অধিকার কী ? Rights
বিভিন্ন ধরনের অধিকারগুলি কী কী ?
অধিকারের উৎস কী ?
মানবাধিকার
রাষ্ট্র এবং ন্যায়সংগত অধিকার
অধিকারের প্রকারভেদ
অধিকার এবং দায়বদ্ধতা
অধিকার কী?
সহজ কথায়, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বা মানব সমাজের সদস্য হিসেবে ব্যক্তির দাবি বা সুযোগসুবিধাকে অধিকার বলে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় 'অধিকার' এত সরল নয়। যেমন—ল্যাস্কি বলেছেন, ‘অধিকার হল সেইসব সামাজিক অবস্থা, যার দ্বারা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিকশিত হয়।' তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বার্কার বলেছেন, রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত, প্রদত্ত ও সংরক্ষিত সর্বাধিক সুযোগসুবিধা যা মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য উপযোগী তাই হল অধিকার।
উপরিউক্ত বক্তব্য থেকে অধিকারের একটি সাধারণ গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা হল—অধিকার বলতে বোঝায় সামাজিক মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও জীবনধারণের উপযোগী কিছু নির্দিষ্ট সুযোগসুবিধা যা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত, প্রদত্ত ও সংরক্ষিত। যেমন—জীবনের অধিকার, চাকুরির অধিকার, ভোটাধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, সাম্যের অধিকার প্রভৃতি।
বিভিন্ন ধরনের অধিকারগুলি কী কী ?
সাধারণভাবে বলা যায়, অধিকার হল যার দ্বারা আমরা সমাজের মধ্যেই সকলের সঙ্গে সম্মান ও শ্রদ্ধা সহকারে জীবন অতিবাহিত করতে পারি। যেমন—রোজগার বা চাকুরি করার অধিকার। এই অধিকারের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় আমরা কেমন থাকি বা কতটা সম্মানের সঙ্গে সমাজে বসবাস করতে পারছি। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অধিকারও সুনিশ্চিত হচ্ছে। এই অধিকারের ফলে ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশসাধনের মাধ্যমে সমাজে স্বচ্ছল এবং স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করতে পারে। এ ছাড়াও, ভাব প্রয়োগের স্বাধীনতা যা আমরা নাচ, গান, নাটক, বা কোনও কিছু লিখে বা এঁকে প্রকাশ করতে পারি। সুতরাং, চাকুরি করার স্বাধীনতা এবং ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা সকলের জন্য প্রয়োজন এবং এই স্বাধীনতাগুলি সর্বজনীন। তবে ব্যক্তি এমন দাবি করবে না যা তার শরীরের জন্য হানিকর, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র কখনোই তা সমর্থন করবে না। যেমন—মদ্যপান, ধূমপান ।
অধিকারের উৎস কী?
ভগবান বা প্রকৃতিই হল অধিকারের উৎসস্থল, এমনই ভাবতেন সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের রাষ্ট্রদার্শনিকরা। প্রাকৃতিক আইন থেকে উদ্ভব অধিকারের। সুতরাং, অধিকার কোনোভাবেই কোনো রাষ্ট্র প্রদত্ত বিষয় নয়। বরং আমরা জন্মাই অধিকারগুলিকে নিয়ে। তাই স্বচ্ছন্দেই বলা যায়, অধিকারগুলি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এগুলি কেউ আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে - না। রাষ্ট্রদার্শনিকরা তিন ধরনের অধিকারের কথা বলেছেন, যথা—জীবনের অধিকার, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার—যা আমাদের জন্মগত অধিকার। এইগুলি ব্যতীত আমরা আর যে সকল অধিকার ভোগ করি তার উৎপত্তিকেন্দ্র হল এই তিনটি মূল অধিকার। সুতরাং, আমরা যে প্রাকৃতিক অধিকার ভোগ করি তা দেশের শাসকের স্বৈরাচারিতাকে রোধ করে এবং অধিকার ব্যক্তিস্বাধীনতার রক্ষাকবচ।
সাম্প্রতিককালে, প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অধিকার যাকে ভগবান প্রদত্ত অধিকার বলে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ভাবা হত, তা এখন মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য। তাই প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অধিকারকে বর্তমানে মানবিক অধিকার নামে আখ্যায়িত করা হয়। মানবিক অধিকার কথাটি বা শব্দটি ব্যবহার করা হয় কারণ, সকল ব্যক্তিই মনুষ্য প্রজাতি, যারা প্রত্যেকেই একে অপরের থেকে পৃথক এবং স্বতন্ত্রতাসম্পন্ন। তা সত্ত্বেও প্রত্যেকেই সমাজের চোখে সমান। প্রত্যেকেই সমান অধিকার ভোগ করার অধিকারী। বিভিন্ন বর্ণ তাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে অধিকার হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা দেয়। সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতেই পারে, কিন্তু শিক্ষার অধিকারকে সমস্ত ছাত্রদের মধ্যে বিস্তার ঘটনোর গুরুদায়িত্ব একমাত্র রাষ্ট্রের।
তবে রাষ্ট্রের সমাজের প্রতি বা নাগরিকদের প্রতি কি করণীয়, কেবল অধিকার তাই নিয়েই গড়ে ওঠে না, রাষ্ট্র কী করবে না, অধিকার সে কথাও বলে। যেমন—কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতারের সঠিক কারণ লিখিতভাবে না জানিয়ে গ্রেফতার করতে পারবে না। ঠিক এইভাবে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার ও তার পবিত্রতাকে বিনষ্ট করতে পারবে না ।
মানবাধিকার
শুধুমাত্র মানুষ হিসেবে পূর্বনির্ধারিত কোনো যোগ্যতা ছাড়াই যে অধিকার ভোগ করা যায় তাকে মানবাধিকার বলে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ দুর্গাদাস বসু বলেছেন, মানবাধিকার হল সেইসব অধিকার যেগুলি সব মানুষ মানব পরিবারের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্র ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভোগ করে।
1948 খ্রিস্টাব্দে, 10 ডিসেম্বর জাতিপুঞ্জের (UNO) সাধারণ সভায় গৃহীত মানবাধিকারের বিশ্বজনীন ঘোষণার পর থেকে সারা বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্র মানবাধিকার রক্ষার বিভিন্ন আইন তৈরি করে।
1993 খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার মানবাধিকার আইন তৈরি করে। এর নাম 'মানবাধিকার সংরক্ষণ আইন 1993'। এই আইনে মানবাধিকারের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা হল, মানবাধিকার বলতে সংবিধান কর্তৃক সংরক্ষিত অথবা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারপত্রে উল্লিখিত এবং আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, সমতা ও মর্যাদা সংক্রান্ত অধিকারসমূহকে বোঝায়।
রাষ্ট্র এবং ন্যায়সংগত অধিকার
সকল অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। নাগরিক এই অধিকার তখনই ভোগ করতে পারে যখন অধিকারগুলি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়। রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে অধিকারগুলি সংরক্ষিত করে। সমাজের জন্য এবং ব্যক্তি মানুষের জন্য যা ইতিবাচক রাষ্ট্র নাগরিকের সেই দাবিকেই সংরক্ষণ করে। কিন্তু যা সমাজের জন্য ক্ষতিকারক সেই দাবিকে সংরক্ষণ যেমন রাষ্ট্র করবে না, অন্যদিকে রাষ্ট্র মানুষের বা সমাজের ক্ষতিসাধন করছে এমন কোনো রীতি আইনের মাধ্যমে নস্যাৎ করতে পারে। যেমন—অস্পৃশ্যতা নীতি। সুতরাং, নাগরিকরা যে অধিকারগুলি ভোগ করে তা আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা পাওয়ায় তার মূল্যবৃদ্ধি হয় বলাই বাহুল্য।
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, অধিকার ও আইন পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। আইন ছাড়া অধিকার মূল্যহীন। আবার অধিকারের মধ্যে আইনের অস্তিত্বের জন্য এবং অধিকারকে যুগোপযোগী ও সমাজের প্রতি ইতিবাচক রাখতে অধিকার সংকোচন ও সম্প্রসারণশীল। তবে, আইন ছাড়া অধিকার অস্তিত্বহীন হলেও একথা ভুলে গেলে চলবে না অধিকার আসলে রাষ্ট্রের যে নাগরিকদের দাবি। যেমন—নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি দাবি কেউ-ই যেন শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। এই দাবিকে রাষ্ট্র বিবেচনা করে।
অধিকারের প্রকারভেদ
সাধারণভাবে মানুষ যে সমস্ত অধিকারগুলি ভোগ করে, তাকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়, যথা—[a] নৈতিক অধিকার, [b] আইনগত অধিকার।
[a] নৈতিক অধিকার: সমাজের ন্যায়নীতিবোধ ও বিবেকের দ্বারা সমর্থিত পারস্পরিক দাবিই হল নৈতিক অধিকার। এই অধিকারগুলি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত নয়; তাই অধিকারগুলি ভঙ্গ করলে রাষ্ট্র কোনোরূপ শাস্তি দিতে পারে না। কেবল বিবেকের দংশন ও সামাজিক নিন্দা সহ্য করতে হয়।
[b] আইনগত অধিকার: রাষ্ট্র কর্তৃক আইনের মাধ্যমে স্বীকৃত ও সংরক্ষিত অধিকারকে আইনগত অধিকার বলা হয়। আইনগত অধিকারকে চার ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- [i] পৌর অধিকার, [ii] সামাজিক অধিকার, [iii] রাজনৈতিক অধিকার, [iv] অর্থনৈতিক অধিকার।
[i] পৌর অধিকার: যে-সকল সুযোগসুবিধা ছাড়া মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে সভ্য জীবনযাপন ও ব্যক্তি- সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে না, সেগুলিকে পৌর অধিকার বলে । পৌর অধিকারের মধ্যে জীবনের অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, ধর্মের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, পরিবার গঠনের অধিকার, সাম্যের অধিকার, চুক্তির অধিকার প্রভৃতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
[ii] সামাজিক অধিকার: নাগরিকদের সামাজিক জীবনকে সুন্দর করে তোলার জন্য যে-সমস্ত সামাজিক সুযোগসুবিধাগুলি একান্ত অপরিহার্য, সেগুলিকে সামাজিক অধিকার বলে। সামাজিক অধিকারের মধ্যে শিক্ষার অধিকার, সংস্কৃতির অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার, সুস্থ পরিবেশে বসবাস করার অধিকার, সাম্যের অধিকার ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। শিক্ষার অধিকারের মধ্যে মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষালাভের অধিকার অন্যতম। সেইসঙ্গে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি-নির্ভর জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান গুরুত্বপূর্ণ মানা হয় ।
[iii] রাজনৈতিক অধিকার: নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধাকেই রাজনৈতিক অধিকার বলে। যেমন—ভোটাধিকার, নির্বাচিত হওয়ার অধিকার, যোগ্যতা অনুসারে সরকারি চাকুরি লাভের অধিকার, দলগঠনের অধিকার, সরকারের সমালোচনার অধিকার, বিদ্রোহের অধিকার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
[iv] অর্থনৈতিক অধিকার: যে-সমস্ত অধিকার মানুষের জীবনকে অভাব, অনটন ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দিয়ে সুখস্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নিরাপদ করে। তোলে, সেগুলিকে অর্থনৈতিক অধিকার বলে। যেমন—কর্মের অধিকার, উপযুক্ত মজুরির অধিকার, বিশ্রামের অধিকার, বৃদ্ধ ও অক্ষম অবস্থায় রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার, ইউনিয়ন করার অধিকার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
অধিকার এবং দায়বদ্ধতা
মানুষ ও নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক ব্যক্তির সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি, মানবতার প্রতি কিছু দায়দায়িত্ব থাকে, এই দায়দায়িত্ব পালন করাকেই দায়বদ্ধতা বলে। দায়বদ্ধতা দু-ধরনের যথা—[a] নৈতিক দায়বদ্ধতা ও [b] আইনগত দায়বদ্ধতা।
অধিকার ও দায়বদ্ধতা এই দুটি বিষয় পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বা একই মুদ্রার দুটি দিক এমনও বলা যেতে পারে। সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি, অধিকারের মধ্যেই দায়বদ্ধতা নিহিত। রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ যদি অধিকার হয় ঠিক তেমনভাবেই দায়বদ্ধতা হল সমাজের ওপর রাষ্ট্রের দ্বারা আরোপিত ব্যক্তির দায়িত্ববোধ। যেমন—
রাষ্ট্র ও নাগরিক একে অপরের প্রতি
আমরা সমাজে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার অধিকারী। রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আমাদের পরিবেশকে সুস্থ, স্বাস্থ্যকর, দূষণমুক্ত করা। ঠিক এমনইভাবে রাষ্ট্রের দ্বারা আমাদের ওপর দায়িত্বও বর্তায় নিজেদের পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে। যেমন—গাছ না-কাটা, বৃক্ষরোপণ, ওজন স্তরকে রক্ষা করতে আমাদেরও যত্নবান হওয়া ইত্যাদি।
নাগরিকদের প্রতি নাগরিকরা
রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে অধিকার ও দায়বদ্ধতার যে সম্পর্ক রয়েছে, ঠিক তেমনই প্রত্যেক নাগরিকেরও একে অপরের প্রতি এমনই সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, অন্যের অধিকার ভোগের স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো। আমি কেমন পোশাক পরব, কী খাব বা কীভাবে বসবাস করব এই বিষয়ে কেউ হস্তক্ষেপ করবে না এমনটা যদি আমার চাওয়া হয়, অন্যদিকে, অন্যের পছন্দ বা অপছন্দের প্রতি আমারও সম্মান জানানো বা দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। সংক্ষেপে, আমি অধিকার ভোগ করব, অন্যের দায়িত্ব তাকে সম্মান জানানো। ঠিক তেমনই অন্যেরা অধিকার ভোগ করবে, আমার দায়িত্ব তাদের সম্মান জানানো।
ভাব প্রকাশের অধিকার ও দায়বদ্ধতা
আমি নাগরিক হিসেবে বাক ও ভাব প্রকাশের অধিকার ভোগ করি। কিন্তু এমন কোনো কুরুচিপূর্ণ কথা বলে সমাজকে দূষিত করব না, এটি আমার সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। বা ছবি তোলার অধিকার আছে কিন্তু এমন ছবি তুলব না যাতে কোনও ব্যক্তির সম্মানহানি হয় বা ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ হয়।
অধিকারের সীমাবদ্ধতার প্রতি নাগরিকদের সচেতনতা
রাষ্ট্র কর্তৃক আমরা কিছু অধিকার ভোগ করতে পারি, কিন্তু সব অধিকারেই কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, সেইগুলির প্রতি সচেতন হওয়া আমাদের দায়িত্ব। যেমন—আমাদের সভা ও সমিতি করার অধিকার আছে, কিন্তু সভা বা সমিতির মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচারণ করতে পারি না বা করব না—এই বিষয়ে সজাগ থাকা আমাদের দায়িত্ব বা কর্তব্য। তেমনই, সভা সমিতিতে আমি যেতে পারি বা আমার অবাধ যাতায়াতের অধিকার আছে কিন্তু আমি কোনোভাবে আগ্নেয়াস্ত্র বহণ করব না, যা আমার দায়িত্ব বা কর্তব্য।
পরিশেষে বলা যেতে পারে, রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়েরই উচিত একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা চ্যুত না হওয়া। রাষ্ট্রীয় আইন এবং মৌলিক অধিকার উভয় বিষয়েই নাগরিকদের উচিত সজাগ এবং সচেতন থাকা। রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন করা যেমন নাগরিকের উচিত নয়, ঠিক তেমনই রাষ্ট্রেরও নাগরিকদের অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। নাগরিকও যেমন দেশদ্রোহী হয়ে সমাজের বিপদের কারণ হয়ে উঠবে না, পাশাপাশি রাষ্ট্রও বিনা দোষে বা বিনা যুক্তিতে নাগরিককে গ্রেফতার করে তার অপমান করবে না।
অনুশীলনীর প্রশ্নোত্তর
1. অধিকার বলতে কী বোঝায় ? প্রত্যেকের নিকট অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ ? কীসের ভিত্তিতে মানুষের বিভিন্ন দাবি দাওয়াগুলি অধিকারে পরিণত হয় ?
অধিকার বলতে কোনো কিছু বৈধ ও যুক্তিসম্মত দাবিকে বোঝায়। এই বৈধ ও যুক্তিসম্মত দাবিগুলি একজন নাগরিক, একজন ব্যক্তি ও সামাজিক প্রাণী হিসেবে প্রয়োজন। যাতে আমরা আমাদের ব্যক্তিসত্তার প্রকৃত বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হই এবং এই ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় দাবিগুলি অবশ্যই সমাজ স্বীকৃত হবে।
একজন ব্যক্তি হিসেবে আমরা প্রত্যেকে যেন সমাজের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারি সেই কারণেই প্রত্যেকের নিকট অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অধিকার এমন একটি পরিবেশের সৃষ্টি করে যেখানে সমাজবদ্ধ মানুষের যৌথ জীবনযাত্রা যেন আত্মসম্মানবোধ ও মর্যাদার সঙ্গে চলে। যেমন—জীবিকা অর্জনের অধিকার হল সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাত্রাকে উন্নত স্তরে নিয়ে যাওয়া। আবার, মানুষের প্রয়োজনীয় শর্ত যেগুলি একজনের জীবনযাত্রাকে স্বচ্ছন্দে অতিবাহিত করতে এবং তার প্রতিভা ও উৎসাহগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।
মানুষের জীবনযাত্রাকে উন্নতমানের তথা ভালো থাকতে সাহায্য করে অধিকারগুলি। অধিকারগুলি ব্যক্তিকে তাদের দক্ষতা ও প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে থাকে। যেমন—শিক্ষা ব্যক্তির জীবনে যুক্তিবোধসম্পন্ন করে তোলে যা মানুষের জীবনে দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে থাকে। তবে কোনো কার্যকলাপ, যেটি ক্ষতিকারক এবং আমাদের সুস্বাস্থ্যের পক্ষেও অন্তরায়, তাকে আমরা অধিকারের দাবির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করব না।
2. কীসের ভিত্তিতে কতগুলি অধিকারকে বিশ্বজনীন অধিকার বলে মনে করা হয় ?
সর্বজনীন অধিকার বলতে সেইসব অধিকারকে বোঝায় যেগুলির আবেদন বিশ্বব্যাপী। এই অধিকারগুলির সীমারেখা নেই। মানুষ জন্মের সময় এই অধিকারগুলি নিয়ে জন্মায়। এই অধিকার- গুলিকে মানুষ বা সমাজের দ্বারা অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। এই অধিকারগুলির কোনো একটির অভাব মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশে বা জীবনধারণের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এই অধিকারগুলি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং কেউই এগুলিকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে না। এই যুক্তিতেই এই অধিকারগুলি সর্বজনীন অধিকারের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষের তিনটি প্রকৃতিদত্ত অধিকার হল জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার। বাকি সমস্ত অধিকারগুলি এই তিনটি অধিকার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এগুলি আমরা জন্মের সময় সঙ্গে নিয়েই জন্মাই। এই ধারণাটি খুবই শক্তিশালী ধারণা কারণ এগুলিকে কোনো সংগঠন বা রাষ্ট্র আমাদের ভোগ করা থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। এগুলি মানুষ জন্মের সময় প্রকৃতির কাছ থেকে পেয়ে থাকে।
3. বর্তমানে ভারতবর্ষে যে-সকল নিত্যনতুন দাবি ও অধিকার সামনে এসেছে সেগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। উদাহরণস্বরূপ—আদিবাসীদের জীবন, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি রক্ষা করার অধিকার, শিশুদের অধিকার বিশেষ করে বেগার শিশু-শ্রমিকের অধিকার।
বর্তমানে আমাদের দেশে যেসব নতুন অধিকারগুলি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উঠেছে, সেগুলি হল—
[i] উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষদের অধিকার: সাধারণত উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষ বা সেই প্রাচীনকাল থেকেই জমি ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তারা চায় না তাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় এই উপাদানগুলিতে আধুনিকীকরণের নাম করে কেউ যেন হস্তক্ষেপ না করে। সুতরাং, তাদের দাবিগুলি যথেষ্ট যুক্তিসংগত এবং একই সঙ্গে এইসব মানুষদের সম্মানজনক ও সুনিশ্চিত জীবন- ধারণের জন্য প্রয়োজন।
[ii] বলপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে শিশুদের অধিকার: শিশুরা হল দেশের ভবিষ্যৎ। সুতরাং, শিশুদের শৈশব যাতে সুরক্ষিত থাকে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। রাষ্ট্রের উচিত যে-কোনো ধরনের বলপূর্বক তথা সাধারণ শিশুশ্রম বিরোধী আইন তৈরি করা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাতে শিশুরা যে-কোনো ধরনের বলপূর্বক শ্রম ও শোষণ থেকে মুক্তি পায়।
[iii] শিক্ষার অধিকার: প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করার অধিকার আছে। রাষ্ট্রের উচিত প্রতিটি শিশুকে তার ন্যূনতম প্রাথমিক শিক্ষাপ্রদান করা যাতে তারা তাদের দক্ষতা অনুযায়ী তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।
4. রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো। প্রত্যেক ধরনের অধিকারের উদাহরণ দাও।
সাধারণত অধিকার বলতে কোনো কিছু দাবি করাকে বোঝায়। তবে অধিকার বলতে সব মানুষের সম্ভাব্য সর্বাধিক পরিমাপ ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযোগী সেইসব প্রয়োজনীয় শর্তগুলিকে বোঝায়, যেগুলি রাষ্ট্রের দ্বারা স্বীকৃত ও রক্ষিত হয়। অধিকারের বিভিন্ন বিভাজনের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার। এ ছাড়াও বর্তমানে আর একটি অধিকারের আবির্ভাব ঘটেছে যাকে সাংস্কৃতিক অধিকার বলা হয়ে থাকে।
রাজনৈতিক অধিকার বলতে রাষ্ট্রীয় কার্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকে বোঝায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই হল সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং, জনগণের রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি ছাড়া উপযুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন অসম্ভব। রাজনৈতিক অধিকারগুলির মধ্যে ভোটদানের অধিকার, নির্বাচিত হওয়ার অধিকার, সরকারি চাকুরিলাভের অধিকার, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার পড়ে। অর্থনৈতিক অধিকার হল সেইসব অধিকার, যেগুলি অভাব-অনটন ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষের জীবনকে সুখস্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নিরাপদ করে তোলে। অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত না-হলে সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমশ বেড়েই চলে। এই অধিকারটি না থাকলে ব্যক্তি তার ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে না। সুতরাং, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের যথার্থ রূপদানের প্রয়োজনে অর্থনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি একান্ত প্রয়োজন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অধিকার হল—কর্মের অধিকার, উপযুক্ত ে পারিশ্রমিকের অধিকার, বিশ্রামের অধিকার ইত্যাদি। এ ছাড়াও বর্তমানে নাগরিকদের সাংস্কৃতিক অধিকারটির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অধিকারটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রতিটি ভাষাভাষি মানুষের নিজস্ব কৃষ্টি ও ঐতিহ্য আছে । সেগুলিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। প্রতিটি নাগরিক যাতে নিজ নিজ প্রতিভা অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা করতে পারে তার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
5. অধিকার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর কতগুলি সীমাবদ্ধতা আরোপ করে—উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো।
অধিকার হল সমাজজীবনের সেই শর্ত, যেগুলি ছাড়া ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে না। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর অধিকার কতকগুলি সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। অধিকার রাষ্ট্রের দ্বারা ও রাষ্ট্রীয় আইনের দ্বারা সংরক্ষিত হয়। অধিকার বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রের ওপর আনুগত্যের জায়গা রাখে। মৌলিক অধিকারগুলিকে কার্যকর ও প্রয়োগ করা সরকারের আবশ্যিক কাজ। অধিকারগুলি সরকারকে তার কাজগুলি করতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। যেমন—সংবিধান কোনো নাগরিককে তার জাতি, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ, ভাষার ভিত্তিতে অন্য নাগরিকদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে নিষিদ্ধ করেছে। চাকুরিতে নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে। স্বাধীনতার অধিকার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে অনেকটাই সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল প্রতিটি ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। রাষ্ট্রের ক্ষমতা নেই কোনো ব্যক্তিকে তার জীবনের ও স্বাধীনতার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। রাষ্ট্র কোনোভাবেই তার নাগরিকদের আইনের দৃষ্টিতে সাম্য ও আইনের দ্বারা সমভাবে সংরক্ষিত হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। আবার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার হল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর অপর একটি সীমাবদ্ধতা। রাষ্ট্র ধর্মীয় ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়াও, স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকারও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত কার্যাবলি, এবং উৎসভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
1. সাম্প্রতিককালে সংবাদপত্র গুলিতে প্রকাশিত মানুষের বিভিন্ন ধরনের অধিকারের প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন গণ- অন্দোলনের সংবাদগুলি সংগৃহীত করে একটি তালিকা প্রস্তুত করো।
ইতিহাস সাক্ষী, বহু মানুষ একত্রিত হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে বারংবার। কখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, কখনও বা নিজের অধিকার বুঝে নিতে, বারংবার সাধারণ মানুষ এমন প্রতিবাদমুখী হয়েছে। সমাজ বলেছে, ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। ভারতবর্ষ ও এমন বহু আন্দোলনের সাক্ষী। যেমন—1903 খ্রিস্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ থেকে 1930 খ্রিস্টাব্দের সত্যাগ্রহ আন্দোলন যা একটি জাতিকে পুনর্গঠন করে।
2015 খ্রিস্টাব্দের 7 জানুয়ারি ফ্রান্সের একটি বিদ্রুপাত্মক খবরের কাগজের অফিসে অত্যন্ত নৃশংসভাবে 12 জনকে হত্যা করা হয়। বাকস্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী এমন ঘটনা। বাক্ ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে ফ্রান্সের রাস্তায় অসংখ্য মানুষের ঢল নামে ওই দিন। প্রত্যেকের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড যাতে লেখা—“I am Charlie” অর্থাৎ ওই দিন প্রতিটি মানুষ নিজেকে চার্লি বলে এই প্রমাণ করতে চায় তাদেরও হত্যা করা হোক, কারণ, তারা সকলেই চার্লি। টুইটারেও এই ঘটনার প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এত পরিমাণ Hashtag ব্যবহার হয় যা টুইটারের ইতিহাসে প্রথম। ঘটনার প্রভাব ভারতেও পড়ে। সাধারণ মানুষ আন্দোলনের জোয়ারে গা ভাসায়, যদিও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলি ঠিক সেইভাবে এগিয়ে আসেনি বিপ্লবে।
লোকপাল বিল নিয়ে 2011 খ্রিস্টাব্দে আন্না হাজারে আন্দোলনে নামেন। দুর্নীতি বিরোধী কর্মী আন্না হাজারে নয়া দিল্লির যন্ত্রর মন্তরে আন্দোলন শুরু করেন। এই বিলের বিরুদ্ধে গোটা দেশ ওইদিন আন্নার পাশে দাঁড়িয়েছিল। এই আন্দোলন শেষপর্যন্ত কৃষিমন্ত্রী শরদ পাওয়ারের ইস্তফা অবধি গড়ায়। শরদ পাওয়ার =) | লোকপাল বিলকে পুনঃসমীক্ষা করার প্রস্তাব দেন।
এই সকল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায় যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণ যখন একজোট হয়ে প্রতিবাদে সামিল হয় তখন তা ঠিক কতটা শক্তিশালী হয়।
2012-র নির্ভয়া আন্দোলন: এই ঘটনা একদিকে যেমন । আবার প্রমাণ করে রাতের দিল্লি আজও মহিলাদের জন্য নিরাপদ নয়, ঠিক তেমনই গণতন্ত্র সোচ্চার হলে কী হয় তাও দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায় নিৰ্ভয়া কাণ্ড। 1012 খ্রিস্টাব্দের 16 ডিসেম্বর দিল্লির রাস্তায় গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে 23 বছরের যুবতীর সঙ্গে। বেসরকারি বাসে অকথ্য নির্যাতন এবং গণধর্ষণের শিকার হন তিনি। সঙ্গে তাঁর বন্ধুকেও যথেষ্ট মারধর করা হয়। মেয়েটির পরিস্থিতি এত গুরুতর হয় যে, তাকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু মেয়েটিকে বাঁচানো যায়নি।
এই ঘটনা গোটা দেশকে বাকরুদ্ধ করে, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর যারা দোষী, তাদের শাস্তি হয় এবং সেইসময় সামগ্রিকভাবে গোটা দেশের তীব্র প্রতিবাদ, ভর্ৎসনা, নিন্দা, আন্দোলন গড়ে ওঠে যা সরকারকে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করে।
2017 খ্রিস্টাব্দে তামিলনাড়ুর সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত একটি ক্রীড়া জালিকাটুকে কেন্দ্র করে তামিলনাড়ু উত্তাল হয়। এই খেলায় ষাঁড়ের ব্যবহার হয়। PETA আইন অনুযায়ী, কোনো পশুকে খেলার কাজে ব্যবহার করা যাবে না। PETA আইন হল প্রাণীর অধিকার সংরক্ষণ আইন বা, পশু ও প্রাণী এবং পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ক আইন। এই আইন অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর জালিকট খেলাটি PETA আইনকে অস্বীকার করছে। তাই সুপ্রিমকোর্ট এই আইনটি বাতিল করেছিল। ঘটনাটি 2017 খ্রিস্টাব্দের। কিন্তু তামিলনাডুবাসী এই আইন মেনে নেয়নি। তাদের বক্তব্য ছিল জালিকট্রু খেলাটি তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। তাই খেলাটি রদ করা যাবে না। তাই নিয়ে তারা দীর্ঘ বিক্ষোভ করেন। তার ফলস্বরূপ, সুপ্রিমকোর্টের রদ ওঠে। পরবর্তীকালে তামিলনাড়ু সরকার ওই ক্রীড়াটিকে আইন সিদ্ধ করে দেয়।
কাবেরী নদীর জলবণ্টনকে নিয়ে যে কাজিয়া দীর্ঘদিন ধরে। চলছে, তাকে নিয়েই কাবেরী ম্যানেজমেন্ট বোর্ড-এর তীব্র বিরোধিতা করে তামিলনাড়ু যা, গোটা ভারত সাক্ষী আছে। তামিলনাড়ুর এই আন্দোলন ইতিহাসের বহু আন্দোলনকে মনে করিয়ে দেয়। প্রমাণ করে গণতন্ত্র একত্রিত হলে তার জোর কতখানি হয়।
2018 খ্রিস্টাব্দে তীব্র প্রতিবাদ হয়। জলবণ্টনের ফলে নদীর গতিপথের যে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাতে তামিলনাড়ুর মানুষ ক্ষুদ্ধ হয় এবং ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের তীব্র বিরোধিতা করে। এই বিরোধিতার সঠিক সমাধান আজও সম্ভব হয়নি।
উপরিউক্ত ঘটনাগুলি বারংবার প্রমাণ করে গোটা বিশ্বেই, মানুষ যদি একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ করে তাতে আইন, প্রশাসনিক নীতি, সামাজিক পরিস্থিতি বদলাতে বাধ্য।
2. বিগত কয়েকদিনের দৈনিক সংবাদপত্রগুলি পাঠ করো। এবং এটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করো কোথাও কোনো অধিকার হননের ঘটনা ঘটেছে কিনা। এরকম ক্ষেত্রে সরকার এবং নাগরিক সমাজের কী করা উচিত ?
2018, 18 জুলাই: কেরলের মন্দির সবরীমালা। এই মন্দিরটিতে সারা বছর প্রচুর পরিমাণ ভক্তের সমাগম হয়। এটি ভারতের একটি দ্রষ্টব্য বিখ্যাত মন্দির। লক্ষাধিক মহিলারাও মন্দির পরিদর্শনে আসেন। কিন্তু মন্দিরের ব্রাহ্মণকূল মহিলাদের মন্দিরে প্রবেশ নিয়ে বাধা দেন। এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় স্বভাবতই হয় বিরোধিতা। ভারতে এমন কোনো মন্দির নেই যেখানে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। কিন্তু সবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ নিয়ে এই বিরোধিতা গোটা সমাজের চোখে আসে।
এখন প্রশ্ন হল, এই বিরোধিতা কতটা ন্যায়সংগত ও কতটা আইনসংগত? ভারতীয় সংবিধানের 25 থেকে 28নং ধারায় ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারটি লিপিবদ্ধ আছে। সেই অনুযায়ী, সমাজের সকল স্তরের মানুষ, যেকোনো লিঙ্গের মানুষ তার পছন্দমতো ধর্মের সেবা করতে পারবে।
সুতরাং, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের নিরিখে কোনো মন্দিরে প্রবেশ করে ধর্মের সেবা করার পথে একজন পুরুষ এবং একজন নারীর সমানাধিকার। তাহলে, সবরীমালা মন্দিরে একজন নারীর প্রবেশের পথে সমাজের একাংশ বাধা হতে পারে না ।
সুপ্রিমকোর্টে মামলায় শুনানি হয় এবং যথেষ্ট বিতর্কের পর সবরীমালা মন্দিরের মহিলাদের প্রবেশ তাদের মৌলিক অধিকার, তাই তাদের বাধা দেওয়া যাবে না—সুপ্রিমকোর্ট এই রায় দেয়। এই রায়ের পর অবশেষে সবরীমালা মন্দিরের দরজা মহিলাদের জন্য খুলে যায়।
3. সাংস্কৃতিক অধিকার বলতে কখনোই এটি বোঝায় না যে, কোনো ব্যক্তি অন্য ধর্ম সম্প্রদায় বা সাংস্কৃতিক বিন্যাসে আঘাত করে কোনো ছায়াছবি নির্মাণ করতে পারে।
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকার [a সকলেই ভোগ করার অধিকারী যা সংবিধান স্বীকৃত। সাংস্কৃতিক অধিকারের মধ্যে চলচ্চিত্র বানানোর অধিকার যেমন বর্তায়, ঠিক তেমনই এই চলচ্চিত্র বানানোর স্বাধীনতা ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতারও একটি দিক। ভাব ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমে যে কেউ নিজের ভাবপ্রকাশ করতে পারে, আর ভাবপ্রকাশের ধরন বিভিন্ন হতে পারে। যেমন—সংবাদপত্র, রেডিয়ো, টেলিভিশন এই তিন ধরনের মূল গণমাধ্যমের মাধ্যমে ভাবপ্রকাশ করা যেতে পারে, আবার, গান, কবিতা ছাড়া, পুস্তিকা, গ্রন্থ বা চলচ্চিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের ভাবপ্রকাশ করা যেতে পারে।
আবার, ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের বশবর্তী হয়ে কেউ যদি চলচ্চিত্র বানাতে চায় সেক্ষেত্রে তার স্বাধীনতা এক হবে না। প্রত্যেকেই নিজের ভাবপ্রকাশ করবেন কিন্তু অতিরিক্ত কোনো ঘৃণা প্রদর্শন করতে পারবেন না। কোনো চলচ্চিত্র পরিচালক এমন কোনো চলচ্চিত্র তৈরি করবেন না, যা সমাজের কোনো নির্দিষ্ট অংশের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক করে। এর থেকে সমাজে ধর্মীয় বিরোধ তৈরি হতে পারে। তাই ভাবপ্রকাশ বা সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগ করাই যেতে পারে, কিন্তু অন্যের ভাবাবেগকে আঘাত করে নয়।
অন্যদিকে, ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা বা সাংস্কৃতিক অধিকারহেতু যে কেউ যুক্তি বোঝাতে ভাবপ্রকাশ করতে পারে। সঠিক কথা বা ন্যায্য কথা অনেক সময় মানতে অসুবিধা তৈরি হয়, কিন্তু তা ভুল বা অন্যায় নয়। সেই ধরনের বক্তব্য বা ভাবপ্রকাশ কোনো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে করা যেতেই পারে। যেমন—সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ধর্মের পথের সম্পর্কে প্রায় সমানভাবেই দেখানো হয়েছিল। সেক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ধর্মকে আঘাত করা হয়নি।
তথাপি, এই ধরনের বিষয়বস্তু ধর্মীয় ভাবনাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয় । আর আমরা জানি, এই ধর্মীয় ভাবনা সংবেদনশীল একটি বিষয় যা মানুষের ভাবাবেগকে আঘাত করে।
4. নীচে দেওয়া নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগত ও সম্প্রদায়গত অধিকার- গুলি কতটা ন্যায়সংগত তা আলোচনা করো।
[a] কোনো একটি শহরে জৈন সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের নিজস্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সেই বিদ্যালয়ে শুধুমাত্র ওই সম্প্রদায়ের ছাত্রদেরই ভরতির সুযোগ দিল ।
[b] হিমাচল প্রদেশের অধিবাসীদের ওপর ওই রাজ্যে জমি বা সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রয়োগ করা হয়েছে।
[c] একটি যৌথ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ এমন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করলেন যেখানে ছাত্রীদের পাশ্চাত্য পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ করা হল।
[d] যদি কোনো ছেলে ভিন্ন জাতির মেয়েকে বিবাহ করে, তাহলে তারা ওই গ্রামে বসবাস করতে পারবে না বলে হরিয়ানা রাজ্যের একটি পঞ্চায়েতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল।
গোষ্ঠীগত ও সমষ্টিগত অধিকার
[a] সংবিধানের 29নং এবং 30নং ধারায় সংস্কৃতি ও শিক্ষা- বিষয়ক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এই ধারানুযায়ী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও নিজেদের পছন্দমতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে পারে ও পরিচালনা করতে পারে। তবে এই ধরনের অধিকারের ভিত্তিতে ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতার মনোভাব ও প্রাদেশিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এই প্রবণতা মারাত্মক।
[b] পঞ্চম ও ষষ্ঠ তপশিল হল ভারতীয় সংবিধানের বিশেষ এলাকা। 244 (1) নং ধারায় সংবিধানে বলা হয়েছে, তপশিলি এলাকাভুক্ত রাজ্যগুলির নিয়ন্ত্রণ থাকবে রাষ্ট্রপতির হাতে। সীমানা পরিবর্তন, পরিবর্ধন ইত্যাদি সবই রাষ্ট্রপতি ওই রাজ্যের রাজ্যপালের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে করতে পারেন। এই এলাকায় যাবতীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। তপশিলি উপজাতিভুক্ত এলাকাগুলির বিশেষভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করার প্রয়োজন এবং তপশিল উপজাতিদের স্বার্থ সংরক্ষণই কেবল নয়, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়।
[i] এই প্রয়োজনের নিরিখে ১ম তপশিলের অন্তর্ভুক্ত রাজ্যগুলির জমি ও সম্পত্তির হস্তান্তরের নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে।
[ii] উপজাতিদের মধ্যে জমির বণ্টনকেও সরকার নিয়ন্ত্রণ করে।
ওপরের দুটি নিষেধাজ্ঞা থেকে আমরা বুঝতে পারছি, তপশিল উপজাতিভুক্ত রাজ্যগুলির জমি ও সম্পত্তি রাজ্যবাসীরা অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারে না। তাই অ-হিমাচলবাসীরা এইসব এলাকায় জমি বা সম্পত্তি ক্রয় করতে পারে না। উপজাতিদের আর্থিক অসুবিধার কারণে এদের প্রবণতা থাকতে পারে জমি বিক্রির। তাই সরকারি নির্দেশ জারি করে এতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। রাজ্যের বাইরের যারা তারা উপজাতিভুক্ত এলাকায় বসবাস করলে এদের নিজস্ব বা স্বকীয়তা বিপন্ন হবে। এদের সংস্কৃতি বিনষ্ট হবে। এই জন্য সরকার এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
[c] স্বাধীনতার অধিকারে, যা সংবিধানের 19 নং ধারায় লিপিবদ্ধ তাতে ব্যক্তির মতামত প্রকাশের অধিকার অনুযায়ী যে কেউ নিজের পছন্দমতো পোশাক পরিধান করবে, সেক্ষেত্রে কোনো পোশাক সম্পর্কে বিধি থাকবে না ব্যক্তিগত জীবনেও যেমন থাকবে না, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও থাকবে না। সুতরাং, কোনো প্রিন্সিপাল এই নিয়ম জারি করতে পারেন না। এর ফলে সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করা হবে। যে-কোনো পোশাক নিজের পছন্দমতো পড়তে পারবে সকলেই। কেবল তা যেন অন্যের অসুবিধার কারণ না। হয় তা দেখতে হবে।
[d] হরিয়ানা পঞ্চায়েত প্রধান দু-জন ভিন্ন জাতির একটি ছেলে ও একটি মেয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায় তাদের ওই গ্রামে থাকতে না দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছে। মৌলিক অধিকার অনুযায়ী, নিজের পছন্দমতো চলাফেরা, মতামত ও ভাব প্রকাশ করা এবং বাকস্বাধীনতার কথা সংবিধানের 19 নং ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যা স্বাধীনতার অধিকার হিসেবে স্বীকৃত।
স্বাধীনতার অধিকার 19 থেকে 22নং ধারায় লিপিবদ্ধ এবং 19-এর 1নং ধারা থেকে 19-এর 6নং ধারায় উপরিউল্লিখিত অধিকারগুলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
এই অধিকার অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী ও পুরুষ নিজেদের পছন্দমতো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে এবং সমাজ ও প্রশাসন বাধা দিতে পারে না। ধর্ম-জাতি-জাত প্রথার আধিক্য যেখানে সেইসব এলাকায় আজও এই ধরনের বাধা দেখা যায়। যা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করে।
5. একজন ব্যক্তির অধিকার তখনই ক্ষুণ্ণ হয়, যখন অন্য কেউ তার ওপর হস্তক্ষেপ শুরু করে।
আমি ভারতরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার অধিকার ভোগ করি। মূলত ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার। এই অধিকারের সাহায্যেই আমরা যাবতীয় রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকার ভোগ করি, অর্থাৎ, স্বাধীনতার অধিকারের ভিত্তিতে আমরা অন্য সব অধিকার ভোগ করি। উপরিউক্ত বক্তব্যটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য এবং মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি ওলিভার ওয়েনডেল হোমস জুনিয়র-এর বক্তব্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি এবং ইনিও কবি অ্যালফ্রেড জর্জ গার্ডিনার এর কথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
স্বাধীনতা ভোগ এবং এই ভোগের পরিমাণ অসীম নয়, এই ধারণার ওপর বক্তব্যটি প্রতিষ্ঠিত। সীমার মধ্যে থেকেই স্বাধীনতা ভোগ করতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে আমার স্বাধীনতা যেন অন্যের অসুবিধার কারণ না হয়। তাই সমাজে সকলেই স্বাধীনতা ভোগ করবেন কিন্তু তা যেন স্বেচ্ছাচারিতা না হয়।
অন্যদিকে, যদি আমরা অন্যের স্বাধীনতা ভোগের সীমা নির্ধারণ করি বা করতে যাই তাহলে নিজের স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করতে পারব না। যেমন—আমার বাকস্বাধীনতার অধিকার আছে। আমি কোনো একটি বিষয়ে যা বলছি তা অন্যের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারে। অর্থাৎ, আমাদের ভারতবর্ষে, যেখানে নানা ভাষা নানা মত অর্থাৎ, এত বৈচিত্র্য, সেখানে একজনের স্বাধীনতা অপরের বাধা হতেই পারে।
তাই এমতাবস্থায় মানুষের ভাবাবেগ দ্বারাই এই সমস্যার বিচার করা উচিত। এবং শিক্ষাগত বৈষম্য, হিংসা বা অহিংস যে-কোনো উপায়ে আমরা কোনো বিষয়ে একমত হতে পারি এবং এই কথা ঐতিহাসিক সত্য, ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তার প্রমাণ।
তবে কেবল ভারতই নয় গোটা বিশ্বেই জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে বাক ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধিতা।
এই বক্তব্যটি বিচারপতি ওলিভার ওয়েনডেল জেমস থেকে জন স্টুয়ার্ট মিল এবং আব্রাহাম লিঙ্কন সকলেই করেছেন।
অন্যান্য সম্ভাব্য প্রশ্নোত্তর বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 1
1. অধিকার হল—
A. স্বীকৃতি
B. দাবি
C. আগের দুটিই
D. কোনোটিই নয়
2. মানবাধিকারকে বিশ্বজনীন স্বীকৃতি দেয়—
A. নিরাপত্তা পরিষদ
B. সাধারণ সভা
C. অছিপরিষদ
D. আন্তর্জাতিক বিচারালয়
3. মানবাধিকারকে সাধারণ সভা স্বীকৃতি দেয়—
A. 1947 খ্রিস্টাব্দে
B. 1948 খ্রিস্টাব্দে
C. 1949 খ্রিস্টাব্দে
D. 1950 খ্রিস্টাব্দে
4. অধিকার প্রয়োজন কারণ—
A. সম্মান
B. স্বাধীনতা
C. ব্যক্তিত্বের বিকাশ
D. সবকটিই
5. কোন্ অধিকারটি ন্যায্য, তার সিদ্ধান্ত নেবে—
A. রাষ্ট্র
B. রাজ্য
C. জেলাপরিষদ
D. রাষ্ট্রপতি
6. অধিকারের উৎস হল —
A. স্বাভাবিক অধিকার
B. মানবাধিকার
C. উভয়ই
D. কোনোটিই নয়
7. ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন' গঠিত হয়—
A. 1993 খ্রিস্টাব্দে
B. 1994 খ্রিস্টাব্দে
C. 1995 খ্রিস্টাব্দে
D. 1996 খ্রিস্টাব্দে
8. রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার হল—
A. পৌর অধিকার
B. রাজনৈতিক অধিকার
C. সামাজিক অধিকার
D. অর্থনৈতিক অধিকার
9. ‘অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরাধীন শ্রমিক কখনোই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাধীন হতে পারে না।' উক্তিটি করেছেন—
A. বার্কার
B. হবহাউস
C. জেনিংস
D. ইন্দিরা গান্ধি
10. ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য-সংখ্যা—
A. 6 জন
B. 8 জন
C. 12 জন
D. 4 জন
11. স্বাভাবিক অধিকার হল—
A. প্রকৃতি যার উৎস
B. মানুষ বলেই প্রাপ্ত অধিকার
C. রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত অধিকার
D. আগের কোনোটিই নয়
12. শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকার ভারতীয় সংবিধান কর্তৃক সংরক্ষিত একটি—
A. মৌলিক অধিকার
B. মৌলিক অধিকার নয়
C. মৌলিক দায়বদ্ধতা
D. নির্দেশমূলক নীতি
13. ভারত সরকার মানবাধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করে—
A. 1992 খ্রিস্টাব্দে
B. 1993 খ্রিস্টাব্দে
C. 1994 খ্রিস্টাব্দে
D. 1995 খ্রিস্টাব্দে
14. ‘আইন হল শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নির্দেশ—কথাটি বলেছেন—
A. জন স্টুয়ার্ট মিল
B. ম্যাকিয়াভেলি
C. লর্ড অ্যাক্টন
D. কার্ল মার্কস
15. ভারতের সুপ্রিমকোর্ট সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের যে ধারাটিকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে—
A. 32-A নং ধারা
B. 34-B নং ধারা
C. 84-C নং ধারা
D. 66-A নং ধারা
16. অন্যান্য অধিকারগুলির উৎস হল—
A. শিক্ষার অধিকার
B. প্রাকৃতিক অধিকার
C. পৌর অধিকার
D. সাংস্কৃতিক অধিকার
17. মানবাধিকার হল—
A. প্রকৃতি আগত অধিকার
B. মানুষ বলে প্রাপ্ত অধিকার
C. রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত অধিকার
D. কোনোটিই নয়
18. অধিকার ও দায়বদ্ধতা ধারণা দুটি একে অপরের পরিপূরক কারণ—
A. অন্য ব্যক্তির অধিকারকে সম্মান জানাতে হয়
B. অধিকারের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রতি নাগরিকদের সজাগন জর
C. সবার মঙ্গল গুরুত্বপূর্ণ
D. উপরের সবকটিই
19. প্রাকৃতিক অধিকারগুলি হল—
A. জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি
B. জীবন, স্বাধীনতা
C. জীবন, সম্পত্তি
D. স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি
20. ‘সার্বভৌমের আদেশই হল আইন—এ কথা বলেছেন—
A. হেনরি মেইন
B. অস্টিন
C. ল্যাক্সি
D. উইলসন
21. রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে সংযুক্ত যে অধিকার—
A. পৌর অধিকার
B. সাংস্কৃতিক অধিকার
C. অর্থনৈতিক অধিকার
D. ধর্মের অধিকার
22. সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ নাগরিকরা কোন্ অধিকারের মাধ্যমে ভোগ করেন ?
A. রাজনৈতিক অধিকার
B. সাংস্কৃতিক অধিকার
C. অর্থনৈতিক অধিকার
D. পৌর অধিকার
23. জাতিপুঞ্জ মানবিক অধিকারের—
A. অতন্দ্র প্রহরী
B. অতন্দ্র প্রহরী নয়
C. রক্ষক
D. রক্ষক নয়
24. 'ESMA' আইন যে অধিকারের ক্ষেত্রে একটি বাধা—
A. সাম্যের
B. স্বাধীনতার
C. ধর্মীয় স্বাধীনতার
D. জীবনের
25. জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনের সদর দফতরঅ বস্থিত—
A. প্যারিসে
B.জেনেভায়
C. নিউইয়র্কে
D. লন্ডনে
26. মানবাধিকার দিবস হিসাবে পালিত হয়—
A. 10 নভেম্বর
B. 10 ডিসেম্বর
C. 10 সেপ্টেম্বর
D. 10 জানুয়ারি
27. মানবাধিকারের বৈশিষ্ট্য হল—
A. গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা
B. শিক্ষকের অধিকার রক্ষা
C. সকলের অধিকার রক্ষা
D. জাতীয় অধিকার রক্ষা
28. ভারতীয় সংবিধানে .......... লেখ-এর উল্লেখ আছে।
A. 4টি
B. 5টি
C. 6টি
D. 10
29. যে অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত নয়—
A. মৌলিক অধিকার
B. বাকস্বাধীনতার অধিকার
C. ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার
D. নৈতিক অধিকার
30. ‘ধাক্কা না খেয়ে পথ চলার অধিকার যদি আমার থাকে, তবে অপরের দায়বদ্ধতা হল আমাকে প্রয়োজনমতো পথ ছেড়ে দেওয়া' উক্তিটি করেছেন—
A. বার্কার
B. হবহাউস
C. ল্যাস্কি
D. বেণ্থাম
31. মানবাধিকারের প্রকৃতি হল—
A. রাষ্ট্রীয়
B. বিশ্বজনীন
C. আঞ্চলিক
D. সর্বজনীন
32. ভারতীয় মানবাধিকার কশিনের সদর দফতর—
A. কলকাতায়
B. মুম্বাই-এ
C. দিল্লি-তে
D. চেন্নাই-এ
33. ড. আম্বেদকর • অধিকারকে সংবিধানের আত্মা ও প্রাণকেন্দ্র বলে বর্ণনা করেছিলেন।
A. সাম্যের
B. স্বাধীনতা
C. ধর্মীয় স্বাধীনতার
D. শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের
34. প্রাচীন যে দেশে দাস, শ্রমিক এবং স্ত্রীলোকদের নাগরিক মর্যাদা দেওয়া হত না—
A. প্রাচীন গ্রিসে
B. রোমে
C. মিশরে
D. চিনে
35. মানবিক অধিকারের রক্ষাকর্তা হল—
A. লোক আদালত
B. হাইকোর্ট
C. সুপ্রিমকোর্ট
D. কোনোটিই নয়
36. ভারতীয় সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আইন পাস হয়—
A. 1960 খ্রিস্টাব্দে
B. 1961 খ্রিস্টাব্দে
C. 1962 খ্রিস্টাব্দে
D. 1963 খ্রিস্টাব্দে
37. মানবাধিকারের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য—
A. জাতিগত বৈষম্যের অবসান করা
B. দেশ রক্ষা করা
C. আইনের অধিকারের প্রবর্তন করা
D. ব্যক্তিত্বের বিকাশসাধন করা
38. পিতা-মাতার সেবা করা এবং সাধ্যমতো তাঁদের সুখশান্তি দেওয়া যে কর্তব্যের অন্তর্গত তা হল—
A. রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা
B. পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা
C. সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা
D. বিশ্বমানবের প্রতি দায়বদ্ধতা
39. কর প্রদান করা নাগরিকদের একটি—
A. দায়বদ্ধতা নয়
B. দায়বদ্ধতা
C. ক্ষেত্রবিশেষে দায়বদ্ধতা
D. ক্ষেত্রবিশেষে দায়বদ্ধতা নয়
40. ভারতীয় সংবিধানে যা রোধ করা হয়েছে—
A. অস্পৃশ্যতা নীতি
B. সম্পত্তির অধিকার
C. ধর্মীয় স্বাধীনতা
D. বাকস্বাধীনতার অধিকার
41. মানবাধিকারের উৎস হল—
A. স্বাভাবিকতা
B. অ-হস্তান্তরযোগ্যতা
C. মানবতা
D. মানুষের মর্যাদা
42. পৌর এবং রাজনৈতিক অধিকার সামগ্রিকভাবে যে ধরনের শাসনব্যবস্থার ভিত্তি—
A. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা
B. একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা
C. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা
D. সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা
43. দায়বদ্ধতা একটি—
A. সামাজিক ধারণা
B. রাজনৈতিক ধারণা
C. অর্থনৈতিক ধারণা
D. সাংবিধানিক ধারণা
44. Models of Democracy গ্রন্থের প্রবক্তা হলেন—
A. ডেভিড হেল্ড
B. বার্কার
C. ইস্টন
D. লাসওয়েল
45. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হল একটি—
A. পৌর অধিকার
B. রাজনৈতিক অধিকার
C. স্বাভাবিক অধিকার
D. অর্থনৈতিক অধিকার
46. রাষ্ট্রের বিরোধিতা করার অধিকার নাগরিকের—
A. আছে
B. নেই
C. ক্ষেত্রবিশেষে আছে
D. আদালতের নির্দেশে
47. অধিকার যার দ্বারা স্বীকৃত হবে—
A. রাষ্ট্র
B. রাজ্য
C. আঞ্চলিক সরকার
D. প্রধানমন্ত্রী
48. নির্দেশমূলক নীতিকে 'সমাজবিপ্লবের অধিকতর স্পষ্ট বিবৃতি' বলেছেন—
A. গ্রেনভিল অস্টিন
B. জেমস মিল
C. জওহরলাল নেহরু
D. রাজীব গান্ধি
49. মানবাধিকার—
A. কেড়ে নেওয়া যায় না
B. কেড়ে নেওয়া যায়
C. সরকার কেড়ে নিতে পারে
D. আদালত শর্তসাপেক্ষে কেড়ে নিতে পারে
50. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি নির্বাচিত করেন—
A. প্রধানমন্ত্রী
B. রাষ্ট্রপতি
C. লোকসভা
D. বিধানসভা
51. মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে যতগুলি ধারায় পৌর, রাজনৈতিক, সামাজিক অধিকার স্থান পেয়েছে—
A. 25টি ধারায়
B. 10টি ধারায়
C. 30টি ধারায়
D. 20টি ধারায়
52. মানবাধিকারের ঘোষণা হয়—
A. প্যারিসে
B. রোমে
C. লন্ডনে
D. জেনেভায়
53. মানবাধিকারের প্রতি থাকে—
A. জনসমর্থন
B. বিশ্বজনমতের সমর্থন
C. সরকারের সমর্থন
D. রাষ্ট্রের সমর্থন
54. যে ধরনের অধিকার রাষ্ট্রকে নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে তা হল—
A. রাজনৈতিক অধিকার
B. সাংস্কৃতিক অধিকার
C. অর্থনৈতিক অধিকার
D. শিক্ষার অধিকার
55. নীচের যেটি সত্য—
A. অধিকার স্থিতিশীল
B. অধিকার গতিশীল
C. প্রয়োজনের ভিত্তিতে অধিকার পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা হয়
D. অধিকারকে প্রয়োজনে পরিবর্তন করা যায় না।
56. ‘যে-রাষ্ট্র তার নাগরিকদের যত বেশি পরিমাণ অধিকার প্রদান করে, সেই রাষ্ট্র তত বেশি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে পরিগণিত হয়।’—উক্তিটি করেছেন—
A. ল্যাস্কি
B. গার্নার
C. জওহরলাল নেহরু
D. বি আর আম্বেদকর
57. ‘বৈষম্যমূলক বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থায় মুষ্টিমেয় শাসক শ্রেণিই প্রকৃত অধিকার ভোগ করে।' কথাটি বলেছেন—
A. মার্কস
B. বেথাম
C. ল্যাস্কির
D বার্কার
58. যে-বছরটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বর্ষ হিসেবে পালন করা হয়েছিল—
A. 1965 খ্রিস্টাব্দকে
B. 1967 খ্রিস্টাব্দকে
C. 1968 খ্রিস্টাব্দকে
D. 1970 খ্রিস্টাব্দকে
59. ‘সুন্দর জীবনের জন্য অবকাশ অপরিহার্য' কথাটি বলেছেন—
A. প্লেটো
B. ল্যাস্কি
C. অ্যারিস্টটল
D. হবস
60. সংবিধানের 12নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত অধিকারগুলির সংখ্যা—
A. 4টি
B. 6টি
C. 7টি
D. 10টি
61. মানবাধিকারকে মনুষ্য প্রজাতির অধিকার বলে অভিহিত করেছেন—
A. ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ
B. বি আর আম্বেদকর
C. ড. উপেন্দ্র বক্সী
D. দুর্গাদাস বসু
62. ‘অধিকারের মধ্যেই দায়বদ্ধতা নিহিত।' কথাটি বলেছেন—
A. বার্কার
B. ল্যাস্কি
C. অ্যারিস্টটল
D. জেনিংস
63. ‘কোনো জাতি তার যোগ্যতা অনুসারে সরকার পায়’ কথাটি বলেছেন—
A. রুশো
B. মন্তেস্কু
C. ভলতেয়ার
D. অ্যাডাম স্মিথ
64. ‘মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়ে থাকে।—উক্তিটি করেছেন—
A. ফ্রিডম্যান
B. দুর্গাদাস বসু
C. স্মিথ
D. অ্যারিস্টটল
65. ‘সমাজের বিরুদ্ধাচরণ করে আমি কোনো অধিকার পেতে পারি না।'—কথাটি বলেছেন—
A. বার্কার
B. ল্যাস্কি
C. হবহাউস
D. লক
66. মানবাধিকার ঘোষণাটি প্রকাশিত হয় 1948 খ্রিস্টাব্দের—
A. 9 ডিসেম্বর
B. 10 ডিসেম্বর
C. 11 ডিসেম্বর
D. 12 ডিসেম্বর
67. Human Rights in India বইটির লেখক—
A. সাবিরা খান
B. বিচারপতি ভগবতী
C. শ্যামল সেন
D. প্রণয় রায়
68. ভারতের সংবিধানে বলা হয়েছে—
A. সার্বিক সাক্ষরতার কথা
B. সার্বিক প্রাথমিক শিক্ষার কথা
C. নিরক্ষরতা দূরীকরণের কথা
D. সার্বিক মাধ্যমিক শিক্ষার কথা
69. যে মামলার রায়ে সুপ্রিমকোর্ট মৌলিক অধিকারসমূহকে ‘মহাসনদ' বা ‘Magna Carta' বলে আখ্যা দেয়—
A. এ কে গোপালন বনাম মাদ্রাজ রাজ্য
B. বালসারা বনাম মুম্বই রাজ্য
C. বিহার রাজ্য বনাম কামেশ্বর সিং
D. কুরেশি বনাম বিহার রাজ্য
70. মানবাধিকার কমিশনের প্রথম সভানেত্রী ছিলেন—
A. ইন্দিরা গান্ধি
B. শ্রীমতী এলেনর রুজভেল্ট
C. সুচেতা কৃপালনি
D. সরোজিনী নাইডু
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 1
1. অধিকার কী ?
> কোনো ব্যক্তির ন্যায্য দাবি যা ব্যক্তি ভোগ করে এবং যে দাবি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত তাই অধিকার।
2. অবসরের অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> অবসরের অধিকার হল অর্থনৈতিক অধিকার ।
3. শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার হল সামাজিক অধিকার।
4. অধিকারগুলি কি অবাধ ?
> সমাজে সাম্যের নীতি প্রতিষ্ঠা করতে এবং সকলের জন্য সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যক্তির অধিকার অবাধ নয়, সীমিত।
5. সরকারি চাকুরিলাভের অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> সরকারি চাকুরিলাভের অধিকার হল রাজনৈতিক অধিকার ।
6. সরকারের সমালোচনা করার অধিকার কোন্ প্রকার অধিকার ?
> সরকারের সমালোচনা করার অধিকার হল রাজনৈতিক অধিকার ।
7. অধিকারের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো ।
> অধিকার হল একটি আইনগত ধারণা। কারণ রাষ্ট্র আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অধিকারের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে।
8. নাগরিক ও অধিকারের সম্পর্ক কী ?
> অধিকারের মাধ্যমেই নাগরিক, ব্যক্তি বা মনুষ্যসমাজ নিজেদের পরিচিতি বা অস্তিত্বকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে ।
9. যে-কোনো দুটি রাজনৈতিক অধিকারের উল্লেখ করো ।
> দুটি রাজনৈতিক অধিকার হল—ভোটদানের অধিকার ও নির্বাচিত হওয়ার অধিকার।
10.বাকস্বাধীনতার অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> বাকস্বাধীনতার অধিকার হল পৌর অধিকার।
11. বিদ্রোহের অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> বিদ্রোহের অধিকার হল রাজনৈতিক অধিকার।
12. দুটি অর্থনৈতিক অধিকারের নাম করো ।
> দুটি অর্থনৈতিক অধিকার হল—কর্মের অধিকার ও উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অধিকার।
13. সম্পত্তির অধিকারের ওপর প্রথম গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন কোন্ দার্শনিক ?
> জন লক সম্পত্তির অধিকারের ওপর প্রথম গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
14. পরিচালন ব্যবস্থায় কর্মীদের অংশগ্রহণের অধিকার কোন্ প্রকার অধিকার ?
> পরিচালন ব্যবস্থায় কর্মীদের অংশগ্রহণের অধিকার হল রাজনৈতিক অধিকার।
15. শিক্ষার অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> শিক্ষার অধিকার হল সামাজিক অধিকার।
16. কোন্ বিষয়গুলি মনুষ্য জীবনের উন্নয়নের স্বার্থে নিয়োজিত ?
> জল ও বায়ু দূষণকে প্রতিরোধ করা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা, বনসংরক্ষণ করা এবং সর্বোপরি ওজনস্তরের ভারসাম্য রক্ষা করা ইত্যাদি বিষয়গুলি মনুষ্য জীবনের উন্নয়নের স্বার্থে নিয়োজিত ।
17. বর্তমানে স্বাভাবিক অধিকারের পরিবর্তে কোন বিকল্প শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে ?
> বর্তমানে স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক অধিকারের পরিবর্তে ‘মানবাধিকার’ (Human Rights) শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
18. সব দাবিই কি অধিকার ?
> আইনের দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত দাবিই হল অধিকার।
19. মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণা সর্বপ্রথম স্বীকৃতি পায় কোথায় ?
> সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদে মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণা সর্বপ্রথম স্বীকৃতি পায় ।
20. অধিকারগুলিকে সংবিধানে সংযুক্ত করা হয় কেন ?
> নাগরিক জীবনে অধিকারগুলির গুরুত্ব বোঝাতে সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রেরই সংবিধানে নাগরিকদের অধিকারগুলিকে যুক্ত করা হয়েছে।
21. ভোটাধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> ভোটাধিকার রাজনৈতিক অধিকার।
22. অধিকারকে একটি সামাজিক ধারণা কেন বলা হয় ?
> স্বত্ব বা দাবির আইনি স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ সমাজের মধ্যেই একমাত্র সম্ভব। সমাজের বাইরে তা কখনোই সম্ভব নয়। তাই অধিকারকে একটি সামাজিক ধারণা বলা হয়।
23. মৌলিক অধিকারকে কোথায় সংযুক্ত করা হয়েছে?
> ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলিকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
24. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নিজেকে শাসন করার অর্থ কী ?
> রাজনৈতিক অধিকারভোগের মাধ্যমে ভোট প্রদান করা, নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা, সরাসরি রাজনীতিতে যোগদান করা প্রভৃতি।
25. স্বাভাবিক অধিকারগুলি কী কী ?
> স্বাভাবিক অধিকারগুলি হল—জীবনের স্বাধীনতার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি।
26. জীবনের অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> জীবনের অধিকার হল পৌর অধিকার।
27. স্বাধীনতার অধিকার কী ?
> স্বাধীনতার কথা বলতে ভাব প্রকাশের অধিকার, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার, স্বাধীনভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার ইত্যাদিকে একত্রে স্বাধীনতার অধিকার বলে।
28. মানুষের অধিকার বলে দাবি করা যাবে না, এমন দুটি বিষয়ের উল্লেখ করো ।
> মানুষের অধিকার বলে দাবি করা যাবে না, এমন দুটি বিষয় হল—[a] ধূমপান, [b] মাদকদ্রব্যের সেবন।
29. উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অধিকার কোন প্রকার অধিকার ?
> উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অধিকার হল অর্থনৈতিক অধিকার।
30. বিশ্রামের অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> বিশ্রামের অধিকার হল অর্থনৈতিক অধিকার।
31. সম্পত্তির অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> সম্পত্তির অধিকার হল পৌর অধিকার।
32. ধর্মের অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> ধর্মের অধিকার হল পৌর অধিকার।
33. সাম্যের অধিকার কোন প্রকার অধিকার ?
> সাম্যের অধিকার হল পৌর অধিকার।
34. সাংস্কৃতিক অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> সাংস্কৃতিক অধিকার হল সামাজিক অধিকার।
35. পরিবার গঠনের অধিকার হল কোন প্রকার অধিকার ?
> পরিবার গঠনের অধিকার হল পৌর অধিকার।
36. নির্বাচিত হওয়ার অধিকার হল কোন্ ধরনের অধিকার ?
> নির্বাচিত হওয়ার অধিকার হল রাজনৈতিক অধিকার।
37. দরিদ্রদের সাহায্যার্থে সরকার কোন্ ধরনের যোজনার সূচনা করেছে ?
> দরিদ্রদের সাহায্যার্থে সরকার গ্রামীণ স্বরোজগার যোজনার সূচনা করেছে।
38. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ব্যতীত আর কোন্ ধরনের অধিকারকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি ?
> রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ব্যতীত সাংস্কৃতিক অধিকারকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি।
39. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র কত খ্রিস্টাব্দে প্রণীত হয় ?
> সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র 1948 খ্রিস্টাব্দে প্রণীত হয়।
40. প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার কোন্ ধরনের অধিকার ?
> প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার হল রাজনৈতিক অধিকার।
41. ‘সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা' (Universal Declaration of Human Rights) কবে গ্রহণ করা হয় ?
> সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাটি গ্রহণ করা হয় 1948 খ্রিস্টাব্দের 10 ডিসেম্বর।
42. জীবনের অধিকার কী ?
> বহিঃশত্রুর আক্রমণমুক্ত, নির্ভয় জীবনযাপনের অধিকারকে জীবনের অধিকার বলে। এই অধিকারের সাহায্যে ব্যক্তি স্বচ্ছন্দে নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ করতে পারে।
43. মানবিক অধিকারের ধারণা সম্পর্কে রাষ্ট্রসংঘ কী বলেছে ?
> মানবাধিকারের দাবিকে গ্রহণের মাধ্যমে ব্যক্তির জীবনের প্রতি গুরত্ব, সম্মান এবং আত্মসম্মান প্রদর্শনের কথা বলেছেন।
44. প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অধিকারের একটি উদাহরণ দাও ।
> একটি স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক অধিকারের উদাহরণ হল— জীবনধারণের অধিকার।
45. অধিকারের উৎস কী ?
> অধিকারের উৎস হল সমাজজীবন।
46.স্বাভাবিক অধিকার কী ?
> মানুষ জন্মসূত্রে যেসব অধিকারলাভ করে সেগুলি হল স্বাভাবিক অধিকার।
47. নাগরিকরা যে অধিকার ভোগ করেন, ভারতে তাকে কী বলে ?
> ভারতীয় নাগরিকরা যে অধিকারগুলি ভোগ করেন তাকে মৌলিক অধিকার বলে।
48. অধিকার কখনোই শ্রেণি নিরপেক্ষ নয়—এটি কাদের মত ?
> অধিকার কখনোই শ্রেণি নিরপেক্ষ নয়—এটি মার্কসবাদীদের মত।
49. অধিকারের সবচেয়ে প্রাচীন তত্ত্বটি কী ?
> অধিকারের সবচেয়ে প্রাচীন তত্ত্বটি হল - স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্ব।
50. 'No Rights without Duties, no Duties without Rights' উক্তিটি কার ?
> আলোচ্য উক্তিটি কার্ল মার্কসের।
51. সুপরিবেশের অধিকার হল কোন্ ধরনের অধিকার ?
> সুপরিবেশের অধিকার হল সামাজিক অধিকার।
52. স্বাস্থ্যের অধিকার কোন ধরনের অধিকার ?
> স্বাস্থ্যের অধিকার হল সামাজিক অধিকার।
53. একটি সাংস্কৃতিক অধিকারের উল্লেখ করো ।
> একটি সাংস্কৃতিক অধিকার হল— মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষালাভের অধিকার।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 2
1. অধিকার কাকে বলে ?
> এক সাধারণত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধাকে অধিকার বলা হয়। রাষ্ট্র সমাজের পক্ষে আইনের মাধ্যমে এই অধিকারকে স্বীকার ও সংরক্ষণ করে থাকে। সুতরাং বলা যায়, অধিকার হল ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযোগী সেইসব সুযোগসুবিধা যেগুলি রাষ্ট্রের দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়।
2.অধিকারের যে-কোনো তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো ।
> অধিকারের তিনটি বৈশিষ্ট্য হল—
(a) অধিকার হল একটি সামাজিক ধারণা। শুধুমাত্র সমাজবদ্ধ মানুষ একে অপরের আত্মবিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় দাবিকে স্বীকৃতি দিলে অধিকারের সৃষ্টি হয়।
(b) অধিকার হল একটি আইনগত ধারণা। কারণ, রাষ্ট্র আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অধিকারের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে।
[c] ব্যক্তির অধিকার কখনোই সমগ্র সমাজের স্বার্থ- বিরোধী হতে পারে না। সমাজের স্বার্থ বিনষ্ট করে কারোর পক্ষে অধিকার ভোগ করা সম্ভব হয় না।
3. অধিকার কীভাবে উদ্ভূত হয় ?
> সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের রাষ্ট্রদার্শনিকরা বলেছেন, অধিকারের উৎস ভগবান বা প্রকৃতি প্রদত্ত। প্রাকৃতিকভাবে আমরা অধিকারগুলি অর্জন করি। রাষ্ট্র বা সমাজ কর্তৃক দান নয়। বরং আমরা অধিকারগুলিকে নিয়েই জন্মগ্রহণ করি। তাই এই অধিকারগুলিকে আমাদের থেকে হরণ করা যাবে না। জীবন, সম্পত্তি ও স্বাধীনতা—এই তিনটি প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অধিকার নিয়েই আমরা জন্মাই। এই তিনটি অধিকার ছাড়া যে অধিকারগুলি আমরা ভোগ করি তা এই তিনটি মূল অধিকার থেকেই উদ্ভূত। আর এই প্রাকৃতিক অধিকারগুলি ব্যক্তিনাগরিকদের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করার সঙ্গে সঙ্গে শাসকদের স্বৈরাচারী হওয়ার প্রবণতাকে রোধ করে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকে রক্ষা করে। পরবর্তীকালে মানবিক অধিকারগুলি ভগবান প্রদত্ত প্রাকৃতিক অধিকারের জায়গা গ্রহণ করেছে এবং সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে ও বিশ্বজনীন পরিচিতি লাভ করেছে।
4. অধিকারের প্রয়োজনীয়তা কোথায় ?
> মানুষের জীবনকে শ্রদ্ধাপূর্ণ ও সম্মানজনক করে তুলতে প্রাথমিকভাবে অধিকারের প্রয়োজন। যেমন—জীবিকা নির্বাহের অধিকার ব্যক্তিজীবনকে সম্মানজনক করে তোলে। অন্যথায়, ব্যক্তিজীবন অসম্মানজনক হয়ে উঠত এবং আমরা প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করতে ভিক্ষা করতে বাধ্য হতাম যা ব্যক্তিজীবনকে অশ্রদ্ধাপূর্ণ করে তুলত। এছাড়াও, আমাদের ভালোভাবে, স্বচ্ছলভাবে এবং স্বচ্ছন্দে জীবন কাটানোর জন্যও অধিকারের প্রয়োজন। এই অধিকারের সাহায্যে ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। যার দ্বারা তার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, যেমন—শিক্ষার অধিকার।
5. কীভাবে অধিকারের দ্বারা আমাদের জীবন সম্মানজনক হয়ে ওঠে ?
> জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে আমাদের অর্থ লাগে। অর্থ উপার্জন করতে পারলে আমরা জীবনের নূন্যতম চাহিদা মেটাতে সক্ষম হই এবং সামান্য স্বচ্ছন্দটুকুও বজায় থাকে। সুতরাং, জীবিকানির্বাহের মাধ্যমে আমরা স্বচ্ছল ও স্বচ্ছন্দভাবে জীবন অতিবাহিত করতে পারি। আর্থিক স্বচ্ছলতার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের পরিবারসহ তার পারিপার্শ্বিককেও সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারে। তাই জীবিকা বা কর্মের অধিকারের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনকে শ্রদ্ধাপূর্ণ এবং সম্মানজনক করে তুলতে পারি।
6. প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অধিকার কী ?
> সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের রাষ্ট্রতাত্ত্বিকরা প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অধিকার ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁদের মতে, ব্যক্তি জন্ম থেকে যে অধিকার নিয়ে জন্মায় তাই প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অধিকার অর্থাৎ, ভগবান প্রদত্ত অধিকারই হল স্বাভাবিক অধিকার। প্রাকৃতিক অধিকারের উৎপত্তি প্রাকৃতিক আইন থেকে। জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকারই হল প্রাকৃতিক অধিকার। এই তিনটি অধিকার শাসক কর্তৃক প্রদত্ত নয়, ভগবান প্রদত্ত।
7. স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্বের মূল বক্তব্য কী ?
> স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ কতকগুলি সহজাত, স্বাভাবিক, অপরিহার্য এবং অবাধ অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এই অধিকারগুলি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির উর্ধ্বে। কারণ, এগুলি প্রাক্-সামাজিক ও প্রাক্-রাজনৈতিক। জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার হল স্বাভাবিক অধিকারের উদাহরণ।
8. মানবিক অধিকার কী ?
> প্রাচীনকালের স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক অধিকারের আধুনিক ধারণাই হল সামাজিক অধিকার। আধুনিককালে ভগবান প্রদত্ত অধিকার—এই ধারণা কম বিশ্বাসযোগ্য বা প্রায় অবিশ্বাসযোগ্য বলেই প্রাচীনকালের স্বাভাবিক অধিকার- গুলিকেই মানবিক অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
9. মানবাধিকারগুলিও কি স্থিতিশীল ?
> সমাজের গতিশীলতা, মানুষের জীবনে প্রতিযোগিতামুখী মানসিকতা, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ করার দক্ষতা অর্জন প্রভৃতি কারণে মানবাধিকারের তালিকাও আজ সম্প্রসারিত। প্রাকৃতিক অধিকারগুলির আধুনিক রূপ মানবিক অধিকার। সুতরাং, মানবিক অধিকারের সূচনাও বিশ্ব মানুষের স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পত্তির অধিকারই ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে বিশ্বের পটভূমিতে আরও এমন বহু সমস্যার মুখোমুখি বিশ্ববাসীকে হতে হয় যার জন্য নতুন আইন তৈরি বাঞ্ছনীয়। যেমন—বর্তমানে পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ এই দুটি বিষয় বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। মানবাধিকার কমিশন এই দুটি বিষয়ের দিকে নজর রেখে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, আমরা বলতেই পারি সংবিধান স্বীকৃত অধিকারের মতো মানবাধিকারও স্থিতিশীল নয়। তা নিয়ত সম্প্রসারণশীল। -
10.প্রচলিত সব প্রথাই কি অধিকার হতে পারে ?
> ভারতের ইতিহাস বলছে আমাদের দেশে বহুদিন ধরেই অস্পৃতার নীতিকে মেনে চলা হত। নীচু বর্ণের মানুষের হাতে জল বা মৃত্তিকা গ্রহণ না করা, ঘরের সামনে প্রবেশ। নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি বহু কিছুই সমাজে প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে 1955 খ্রিস্টাব্দে অস্পৃশ্যতা (অপরাধ) বিরোধী আইন প্রণীত হয় এবং সাম্যের অধিকারের 17 নং ধারায় অস্পৃশ্যতা বর্জন করে সকলের প্রতি সমান আচরণের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সুতরাং, প্রচলিত প্রথা মতোই যা কিছুই ব্যক্তি মেনে চলুক না-কেন সমাজের প্রতি অন্যায় হলে তার বিলোপ সাধন করা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।
11. অধিকারের প্রকৃতি কী চরম ? কারণ দর্শাও।
> যদিও আমরা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত অধিকার ভোগ করি এবং রাষ্ট্র সেক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে না। তথাপি অধিকার চরম নয়।
[i] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে ব্যক্তির অধিকার চরম এবং তা খর্ব করা হয় না।
[ii] ভারতীয় সংবিধানে উল্লেখ আছে দেশে জরুরি অবস্থার পরিস্থিতিতে 352নং ধারানুযায়ী ব্যক্তির মৌলিক অধিকারকে সংকুচিত করা হতে পারে প্রয়োজনের নিরিখে।
[iii] জরুরি অবস্থা চলাকালীন কোনো নাগরিকই নিরাপত্তার অধিকার ভোগ করতে পারবে না।
12. অধিকারের আইনি স্বীকৃতি কথার অর্থ কী ?
> ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ এবং স্বচ্ছন্দে বসবাসযোগ্য পরিবেশে বসবাস করার অধিকার তখনই সফল বা সার্থক হয়, যখন ওই অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক তথা আইন কর্তৃক স্বীকৃত হয়। আইনি স্বীকৃতি ছাড়া যে-কোনো অধিকারই অর্থহীন।
13. আইনি স্বীকৃতি ছাড়া অধিকার অর্থহীন কেন ?
> কোনো ব্যক্তি প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে যাতে ওই ব্যক্তি আদালতের সাহায্য নিতে পারে নিজের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য তাই অধিকারগুলির আইনি স্বীকৃতি বাঞ্ছনীয়। আইনি স্বীকৃতি থাকলে সহজে অধিকার থেকে কোনো ব্যক্তি বঞ্চিত হতে পারে না বা, কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ব্যক্তির অধিকারের সংকোচন করতে পারে না।
14. অধিকারকে আইনি ধারণা হিসেবে চিহ্নিত কেন করা হয় ?
> সাধারণ অর্থে অধিকার হল ব্যক্তির স্বত্ব। কিন্তু তাতে আইনি স্বীকৃতি বা সংরক্ষণ না থাকলে তা অধিকারের শিরোপা পায় না অর্থাৎ, গ্রহণযোগ্য হয় না। সুতরাং, রাষ্ট্রই সমাজের জন্য আইনের দ্বারা অধিকারকে সংরক্ষণ ও স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা করে। তাই অধিকারকে আইনি ধারণা বলা হয়।
15. ব্যক্তির সমস্ত দাবিই কি অধিকারের স্বীকৃতি পায় ?
> বার্কারের মতে, রাষ্ট্র এবং আইন ন্যায়ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং, ব্যক্তির যে দাবি ন্যায়সংগত, সমাজের সকলের মঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেই দাবিই আইনি স্বীকৃতি পায়। যে সকল দাবি ন্যায়সংগত নয় অর্থাৎ, সমষ্টির স্বার্থে নয়, তা কখনোই আইনি স্বীকৃতি পায় না।
16. নৈতিক অধিকার কাকে বলে ? এই অধিকার ভঙ্গ করলে শাস্তি পেতে হয় কি ?
> অধিকারকে সাধারণত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—– আইনগত অধিকার ও নৈতিক অধিকার। সাধারণত ন্যায়বুদ্ধি ও বিবেকের ওপর নৈতিক অধিকার নির্ভর করে। অর্থাৎ, সামাজিক ন্যায়নীতিবোধের ওপর ভিত্তি করে যেসব অধিকার গড়ে উঠেছে, তাকে নৈতিক অধিকার বলে। নৈতিক অধিকারগুলি ভঙ্গ করলে কোনো শাস্তি পেতে হয় না। বিবেকের দংশন ও সামাজিক নিন্দা সহ্য করতে হয় কেবলমাত্র।
17. আইনগত অধিকার বলতে কী বোঝো ? একে ক-টি ভাগে ভাগ করা হয় ও কী কী ?
> যে-সমস্ত অধিকারগুলি সংবিধান ও আইন কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়, তাকে আইনগত অধিকার বলে। আইনগত অধিকার লঙ্ঘন করলে রাষ্ট্র শাস্তি দিতে পারে। যেমন— ভোটদান করার অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার। এই অধিকারে কেউ হস্তক্ষেপ করলে রাষ্ট্র শাস্তি দিতে পারে।
আইনগত অধিকারসমূহকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা—[a] পৌর অধিকার, [b] সামাজিক অধিকার, [c] রাজনৈতিক অধিকার ও [d] অর্থনৈতিক অধিকার।
18. অধিকারকে ক-ভাগে ভাগ করা যায় ও কী কী ?
> ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অপরিহার্য উপাদান হল অধিকার। প্রকৃতিগতভাবে অধিকারকে মূলত দু-ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—[a] নৈতিক অধিকার—এই অধিকারগুলি রাষ্ট্রের দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত নয়। এবং [b] আইনগত অধিকার—এই অধিকারগুলি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত।
19. রাজনৈতিক অধিকার বলতে কী বোঝো ? রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে পরিচিত এমন কয়েকটি অধিকারের নাম লেখো।
> জনগণই হল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। আর যে-সমস্ত অধিকার নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় কার্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়, সেই সমস্ত অধিকারগুলিকে রাজনৈতিক অধিকার বলে ।
ভোটদানের অধিকার, নির্বাচিত হওয়ার অধিকার, সরকারি চাকুরি লাভের অধিকার, সরকারের সমালোচনার অধিকার, বিপ্লবের অধিকার প্রভৃতি রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে পরিগণিত।
20. সামাজিক অধিকার বলতে কী বোঝো? সামাজিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি অধিকারের নাম লেখো ।
> নাগরিকদের সামাজিক জীবন সুন্দর ও সার্থক করে গড়ে তোলার জন্য এবং সমাজে তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কতকগুলি সুযোগসুবিধা একান্তভাবে প্রয়োজন। সেইসব অধিকারগুলিকে সামাজিক অধিকার বলে। এই অধিকারগুলি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত।
সামাজিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি অধিকার হল— শিক্ষার অধিকার, সুস্থ পরিবেশে বসবাসের অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার, সাম্যের অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার ইত্যাদি।
21. অর্থনৈতিক অধিকার বলতে কী বোঝো ? এর কয়েকটি উদাহরণ দাও ।
> কেবলমাত্র সামাজিক, রাজনৈতিক ও পৌর অধিকারগুলি মানুষের জীবনে পূর্ণতা আনতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক অধিকার। অর্থনৈতিক অধিকার বলতে সেই সমস্ত অধিকারকে বোঝায় যেগুলি মানুষের জীবনকে অভাব- অনটন ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দিয়ে সুখস্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নিরাপদ করে তোলার জন্য একান্ত অপরিহার্য। অর্থনৈতিক অধিকারের কয়েকটি উদাহরণ হল-কর্মের অধিকার, উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অধিকার, অবকাশের অধিকার, প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার ইত্যাদি ।
22. আর্থসামাজিক অধিকারের কয়েকটি উদাহরণ দাও।
> সমাজে মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উভয় ধরনের অধিকার প্রয়োজন। অর্থাৎ, জীবনধারণের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, পরিবার গঠনের অধিকারসহ জীবিকা অর্জনের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। উল্লিখিত অধিকারগুলি ব্যক্তিজীবনে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত হলে ব্যক্তিজীবন পরিপূর্ণতা পায়। আর উল্লিখিত অধিকারগুলিকে একত্রে আমরা আর্থসামাজিক অধিকার হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি।
[i] জীবনে স্বচ্ছলভাবে টিকে থাকতে গেলে কর্মের অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত হয় যা, অর্থনৈতিক অধিকারের উদাহরণ।
[ii] জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে নাগরিকদের অধিকার থাকে তার পছন্দমতো জীবিকা নির্বাচনের। রাষ্ট্র তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কর্ম নির্বাচনে বাধ্য করতে পারে না।
23. পৌর অধিকার বলতে কী বোঝো ? পৌর অধিকারের অন্তর্ভুক্ত এমন কতকগুলি অধিকারের নাম উল্লেখ করো ।
> বর্তমানে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ হল পৌর অধিকার। যে-সকল সুযোগসুবিধা ছাড়া মানুষ সভ্য ও সামাজিক জীবনযাপন করতে পারে না এবং যে- সুযোগের অভাবে ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব হয়। না, সেইসব সুযোগসুবিধাকে পৌর অধিকার বলা হয়।
উল্লেখযোগ্য পৌর অধিকারগুলি হল—জীবনের অধিকার, চিন্তা ও মতামত প্রকাশের অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, ধর্মের অধিকার ইত্যাদি।
24. কোন্ ধরনের অধিকারকে সংবিধানে যুক্ত করা হয় ?
> যে অধিকারগুলি নাগরিকদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ, যে অধিকারগুলির সঙ্গে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা যুক্ত, সেই ধরনের অধিকারকে সংবিধানে যুক্ত করা হয়। যেমন— ভারতের ক্ষেত্রে বাকস্বাধীনতার অধিকার।
25. সাম্যের অধিকারটি ব্যাখ্যা করো।
> সংবিধানের 14-18নং ধারায় সাম্যের অধিকারটি বর্ণিত আছে। উক্ত ধারায় সাম্যের অধিকারটিতে বলা আছে—
[i] ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা' ও আইন কর্তৃক সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার, 14নং ধারায় বর্ণিত এই অধিকারটি সাম্যের প্রথম অংশ।
[ii] 15 নং ধারায় বলা হয়েছে, জাতি, ধর্ম-বর্ণ, ইত্যাদি নির্বিশেষে সকলের সমানাধিকার।
[iii] 16নং ধারায় সরকারি চাকুরিতে সকলের সমানাধিকারের কথা বলা হয়েছে।
[iv] 17 নং ধারায় অস্পৃশ্যতার বিলোপ সম্পর্কে সকলকে সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
[v] সামরিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে গুণের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্র উপাধি বা পদ দেয়। রাষ্ট্র অন্য কোনো ক্ষেত্রে উপাধি প্রদান করে বৈষম্য তৈরি করবে না, যা 1৪নং ধারায় বলা হয়েছে।
26. ধর্মীয় অধিকার কী ?
> ব্যক্তি নাগরিক স্বচ্ছন্দে নিজের পছন্দমতো ধর্মগ্রহণ করতে পারে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারে, ধর্মীয় উপাসনা করতে পারে। এই ইচ্ছায় যাতে কোনো ব্যক্তি তথা রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে না পারে—সামগ্রিক বিষয়টি হল মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং তা ভোগ করার অধিকার, যা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত।
27. শিক্ষার অধিকার কী ?
> প্রতিটি শিশুর পড়ার স্বাধীনতা আছে। প্রতিটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার স্বাধীনতা আছে। এই স্বাধীনতাকে সংরক্ষণের জন্য শিক্ষার অধিকারকে রাষ্ট্র কর্তৃক সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাই শিক্ষার অধিকারকে রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছে।
28. কর্মের অধিকার কী ?
> সমাজে প্রতিটি ব্যক্তির ন্যূনতম চাহিদাটুকু মেটানোর স্বচ্ছলতা থাকার অধিকার আছে। তাই প্রতিটি ব্যক্তির কর্মের অধিকার থাকা বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্র ব্যক্তির কর্মের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে ব্যক্তি নাগরিকের জীবিকা নির্বাহের স্বাধীনতাকে মান্যতা প্রদান করেছে।
29. সম্পত্তির অধিকার কী ?
> ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করার এবং স্বচ্ছন্দে জীবনযাপনের মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার অধিকার আছে। সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য ব্যক্তির জীবিকানির্বাহের প্রয়োজন বা সম্পত্তির প্রয়োজন, যার মাধ্যমে ব্যক্তি নাগরিক সুন্দর ও স্বচ্ছন্দ জীবনধারণ করতে পারে।
30. প্রতিরোধের অধিকার কী ?
> প্রতিরোধের অধিকার বলতে বোঝায় রাষ্ট্রীয় আইন যদি জনস্বার্থবিরোধী হয় অথবা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তাহলে নাগরিকরা তার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে।
31. ভারতীয় নাগরিকদের দুটি মৌলিক দায়িত্ব বা দায়বদ্ধতা উল্লেখ করো ।
> ভারতীয় নাগরিকদের দুটি মৌলিক দায়িত্ব বা দায়বদ্ধতা হল—
[a] সংবিধান মান্য করা এবং সাংবিধানিক আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় স্তোত্র-এর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
[b] স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণাদানকারী সুমহান আদর্শগুলির সযত্ন সংরক্ষণ ও অনুসরণ করা।
32. অধিকার ও দায়িত্ব বা কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক কী ?
> অধিকার ও দায়িত্ব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অধিকার হল সমাজ জীবনের সেইসকল অবস্থা যেগুলি ছাড়া ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশ সম্ভব নয়। অপরদিকে, দায়িত্ব পালনের মধ্যে দিয়েই এই সুযোগসুবিধাগুলি ভোগ করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দায়িত্ব হল কর্তব্য পালনের প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 4
1. " কাকে আমরা অধিকার বলি ? কেন অধিকারের প্রয়োজন ? কোন্ দাবিগুলি অধিকারের স্বীকৃতি পায় ?
> অধিকার: অধিকারগুলি হল নিম্নরূপ—
[i] সমাজে কোনো একজন ব্যক্তির, নাগরিক বা মনুষ্য জাতি হিসেবে স্বীকৃতি বা পরিচিতি।
[ii] সমাজ অধিকারকে বৈধ দাবি হিসেবে সমর্থন করে।
[iii] আমি কী চাই এবং ভাবি আমি পাওয়ার অধিকারী কিনা —এই দু'য়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে অধিকার।
অধিকারের প্রয়োজনীয়তা: অধিকারের প্রয়োজনগুলি হল—
[i] ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়ে জীবনের স্বচ্ছলতা ও স্বাচ্ছন্দ্য গড়ে তোলে অধিকার, যার মানে ব্যক্তি সমাজে সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারে।
[ii] বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার ভোগ করে।
[iii] সরকারকে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে সচেতন করা অধিকারের কাজ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অধিকারের ওপর ভিত্তি করেই জনসমাজ সরকারের প্রতি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যত্নবান হতে পারে।
[iv] গোটা বিশ্বেই অধিকার প্রয়োজনীয় অর্থাৎ, জীবনের ভাব প্রকাশের, স্বাধীনতার অধিকার ইত্যাদি।
[v] অধিকার ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহযোগী ভূমিকা পালন করে, যাতে ব্যক্তি তার যোগ্যতা অনুযায়ী দক্ষতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়।
অধিকারের দাবি: যে-দাবিগুলি অধিকারের পরিচিতি লাভ করে—
[i] জীবিকানির্বাহের জন্য রোজগারের দাবি।
[ii] যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী শিক্ষার ও কর্মের দাবি।
[iii] ‘শ্রদ্ধাপূর্ণ ও সম্মানজনক' জীবনের দাবি।
[iv] মনুষ্য প্রজাতি অধিকার হিসেবে স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক দাবিগুলি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। যেমন— জীবন, সম্পত্তি ও স্বাধীনতার অধিকার।
[v] কিন্তু ব্যক্তির এমন কোনো কাজ যদি তা ক্ষতিকর হয় তা কখনোই অধিকারের শিরোপা পেতে পারে না। যেমন—ধূমপান, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর তা কখনোই ব্যক্তির অধিকার হতে পারে না ।
2. কোন্ পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অধিকারকে বিশ্বজনীন হিসেবে সমর্থন করা হয় ? যুক্তিসহ আলোচনা করো।
> বেশ কিছু অধিকারকে বিশ্বজনীন স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তাদের প্রকৃতিগত দিক থেকে। ওই অধিকারগুলি সমাজে সকল ব্যক্তির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— জীবনের অধিকার, ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার।
এর কারণ হিসেবে নিম্নলিখিত যুক্তিগুলি বলা যেতে পারে—
[i] মনুষ্য জীবনে সম্মান রক্ষার্থে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বসংসারে সম্মান ও শ্রদ্ধাপূর্ণ পরিচিতি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে গেলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে বিশ্বজনীন অধিকার হিসেবে সমর্থন করা যেতে পারে।
[ii] ব্যক্তির নিজ পছন্দমতো ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতানুযায়ী দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা সহযোগী ভূমিকা পালন করে। আর এই ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের জন্য সরকার তার সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে সতর্ক হয়।
[iii] শিক্ষার অধিকার ব্যক্তির দক্ষতাকে আরও সুনিপুণ করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে এবং নাগরিকদের নিজের পছন্দমতো যে-কোনো ক্ষেত্রে, যে-কোনো জায়গায় কর্মজীবনে প্রবেশাধিকার গড়ে তোলে। সুতরাং, এইভাবে শিক্ষার অধিকার সর্বজনীন প্রকৃতি হিসেবে গড়ে উঠেছে।
3 রাষ্ট্র কী করবে না—এমন কিছু বলে অধিকার, সেগুলি কী ?
> নাগরিকদের প্রতি কী করণীয় সেই বিষয়ে অধিকার, রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করে। প্রতিটি অধিকারই রাষ্ট্রের কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়—উভয় ধরনের নির্দেশই দিয়ে থাকে। যেমন—জীবনের অধিকার অনুযায়ী কেউ আমাকে আঘাত করলে বা ক্ষতি করতে চাইলে রাষ্ট্র আমাকে আইনের দ্বারা রক্ষা করবে এবং যে ক্ষতি করতে চাইছে তাকে শাস্তি দেবে। অন্যদিকে, জীবনের অধিকার বলতে যদি সুন্দরভাবে এবং স্বাস্থ্যকরভাবে জীবনযাপনকে বোঝায় তাহলে পরিবেশ দূষণ রোধে রাষ্ট্র আইনমূলক ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু অধিকার কেবল রাষ্ট্রকে করতেই বলে না, কী করা উচিত নয়, এমন নির্দেশও দেয়। স্বাধীনতার অধিকার অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার করতে পারবে না। তা ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী হবে। এর অন্যথা হলে ব্যক্তিস্বাধীনতা রাষ্ট্র কর্তৃক সংকুচিত হবে, লাঞ্ছিত হবে। কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলে তার নির্দিষ্ট কারণ দর্শাতে রাষ্ট্র বাধ্য। তাই ব্যক্তিস্বাধীনতা রাষ্ট্র কর্তৃক সংকুচিত হলেও রাষ্ট্র কারণ দর্শাতে বাধ্য। নচেৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মানহানির মামলা করার অধিকারী।
সংক্ষেপে বলা যায়, রাষ্ট্র কোনোভাবেই নাগরিকদের জীবনের পবিত্রতা, মর্যাদা, সম্মান, শ্রদ্ধা কোনো কিছুই নষ্ট করতে বা সংকুচিত করতে পারে না। ব্যক্তি নাগরিকদের অধিকারগুলি রাষ্ট্রকে এসব করার পথে বাধাপ্রদান করে। ব্যক্তিজীবনের প্রতি রাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপকে বাধা দিতেই সংবিধানে মৌলিক অধিকারের লিপিবদ্ধকরণ। সুতরাং, ব্যক্তিজীবনের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করাতে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ।
4. স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্বটি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
> যেসব অধিকারগুলি সমাজজীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সেইসব অধিকারগুলিকে বলে স্বাভাবিক অধিকার। মানুষ কতগুলি অধিকার নিয়ে জন্মায়। এই সহজাত অধিকারগুলি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ঊর্ধ্বে। যেমন—জীবনের অধিকার, বাকস্বাধীনতার অধিকার ইত্যাদি। স্বাভাবিক অধিকারের ধারণাটি অতি প্রাচীন। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই অধিকারটির বিকাশ ঘটে। স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্বের প্রবক্তাদের মতে, প্রাক্ রাষ্ট্রীয় যুগে স্বাভাবিক অধিকার ছিল। চুক্তির মধ্যদিয়ে রাষ্ট্র সৃষ্টির ফলে স্বাভাবিক অধিকারের কোনো ক্ষতি হয়নি। ফ্রান্স ও আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্বের বাস্তব রূপ দেখতে পাওয়া যায়। বলা হয় যে, মানুষ ঈশ্বরের দ্বারা কতকগুলি অবিচ্ছেদ্য অধিকারে আবদ্ধ। অধিকার মানুষের সমাজবোধ থেকে সৃষ্টি হয়। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অধিকারেরও পরিবর্তন হয়।
সুতরাং, অধিকার শাশ্বত ও সহজাত হতে পারে না। তবে স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্বটি মূল্যহীন নয়। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে শোষিত, দরিদ্র মানুষের কাছে স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্বটি উচ্চমানের সৃষ্টি করে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, স্বাভাবিক অধিকার মানুষের বিকাশের পক্ষে অপরিহার্য।
5. সাংবিধানিক এবং প্রাকৃতিক অধিকারের পার্থক্যগুলি কী ?
> সংবিধান স্বীকৃত বা সংরক্ষিত অধিকারগুলি সাংবিধানিক আইন যা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাপ্ত হয়। অন্যদিকে, যে অধিকারগুলি নিয়ে আমরা জন্মগ্রহণ করি, কারোর দ্বারা প্রদত্ত নয় বা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, সেই অধিকারগুলি স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক অধিকার। এই অধিকার দুটির মধ্যে কয়েকটি পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়—
[i] সাংবিধানিক আইন সংবিধান স্বীকৃত। প্রাকৃতিক অধিকার- গুলি ভগবানপ্রদত্ত।
[ii] প্রাকৃতিক অধিকারগুলি স্বাভাবিক এবং মনুষ্যজাতির জন্য প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে, সাংবিধানিক আইনগুলি রাষ্ট্রকর্তৃক ব্যক্তিনাগরিকের জন্য প্রদত্ত অধিকার যা নির্দিষ্ট এবং আইনের সাহায্যে প্রয়োগ করা হয়।
[iii] জীবন, সম্পত্তি এবং স্বাধীনতার অধিকার—এই তিনটি হল প্রাকৃতিক অধিকারের উদাহরণ। অন্যদিকে, সাংবিধানিক অধিকারের উদাহরণ হল—ভোট প্রদান, সাম্য এবং নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ।
6. ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহযোগী অধিকারের কেন প্রয়োজন ?
> প্রতিটি ব্যক্তি তার জন্মগত অধিকার নিয়েই জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু জীবনে বেঁচে থাকতে বা টিকে থাকতে গেলে সেই অধিকারকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, ওই অধিকারগুলি অনেক সময় যথেষ্টও হয় না। রাষ্ট্রপ্রদত্ত ও স্বীকৃত অধিকারের প্রয়োজনীয়তা থাকে। কিন্তু এই সকল অধিকারের প্রয়োজনীয়তা তখনই সম্পূর্ণ হয় যখন ওই অধিকারগুলি মনুষ্য জীবনের বিকাশে পরিপূর্ণতা আনে।
[i] অধিকার সব সময়ই ব্যক্তি জীবনের বিকাশের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি করে। এতেই অধিকারের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
[ii] নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলি ব্যক্তির যোগ্যতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তির ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর উপযোগী করে তোলে।
[iii] মৌলিক অধিকারগুলি ব্যক্তিকে কেবল তার ন্যূনতম চাহিদাই নয়, তার নিজের পছন্দমতো জীবিকা নির্বাহের উপযোগী করে তোলে। আর এইভাবে অধিকারগুলি ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহযোগী ভূমিকা পালন করে।
7. অধিকারের রক্ষাকবচ কোন্গুলি ?
> ব্যক্তির মৌলিক অধিকারগুলিকে রক্ষা করার জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে ভারতীয় সংবিধানে—
[i] সংবিধানে আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অর্থাৎ, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনসমূহ কর্তৃক সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার সংবিধান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
[ii] প্রেস বা মিডিয়ার রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার স্বাধীনতা আছে।
[iii] ব্যক্তির মৌলিক অধিকার খর্ব হলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বা লড়াই করার স্বাধীনতা স্বীকৃত।
[iv] অধিকারের খর্ব হওয়াকে রোধ করতে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণও একধরনের রক্ষাকবচ যা সংবিধানে স্বীকৃত।
[v] নিরপেক্ষ আদালত ও জনমত।
8. কীভাবে আমরা বলতে পারি, অধিকারের মধ্যেই দায়িত্ব বা কর্তব্য নিহিত রয়েছে ?
> একই বিষয়ের দুটি দিক হল অধিকার ও দায়িত্ব বা কর্তব্য। উভয়ই অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। একটিকে ছাড়া অন্যটি অর্থহীন এবং অস্তিত্বহীনও বটে। সুতরাং, একটি ছাড়া অন্যটির প্রয়োগ অসম্ভব। সেক্ষেত্রে আগে দায়িত্ব পরে অধিকার আসে ক্রমানুযায়ী—
[i] দায়িত্ব বা কর্তব্য আমাদের অন্যদের প্রতি দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে, অধিকার হল আমাদের প্রতি অন্যের দায়বদ্ধতা। অর্থাৎ, রাষ্ট্র আমাদের অধিকার প্রদান করে আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, পাশাপাশি আমাদের সেক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা তৈরি হয় রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করার। সেইহেতু সংবিধানে 51 (a) নং ধারায় 11টি মৌলিক কর্তব্য সংযোজিত হয়েছে যা আমাদের রাষ্ট্রের প্রতি পালন করার কথা।
[ii] সুতরাং, অধিকার ভোগের মাধ্যমেই আমরা দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে শিখি।
[iii] আমরা যখনই কোনো একটি অধিকার ভোগ করছি ঠিক তখনই অন্যের প্রতি একটি দায়িত্ব বা কর্তব্য পালনকে নিশ্চিত করছি।
9. অধিকারের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা কী? অধিকারের উৎসগুলি কী ?
> ঐতিহাসিকভাবে অধিকারের উৎস সমাজ। সামাজিক মানুষের পারস্পরিক সুযোগসুবিধার আদানপ্রদান ও নৈতিকতা থেকে অধিকারের সৃষ্টি ।
[i] সমাজের প্রচলিত প্রথা যেগুলিকে নাগরিকরা প্রায় কখনোই অমান্য করে না, সেইগুলি অধিকারের অনুমোদন পায় ।
[ii] বহুদিন ধরে প্রচলিত রীতি বা প্রথাগুলি ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরেই মেনে আসে, তাই প্রথাগুলির প্রতি নাগরিকদের স্বীকৃতি থাকে বরাবর। তাই ওই স্বীকৃত প্রথাগুলিকে রাষ্ট্র অধিকারের মর্যাদা দিয়ে নির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত করে।
[iii] আধুনিক যুগে অধিকারের প্রধান উৎস হল সংবিধান ও আইনসভা কর্তৃক গৃহীত ‘বিধিবদ্ধ আইন'। যেমন— ভারতের সংবিধানে সম্পত্তির অধিকার মৌলিক অধিকারের তালিকা থেকে বাতিল হয় গেলেও বিধিবদ্ধ অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আছে।
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 6
1. অধিকার বলতে কী বোঝায় ? নাগরিকদের পৌর অধিকার- গুলি বর্ণনা করো।
> অধিকার: অধিকার হল সমাজজীবনের সেইসব অবস্থা যেগুলি ছাড়া মানুষ সাধারণভাবে তার ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশসাধন করতে পারে না। আবার রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ছাড়া অধিকার পূর্ণ হতে পারে না। সুতরাং, অধিকারগুলি হল রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং সংরক্ষিত দাবি। এককথায় বলতে গেলে, অধিকার হল মানুষের ব্যক্তিগত বিকাশের উপযোগী সেইসব সুযোগসুবিধা যেগুলি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়।
নাগরিকদের পৌর অধিকার: যেসব সুযোগসুবিধাগুলি ছাড়া মানুষ সভ্য ও সামাজিক জীবনযাপন করতে পারে না এবং যে-সমস্ত সুযোগের অভাবে ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশসাধন ব্যাহত হয়, সেইসব সুযোগসুবিধাকে পৌর অধিকার বলা হয়। পৌর অধিকারগুলি হল—
[i] বাঁচার বা জীবনের অধিকার: বেঁচে থাকার এবং জীবন- রক্ষার অধিকার নাগরিকদের একটি অপরিহার্য পৌর অধিকার। তাই প্রত্যেক রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়বদ্ধতা হল নাগরিকদের জীবন সংরক্ষণ করা। তাই সংবিধানের 21নং ধারাতে ব্যক্তির জীবনের অধিকার স্বীকৃত।
[ii] স্বাধীনতার অধিকার: নাগরিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পৌর অধিকার হল স্বাধীনতার অধিকার। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ছ-টি অধিকার ভারতের সংবিধানের 19নং ধারায় জনগণের জন্য স্বীকৃত। সেগুলি হল—
[a] বাকস্বাধীনতার অধিকার,
[b] স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার,
[c] বিনা বিচারে আটক না-হওয়ার অধিকার,
[d] সংঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার,
[e] সভা-জমায়েতে যোগ দেওয়ার অধিকার,
[f] পেশা ও বৃত্তির অধিকার।
[iii] সম্পত্তির অধিকার: সম্পত্তির অধিকার বলতে আইন- সংগতভাবে সম্পত্তি ভোগ, অর্জন ও ক্রয়বিক্রয়ের সুযোগকে বোঝায়। ভারতে বর্তমানে সম্পত্তির অধিকার একটি সাংবিধানিক অধিকার, মৌলিক অধিকার নয়।
[iv] ধর্মের অধিকার: প্রতিটি নাগরিক স্বেচ্ছায় ধর্মগ্রহণ করতে পারবে, ধর্মীয় আচার-আচরণে অংশগ্রহণ করতে পারবে, সেইসঙ্গে নিজ ধর্মমত প্রচারও করতে পারবে। আমাদের সংবিধানের 25 28 নং ধারায় ধর্মাচরণের অধিকার স্বীকৃত।
[v] সাম্যের অধিকার: সাম্যের অধিকার হল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। পৌর অধিকার। সাম্যের অর্থ হল আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান। সমাজে সাম্য না থাকলে অন্যান্য অধিকার নাগরিকদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে।
[vi] পরিবার গঠনের অধিকার: গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, সমাজজীবনের মূলভিত্তি হল পরিবার। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পরিবার গঠন ছাড়া সমাজজীবনের কল্পনা অবাস্তব। এ কারণে পরিবার গঠনের অধিকার সব রাষ্ট্রেই স্বীকৃত।
[vii] সংঘ গঠনের অধিকার: সমাজে মানুষের বহুবিধ প্রয়োজন মেটানোর জন্য নানা ধরনের সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ব্যক্তি যখন তার দাবিকে একা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না, তখন সেই দাবিকে সংঘবদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংঘ গঠন করে।
তবে পৌর অধিকারগুলি অবাধ ও নিরঙ্কুশ হতে পারে না। প্রতিটি অধিকার ভোগের সঙ্গে কর্তব্যপালন বাঞ্ছনীয়। তা না হলে কোনো ব্যক্তি নিজ অধিকার দাবি করতে পারে না।
2. অধিকারের বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী ?
> ব্যাপক অর্থে অধিকার শুধু দাবিই বোঝায় না। বিভিন্ন অধিকারের মধ্যদিয়ে নাগরিক তার পূর্ণ ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়। অধিকারের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল নিম্নরূপ—
[i] অধিকারের উৎস সমাজজীবন। সমাজজীবন ব্যতীত অধিকার থাকতে পারে না। যেমন— নির্জন দ্বীপে রবিনসন ক্রুশোর কোনো অধিকার ছিল না।
[ii] সমাজে অধিকার ভোগ করে ব্যক্তি । অধিকারের অর্থ সমাজে ব্যক্তির অধিকার। এই অধিকারই ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের এবং সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্দেশ করে।
[iii] গ্রিনের মতে, 'অধিকারের বৈশিষ্ট্য হল স্বাধীনভাবে চলার দাবি। অধিকার ব্যক্তির অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে বিকশিত করে। ব্যক্তির স্বাধীনতার দাবি সমাজের মঙ্গলের জন্য।
[iv] ল্যাস্কির মতে, অধিকারের উৎস সমাজজীবন ও পরিবেশ যেগুলি না-থাকলে ব্যক্তি নিজেকে বিকশিত করতেপারে না। তাঁর মতে, ‘অধিকারের উৎস ব্যক্তি ও সমাজজীবন। ল্যাস্কি অধিকারকে দেখেছেন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের দিক থেকে।
[v] বার্কারের মতে, অধিকারের উৎস ন্যায়। তাঁর মতে, ‘প্রতিটি রাষ্ট্রই আইনের মাধ্যমে ন্যায়ব্যবস্থাকে রূপায়িত করে।' তাঁর মতানুযায়ী, আদর্শ অধিকারের উৎস দুটি— [a] ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, [b] রাষ্ট্র ও তার আইন। অধিকার এই দুই উৎস থেকে উদ্ভূত হয়। আদর্শ অধিকারের বৈশিষ্ট্য দুটি—[a] অধিকার ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের শর্ত [b]আইনের দ্বারা অধিকার স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়।
[vi ] অধিকারের অপর বৈশিষ্ট্য হল, কোনো অধিকারই সমাজ- নিরপেক্ষ নয় এবং কোনো অধিকার সীমাহীন নয়।
[vii] অধিকার বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে পারে না। প্রতিটি অধিকারই অন্যান্য অধিকারের সঙ্গে যুক্ত।
[viii] মার্কসীয় তত্ত্বে অধিকারকে শ্রেণিস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে দেখা হয়। সব অধিকারের দাবি সমাজের কোনো- না-কোনো শ্রেণির দাবি।
3. স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্বটি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
> যেসব অধিকারগুলি সমাজজীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সেইসব অধিকারগুলিকে বলে স্বাভাবিক অধিকার। মানুষ কতকগুলি অধিকার নিয়ে জন্মায়। এই সহজাত অধিকারগুলি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ঊর্ধ্বে। যেমন—জীবনের অধিকার, বাকস্বাধীনতার অধিকার ইত্যাদি। স্বাভাবিক অধিকারের ধারণাটি অতি প্রাচীন। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই অধিকারটির বিকাশ ঘটে। স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্বের প্রবক্তাদের মতে, প্রাক্-রাষ্ট্রীয় যুগে স্বাভাবিক অধিকার ছিল। চুক্তির মধ্যদিয়ে রাষ্ট্র সৃষ্টির ফলে স্বাভাবিক অধিকারের কোনো ক্ষতি হয়নি। ফ্রান্স ও আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্বের বাস্তব রূপ দেখতে পাওয়া যায়। বলা হয় যে, মানুষ ঈশ্বরের দ্বারা কতকগুলি অবিচ্ছেদ্য অধিকারে আবদ্ধ। আর এই অধিকারগুলি ছাড়া রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না। কিন্তু অনেকে বলেন যে, স্বাভাবিক অধিকার তত্ত্বটি অবাস্তব। অধিকার মানুষের সমাজবোধ থেকে সৃষ্টি হয়। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অধিকারেরও পরিবর্তন হয়। সুতরাং, অধিকার শাশ্বত ও সহজাত হতে পারে না। তবে স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্বটি মূল্যহীন নয়। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে শোষিত, দরিদ্র মানুষের কাছে স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্বটি উচ্চমানের সৃষ্টি করে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, স্বাভাবিক অধিকার মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে অপরিহার্য।
4. মানবাধিকারের অর্থ এবং প্রকৃতি লেখো।
> যুক্তিবাদী দার্শনিক জন লক, রুশো, ভলতেয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের রচনায় মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ধারণার সন্ধান পাওয়া যায়। মানবাধিকার বলতে প্রতিটি মানুষের আত্মমর্যাদার সঙ্গে জীবনধারণের অধিকার, স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার এবং সমতা ও সমমর্যাদার অধিকারকে বোঝায়। মানবাধিকার হল মনুষ্য প্রজাতির অধিকার, যার সাহায্যে মানুষ তার সহজাত গুণাবলি, বুদ্ধি ও প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশসাধন করতে পারে।
প্রকৃতিগতভাবে মানবাধিকার সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ডি ডি বাসু তাই বলেছেন, মানবাধিকার হল সেইসব ন্যূনতম অধিকার যেগুলি সব মানুষ মানব পরিবারের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্র ও অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভোগ করে।
ভারতে 1993 খ্রিস্টাব্দে লোকসভায় মানবাধিকার সম্পর্কে একটি আইন পাস হয় । আইনটির নাম Protection of Human Rights Act, 1993। অর্থাৎ, মানবাধিকার সংরক্ষণ আইন। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের 1948 খ্রিস্টাব্দের 10 ডিসেম্বর মানবাধিকার সম্পর্কিত বিশ্বজনীন ঘোষণা সাধারণ সভায় গৃহীত হয়েছে।
ঘোষণাপত্রের মুখবন্ধে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং প্রতিটি মানুষ জাতি, বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, জন্মস্থান, নারী-পুরুষ এবং মর্যাদাগত পার্থক্য নির্বিশেষে ঘোষণাপত্রে বিধিবদ্ধ অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগের সমানাধিকারী।
* মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র: মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে কয়েকটি অধিকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন—
[i] প্রত্যেকটি মানুষের জন্য জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার ।
[ii] আইনের দৃষ্টিতে সাম্যের অধিকার।
[iii] চিন্তা ও মতামত প্রকাশের অধিকার।
[iv] নারী ও পুরুষের সমতা ও সম্পত্তির মালিকানার অধিকার।
[v] চাকুরি ও অবসর গ্রহণের অধিকার।
[vi] শ্রমিক সংঘে যোগদানের অধিকার।
[vii] স্বাধীনভাবে চলাচল ও বাসস্থানের অধিকার।
[viii] কর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার।
[ix] সামাজিক নিরাপত্তা, ভোটদানের অধিকার।
[x] বেআইনি আটক ও গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার ইত্যাদি।
* মানবাধিকারের প্রকৃতি: মানবাধিকারের সংজ্ঞা ও ধারণা বিশ্লেষণ করলে মানবাধিকারের প্রকৃতির যে-দিকগুলির সন্ধান পাওয়া যায়, সেগুলি হল—
[i] সর্বজনীন অধিকার: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের 1948 খ্রিস্টাব্দের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে মানবাধিকারকে বিশ্বজনীন অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানবাধিকারের গণ্ডি কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিক সমাজ, পারিবারিক সংগঠন, সরকারি বা বেসরকারি সংগঠনের সদস্য নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ এইসব অধিকার ভোগ করার অধিকারী।
[ii] বিশ্বশান্তির অধিকার: মানবাধিকার বিশ্বশান্তি ও সুস্থিতির পক্ষে এক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
[iii] প্রগতিশীল ও ইতিবাচক অধিকার: মানবাধিকার এমন এক ধরনের প্রগতিশীল ও ইতিবাচক অধিকার যা প্রতিটি মানুষের জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সবরকম বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সমতাকে নিশ্চিত করে।
[iv] অহস্তান্তরযোগ্য: মানবাধিকার যেহেতু প্রতিটি মানুষের সহজাত অধিকার, তাই প্রকৃতিগতভাবে মানবাধিকার হল অহস্তান্তরযোগ্য। এই অধিকার কোনো ব্যক্তি অপরকে অর্পণ করতে পারে না।
[v] স্বাভাবিক অধিকার: মানবাধিকার প্রকৃতিতে সহজাত ও স্বাভাবিক। এইসমস্ত অধিকার মানুষ জন্মগতভাবেই অর্জন করে থাকে। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন বা আইন দ্বারা এইসমস্ত অধিকার প্রদত্ত হয় না।
5. অধিকার ও মানবাধিকারের মধ্যে পার্থক্য লেখো।
> অধিকার ও মানবাধিকারের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করার পূর্বে অধিকার ও মানবাধিকারের সংজ্ঞা দেওয়া দরকার।
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তিই চায় তার ব্যক্তিসত্তাকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করতে। এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজন হয় কতকগুলি সামাজিক সুযোগসুবিধার। এই সকল সামাজিক সুযোগ-সুবিধাকে অধিকার বলে।
মানবাধিকার বলতে সেইসব অধিকারকে বোঝায় যা জন্মগত- ভাবে প্রত্যেকেরই আছে। মানবাধিকার হল সেইসব অধিকার যেগুলির সাহায্যে মানুষ তার সহজাত গুণাবলি ও প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে এবং আত্মিক ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম।
অধিকার ও মানবাধিকারের মধ্যে অনেকগুলি পার্থক্য লক্ষ করা যায়, যেগুলি বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে—
[i] আইনের অনুমোদন: অধিকার একটি আইনগত ধারণা। রাষ্ট্রীয় আইনের অনুমোদন ছাড়া অধিকার অর্থহীন। রাষ্ট্র স্বীকৃত অধিকার আইনানুমোদিত। কিন্তু মানবাধিকারের কোনো আইনগত অনুমোদন নেই । এর ভিত্তি হল স্বাভাবিক অধিকারের তত্ত্ব। ওই তত্ত্ব মনে করে, মানুষ স্বাধীন এবং সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাই মানবাধিকারকে বলা হয় মানব প্রজাতির অধিকার।
[ii] প্রতিবিধানের ব্যবস্থা: অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হতে হলে অধিকার ভঙ্গের ক্ষেত্রে তা প্রতিহত এবং প্রতিবিধান করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় অধিকারের ক্ষেত্রে এরূপ ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে যদিও প্রতিবিধানের জন্য মানবাধিকার কমিশনসহ অন্যান্য সংস্থা এবং ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু শাস্তিবিধানের জন্য কোনো দমনমূলক শক্তি না-থাকায় মানবাধিকার নিছক সুপারিশে আবদ্ধ রয়েছে।
[iii] বিচারালয়ের প্রতিকার: রাষ্ট্র স্বীকৃত অধিকার সাধারণভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় সংবিধান বা আইনি দলিলে বিধিবদ্ধ থাকে। তাই এগুলি লঙ্ঘিত হলে বিচারালয়ে প্রতিকার প্রার্থনা করা যায়। কিন্তু মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র তা নয় । এই অধিকারগুলি অনেকটা আমাদের দেশের সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির মতো। নৈতিক মূল্য এবং আলংকারিক শোভা থাকলেও মানবাধিকার আদালতগ্রাহ্য নয়।
[iv] সার্বভৌমের নির্দেশ: অনেক বিদ্বজ্জন মনে করেন, অধিকারের ভিত্তি হল সার্বভৌমের নির্দেশ ও আদেশ। অর্থাৎ, সার্বভৌমের অস্তিত্ব না থাকলে অধিকারের কোনো স্বীকৃতি থাকে না। মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র কোনো সার্বভৌমের নির্দেশ নয়, এগুলি জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভা দ্বারা গৃহীত। কিন্তু জাতিপুঞ্জ সার্বভৌম সংস্থা নয়।
[v] আদালত মান্যতা: কোনো রাষ্ট্র কর্তৃক বিধিবদ্ধ কোনো আইনের সঙ্গে যদি ঘোষণাপত্রে স্বীকৃত কোনো মানবাধিকারের বিরোধিতা দেখা যায়, তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের আইনের চোখে মানবাধিকারটি আদালতগ্রাহ্য হবে না।
[vi] ভৌগোলিক গণ্ডি: রাষ্ট্র স্বীকৃত অধিকার নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে কার্যকর থাকে। কিন্তু মানবাধিকার সারা বিশ্বে ব্যাপ্ত এবং বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য স্বীকৃত।
[vii] জাতীয়তা এবং আন্তর্জাতিকতা: অধিকার একটি রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় ব্যাপার। প্রতিটি জাতি তার নিজস্ব ইচ্ছা ও প্রয়োজন অনুসারে অধিকারকে বিধিবদ্ধ করে। অন্য কোনো রাষ্ট্র বা জাতির তা মান্য করার বাধ্যবাধকতা থাকে না। কিন্তু মানবাধিকার একটি আন্তর্জাতিক ব্যাপার। অধিকারের এরূপ আন্তর্জাতিকরণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
[viii] প্রকৃতিগত পার্থক্য ও সর্বজনীনতা: বিভিন্ন দেশের অধিকারের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। সমাজতান্ত্রিক দেশে অর্থনৈতিক অধিকার স্বীকৃত, অন্য সমাজব্যবস্থায় ওই অধিকার স্বীকৃতি পায় না। কিন্তু মানবাধিকার সর্বজনীন— পৃথিবীর সকল দেশে এক এবং অভিন্ন। তা ছাড়া, সকল শ্রেণির অধিকারই মানবাধিকারের মধ্যে স্বীকৃত হয়েছে।
[ix] অধিকার আছে, কিন্তু দায়বদ্ধতা নেই: অধিকারের সঙ্গে দায়বদ্ধতা পারস্পরিকভাবে যুক্ত। অধিকার ও দায়বদ্ধতা একই মুদ্রার দুটি দিক। কর্তব্যের প্রেক্ষাপটেই অধিকার অর্থবহ হয়ে ওঠে। ভারতের সংবিধানে অধিকারের পরে দায়বদ্ধতা লিপিবন্ধ হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে শুধুমাত্র অধিকারগুলিই লিপিবদ্ধ হয়েছে, পাশাপাশি কোনো দায়বদ্ধতা সংযোজন করা হয়নি। কোনো দায়বদ্ধতা ছাড়াই এই অধিকারগুলি ভোগ করা যায়।
[x] ব্যক্তির কল্যাণ বনাম সমষ্টির কল্যাণ: অধিকার হল সমাজজীবনের সেই সকল শর্ত যা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অপরিহার্য। এগুলি ব্যক্তির অধিকারকে সৃষ্টি এবং সংরক্ষণ করে। কিন্তু মানবাধিকারের লক্ষ্য হল সমষ্টিগত কল্যাণকে সুনিশ্চিত করা। তাই মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে সমষ্টিগত কল্যাণকে নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বমানব পরিবারের প্রত্যেকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে যে, মানবাধিকারের স্বীকৃতিই হল মানবসভ্যতার বিকাশের শর্ত।
6. নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকারগুলি লেখো।
> যেসব অধিকার থাকলে রাষ্ট্রের কাজকর্মে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করা যায় সেইসব অধিকারকে রাজনৈতিক অধিকার বলে। এগুলি হল—
[i] ভোটদানের অধিকার: ভোটদানের অধিকার হল একটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার। এই অধিকারের মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের পছন্দ- মতো সরকার গঠন করতে পারে। তবে বিদেশি, দেউলিয়া বা বিকৃত মস্তিষ্ক ব্যক্তিদের ভোটাধিকার থাকে না।
[ii] নির্বাচিত হওয়ার অধিকার: শাসনকার্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্রতিটি নাগরিকেরই প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার আছে।
[iii] সরকারি চাকুরি পাওয়ার অধিকার: যোগ্যতা অনুযায়ী জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের চাকুরি পাওয়ার অধিকার আছে।
[iv] সরকারের সমালোচনা করার অধিকার: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের কাজকর্ম নিয়ে সমালোচনা করার অধিকার জনগণের রয়েছে।
[v] প্রতিবাদ করার অধিকার: যদি নাগরিকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় তবে নাগরিকরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে তার প্রতিবিধানের চেষ্টা করতে পারে। সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ বিষয়ে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করার অধিকার আছে।
[vi] বিদেশে নিরাপত্তার অধিকার: বিদেশে থাকাকালীন নাগরিকরা নিজ রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তার অধিকার দাবি করতে পারে।
7. নাগরিকদের সামাজিক অধিকারগুলি লেখো ।
> মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। তাই সমাজেই তার বিকাশ সম্ভব। সমাজের সদস্য হিসেবে ব্যক্তিসত্তার পূর্ণ বিকাশের জন্য কতকগুলি সামাজিক সুযোগসুবিধা সে ভোগ করে। সেগুলি হল—
[i] সামাজিক সাম্যের অধিকার: সমাজে সামাজিক বৈষম্য থাকলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত হয় বা সঠিকভাবে উন্নয়ন- মূলক কাজ রূপায়িত হতে পারে না। তাই স্ত্রী-পুরুষ, জাতিধর্মনির্বিশেষে সমস্ত নাগরিকের সামাজিক দিক থেকে সাম্যের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
[ii] শিক্ষার অধিকার: সভ্য সমাজগঠনের কাজে শিক্ষার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । শিক্ষা ছাড়া মানুষ কখনোই আত্মসচেতন হয়ে উঠতে পারে না। সেজন্য শিক্ষার অধিকার স্বীকার করে নেওয়া প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।
[iii] সুস্থ জীবনযাপনের অধিকার: সুস্থ সামাজিক পরিবেশে জীবনযাপন করা প্রত্যেকের জন্মগত অধিকার। কারণ, সুস্থ সামাজিক পরিবেশে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। তাই সমাজজীবনে সুস্থ পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ।
[iv] ধর্মের অধিকার: স্বাধীনভাবে ধর্মাচরণ ও ধর্মপ্রচার করার অধিকারকে ধর্মের অধিকার বলে।
[v] স্বাস্থ্যের অধিকার: প্রতিটি রাষ্ট্রের নাগরিকরা যাতে সুস্থ ও সবল দেহের অধিকারী হতে পারে তার সুব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের একান্ত দায়বদ্ধতা।
[vi] শোষণমুক্তির অধিকার: মানবসমাজের ইতিহাসে শোষণ এক অভিশাপ। তা সত্ত্বেও উন্নত দেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে আজও আমরা শিশুশ্রম লক্ষ করি। শিশুশ্রম এখনও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়নি। তাই রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা প্রতিটি ব্যক্তির শোষণমুক্তির অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।
[vii] সাংস্কৃতিক অধিকার: প্রত্যেকে যাতে স্বাধীনভাবে নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, ঐতিহ্য প্রভৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশ ঘটাতে পারে এবং নিজ নিজ প্রতিভা অনুযায়ী বিজ্ঞান, সাহিত্য ইত্যাদি চর্চা করতে পারে তার ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
8. নাগরিকদের অর্থনৈতিক অধিকারগুলি লেখো।
> অর্থনৈতিক অধিকার বলতে সেই অধিকারকেই বোঝায় যা মানুষকে অভাব-অনটন ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দেয় এবং জীবনকে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখে। নাগরিকদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অধিকারসমূহের মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ।
[i] জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত মজুরি পাওয়ার অধিকার: জীবনধারণের জন্য প্রতিটি কর্মরত ব্যক্তির উপযুক্ত কাজের জন্য উপযুক্ত মজুরি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তা ছাড়া, একই কাজে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সকলের সমান পারিশ্রমিক পাওয়ার বিষয়টিও অর্থনৈতিক অধিকারের মধ্যে স্বীকৃত ।
[ii] বিশ্রামের অধিকার: মানুষ যন্ত্র নয়, তাই তার কাজের মধ্যে অবসর অবশ্যই প্রয়োজন। বিশ্রামের অধিকার না- থাকলে মানুষের পক্ষে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব নয়।
[iii] কর্মের অধিকার: রাষ্ট্রের প্রধান দায়বদ্ধতা হল প্রতিটি ব্যক্তি যাতে তার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা অনুসারে কর্মে নিযুক্ত হতে পারে তার ব্যবস্থা করা। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র- গুলিতে কর্মের অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।
[iv] শ্রমিক সংঘ গঠনের অধিকার: শ্রমিক সংঘ গঠনের অধিকার এবং তাতে যোগদানের অধিকার, বর্তমানে অন্যতম অর্থনৈতিক অধিকার। শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয় শ্রমিক সংঘ গঠনের মাধ্যমে।
[v] বার্ধক্যে ও অক্ষমতায় প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার: একজন নাগরিকের তার রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যখন বার্ধক্যে উপনীত হয় সে ক্রমে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা হল ব্যক্তির অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অধিকার স্বীকার করে নেওয়া ।
[vi] পরিচালন ব্যবস্থায় কর্মীদের অংশগ্রহণের অধিকার: বর্তমানে অনেক দেশেই কর্মীদের পরিচালন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। কারণ, মনে করা হয় যে, এর মাধ্যমে মালিক-শ্রমিক ভুল বোঝাবুঝি দূর হবে এবং কর্মীরা উৎসাহের সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
9. অধিকার এবং কর্তব্য বা দায়িত্ব কীভাবে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তা আলোচনা করো।
অথবা, অধিকারের মধ্যেই কর্তব্য নিহিত আছে'—এই উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
> অধিকার এবং কর্তব্য বা দায়িত্ব হল একই মুদ্রার দুটি দিক। ইংরেজিতে একটি কথা আছে— Rights imply Duties—অর্থাৎ, অধিকার বললেই সঙ্গে সঙ্গে কর্তব্যের কথা ওঠে। একজনের যেমন ধর্মীয় উপাসনার অধিকার আছে, তেমনি অন্যের দায়বদ্ধতা হল ধর্মীয় উপাসনায় বাধা না- দেওয়া। হহাউস অধিকার ও কর্তব্যের সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, 'আমার যেমন অধিকার আছে রাস্তা দিয়ে হাঁটার ; তেমনই তোমার দায়বদ্ধতা হল আমাকে রাস্তায় হাঁটতে বাধা না-দেওয়া।' দেখা যাচ্ছে যে, একজনের অধিকারভোগ অন্যের দায়বদ্ধতা পালনের ওপরে নির্ভর করে।
[i] আইনগত কর্তব্যের সঙ্গে আইনগত অধিকারও জড়িত: প্রত্যেক নাগরিকেরই আইনগত অধিকার আছে রাস্তা দিয়ে স্বাধীনভাবে চলাচল করার । কিন্তু এই অধিকার নিশ্চিত হতে পারে অন্যান্য নাগরিকের আইনগত দায়- বদ্ধতা পালনের দ্বারা। স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করা ব্যক্তির আইনগত অধিকারের মধ্যে পড়ে। অন্যের আইনসংগত দায়বদ্ধতা হল ওই অধিকারে বাধা না- দেওয়া। কিন্তু কেউ যদি অন্য একজনের স্বাধীন মত- প্রকাশে বাধা দান করে, তাহলে ওই ব্যক্তির মতপ্রকাশের অধিকার বজায় থাকতে পারে না। কোনো নাগরিক যদি কর্তব্যে অবহেলা করে, আইন না-মেনে চলে, কর না-দেয়—তবে সেই নাগরিকের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের থাকতে পারে না।
[ii] নৈতিক অধিকার ও নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক: কেবলমাত্র আইনসম্মত অধিকারের ক্ষেত্রে নয়, নৈতিক অধিকার ও নৈতিক দায়বদ্ধতা উভয়ের মধ্যেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেমন—পিতা-মাতার নৈতিক দায়বদ্ধতা হল তাদের সন্তানকে যথাযথ লালনপালন, শিক্ষাদান ও চরিত্র গঠনের দ্বারা তাকে মানুষ করে তোলা। তেমনি পিতা-মাতার নৈতিক অধিকার আছে বৃদ্ধবয়সে সন্তানের কাছ থেকে আদরযত্ন, সেবা-শুশ্রূষা ও ভরণপোষণ পাওয়ার। পিতা-মাতা তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা পালন না-করে নৈতিক অধিকার দাবি করতে পারে না।
[iii] রাজনৈতিক অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক: নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রের যেমন কতকগুলি অধিকার আছে, রাষ্ট্রকেও তেমনি নাগরিকদের প্রতি কতকগুলি দায়বদ্ধতা পালন করতে হয়। নাগরিকের আনুগত্য ও সহযোগিতা রাষ্ট্র দাবি করতে পারে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রও নাগরিকের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি সুনিশ্চিত করার জন্য দায়বদ্ধতা পালন করবে। রাষ্ট্র যেমন নাগরিকদের স্বাধীন মতপ্রকাশ, সম্পত্তি ভোগ, সংঘবদ্ধ হওয়া, পরিবার গঠন ইত্যাদির অধিকার দেয়, তেমন নাগরিকদেরও রাষ্ট্রের প্রতি কতকগুলি দায়বদ্ধতা রয়েছে, যেমন—সময়মতো কর দেওয়া, রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলা, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দেখানো ইত্যাদি।
[iv] অধিকার কর্তব্যের দ্বারা সীমাবদ্ধ: অধিকার অবাধ হতে পারে না। কারণ, অধিকার অবাধ হলে শক্তিমানেরাই যাবতীয় ক্ষমতা ভোগ করবে। দুর্বলের কোনো অধিকার থাকবে না। তাই দুর্বলরা যাতে অধিকার ভোগ করতে পারে তার জন্য সবলদের কিছু দায়বদ্ধতাবোধের দ্বারা গণ্ডিবদ্ধ করা দরকার।
[v] সামাজিক দিক থেকে সম্পর্ক: কেবলমাত্র স্বার্থসিদ্ধির জন্য নাগরিক তার অধিকার ব্যবহার করবে না। তার অধিকার যাতে সামাজিক কল্যাণের বিরুদ্ধে না-যায়, তাও নাগরিকদের লক্ষ করা উচিত। আমার অধিকার আছে—আমার বাড়ির সামনে আমার জায়গায় আবর্জনা ফেলার। কিন্তু ওই অধিকার প্রয়োগ করার ফলে যদি আমার প্রতিবেশীর ক্ষতি হয় তবে তা সমাজকল্যাণের বিরোধী। এরূপ অধিকারের প্রয়োগের ফলে সমাজের প্রতি আমার যে দায়বদ্ধতা তা লঙ্ঘিত হয়।
মূল্যায়ন: উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। সেজন্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি তাদের লিখিত সংবিধানে অধিকারের পাশাপাশি কর্তব্যেরও উল্লেখ করেছে। ভারতের মূল সংবিধানে কর্তব্যের উল্লেখ না-থাকলেও 1976 খ্রিস্টাব্দের 42-তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দশটি দায়বদ্ধতা সংযোজিত করা হয়েছে। 2002 খ্রিস্টাব্দের 86-তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আরও একটি দায়বদ্ধতা সংযোজন করা হয়েছে। বর্তমানে মৌলিক কর্তব্যের সংখ্যা 11।






মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন