীয় সংবিধানের 14 থেকে 1৪নং ধারায় সাম্যের অধিকারটি স্বীকৃত হয়েছে।
15. সাংবিধানিক স্বীকৃতি কি সমাজে অসাম্য দূর করতে সক্ষম ?
> পৃথিবীর সর্বত্র, এমনকি আমাদের সমাজে এখনও সাম্যের পরিবর্তে অসাম্য বেশি নজরে আসে। যেমন—শহরে পাকা বাড়ির পাশাপাশি বস্তি এলাকাও গড়ে উঠেছে, যার সংখ্যা অধিক। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যেও বৈষম্য স্পষ্ট। আমাদের সমাজে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের পরিকাঠামোগত বৈষম্যই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
16. সাম্যের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে ল্যাস্কি কী বোঝাতে চেয়েছেন ?
> সাম্যের নেতিবাচক দিক হিসেবে ল্যাস্কি, বিশেষ সুযোগ- সুবিধার অনুপস্থিতিকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, নেতিবাচক সামা বলতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গভেদে কোনো বৈষম্য না করাকে বোঝায়। এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য করার অর্থই হল ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, সাম্য হল নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী সরকারি চাকুরির পরীক্ষায় অবতীর্ণ ও উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পাওয়া।
17. সাম্য ও সমরূপতা কি এক ?
> বার্কার-এর মতে, সমতা বা সাম্য এবং সমরূপতা এক নয়। সাম্যের উদ্দেশ্য যদি সমরূপতা (Uniformity) হয়, তাহলে সামোর উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং সেখানে। কোনোভাবেই ব্যক্তিত্বের সর্বোচ্চ বিকাশ সম্ভব নয়। বার্কারের মতে, সমরূপতাকে স্বীকার করা বা প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থ মানুষে-মানুষে যে বৈচিত্র্য আছে তাকে অস্বীকার করা। বার্কার সাম্য ও সমরূপতাকে পৃথক করতে চেয়েছেন।
18. শিক্ষার ক্ষেত্রে সাম্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ?
> সংবিধানের 29 নং ধারায় শিক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষাকে যুগ্ম তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যকে যেমন দূর করা যায়নি, ঠিক তেমনই স্কুলছুটের সমস্যাও বেড়েছে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য 21 (1) নং ধারায় 6-14 বছর বয়সি শিশুদের শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
19. অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলিতে কোন সাম্যকে অধিক গুৰুত্ব প্রদান করা হয় ?
> উল্লিখিত রাষ্ট্রগুলি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদাহরণ। সুতরাং, উক্ত রাষ্ট্রগুলিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যকে অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং অর্থনৈতিক সাম্যকে অবহেলা করা হয়।
20. আনুষ্ঠানিক সাম্য কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয় ?
> সমাজের মধ্যে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসাম্যগুলি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে সেগুলিকে যখন সংবিধান, আইনের মাধ্যমে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয় এবং যেসব চলে আসা প্রথা, রীতিনীতিগুলির মাধ্যমে এই বৈষম্যগুলি টিকেছিল সেইসব প্রথা ও রীতিনীতিকে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয় তখনই আনুষ্ঠানিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।
21. ইতিবাচক ও নেতিবাচক সাম্যের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী ?
> নেতিবাচক সাম্য বলতে বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতিকে বোঝায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্পত্তি, লিঙ্গ প্রভৃতির ভিত্তিতে কোনোরকম বৈষম্য করা যাবে না। কারণ, এইগুলির ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হল ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভার বিকাশের পথে বাধার সৃষ্টি করা। অপরদিকে, ইতিবাচক সাম্য বলতে পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদানকে বোঝায়। অর্থাৎ, প্রত্যেকের আত্মবিকাশের উপযোগী যথাযথ সুযোগসুবিধাই হল ইতিবাচক সাম্য। ইতিবাচক সাম্যের ধারণায় ব্যক্তির জীবনের ক্ষেত্রে শুরুতেই সাম্যের ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 4
Class 11 Political Science Question Answer 4 Mark
1. সাম্যের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
> সাম্যের বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
[i] বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতি,
[ii] সকলের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা,
[iii] উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান,
[iv] প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের নির্দিষ্ট পাওনাটুকু সমাজ থেকে অর্জন করার অধিকার প্রদান করে সাম্য।
2. স্বাভাবিক অসাম্য বলতে কী বোঝো ?
> অসাম্য দু-ধরনের হতে পারে। একটি স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক । অর্থাৎ, জন্ম থেকে ব্যক্তিরা যে ধরনের অসাম্যের শিকার হয়। আর এক ধরনের অসাম্য সমাজ স্বীকৃত।
[i] জন্ম থেকে যে অসাম্য থাকে, যেমন—শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা কিংবা শারীরিক বা মানসিক পার্থক্যের কারণে জন্ম থেকে যে অসাম্য তৈরি হয়।
[ii] এই ধরনের অসমতার জন্যই মানুষে মানুষে ভিন্নতা তৈরি হয় তাদের চারিত্রিক যোগ্যতার দিক থেকে, যা জন্মগত।
[iii] এই ধরনের জন্মগত পার্থক্য কোনোভাবেই পরিবর্তন সাপেক্ষ নয়।
3. সাম্যের তিনটি দিক বা মাত্রাগুলি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
> সাম্য ধারণার তিনটি দিক বা মাত্রাগুলি হল— [a] সামাজিক সাম্য, [b] অর্থনৈতিক সাম্য ও [c] রাজনৈতিক সামা। নীচে সংক্ষেপে এগুলি আলোচনা করা হল—
[a] সামাজিক সাম্য: সামাজিক সাম্য বলতে সামাজিক ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে মানুষের সমতাকে বোঝায়। যেমন— জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বংশমর্যাদা, অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রভৃতির ভিত্তিতে যখন মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য নির্ধারণ করা হয় না, তখন তাকে সামাজিক সাম্য বলা হয়। ধনতান্ত্রিক সমাজেই সামাজিক অসাম্য বা বৈষম্য ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ও ভারতে জাতপাতের ভিত্তিতে ভেদাভেদের কথা বলা যায়।
[b] অর্থনৈতিক সাম্য: সমান কাজের জন্য সমান বেতন প্রদানকে আয়ের ক্ষমতার নীতি বলা হয়। যেসব বস্তু ছাড়া জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে সেইসব বস্তুর ওপর সকলের সমানাধিকার থাকা বাঞ্ছনীয়। তা না-হলে মুষ্টিমেয় মানুষের বিলাসব্যসনের পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দুঃখদারিদ্র্য গণতান্ত্রিক তত্ত্বসর্বস্ব নীতিকথায় পর্যবসিত হয়ে পড়বে।
[c] রাজনৈতিক সাম্য: রাজনৈতিক সাম্য বলতে সরকার গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সকলের সমান অংশগ্রহণের অধিকারকে বোঝায়। জাতি, ধর্ম, বৰ্ণ, অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, লিঙ্গ প্রভৃতি নির্বিশেষে সকলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সরকারি চাকুরি অর্জন, সরকারের নিকট অভাব-অভিযোগ পেশ ও সরকারি কার্যের সমালোচনা করার সমান অধিকারকে রাজনৈতিক সাম্য বলা হয়। রাজনৈতিক সাম্য না থাকলে গণতন্ত্র তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
4. ‘স্বাভাবিক অসাম্য বরাবর অবিকৃত থেকে যায় না' -ব্যাখ্যা করো ।
> জন্মগত কারণে মানুষ যখন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মায়, তখন তিনি স্বাভাবিক কারণেই বাকিদের মতো রাষ্ট্রপ্রদত্ত সুযোগসুবিধাকে ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু,
চিত্র শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয়ের দৃষ্টান্ত
[i] বিজ্ঞানসহ চিকিৎসাবিদ্যার উন্নতিহেতু শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকেও আজ মানুষ জয় করেছে এবং বাকিদের মতো প্রায় সমান কাজই করতে সমর্থ হচ্ছে।
[ii] অন্ধ ব্যক্তিদেরও কম্পিউটার সাহায্য করে কাজ করতে।
[iii] কসমেটিক সার্জারির মাধ্যমে মানুষের সুসংগত পরিবর্তন করা সম্ভব।
সুতরাং, জন্মগত কারণে শারীরিক বৈষম্যকে উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে অনেকাংশে পরিপূর্ণ করা সম্ভব। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিকতা থেকে যায়, যেমন—বিশেষ করে মানসিক প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে।
5. সামাজিক বৈষম্য বা অসাম্যকে কীভাবে দূর করা সম্ভব ?
> নিম্নলিখিত উপায়ে সামাজিক বৈষম্য বা অসাম্যকে দূর করা যেতে পারে—
[i] সমাজে পিছিয়ে পড়া শ্রেণিদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা উচিত। ছাত্র সংরক্ষণেও সুযোগ দেওয়া উচিত।
[ii] তপশিলি জাতি, উপজাতি এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণিদের জন্য আসন সংরক্ষণের নীতি ভারতীয় সংবিধান গ্রহণ করেছে।

চিত্র। অস্পৃশ্যতার নমুনা
[iii] সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন যাতে তাদের নিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন করা সম্ভব হয়। সর্বোপরি সমাজ থেকে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ আশু প্রয়োজন। যদিও ভারতীয় সংবিধানে এই কুপ্রথা নিবারণের কথা বলা হয়েছে ।
6. রাজনৈতিক সাম্যের গুরুত্বটি আলোচনা করো।
> লর্ড ব্রাইস এবং হ্যারল্ড ল্যাস্কি, উভয়েই সাম্যের শ্রেণিবিভাজন করেছেন। উভয়েই রাজনৈতিক সাম্যের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সাম্যের গুরুত্বগুলি নিম্নরূপ—
[i] গণতন্ত্রকে সাফল্যমণ্ডিত করতে সকল নাগরিকদের সর্বজনীন ভোটাধিকার অবশ্যই কাম্য।
[ii] প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকারই হল রাজনৈতিক সাম্য।
[iii] সরকারি অফিসে মনোনয়ন বা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্যকে স্বীকার করা হয় না।
চিত্র রাজনৈতিক সাম্য
7. অর্থনৈতিক সাম্যের গুরুত্বটি আলোচনা করো।
> সমাজে বসবাস করতে গেলে প্রতিটি নাগরিকই তাদের ব্যক্তিত্বকে পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য স্বাধীনতার অধিকার ভোগ করে। এই অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রত্যেকের সঙ্গেই সমান আচরণ করে। প্রতিটি নাগরিকই পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা পেয়ে থাকেন এবং কেউই বিশেষ সুযোগ পান না। এইখানেই রাষ্ট্র সকলের মধ্যে সাম্য বজায় রাখে। কিন্তু ব্যক্তিরা সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্যের অধিকারসহ অর্থনৈতিক সাম্যও পেয়ে থাকেন।
[i] অর্থনৈতিক সাম্যকে সুনির্দিষ্ট করা হয়, যাতে সমাজে প্রত্যেকেই স্বযোগ্যতানুযায়ী নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার সুযোগ পান।
[ii] অর্থনৈতিক সাম্য সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানকে সংকুচিত করে।
[iii] অর্থনৈতিক বৈষম্য সমাজসংস্কারের পথে বাধাস্বরূপ।
[iv ] উক্ত তিনটি কারণের জন্য রাষ্ট্র সকল অধিকারসহ অর্থনৈতিক সাম্যের গুরুত্বকে অস্বীকার করতে পারে না এবং অর্থনৈতিক সাম্যকে সুনির্দিষ্ট করে।
8. অর্থনৈতিক সাম্য ছাড়া রাজনৈতিক সাম্য অর্থহীন ব্যাখ্যা করো ।
> সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য ছাড়া রাজনৈতিক সাম্য অর্থহীন। ল্যাস্কি এইজন্যই অর্থনৈতিক সাম্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত না হলে স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে পড়ে। সমাজে আয় ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে বৈষম্যের অনুপস্থিতিই হল প্রকৃত সাম্য। ল্যাক্সির মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করে। যারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাশালী তারা সহজে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে পারে বলে ল্যাস্কি মনে করেন। অর্থনৈতিক অধিকার যে সমাজে অবহেলিত সেখানে নাগরিকরা বঞ্চিত অবস্থায় দিন কাটান।

চিত্ত অর্থনৈতিক অসাম্যের নমুনা
সুতরাং, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য ছাড়া স্বাধীনতা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সামা ব্যতীত রাজনৈতিক স্বাধীনতাও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। সম্পদের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য সুযোগ- সুবিধার ক্ষেত্রেও বৈষম্যকে প্রকট করে তোলে। সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার মাধ্যমে ব্যক্তিরা নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কায়েম করে। সুতরাং, সম্পত্তির আধিপত্য না থাকলে সমাজে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজের আধিপত্য কায়েম অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই কারণে ল্যাঙ্কি সমাজে সম্পত্তির বৈষম্যকে উচ্ছেদের কথা বলেছেন, এর সঙ্গে ধনবৈষম্যের অবসান ঘটবে এবং সকলের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা নির্দিষ্ট হবে।
9. সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাম্যের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করো।
> মার্কসের মতে, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সাম্যকে যথেষ্ট প্রাধান্য দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে আয় ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে বৈষম্য দূর হয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপসাধন হয়। এইভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপসাধনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে শ্রেণিবৈষম্য বিলুপ্ত হয়। ফলে সমাজব্যবস্থায় প্রকৃত অর্থেই অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামজিক ক্ষেত্রেও সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে, শ্রেণিহীন ও শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজতান্ত্রিক বা সাম্যবাদী দেশগুলিতেই অর্থনৈতিক সাম্য পরিলক্ষিত হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তথা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রে নাগরিকদের অর্থনৈতিক অধিকার সংরক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সুতরাং একথা বলাই যায়, সাম্যের প্রকৃত রূপ পরিলক্ষিত হয় যথার্থভাবে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়।
10. উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাম্যের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করো।
> উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাম্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপটি অগ্রাধিকার পায়। এই ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সাম্য অবহেলিত হয়। এককথায়, অর্থনৈতিক সাম্যের অনুপস্থিতির মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যের অর্থ হল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই সমান, কোনো ভেদাভেদ করে না। আইনের চোখে সকলেই সমান ও আইনের দ্বারা সংরক্ষিত। পরিবার গঠন, ধর্মীয় আচরণ তথা সামাজিক ক্ষেত্রে সকলেই সমান সুযোগ পায়। নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, নির্বাচিত হওয়ার অধিকার থেকেও কেউ বঞ্চি ত হয় না। অর্থাৎ, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় উদারনৈতিক ব্যবস্থায়। উদারনৈতিক ধ্যানধারণা অনুসারে সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যের ভিত্তিতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে এই রকম সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যের উপস্থিতি এবং অর্থনৈতিক সাম্যের অনুপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
11. সাম্যের ইতিবাচক দিক সম্পর্কে ল্যাস্কি কী বলেছেন ?
> ইতিবাচক অর্থে সাম্য বা সমতা হল 'পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদান।' যদিও পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা এবং সমান সুযোগসুবিধা এই ধারণা দুটি এক নয়। কারণ, সব মানুষের প্রয়োজন ও দাবি এবং তাদের চেষ্টা সমান হয় না, ভিন্ন হয়। তাই এই ভিন্নতার কারণে তাদের আত্মবিকাশের জন্য সুযোগসুবিধার প্রয়োজনও ভিন্ন। সুতরাং, সকলের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতেই পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা রাষ্ট্র কর্তৃক ব্যক্তিরা পেয়ে থাকে। এই পরিস্থিতিকে বোঝাতে ল্যাস্কি একটি উদাহরণ ব্যবহার করেন। তিনি বলেছেন, দৌড় প্রতিযোগিতার আগে একই সরলরেখায় দাঁড়ানোর বিষয়টি। অর্থাৎ, প্রথমে সাম্যের প্রয়োজন। যেমন— সকলেই শিক্ষার সুযোগ পাবে। সেক্ষেত্রে একজন রাজমিস্ত্রি এবং একজন চিকিৎসককে তাঁদের কাজের জন্য সমান পুরস্কার প্রদান করলে সাম্যের নীতির প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভুল হবে।
12. সাম্য কি সমালোচনাযোগ্য ?
> বিশেষ সুযোগের অনুপস্থিতি এবং পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা— এই দুইয়ে মিলেই হল সামগ্রিকভাবে সাম্য। পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধার অর্থ হল যোগ্যতা ও দক্ষতার নিরিখে সামা অর্জন করা। আমরা জানি, যোগ্যতা ও দক্ষতা সকলের সমান নয়। কিন্তু সকলেই সবার মতো সবকিছু পেতে চায় যোগ্যতা বা দক্ষতা কিছু কম হওয়া সত্ত্বেও। তখনই সমাজে কম যোগ্যতা বা দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা তাদের না পাওয়া পূরণ করতে বিপরীত পন্থার অনুসরণ করতে পারে।
[i] নিজেদের কম যোগ্যতাকে পূরণ করতে পরিবারগুলি অনেক বেশি প্রতিযোগিতামুখী হয়ে ওঠে।
[ii] সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে আমলাতন্ত্রের জন্ম হয়।
[iii] অনেক সময় দেখা যায়, পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদানের জন্য অনুপ্রেরণা কমতে থাকে, ফলে উৎপাদনশীল ক্ষমতাকে বিঘ্নিত করে।
13. মার্কসীয় মতে সাম্যের ধারণাটি বলো ।
> মার্কসের মতে, রাষ্ট্র প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিত্ববিকাশের জন্য। সমান সুযোগসুবিধা প্রদান করবে। এইভাবেই সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয় যে, সমাজে অর্থবৈষম্য এবং ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান থাকলে কখনোই প্রকৃত অর্থে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়। মার্কসীয় মতে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অস্তিত্ব এবং সাম্য একসঙ্গে সমাজে থাকতে পারে না। মার্কসবাদীদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপসাধনের মাধ্যমে সমাজে প্রকৃত অর্থে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। এর জন্য উৎপাদনের উপকরণের সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার দরকার। এর থেকেই শ্রমিক-মালিক শ্রেণির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে এবং সম্পত্তির সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। এইভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মার্কসবাদীরা মনে করেন।
14. আনুষ্ঠানিক সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন কেন ?
> সমাজের মধ্যে সাম্যের একটি আদর্শনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে অসাম্য ও বিশেষ সুযোগসুবিধার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাটিকে শেষ করতে হবে। পৃথিবীর সর্বত্রই সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থনৈতিক অসাম্যের জায়গাগুলি কিছু প্রথা ও আইনগত ব্যবস্থার দ্বারা কিছু শ্রেণির মানুষের সুযোগসুবিধা ভোগের জন্য টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বেশিরভাগ অনুন্নত দেশগুলিতে দরিদ্র মানুষের ভোটাধিকার নেই, নারীদের এখনও সব ধরনের কাজের জন্য ও জীবিকার জন্য অনুমতি দেওয়া হয় না। ভারতে জাতব্যবস্থায় এখনও উঁচু জাতের মানুষেরা নীচু জাতিভুক্ত মানুষের দিয়ে নিম্নবৃত্তির কাজ করিয়ে নেন। উঁচু কাজের জন্য এইসব নীচু জাতের লোকেদের অনুমতি দেয় না, নয়তো বাধার সৃষ্টি করে। এখনও অনেক দেশেই কিছু পরিবারের লোকেরাই উচ্চপদগুলি অধিকার করে যাবতীয় সুযোগসুবিধা ভোগ করছে এবং পরিবারতন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের অসামা ও বৈষম্যের নীতিগুলিকে নিয়ন্ত্রিত করা বা সুযোগসুবিধাগুলিকে শেষ করা প্রয়োজন। সাম্যের প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সরকারের কড়া পদক্ষেপ ও আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা দরকার। যা আমাদের দেশের সংবিধানে করা হয়েছে। যেমন—সংবিধানে বলা হয়েছে যে, জাতি, বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ, বংশমর্যাদা প্রভৃতির ভিত্তিতে যে-কোনো ধরনের বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অস্পৃশ্যতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেশিরভাগ আধুনিক সংবিধান ও গণতান্ত্রিক সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে সাম্যের নীতিকে গ্রহণ করেছে।
15. বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ?
> আইনের দৃষ্টিতে সাম্য নীতির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, তা নিয়ে
চিত্র বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্য প্রতিষ্ঠা
কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রকৃত সাম্য এর মাধ্যমে কখনোই সম্ভব নয়। কখনো কখনো একই ক্ষেত্রে পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হয়। যেমন—সমাজের মধ্যে নারী, শিশুসহ শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষদের জন্য বিশেষ সুযোগসুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন আছে, না হলে প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। কারণ, বেশকিছু ক্ষেত্রে নারী, শিশু, সমাজের মধ্যে সবদিক থেকে পিছিয়ে পড়া অবহেলিত শ্রেণির মানুষদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান না করলে তারা বাকিদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারবে না, সবসময়ই পিছিয়ে থাকবে। তাই এক্ষেত্রে জীবনধারণের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সবাইকে একলাইনে দাঁড় করিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে পিছিয়ে পড়া, দুর্বল অংশকে অবশ্যই বিশেষ সুযোগসুবিধা প্রদান করতে হবে।
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 6
Class 11 Political Science Qiestion Answer 6 Marks Chapter 3
1. সাম্যের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি বর্ণনা করো।
> সাধারণত সাম্য বলতে বোঝায় সকলেই সমান, কিন্তু বাস্তবে সকলে সমান হতে পারে না ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘সাম্য’ কথাটির অর্থ হল প্রত্যেক ব্যক্তি তার বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা পাবে। এক্ষেত্রে বৈষম্য থাকবে না। বার্কারের মতে, ‘সাম্য’ কথার অর্থ সুযোগসুবিধা বা অধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার পার্থক্য সৃষ্টি না-করা।
‘সাম্য’ বলতে সকল মানুষ সমান বোঝায়, কিন্তু কোনো অর্থে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগ্যতার পার্থক্য রয়েছে। স্বাভাবিক বা প্রকৃতিগতভাবে মানুষে-মানুষে ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে সকলের অভিন্নতা বোঝাতে পার্থক্য স্বীকার করতেই হয়।
চিত্র। সাম্যের প্রতীক
সাম্যের প্রকৃতি: সাম্যের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অধ্যাপক ল্যাস্কি দুটি দিকের কথা তুলে ধরেছেন— [a] বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতি, [b] সকলের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা ।
[a] বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতি: ‘সাম্য' বলতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্পত্তি, লিঙ্গ প্রভৃতির ভিত্তিতে কোনোরকম বৈষম্য না-করাকে বোঝায়। ল্যাস্কির মতে, ‘সাম্য বলতে প্রাথমিকভাবে বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতিকে বোঝায়। এর অর্থ সমাজে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষ সুযোগসুবিধা ভোগ করতে পারবে না। নাগরিক হিসেবে সকলে সমান অধিকার ভোগ করবে।
[b] সকলের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা: ইতিবাচক অর্থে 'সাম্য' বলতে বোঝায় প্রত্যেকের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদান। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা এবং সমান সুযোগসুবিধা এক নয়। যোগ্যতা, দক্ষতা ও ক্ষমতার দিক থেকে মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য আছে। এই যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী রাষ্ট্র এমন পরিবেশ ও সুযোগসুবিধার সৃষ্টি করবে, যাতে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ প্রতিভার যথাযথ বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়।
মার্কসীয় ধারণা: মার্কসবাদীদের মতে, বৈষম্যমূলক সমাজে কখনোই সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কারণ, উৎপাদনের উপকরণের মালিকরা সমাজে যে-বিশেষ সুযোগসুবিধা পায় সাধারণ মানুষ তা পায় না। তাঁদের মতে, সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা হলেই সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তাই সাম্য বলতে মার্কস সমাজের বুক থেকে শ্রেণিবিভাজন লুপ্ত হওয়াকে বুঝিয়েছেন।
2. সাম্যের বিভিন্ন রূপগুলি লেখো।
> সাধারণভাবে সাম্য বলতে সব মানুষই সমান এমন মনে হতে পারে, তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সাম্য বলতে বোঝায় সব মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযোগী যাবতীয় সুযোগসুবিধার সমতা।
বিভিন্ন রূপ: যেহেতু সাম্যের ধারণাটি ব্যাপক সেহেতু এর কয়েকটি রূপ পরিলক্ষিত হয়। সেগুলি হল—
[i] সামাজিক সাম্য: সামাজিক সাম্য বলতে সমাজজীবনে সকলের প্রতি সমান আচরণকেই শুধু বোঝায় না, এর দ্বারা সমাজে প্রত্যেকের জন্য সুযোগসুবিধায় সাম্য বোঝায়। সমাজে যখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, জন্মস্থান এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের জন্য সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা স্বীকৃত হয়, তখন তাকে সামাজিক সাম্য বলে।
[ii] স্বাভাবিক সাম্য: স্বাভাবিক সাম্যের তত্ত্ব অনুসারে প্রতিটি মানুষ জন্ম থেকেই স্বাধীন এবং সমান সুযোগসুবিধার অধিকারী।
[iii] রাজনৈতিক সাম্য: বর্তমান গণতন্ত্রের যুগে সরকার গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সমান অংশগ্রহণের অধিকারকে রাজনৈতিক সাম্য বলে। রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার, ভোটদানের অধিকার ইত্যাদি।
চিত্র আইনের চোখে সকলে সমান
[iv] আইনের সাম্য: আইনগত সাম্যের মূলকথা বলতে সমাজের সকলেই আইনের চোখে সমান এবং আইন কর্তৃক সমাজের সকলকে সমভাবে সংরক্ষণকে বোঝায়।
[v] আন্তর্জাতিক সাম্য: প্রত্যেকটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে সমমর্যাদা দেওয়াই হল আন্তর্জাতিক সাম্যের মূলকথা। এর অর্থ হল বড়ো-ছোটো প্রত্যেকটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমান মর্যাদা ও গুরুত্বের অধিকারী। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদের 2 (1) নং ধারায় রাষ্ট্রীয় সমমর্যাদার নীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
[vi] অর্থনৈতিক সাম্য: অর্থনৈতিক সাম্য বলতে বোঝায় সব নাগরিকের আর্থিক সুযোগসুবিধা ভোগের ক্ষমতা। আর্থিক সাম্যের দ্বারা সমৃদ্ধ নাহলে অন্য সকল প্রকার সাম্য উপহাসে পরিণত হয়। কিন্তু ধনবৈষম্যমূলক সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র শ্রেণিহীন সমাজেই তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
3. সাম্য ও স্বাধীনতার সম্পর্ক আলোচনা করো।
> সাম্য বলতে বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সমতা প্রতিষ্ঠাকে বোঝায়। ল্যাস্কির মতে, 'সাম্য হল সকলের জন্য সমান সুযোগ- সুবিধার উপস্থিতি।' রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সামা বলতে মনুষ্যসৃষ্ট বৈষম্যের অবসানকে বোঝায়। সাম্য হল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রী-পুরুষ, ধনী- নির্ধন নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান সুযোগসুবিধার উপস্থিতি।
স্বাধীনতা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেউ কেউ বলেন যে, নিয়ন্ত্রণহীনতাই হল স্বাধীনতা। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, স্বাধীনতা হল ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশের সহায়ক। সাধারণভাবে বলা যায়, স্বাধীনতা হল রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত সুযোগসুবিধার সমষ্টি যা ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশের সহায়ক। স্বাধীনতা ও সাম্যের সম্পর্ক নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের অভিমতের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতা ও সাম্যের সম্পর্ককে এইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, যথা—
[a] ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের অভিমত: বিভিন্ন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দার্শনিক, যেমন—হার্বার্ট স্পেনসার, লর্ড অ্যাক্টন, লেকি, তকভিল প্রমুখ স্বাধীনতার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করতে গিয়ে স্বাধীনতা ও সাম্যকে পরস্পরবিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। অ্যাক্টন বলেছেন, 'সাম্যের আবেগ স্বাধীনতার দাবিকে মিথ্যে প্রমাণ করে। লেকি মন্তব্য করেছেন, ‘প্রায়ই দেখা যায় গণতন্ত্র স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধী, কেন-না তা শ্রেণিসমূহের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

চিত্র হার্বার্ট স্পেনসার
[b] আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অভিমত: আধুনিক রাষ্ট্র- বিজ্ঞানীগণ, যেমন—মিল, রুশো, ল্যাস্কি, বার্কার, টনি প্রমুখ সান্য ও স্বাধীনতাকে পরস্পরের পরিপূরক বলে অভিহিত করেছেন। শেষজীবনে জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছেন, 'স্বাধীনতার জন্য সুযোগের প্রয়োজন। রুশোর মতে, 'স্বাধীনতা ছাড়া সাম্য অস্তিত্বহীন। ল্যাস্কি মনে করেন, 'স্বাধীনতার জন্যই সাম্য প্রয়োজন। বার্কারের মতে, 'সাম্য কোনো বিচ্ছিন্ন নীতি নয়, স্বাধীনতা ও সৌভ্রাতৃত্বের সঙ্গে সাম্যের সহাবস্থান।
[c] মার্কসবাদীদের অভিমত: মার্কসবাদীরা স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সাম্যের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। মার্কস স্পষ্টই বলেছেন, ‘সাম্য, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সাম্য ছাড়া স্বাধীনতা বাহ্যিক থেকে যায়, কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতা হয় না।'
4. ল্যাঙ্কিকে অনুসরণ করে সাম্যের প্রকৃতি আলোচনা করো।
> হ্যারল্ড ল্যাঙ্কি নেতিবাচক ও ইতিবাচক—এই দুটি দিক থেকে সাম্যের প্রকৃতির ব্যাখ্যা করেছেন। সাধারণভাবে সামা বলতে সকলকেই সমান বোঝায়। যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় সমতার অর্থ অভিন্নতা নয়। এইখানেই সাম্যকে যথার্থভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ল্যাঙ্কি সাম্যের নেতিবাচক দিক এবং সাম্যের ইতিবাচক দিকটি তুলে ধরেছেন।
[i] নেতিবাচক অর্থে সাম্য: সাম্যের নেতিবাচক দিক হিসেবে ল্যাস্কি, বিশেষ সুযোগসুবিধার অনুপস্থিতিকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, নেতিবাচক সাম্য বলতে জাতি, বর্ণ, লিঙ্গভেদে কোনও বৈষম্য না করাকে বোঝায়। এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য করার অর্থই হল ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, সামা হল নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী সরকারি চাকুরির পরীক্ষায় বসা ও উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পাওয়া ।
[ii] ইতিবাচক দিক সম্পর্কে ল্যাস্কির মত: ইতিবাচক অর্থে সাম্য বা সমতা হল পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদান। যদিও পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা এবং সমান সুযোগসুবিধা—এই ধারণা দুটি এক নয়। কারণ, সব মানুষের প্রয়োজন ও দাবি এবং তাদের চেষ্টা সমান হয় না, ভিন্ন হয়। তাই এই ভিন্নতা তাদের আত্মবিকাশের জন্য, তাদের সুযোগসুবিধা ও প্রয়োজনও ভিন্ন। সুতরাং, সকলের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতেই পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা রাষ্ট্র কর্তৃক ব্যক্তিরা পেয়ে থাকে। এই পরিস্থিতিকে বোঝাতে ল্যাঙ্কি উদাহরণ হিসেবে দৌড় প্রতিযোগিতার আগে একই সরলরেখায় দাঁড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, প্রথমে সাম্যের প্রয়োজন। যেমন—সকলেই শিক্ষার সুযোগ পাবে। কিন্তু সকলেই সেই সুযোগকে ব্যবহার করতে পারে না। সেক্ষেত্রে একজন রাজমিস্ত্রি এবং একজন চিকিৎসককে তাঁদের কাজের জন্য সমান পুরস্কার প্রদান করলে সাম্যের নীতির প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভুল হবে।
5. সমাজে সঠিক অর্থে সাম্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ?
> বিভিন্ন ধরনের সমাজব্যবস্থায় তথা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সাম্যের রূপ বা প্রকৃতি কেমন হবে, বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছে পৃথিবীজুড়ে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ব্যক্তিগত বৈষম্যের অবলুপ্তির মাধ্যমে সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, উদারবাদীরা সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্যের ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রনৈতিক ধারার তাত্ত্বিকরা বিভিন্ন পন্থার মাধ্যমে সাম্যকে প্রতিষ্ঠার কথা বললেও সাম্যকে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে নির্দিষ্ট নীতির কথা উঠে আসেনি। সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সমাজে রাষ্ট্রকে যে ইতিবাচক পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করতে হবে—
[i] প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমাজসৃষ্ট অসাম্যকে প্রশ্রয় না দিয়ে বরং এই ধরনের অসাম্যকে নস্যাৎ করতে হবে। সমাজের কোনো বিশেষ শ্রেণি কখনোই বিশেষ ব্যবস্থার সুবিধা পাবে না। সমাজের সকল স্তরের, সকল বর্ণের, লিঙ্গের মানুষের জন্য, সুযোগসুবিধা সমান হবে এবং পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না।
[ii] নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের ন্যায়সংগত দাবি রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে। যেমন—একজন ইঞ্জিনিয়ার অবশ্যই একজন রাজমিস্ত্রি থেকে অধিক সুখস্বাচ্ছন্দ্যের অধিকারী। কারণ, দু-জনের প্রয়োজন ভিন্ন। কিন্তু রাজমিস্ত্রির মৌলিক দাবি পূরণ না করে রাষ্ট্র কখনোই ইঞ্জিনিয়ারের বিশেষ দাবি পূরণ করবে না।
[iii] দরিদ্ররা অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় যা অনুচিত, রাষ্ট্রকে সেদিকে নজর দিতে হবে।
[iv] নারীদের দুর্বল শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে তাদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, রাষ্ট্রকে সেদিকেও নজর দিতে হবে। রাষ্ট্র যদি এই ধরনের বিষয়গুলিতে নজর দেয় এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে সমাজে যথার্থ সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
6. 'নারীবাদ' বলতে কী বোঝো ? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এই মতবাদটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে ?
> নারীবাদের যথার্থ সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। নারীবাদের সংজ্ঞা নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধই শুধু নেই, নারীবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করাও যথেষ্ট কঠিন। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আলোচিত । বা বর্ণিত অন্যান্য মতবাদের মতো কোনো তাত্ত্বিক মতাদর্শের ভিত্তিতে নারীবাদ গড়ে ওঠেনি।
সাধারণভাবে, পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধ মতবাদ হিসেবে নারীবাদের বিকাশ ঘটে এমনটি বলা যায়। সমাজে নারী ও পুরুষদের অধিকারের বৈষম্য নিয়ে যারা আলোচনা করে, যারা সমাজে নারী ও পুরুষদের অধিকার সমান হওয়ার কথা বলে, তারা নারীবাদী এবং নারী ও পুরুষদের অধিকার নিয়ে আলোচনাই হল নারীবাদ। নারীবাদীদের মতে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় পুরুষদের গুরুত্ব অধিক। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী ও পুরুষদের মধ্যে চরিত্র এবং দৈহিক ক্ষমতার নিরিখে ব্যবধান বা পার্থক্য করা হয়। নারীদের শারীরিক ক্ষমতা কম হওয়ায় তাদের সমাজের দুর্বল অংশ বলে চিহ্নিত করা হয় এবং ঘরের বাইরের কাজে তাদের পুরুষদের সমান অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পার্থক্য করা হয়। কিন্তু নারীবাদীদের মতে, বাচ্চার দেখভাল কেবল মায়ের দায়িত্ব নয়, বাবারও সমান দায়িত্ব। এই কাজে পুরুষরাও সমান সাহায্য করতে পারে, যাতে নারীরাও বাইরের কাজে স্বচ্ছন্দে নিজ গুণে অংশগ্রহণ করতে পারে। নারীরাও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারে সমানভাবে।
চিত্র নারীবাদ
আধুনিক নারীবাদীদের মতে, পৃথিবীজুড়ে বহু মহিলাই চাকুরিজীবী। কিন্তু তারা গৃহস্থালির কাজও সামলান। এক্ষেত্রে নারীবাদীরা মহিলাদের ঘর এবং বাহির দু-দিক বজায় রাখার যোগ্যতাসম্পন্ন বলে ভূষিত করেন। কিন্তু নারীবাদের একটিই বক্তব্য ঘরে এবং বাইরে নারী ও পুরুষদের মধ্যে যে বৈষম্য সমাজ কর্তৃক তৈরি হয় তা সত্বর দূরীভূত হওয়া আবশ্যক।







মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন