ন্যায়বিচার Social Justice
ন্যায়বিচার কী ?
সমকক্ষ লোকের প্রতি সম-আচরণ
সমানুপাতিক ন্যায়
বিশেষ চাহিদার স্বীকৃতি
ন্যায্য বণ্টন
জন রল্স-এর ন্যায় তত্ত্ব
সামাজিক ন্যায় অনুসরণ
মুক্তবাজার বনাম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ
অধ্যায় সারসংক্ষেপ
ন্যায়বিচার কী ?
ন্যায়ের সংজ্ঞা নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবুও সহজ কথায় বলা যায়, ন্যায় হল এক পূর্ণাঙ্গ মূল্যবোধ। যা সঠিক ও সংগত তাই হল ন্যায়। তাই বার্কার বলেছেন, “ন্যায়ের ভিত্তিতে আইনের বৈধতা বিচার হয়। ... ন্যায় বিমূর্ত নয়, বাস্তব এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার চূড়ান্ত নীতি।”
বিশ্ব সমাজের প্রায় সকল সংস্কৃতি, সকল সামাজিক ধারাই ন্যায় প্রসঙ্গে বিভিন্ন মতের উপস্থাপনা করেছে। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ন্যায় ছিল ধর্ম । অর্থাৎ, ধর্মের ধারণা ও ন্যায় ওতপ্রতোভাবে সম্পর্কিত ছিল। ধর্মের ধারণার সঙ্গে জড়িত ছিল সামাজিক নির্দেশকে মান্য করা। যা দেখা রাজার প্রাথমিক কর্তব্য। অর্থাৎ, ধর্ম ও সামাজিক নির্দেশ মান্য করার মাধ্যমে ন্যায়প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল প্রাচীন ভারতীয় সমাজে। প্রাচীন চিনে ন্যায়ের ধারণা প্রসঙ্গে কনফুসিয়াস ব্যাখ্যা করেছিলেন, ন্যায়প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব যখন রাজা সমাজে অন্যায়কারীকে শাস্তিপ্রদান করবেন এবং যারা সৎ তাদের পুরস্কৃত করবেন।
গ্রিসের এথেন্সেও প্লেটো ন্যায়তত্ত্ব স্থাপন করেন। The Republic গ্রন্থে প্লেটো তাঁর ন্যায়তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করেন কথোপকথনের মাধ্যমে, প্লেটোর বিবেক হয়েছেন সক্রেটিস। সক্রেটিসের মুখ দিয়েই প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের প্রকৃত রূপ বা বৈশিষ্ট্যকে উপস্থিত করেছেন প্লেটো।
ন্যায় সম্পর্কে প্লেটোর ধারণাটি আজও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও প্লেটোর সময়কাল থেকে বর্তমানে ন্যায়ের ধারণাটি বদলেছে। প্লেটোর মতে, ন্যায়প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব যখন সামগ্রিকভাবে সমাজের স্বার্থে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা হবে। বৃহত্তর স্বার্থে সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মধ্যেই ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বর্তমানে ন্যায়ের ধারণা মানবজাতির অংশ হিসেবে প্রতিটি ব্যক্তির ন্যায্য পাওনাটুকুর সঙ্গে সম্পর্কিত। আধুনিক জার্মান দার্শনিক ইম্যানুয়েল কান্ট-এর মতে, প্রতিটি ব্যক্তি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। রাষ্ট্র কর্তৃক ব্যক্তিরা যদি এই ন্যায্য সম্মান ও মর্যাদাটুকু পায় তাহলে তারা তাদের ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। সুতরাং, ন্যায়প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব যখন রাষ্ট্র প্রতিটি ব্যক্তির প্রতি সমান আচরণ করবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে সাহায্য করবে।
সমকক্ষ লোকের প্রতি সম-আচরণ
আধুনিক সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক আছে. সকলের ন্যায্য পাওনা সমান নাকি ভিন্ন—এই বিষয় সমাধান করা সহজ কাজ নয়।
একটি সমাজের সকল মানুষকে সমান সুযোগসুবিধা বা গুরুত্ব দেওয়া যথেষ্ট কঠিন কাজ। এটি কোনো সহজ ব্যাপার নয় যে, প্রত্যেক মানুষকে কীভাবে তার প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়া যায়। এই বিষয়ে বিভিন্ন নীতি আছে যেগুলির মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা যেতে পারে। তার মধ্যে একটি হল— সকলের জন্য সমান ব্যবস্থা বা আচরণ গ্রহণ। এটি বিবেচনা করা হয় যে, প্রতিটি ব্যক্তির কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে মানবিক জীব হিসেবে সুতরাং, প্রতিটি মানুষের সমান সম্মানবোধ ও সমান ব্যবহার প্রাপ্য। বর্তমানে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেসব পৌর অধিকারগুলিকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে সেগুলি যেন প্রতিটি ব্যক্তি সমানভাবে ভোগ করতে পারে তাদের ব্যক্তিসত্তার বিকাশের জন্য। এইসব পৌর অধিকারগুলির মধ্যে— জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, যেমন—ভোটাধিকার, যার মাধ্যমে মানুষ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এইসব অধিকারগুলি ভোগ করা থেকে যেন কোনো ব্যক্তিকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বংশ, লিঙ্গভেদে বঞ্চিত করা না হয়। প্রতিটি ব্যক্তিকে বিচার করা হোক তার কার্যকলাপ দেখে। যদি ভিন্ন জাতের দুই ব্যক্তি একই কাজ করে তাহলে তাদের একই রকম বেতন প্রদান করা উচিত। পৃথক জাতভুক্ত বলে বেতন ভিন্ন হবে এটি কাম্য নয়।
সুপাতিক ন্যায়
সমানের প্রতি সমান আচরণ ন্যায়ের একমাত্র নীতি নয়। ন্যায় স্থাপনের দ্বিতীয় নীতিটি হল সমানুপাতিক হারে বণ্টন। এই নীতিতে ন্যায়ের বণ্টনকে নির্দিষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। প্রথম নীতিতে যেমন সমানের জন্য সমান আচরণের কথা বলা হয়েছে, এখানে আরও একধাপ এগিয়ে বলা হয়েছে, যারা যোগ্য তাদের বঞ্চিত করা যাবে না, তারা সমাজের যে স্তরেই বসবাস করুন। কিন্তু সকল যোগ্য ব্যক্তির দক্ষতা বা মেধা সমান নয় বা হয় না। দ্বিতীয় নীতি অনুযায়ী সকল যোগ্য ব্যক্তি নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পাবে কিন্তু পুরস্কৃত হবে যার দক্ষতা বা মেধা বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, 100 মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন যোগ্যতার ভিত্তিতে দশ জন কিন্তু দক্ষতা অনুযায়ী যারা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হবেন, পুরস্কৃত হবেন তারাই। এখানেই ন্যায়ের সমানুপাতিক বণ্টন প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই সামাজিক ন্যায়ের জন্য ‘সমানের জন্য সমান' নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায়ের সমানুপাতিক বণ্টন একান্ত প্রয়োজন।
বিশেষ চাহিদার স্বীকৃতি
ন্যায়ের প্রথম দুটি নীতি অনুযায়ী সাধারণ সুস্থ মানুষদের জন্য ন্যায়প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জন্ম থেকেই যারা অসুস্থ বা শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী তাদের জন্য রাষ্ট্রের কর্তব্য বিশেষ ব্যবস্থার আয়োজন করা। রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ প্রয়োজনের ভিত্তিতে সুবিধাটুকু পেলে তারাও সমাজের মূলস্রোতের পাশাপাশি চলতে পারবে। তাই শারীরিক, মানসিকভাবে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে যারা আর্থিক দিক থেকে ভীষণভাবে পিছিয়ে আছে তাদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ এবং আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে রাষ্ট্র। তাছাড়া তপশিলি জাতি-উপজাতির জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা সংবিধানে আছে। এ ছাড়াও অন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যায় এক্ষেত্রে মহিলা কর্মীদের অফিস থেকে বেশি রাতে বাড়ি ফেরার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করাও বিশেষ পরিস্থিতিতে ন্যায়প্রতিষ্ঠার উদাহরণ।
ন্যায্য বণ্টন
সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা করতে সরকার অনেক বেশি তৎপর হতে পারে। সরকারি নীতি ও আইন বিষয়ক ক্ষেত্রে সরকার যত্নবান হতে পারে। দেশ বা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ন্যায়ের যথার্থ বণ্টনের সঙ্গে সামাজিক ন্যায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো রাষ্ট্রে যদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের গভীরতা বৃদ্ধি পায়, সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে প্রয়োজনে বৈষম্য দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের পুনর্বণ্টন করা। কোনো ব্যক্তির জীবনে সরকারি নীতি ও আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কেবল ন্যায় বণ্টন জরুরি নয়, প্রত্যেক ব্যক্তি যেন তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ পাওয়ায় ক্ষেত্রে ন্যায় পায়, সেই দিকেও রাষ্ট্রকে নজর দিতে হবে। যেমন— আমাদের সংবিধানে অস্পৃশ্যতার নীতিকে রাষ্ট্র লুপ্ত করেছে যাতে সমাজে অস্পৃশ্যতার নীতির যে প্রথা আদিকাল থেকে চলে আসছিল তা মানুষের মন থেকে মুছে যায় এবং সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া, সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কিছু রাজ্যে জমির পুনর্বণ্টন করা হয়েছে ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে। রাষ্ট্র এইভাবে সকলের প্রতি সমান আচরণের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা করে।
জন রল্স-এর ন্যায় তত্ত্ব
সমাজের প্রত্যেকের স্বার্থরক্ষা করলে সামগ্রিকভাবে ব্যক্তি সকলের স্বার্থরক্ষা নাও হতে পারে। অন্যদিকে, সবসময় সমাজের নাগরিকদের ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে ভাবনা থেকে নিরস্ত করাও সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি চায় তার সন্তানের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে। প্রত্যেকের ভাবনাই ভিন্ন? তাই রাষ্ট্র কীভাবে সঠিক ও ন্যায্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে?
এ প্রসঙ্গে রসের তত্ত্বটির কথা বলা যায়। সমাজে ন্যায়- প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে জন রলসের ভাবনাটি বেশ অভিনব। জন রস তাঁর A Theory of Justice গ্রন্থে বলেছেন, সমাজে সকলের জন্য সমান ব্যবস্থা ও সকলের জন্য স্বাধীনতার ভিত্তিতে মূল কাঠামোটি নির্মিত না হলে ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে রস দুটি নীতির কথা বলেছেন। যথা—
[a] সকলের সঙ্গে সংগতি রেখে যথাসম্ভব সকলের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা,
[b] সমাজে সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য থাকতে পারে কিন্তু সেখানে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিতরা সবচেয়ে বেশি সুযোগ পায়।
রস ন্যায়প্রতিষ্ঠার জন্য অজ্ঞতার আচ্ছাদন বা অজ্ঞতার অবগুণ্ঠনের কথা বলেন। এই অবস্থায় ব্যক্তিরা তাদের জাতীয় অস্তিত্ব থেকে আড়ালে থাকবে, তারা এই অবস্থায় তাদের প্রয়োজন, যোগ্যতা অনুযায়ী প্রাপ্তি ইত্যাদি সবকিছু সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে। এই অবস্থায় তারা অহংবোধসর্বস্ব থাকে এবং ব্যক্তিকল্যাণের কথা ভাবে। তারা অনিশ্চয়তার পথে যেতে চায় না। এ প্রসঙ্গে রস বলেন, যুক্তিবোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা-
প্রথমত, স্বাধীনতাকে পছন্দ করবে, স্বাধীনতা থাকলে ব্যক্তি তার সুবিধা বা পছন্দমতো যা খুশি করতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সে সাম্য চাইবে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গভেদে যেন সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে বৈষম্য না থাকে। তৃতীয়ত, ব্যক্তিরা বিশেষ কিছু চাইতে পারে। অর্থাৎ, অজ্ঞতার আড়াল থেকে মুক্ত হওয়ার পর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিশেষ সুবিধার দাবি করতে পারে রাষ্ট্রের কাছ থেকে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র তাকে সমাজের মূলস্রোতের সঙ্গে তাল মেলাতে যেটুকু সাহায্যের প্রয়োজন তা করবে।
জন রল্স এইভাবে ন্যায়প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, প্রাথমিক বিষয়াদির ন্যায্য বণ্টনের মধ্যে ন্যায়ের সমস্যা বর্তমান। অর্থাৎ, অধিকার, স্বাধীনতা, বিভিন্ন ক্ষমতা, সুযোগ ইত্যাদি হল প্রাথমিক বিষয়াদির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তাই এই বিষয়াদিগুলি সঠিক পরিমাপ মতো বণ্টন হলেই ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
সামাজিক ন্যায় অনুসরণ
কোনো সমাজে ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য যখন খুবই প্রকট হয় তখন সামাজিক ন্যায় সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি স্বচ্ছন্দে বলা যায়। চূড়ান্ত সামাপ্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বা ন্যায়প্রতিষ্ঠার জন্য চূড়ান্ত সাম্য বা সমতা প্রয়োজনও নয়। তথাপি, সমাজে জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য দৃষ্টিকটু এবং অসাম্যও বটে। তাই সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিরই স্বচ্ছন্দ ও সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকতে গেলে ন্যূনতম চাহিদাপূরণের প্রয়োজন। প্রথমে সমাজে নাগরিকদের ন্যূনতম চাহিদা কী কী তা দেখা প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাদ্য, সুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানীয় জল, চাকুরি ইত্যাদি বিষয়গুলি ন্যূনতম চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। নাগরিকদের এই ন্যূনতম চাহিদাগুলি সঠিকভাবে বণ্টনের মধ্যে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা করা যে-কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কর্তব্য। যদিও ভারতের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রে সিংহভাগ মানুষ যখন দরিদ্র সেইখানে দরিদ্রদের ন্যূনতম চাহিদাপূরণ রাষ্ট্রের ওপর পাহাড়সম বোঝা। এতৎসত্ত্বেও রাষ্ট্র যদি বেশিরভাগ নাগরিককে সাহায্যের চেষ্টা করে বা করতে চায়, তাহলেও কীভাবে সাহায্য করা হবে তা নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ দেখা দেবে। এক্ষেত্রে মার্কসবাদীরা ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানার কথা বলেছেন এবং সমবায় প্রথার কথা বলেছেন। অন্যদিকে, উদারনৈতিক রাষ্ট্রদার্শনিকরা মুক্তবাজার নীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কথা বলেছেন।
মুক্তবাজার বনাম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ
মুক্তবাজার নীতি উদারনৈতিক ব্যবস্থায় একটি মূল বৈশিষ্ট্য। মুক্তবাজার নীতি অনুযায়ী বাজার ব্যবস্থায় প্রবেশ অবাধ। এখানে সকলেই এসে নিজের মতো করে ব্যাবসা করবে নিজেদের পণ্য । এবং প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে মুক্তবাজার নীতির মূলকথা হল ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিদের পূর্ণ স্বাধীনতা। তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো সম্পদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করবে, পুঁজি ব্যবহার করবে। বেতন, মূল্য ও মুনাফা সম্পর্কিত বিষয় চুক্তি ব্যবসায়ীদের মর্জি অনুসারে সম্পন্ন হবে। মুক্তবাজার নীতির প্রবর্তকদের মতে, বাজার ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা নিজেদের পণ্য বিক্রি করবে এবং সর্বোচ্চ লাভ করবে। সুতরাং, কে, কত লাভ করবে এই সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকার জন্য প্রত্যেক ব্যবসায়ী পণ্যের গুণাবলির দিকে যত্নবান হবে। বাজার নীতির প্রবর্তকদের মতে, খোলাবাজার রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপমুক্ত হবে। বাজারে লেনদেন ব্যবস্থায় লভ্যাংশকে সুরক্ষিত করার প্রতি ন্যায় বণ্টনকে সুনিশ্চিত করার কথা বলেছে মুক্তবাজার নীতির সমর্থকরা এবং প্রতিযোগিতার জন্য পুরস্কারের কথাও বলেন অনেকে।
যদিও অনেকেই মুক্তবাজার নীতির অবাধ প্রবেশকে সমালোচনা করেছেন। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিকেও সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, কিছুটা হলেও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। মুক্তবাজার ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের কিছু সাধারণ নীতির উপস্থিতি প্রয়োজন যা সকলেই মান্য করবে। তাহলে প্রত্যেকের জীবন- যাত্রাতেও সমতা বিরাজ করবে। মূলত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আংশিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন সমাজের স্বার্থে। অন্যদিকে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন যাতে তারা প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে পারে। সুতরাং, প্রতিষ্ঠান সরকারি বা বেসরকারি যাইহোক, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পণ্য যাই সরবরাহ করে থাকুক তাদের গুণমান যেমন হবে, প্রতিযোগিতার বাজারে তাদের অবস্থান ঠিক তেমনই হবে।
অনুশীলনীর প্রশ্নোত্তর
1. প্রত্যেককেই তার প্রাপ্য প্রদান করা বলতে কী বোঝায় ? কীভাবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে “যার যা প্রাপ্য তা প্রদান করা”—এই কথাটির অর্থও পরিবর্তিত হয়েছে ?
> প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য দিয়ে দেওয়া বলতে বোঝায় মানুষের ভালোভাবে জীবনধারণের জন্য ন্যায়কে সুনিশ্চিত করা। বর্তমানে বিশ্বে ‘প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য প্রদান করা' এই ধারণাটির পরিবর্তন ঘটেছে। এর অর্থ হল, একজন মানবিক জীব হিসেবে একজন ব্যক্তির কী প্রাপ্য রয়েছে সেটি জানতে হবে। E Kant বলেছেন, যদি সব মানুষ সম্মান চায় তাহলে তাদের প্রত্যেকের প্রতিভা ও পছন্দের লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টাকে উন্নত করার চেষ্টা চালাতে হবে, যাতে তারা তাদের প্রাপ্য সম্মান অর্জন করতে পারে।
2. এই অধ্যায়ে বর্ণিত ন্যায় সংক্রান্ত যে তিনটি নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করো। প্রত্যেকটি নীতির সমর্থনে উপযুক্ত উদাহরণ দাও ।
> ন্যায়ের তিনটি নীতি উদাহরণ সহযোগে নিম্নে আলোচনা করা হল—
[i] সমকক্ষ লোকের প্রতি সম-আচরণ: সমপর্যায়ভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সমান ব্যবস্থা গ্রহণ হল এই নীতির মূল কথা। এ ছাড়াও তারা সমান অধিকার ও সমআচরণের অধিকার লাভের অধিকারী। এই সমঅধিকারের মধ্যে পৌর অধিকার- গান গুলি যেমন—জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, যেমন—ভোটাধিকার এবং সামাজিক অধিকার, যেমন—সমান সামাজিক সুযোগসুবিধা অর্জনের অধিকার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারগুলি রয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে বা মানুষকে যেন জাত, শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য প্রদান করা না হয়। প্রতিটি মানুষকে বিচার করা হবে তার কাজের ভিত্তিতে, কোনো আরোপিত প্রথার ভিত্তিতে নয়। যেমন—যদি দুটি পৃথক জাতের মানুষকে একই কাজ করতে বলা হয়, সেটি পাথর কাটা হোক বা পিৎজা বিতরণ করার কাজই হোক না কেন, তাদের উভয়ের একই বেতন প্রদান করা উচিত।
[ii] সমানুপাতিক ন্যায়: সমানুপাতিক ন্যায়ের মূল কথা হল জনগণকে তাঁর কাজের গুণগত মান ও পরিমাণের অনুপাতে প্রাপ্য দেওয়া হবে। বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রাপ্তির ব্যবস্থা রাখা দরকার। সব ধরনের কার্যকলাপের জন্য একই ধরনের প্রাপ্তি হলে সেটি ন্যায়ের পরিপন্থী হবে। সমান ব্যবহার বা আচরণের নীতির জন্য সুযোগ-সুবিধার নীতির মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজন। তবেই সমানুপাতিক ন্যায়ের ধারণাটি অর্থবহ হয়ে উঠবে। যেমন— একজন পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে একজন কেরানির বেতনের পার্থক্য হওয়া উচিত তাদের কাজের দক্ষতা ও বিপদের সঙ্গে মোকাবিলা করার প্রবণতার ভিত্তিতে।
[iii] বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি প্রদান: ন্যায়ের এই নীতিটি সমাজের মানুষের বিশেষ প্রয়োজনগুলিকে স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে। ন্যায়ের এই নীতিটি হল সামাজিক ন্যায় প্রদানের একটি পথ। সমাজের মূলস্রোত থেকে বিভিন্ন দিকে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য বিশেষ সুযোগসুবিধা রাষ্ট্র বা সরকার প্রদান করে থাকে। কারণ, এই সুযোগগুলির ব্যবস্থা না করলে এই শ্রেণির মানুষগুলি অগ্রসর হতে পারবে না। যেমন—সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু জাতি ও উপজাতিদের জন্য সংরক্ষণ ইত্যাদি।
3. ব্যক্তির বিশেষ চাহিদা পূরণের নীতির সঙ্গে কি সকলের প্রতি সম-আচরণের নীতির কোনো বিরোধ রয়েছে ?
না, বিশেষ চাহিদাপূরণের নীতি সমান আচরণ বা ব্যবস্থা গ্রহণের নীতির সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয় না। কারণ, সমান আচরণ বা ব্যবস্থা গ্রহণের নীতিটি তখনই গ্রহণ করা হয় যখন একটি সমাজের সকলে সমান বলে বিবেচিত হয় না, মানুষের সুযোগ- সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়, সেখানে এই নীতি প্রযোজ্য । কিন্তু বিশেষ চাহিদা পূরণের প্রয়োজনের নীতির ক্ষেত্রে সমাজের একেবারে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষের জন্য বিশেষ সুযোগসুবিধা প্রদান করে মূলস্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়।
4. নিরপেক্ষ ও ন্যায়পূর্ণ বণ্টন ব্যবস্থাকে যুক্তিসংগত আধারের ভিত্তিতে সমর্থন করার জন্য জন রস কীভাবে তাঁর ‘অজ্ঞতার আবরণের ধারণাকে ব্যাখ্যা করেছেন ?
আদি অবস্থানে মানুষের স্বার্থগুলির মধ্যে কীভাবে ন্যায়- সংগত সামঞ্জস্যবিধান করা যায় তা ব্যাখ্যা করার জন্য রস অজ্ঞতার আবরণের ধারণাটি উদ্ভাবন করেছেন। আদি অবস্থানে মানুষ স্বার্থবুদ্ধি ও যুক্তিবোধসম্পন্ন হলেও অজ্ঞতার আচ্ছাদনের আড়ালে থাকায় নিজেদের শক্তি, বুদ্ধি, সামর্থ্য, সমাজে নির্দিষ্ট স্থান, শ্রেণিগত অবস্থান বা মর্যাদা সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকে না, কিন্তু রাজনীতি, অর্থনীতি ও ন্যায় সম্পর্কে তাদের জ্ঞান আছে। রল্স এই ধারণাটিকে ব্যবহার করেছেন যাতে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ন্যায়ের নীতিগুলিকে প্রভাবিত করতে না পারে। কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না যদি না কিছুটা সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যায় জ্ঞানের ওপর। জ্ঞানের ওপর কিছুটা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে রল্স দেখাতে চেয়েছেন যে, বাস্তব জগতে যে সহজাত বৈষম্য কণ্টনমূলক ন্যায়ের পথে বাধার সৃষ্টি করে সেগুলি যেন ন্যায়ের জন্য যুক্তিকে বিকৃত করতে না পারে।
5. সাধারণত কোন বিষয়গুলিকে মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা হিসেবে গণ্য করা হয় ? একটি দায়িত্বশীল সরকারের ওপর সকলের জন্য মৌলিক চাহিদাগুলি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কী ধরনের দায়িত্ব রয়েছে ?
মানুষের সুস্থ ও উৎকর্ষমূলক জীবনধারণের জন্য যেসব প্রাথমিক ন্যূনতম চাহিদাগুলির প্রয়োজন সেগুলি হল—গৃহ, পরিষ্কার জলের জোগান, সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান, শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পারিশ্রমিক সরকারের প্রদান। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলি সুনিশ্চিত করার সরকারের জন্য যেসব ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করা দরকার সেগুলি হল—
[i] সরকারের উচিত বেসরকারি এজেন্টগুলিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ইত্যাদি বিষয়গুলিতে সেবা প্রদানের ব্যাপারে উৎসাহিত করা এবং এমনভাবে নীতি নির্ধারণ করা উচিত যাতে জনগণের এইসব সেবা ক্রয় করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ।
[ii] সরকারের উচিত বৃদ্ধ ও দুর্বল মানুষদের জন্য বিশেষ সাহায্যের ব্যবস্থা করা যারা জীবনধারণের ও সংগ্রামের প্রতিযোগিতায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্যদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে অক্ষম।
[iii] সরকারের এটি দেখা উচিত যে, ভালো গুণমানের দ্রব্যের জোগান যেন স্বাভাবিক থাকে এবং জনগণের ক্রয়- ক্ষমতার সাধ্যের মধ্যে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য।
[iv] সরকারের উচিত একটি সুনির্দিষ্ট আইন ও নিয়মাবলির কাঠামোকে তৈরি করা ও সেটিকে মেনে চলা যেটি জীবনধারণের জন্য মানুষদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়মের বন্ধনে বেঁধে রাখবে। কোনোরকম বিশৃঙ্খলা, বলপ্রয়োগ ও অর্থনৈতিক বাজারের মধ্যে কোনো রকম বাধা সৃষ্টিকারী শক্তি যাতে মাথা চাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেদিকে ব্যবস্থা রাখা।
6. নীচে দেওয়া যুক্তিগুলির মধ্যে কোনটি নাগরিকদের জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে সরকারের কার্যাবলিকে বৈধতা প্রদান করে ?
[a] দরিদ্র এবং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য বিনামূল্যে পরিসেবা প্রদান করাকে সরকারের উদারমূলক কাজ বলে সমর্থন করা হয়।
[b] সকল নাগরিকের জীবনধারণের ন্যূনতম মান প্রদান করা হল সকলের জন্য সমান সুযোগের অধিকারটি সুনিশ্চিত করার অন্যতম উপায় ।
[c] কিছু লোক স্বভাবতই অলস, সুতরাং তাদের প্রতি আমাদের সদয় হওয়া প্রয়োজন।
[d] সকলের জন্য মৌলিক সুযোগসুবিধা এবং জীবন- ধারণের ন্যূনতম মানের নিশ্চয়তা বিধান করাকে মানবাধিকার এবং মানবতাবাদের স্বীকৃতি বলে মনে করা হয় ।
[d] সকলের জন্য মৌলিক সুযোগসুবিধা জীবনধারণের ন্যূনতম মানের নিশ্চয়তা বিধান করাকে মানবাধিকার এবং মানবতাবাদের স্বীকৃতি বলে মনে করা হয়।
পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত কার্যাবলি এবং উৎসভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
1. নীচের পরিস্থিতিগুলি যাচাই করো এবং আলোচনা করো এগুলি ন্যায়ভিত্তিক কিনা। প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তির সাহায্যে বিচার করার চেষ্টা করো যে, এইসব পরিস্থিতিতে ন্যায় এর কোন সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্য।
[a] সুরেশ একজন দৃষ্টিজনিত দিব্যাঙ্গধারী ছাত্র, তাকে সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় প্রদান করা হয়েছে তার অঙ্ক পরীক্ষার উত্তর সম্পূর্ণ করার জন্য, যেখানে অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের জন্য সময় বরাদ্দ করা হয়েছিল তিন ঘণ্টা।
[b] গীতা খুঁড়িয়ে হাঁটে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক মহাশয় সিদ্ধান্ত নিলেন যে, গীতাকে তার অঙ্ক পরীক্ষার উত্তর সম্পূর্ণ করার জন্য সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করা হবে।
[c] একজন শিক্ষক সিদ্ধান্ত নিলেন যে, শ্রেণি কক্ষের দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের মনোবল বৃদ্ধি করার জন্য কিছু অতিরিক্ত নম্বর প্রদান করা হবে।
[d] একজন অধ্যাপক শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের যোগ্যতা ও পারদর্শিতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন ছাত্রছাত্রীকে ভিন্ন ভিন্ন মানের প্রশ্নপত্র প্রদান করলেন ।
[e] এই ধরনের একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে যে, সংসদের উভয় কক্ষে 33% আসন শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হবে।
ন্যায়ভিত্তিক আলোচনা
[a] সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠার তিনটি নীতির মধ্যে শেষতম নীতি বা তিন নম্বর নীতিটিতেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এই নীতিটিতে বলা হয়েছে সমাজের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বাড়তি সুবিধাদানের মধ্যদিয়ে মূলস্রোতে পা মিলিয়ে চলার মতো অবস্থাটুকু তৈরি করে দেওয়া। এর মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই সুরেশকে অতিরিক্ত 30 মিনিট সময় দেওয়া ন্যায্যবিচার।
[b] সুরেশ-এর দৃষ্টিজনিত অসুবিধা অঙ্ক সমাধান করতে সঠিক দৃষ্টিশক্তির প্রয়োজন । ক্ষীণদৃষ্টির জন্য সুরেশের সময় লাগবে । তাই তাকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া ন্যায্য। গীতাও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। ন্যায়ের তৃতীয় নীতি অনুযায়ী গীতাকেও অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া উচিত। কিন্তু গীতা যদি পরীক্ষার হলে সঠিক সময় প্রবেশ করে, তার হাঁটার অসুবিধার জন্য যদি তার দেরি না হয়, তাহলে গীতাকে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার মধ্যে ন্যায়প্রতিষ্ঠার কোন্ বিষয় সম্পর্কিত নয়। তাই গীতাও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাকে পরীক্ষার 30 মিনিট অতিরিক্ত দেওয়া উচিত নয়।
[c] ক্লাসের সামগ্রিক মানোন্নয়নের একটি মাপকাঠি আছে। সেই মাপকাঠিকে বজায় রাখা শিক্ষকের কর্তব্য। সেই মাপকাঠি অনুযায়ী প্রশ্নপত্র তৈরি হয়। এমনভাবেই তৈরি হয় যাতে সকলে অন্তত পাশ করে। এই নিয়ম মেনে চলার পরও যদি কিছু ছাত্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারে তাহলে বুঝতে হবে তাদের শিক্ষা পরিপূর্ণতা পায়নি। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট ক্লাসে তাদের পড়াশোনা যথেষ্ট হয়নি। সেক্ষেত্রে প্রথমত, অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে পাশ করিয়ে দিলে বাকি ছাত্রদের প্রতি অন্যায় হবে এবং দ্বিতীয়ত, তাদের নিজেদের চেষ্টায় কিছু করার অভ্যাস গড়ে উঠবে না। এক্ষেত্রে ন্যায়ের আনুপাতিক বণ্টন নীতি অনুযায়ী অতিরিক্ত নম্বর প্রদান করে পাশ করানো অন্যায়। প্রশ্নানুযায়ী বিভিন্ন মেধার ছাত্রদের জন্য প্রত্যেকের মেধানুযায়ী প্রশ্নপত্র বণ্টন করলেন অধ্যাপক।
(d) ন্যায়ের প্রথম নীতি অনুসারে সমকক্ষ লোকের প্রতি সম- আচরণ বা সমানাধীকার প্রদান করা উচিত রাষ্ট্রের। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষে তা স্কুল বা কলেজ বা যে-কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন প্রত্যেকেই যেহেতু নির্দিষ্ট ক্লাসের ছাত্রছাত্রী, সেহেতু সকলকেই সমান বা একই প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হবে। তাতেই প্রথম নীতি অনুসারে সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
এ ছাড়া আরও একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন । শিক্ষার পাঠক্রম থেকে শুরু করে পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সবই শিক্ষার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, যার একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি আছে। এই মাপকাঠিকে মেনে চলতে হয় সব ছাত্রদের জন্যই। সুতরাং প্রশ্নের মানও নির্দিষ্ট মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় তাই মেধা অনুযায়ী এক-একজনকে এক-একরকম প্রশ্ন দিলে ছাত্রদের মানোন্নয়নও সম্ভব নয়।
[e] 2008-খ্রিস্টাব্দের 108তম সংবিধান সংশোধন বিলে নারীদের লোকসভায় 33 শতাংশ সংরক্ষণের বিল আজও পাশ হয়নি। বারংবার বিলটি মুলতুবি হয়েছে। এই বিলে লোকসভায় নারীদের 33% আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। বাইশ বছর ধরে এই বিল পাশ করা হয়নি।
সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠার দিক থেকে বিচার করলে সমাজে সবক্ষেত্রেই নারীদের সমান অধিকার থাকার কথা। তা কর্মক্ষেত্রেই হোক, বা লোকসভাতেই হোক, কিন্তু গত বাইশ বছর ধরে লোকসভাতে মহিলা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি, যদিও নারীদিবস পালন করা হয় পৃথিবী জুড়ে। অথচ, আন্তর্জাতিক নারীদিবসের দিন ভারতীয় পার্লামেন্ট হল সমাজে একটি বিসদৃশ বিষয়। এককথায়, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন লোকসভায় পুরুষতান্ত্রিক চরিত্র যথেষ্ট দৃষ্টিকটু এবং বৈষম্যের নগ্ন প্রকাশ।
যদিও 2019-এর লোকসভা নির্বাচনে মহিলাদের আসন দখল বেশ খানিকটা বেড়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে গত নির্বাচনে যেখানে 12% ছিল মহিলাদের আসন সংরক্ষণের হার অর্থাৎ 62 জন, সেই সংখ্যা এই নির্বাচনে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে 78 জন।
কিন্তু মহিলা সদস্যের সংখ্যা খানিকটা বৃদ্ধি পেলেও, প্রশ্ন হল সামগ্রিকভাবে লোকসভায় মোট আসনের মধ্যে কতজন মহিলা জায়গা করে নিয়েছেন? উত্তরে বলা যায় 542টি আসনের মধ্যে 78 জন, যা অতি সামান্য।
সুতরাং, সামাজিক ন্যায়প্রতিপন্নতার দিক থেকে বিচার করলে নারী ও পুরুষ উভয়েরই সর্বত্রই সমান অধিকার ভোগের স্বাধীনতা আছে সেহেতু লোকসভাতেও সদস্য- পদের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগযোগ্য। কিন্তু শেষ বাইশ বছর ধরে চেষ্টার পরেও আজও তা সম্ভব হয়নি। তাই 542 এর মধ্যে নারীরা 14%-এর অধিক রয়েছেন। সমান অধিকারের প্রসঙ্গে বললে আসন 50% হওয়া উচিত কিন্তু লোকসভাতে 33% মহিলাদের আসন সংরক্ষণের দাবি ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আজও সম্ভব হয়নি, যা গণতান্ত্রিক শব্দকেও অর্থহীন করে।
2. বিভিন্ন সরকারি এবং সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সংস্থাগুলি খাদ্য, আয় ও জলের মতো বিষয়ের সুবিধাগুলির ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তার ওপর বিভিন্ন হিসাব করেছে। এই হিসাবগুলি সম্পর্কে তোমার বিদ্যালয়ের পাঠাগার অথবা ইনটারনেট-এর সাহায্যে অনুসন্ধান করো।
সমাজে সবকিছু সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পৃথিবীজুড়ে সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠার ছবি বিরল। তার কিছু হিসাব বা তথ্য বা নথি নীচে দেওয়া হল—
বেঁচে থাকার প্রাথমিক শর্ত পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘের হিসাব বলছে পৃথিবীতে এমন বহু জায়গা আছে যেখানে মানুষের কাছে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম খাদ্যের জোগান নেই। রাষ্ট্রসংঘের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে অপুষ্টিতে ভুগছে এমন মানুষের সংখ্যা 2015 থেকে 2018 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে আনুমানিক 422 মিলিয়ন। অর্থাৎ, প্রতি নয় জনের মধ্যে একজন পর্যাপ্ত খাদ্য পায় না যাতে সে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। সাম্প্রতিককালে এডস, ম্যালেরিয়া, টিউবারকিউলোসিস-এর থেকে বিপজ্জনক ব্যাধি অপুষ্টিজনিত রোগ।
রাষ্ট্রসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থার লক্ষ্য এর সংখ্যা কমিয়ে ক্রমশ নির্মূল করা। 2015 খ্রিস্টাব্দে নেওয়া এই লক্ষ্য অনুযায়ী বিশ্ব খাদ্য সংস্থা খাদ্যের বৃদ্ধির জন্য 2004 খ্রিস্টাব্দ থেকে ক্রমাগত চেষ্টা করছে। যার উত্থান-পতনের পর 2008 খ্রিস্টাব্দে ব্যাপক খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতিপুঞ্জ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ব খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা টাস্ক ফোর্স গঠন করে। এতকিছুর পরেও ক্ষুধার্থ মানুষের সংখ্যা এখনও সংকুচিত হয়নি। পরবর্তীকালে ক্ষুধার্তের সংখ্যা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে জাতিপুঞ্জ Sustainable Development Goals (SDGs)-র মাধ্যমে 2030 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিশ্বকে ক্ষুধার্থ শূন্য করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
2017 খ্রিস্টাব্দের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে
[i] 2.1 বিলিয়ন মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জল পায় না।
[ii] 4.5 বিলিয়ন মানুষ সঠিক স্বাস্থ্য পরিসেবা থেকে বঞ্চিত।
[iii] 5 বছরের কম বয়সি 3,40,000 জন শিশুর প্রতি বছর ডায়রিয়াতে মৃত্যু হয়।
[iv] বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী জলের অভাবে ভোগে প্রতি 10 জনের মধ্যে 4 জন মানুষ।
[v] 80 শতাংশ বর্জ্য জল পুনরায় বাস্তুতন্ত্রে (Ecosystem ) ফেরত যায় বিনা ব্যবহারেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, গোটা বিশ্ব জুড়ে জলের সংকট রয়েছে। মানবাধিকার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে 2010 খ্রিস্টাব্দে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ঘোষণা করে—মানুষের ন্যূনতম চাহিদাগুলির মধ্যে অন্যতম হল স্বাস্থ্য পরিসেবা এবং জল। প্রতিটি মানুষ এবং প্রতিটি পরিবারের যথেষ্ট পরিমাণ জল পাওয়া তাদের অধিকার—এই স্বীকৃতি দিয়েছে সাধারণসভা SDG (Sustainable Development Goals 6)। গোল-6 বা লক্ষ্য-6-এর দ্বারা জল পাওয়াকে সুনিশ্চিত করা হয়েছে। যার কাজের সময় ধরা হয়েছে 22 মাৰ্চ, 2018 খ্রিস্টাব্দ ‘জল দিবসের' দিন থেকে শুরু করে 2024 খ্রিস্টাব্দের 22 মার্চ পর্যন্ত। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিসেবার উন্নয়নের দিকটিও দেখা হচ্ছে Sustainable Development Goal এর তত্ত্বাবধানে। 2015 খ্রিস্টাব্দে ইতিমধ্যে 1.3 বিলিয়ন মানুষের জলের কষ্ট খানিকটা কমানো গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর তত্ত্বাবধানে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য পরিসেবা, জল এবং টয়লেট-এর চাহিদা মেটানোর জন্য। 2.3 বিলিয়নের মধ্যে থেকে 1.8 মিলিয়ন মানুষকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যের সংখ্যা আশঙ্কাজনক। কারণ, বেশিরভাগ মানুষ উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছে না। আবার যারা উপার্জনের যদিও-বা সুযোগ পাচ্ছে কিন্তু জীবনধারণের জন্য তা যথেষ্ট নয়। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের রিপোর্ট অনুযায়ী মূলত এশিয়া মহাদেশেই আরও স্পষ্ট করে বললে ভারত ও চিনে উল্লেখযোগ্য।
[i] 2030 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এর পরিমাণ কমাতে হবে।
[ii] শিশু, নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে দারিদ্র্যের পরিমাণ কম করার কথা বলা হয়েছে।
[iii] Sustainable Development Goal 1-4 No Poverty-র কথা বলা হয়েছে।
দারিদ্র্যের কারণ সম্পদের অসম কটন। সেই দিকে লক্ষ্য রাখা এবং বণ্টনকে সমানুপাত করার কথা বলা হয়েছে রিপোর্টে। কিন্তু এর পাশাপাশি ন্যূনতম আয় বৃদ্ধির বিষয়টিতেও যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। যারা রোজগেরে তাদের ন্যূনতম আয়ের পরিমাণ এতই কম যে তাতে স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন সম্ভব নয়। তাই বিশ্ব শ্রমিক সংস্থা ন্যূনতম আয়ের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশিকা জারি করেছে, যেমন—
[i] ন্যূনতম আয়ের পরিমাণকে এমন করতে হবে যা আইন স্বীকৃত হয় এবং নিয়মিত ব্যবধানে যেন শ্রমিকরা তাদের বেতন পায় ।
[ii] বেতনের পরিমাণও এমন হবে যা যুক্তিসংগত এবং যথেষ্ট।
[iii] বেতনের পরিমাণ সমান কাজের জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে নির্দিষ্ট এলাকা বা রাজ্য বা রাষ্ট্রে।
[iv] বেতনের নিরাপত্তা বিষয়টির দেখভালের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে।
অন্যান্য সম্ভাব্য প্রশ্নোত্তর বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 1
1. প্রাচীন ভারতে ন্যায়কে যে ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হত—
A.ধর্ম
B. পূজার্চনা
C. যুদ্ধ
D. প্রথা
2. প্রাচীন ভারতে রাজার প্রাথমিক কর্তব্য ছিল—
A. ধর্মের পালন
B. যুদ্ধ
C. রাজ্যশাসন
D. দেবীর আরাধনা
3. প্রাচীন ভারতে রাজা যেভাবে ন্যায়প্রতিষ্ঠা করতেন—
A. রাজ্যশাসনের মাধ্যমে
B. ধর্মপালনের মাধ্যমে
C. বিষয়ব্যবস্থার মাধ্যমে
D. প্রজাপালনের মাধ্যমে
4. ন্যায়ের ধারণার একটি উৎস হল—
A. ধর্ম
B. রাজনৈতিক কার্যকলাপ
C. আদর্শ রাষ্ট্র
D. রাজনৈতিক দল
5. কনফুসিয়াস যে দেশের লোক ছিলেন, তা হল—
A. চিন
B. আফ্রিকা
C. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
D. ফ্রান্স
6. সর্বপ্রথম ন্যায়ের সন্ধান পাওয়া যায় অনুগামীদের রচনায়। .....-এর—
A. অ্যারিস্টট্স
B. পিথাগোরাস
C. প্লেটো
D. কার্ল মার্কস
7. প্লেটো ন্যায় প্রসঙ্গে আলোচনা করেন—
A. খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে
B. খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে
C. খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে
D. খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে
৪. প্লেটো যে দেশের মানুষ, তা হল—
A. গ্রিস
B. রািশয়া
C ভারতবর্ষ
D. চিন
9. যাদের জন্য 'সমান সুযোগে'র কথা বলা হয়েছে তারা হল—
A. সমকক্ষের জন্য
B. ধনী শ্রেণির জন্য
C. দরিদ্রের জন্য
D. সকলের জন্য
10. রাজনৈতিক অধিকার হল—
A. ভোটাধিকার
B.জীবনের অধিকার
C. স্বাধীনতার অধিকার
D. সম্পদের অধিকার
11. আনুপাতিক ন্যায় বণ্টন হল—
A. সমকক্ষের জন্য সমান আচরণ
B. সকল ধনিক শ্রেণির জন্য
C. মেধা অনুপাতে ন্যায়ের বণ্টন
D. ন্যায়ের পরিমাপ
12. সমান আচরণ যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে—
A. সমকক্ষের দ্বারা
B. আনুপাতিক হারে
C. সৌভ্রাতৃত্বের দ্বারা
D. স্বাধীনতার দ্বারা
13. যেটি ন্যায়ের নীতি নয়, সেটি হল—
A. নুপাতিক ন্যায়ের বণ্টন
B. সমকক্ষের প্রতি সমান ব্যবহার
C. সকলের জন্য সমান অর্থনৈতিক অধিকার
D. বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি
14. যে বিখ্যাত দার্শনিক ন্যায়ের ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করেন—
A. গান্ধি
B রলস
C. মার্টিন লুথার
D. মাদার টেরেসা
15. রসের তত্ত্ব যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে—
A. নৈতিকতা
B. সৌভ্রাতৃত্ববোধ
C. যুক্তিবোধ
D. পবিত্রতা
16. রসের ন্যায়ের নীতি ছিল—
A. 1টি
B. 3টি
C. 5টি
D. ৪টি
17. বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ন্যায়বিচার ধারণাটিকে নতুন করে আবিষ্কার করেন—
A. জন রস
B. বার্কার
C. গেটেল
D. অস্টিন
18. রস ন্যায়ের ধারণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন—
A. সমতাকে
B. ভিন্নতাকে
C. ন্যায্যতাকে
D যুক্তিসংগত বৈষম্যকে
19. ‘ন্যায়ের স্থান শীর্ষে' বলেছেন—
A. অ্যারিস্টটল
B. মিল
C. প্লেটো
D. বার্কার
20. ন্যায়বিচার আইনের—
A. উৎস
B. উৎস নয়
C. আইনের রক্ষক
D. স্বার্থের রক্ষক
21. নৈতিকতা মানুষের যে আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তা হল—
A. অভ্যন্তরীণ
B. বাহ্যিক
C. রাজনৈতিক
D. কোনোটিই নয়
22. নৈতিক আইন লঙ্ঘন করলে শাস্তি—
A. পেতে হয়
B. পেতে হয় না
C. আদালতে বিচার্য
D. সমাজের কাছ থেকে পেতে হয়
23. ন্যায়বিচারের ধারণা—
A. গতিশীল
B. স্থিতিশীল
C. গণতান্ত্রিক
D. কোনোটিই নয়
24. সাম্য ও ন্যায় অঙ্গাঙ্গিভাবে—
A. জড়িত
B. জড়িত নয়।
C. সামঞ্জস্য রক্ষা করে
D. কোনোটিই নয়
25. সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তি জীবনধারণের উপযোগী ন্যূনতম সম্পদের, স্বাস্থ্যকর জীবনের মেধা ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশসাধনের ব্যবস্থা করতে পারে।
A. ন্যায়ভিত্তিক
B. শিক্ষাভিত্তিক
C. ধর্মভিত্তিক
D. কর্মভিত্তিক
26. জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন হল—
A. বিশুদ্ধ পানীয় জল
B তিন কামরার বাড়ি
C. একটি সাইকেল
D. দামি পোশাক
27. খোলাবাজার আমাদের প্রয়োজন কারণ—
A. পণ্য এবং সেবা বিনামূল্যে পাওয়া যায়
B উন্নত মানের পণ্য এবং সেবার সরবরাহ হয়
C. সামাজিক পণ্যের দাম কম
D. খোলাবাজারে পণ্যের ন্যায্য বিতরণ হয়
28. পণ্যের বণ্টনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন কারণ—
A. পণ্য এবং সেবাজাত বিষয় বিনামূল্যে পাওয়া যায়
B. উন্নত মানের পণ্য এবং সেবার সরবরাহ হয়
C. সামাজিক পণ্যের দাম কম হয়
D. খোলাবাজারে পণ্যের ন্যায্য বিতরণ হয়
29. ‘আদর্শ রাষ্ট্রের গুণাবলি — সহনশীলতা, সাহস, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচার,' উক্তিটি করেছেন—
A. প্লেটো
B. বার্কার
C. অ্যারিস্টটল
D. ল্যাস্কি
30. The law of people (1999 খ্রিস্টাব্দ) গ্রন্থটির লেখক—
A. জন রলস
B. বার্কার
C. প্লেটো
D. অ্যারিস্টট্ল
31. A Theory of Justice গ্রন্থটির লেখক হলেন—
A. জন রলস
B. নোজিক
C. বার্কার
D. মার্কস
32. ‘মানুষের মর্যাদা' নিয়ে যে দার্শনিক কথা বলেন—
A. প্লেটো
B. ম্যাথিউস
C. কান্ট
D. অ্যারিস্টটল
33. 'ন্যায়ের স্থান শীর্ষে', বলেছেন—
A. প্লেটো
B. মিল
C. অ্যারিস্টট্স
D বার্কার
34. 'আন্তর্জাতিক কথাটির মধ্যে স্ববিরোধিতা আছে', বলেছেন—
A. গার্নার
B. গেটেল
C. ল্যাঙ্কি
D. পোলক
35. 'প্লেটোর ন্যায়বিচার তত্ত্ব সর্বাত্মক সর্বনিয়ন্ত্রণকারী, বলেছেন—
A. কার্ল পপার
B. রুশো
C. হিউম
D. লক
36. অর্থনৈতিক নীতিকে ন্যায়নীতি ধারণার একমাত্র উৎস বলে মনে করেন—
A. হবস
B. লক
C. মার্কস
D. বার্কার
37. 'ন্যায় ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অধিকার থাকতে পারে না', বলেছেন—
A. বার্কার
B. প্লেটো
C. মিল
D. বেণ্থাম
38. 'সমাজে সহযোগিতার এক সঠিক ব্যবস্থা গড়ে উঠলে স্বাধীনতা ও সমতার মূল্যকে একযোগে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়' বলেছেন—
A. বার্কার
B. রলস
C. রুশো
D. প্লেটো
39. 'মুক্তি ও ন্যায়বিচার সমাজের ভিত', বলেছেন—
A. অ্যারিস্টট্ল
B. প্লেটো
C. ল্যাস্কি
D.দুগুন্ট
40. সামাজিক ন্যায়বিচারের উদাহরণ হল—
A. ভোটাধিকার
B. অস্পৃশ্যতা
C. বাকস্বাধীনতা
D. অবাধ ক্ষমতাভোগ
41. 'সংখ্যাগরিষ্ঠের সর্বোচ্চ মঙ্গল' নীতির প্রবক্তা ছিলেন—
A. বেণ্থাম
B. স্পেনসার
C. মিল
D. ক্রাব
42. ‘ন্যায়বিচারের ধারণাটি সমাজের কোনো শ্রেণিস্বার্থকে ভিত্তি করে গড়ে উঠবে না, গড়ে উঠবে সমগ্র সমাজের স্বার্থকে ভিত্তি করে,' একথা বলেছেন—
A.কার্ল মার্কস
B. প্রুঁধো
C. বার্কার
D. হবহাউস
43. 'ন্যায় হল একটি সামাজিক বাস্তবতা।' বলেছেন—
A. লেকি
B. হায়েক
C. বার্কার
D. নোজিক
44. সর্বপ্রথম আইনকে নৈতিকতা থেকে পৃথক করে বিচার করেন।
A. লক
B. রুশো
C. হবস
D. মেকিয়াভেলি
45. ন্যায়কে A Term of Synthesis' বলেছেন—
A. বার্কার
B. অস্টিন
C. তকভিল
D. মিল
46. সর্বপ্রথম আইনকে নৈতিকতা থেকে পৃথক করে বিচার করেন—
A. মেকিয়াভেলি
B. বার্কার
C. হেনরি মেইন
D রলস
47. ন্যায্যতাকে 'ন্যায়' হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—
A. বার্কার
B. রলস
C. নোজিক
D. প্লেটো
48. পদ্ধতিগত ন্যায়ের তত্ত্ব প্রচার করেন—
A. বার্কার
B রলস
C. নোজিক
D. প্লেটো
49. ন্যায় হচ্ছে বন্ধন যা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে বলেছেন—
A. রুশো
B. লক
C. স্যাবাইন
D মন্তেস্কু
50. ন্যায়কে 'দু-মুখো' বলে বর্ণনা করেছেন—
A. ল্যাস্কি
B. র্যাফেল
C. রাসেল
D. রলস
51. ‘রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব আইনকে বৈধতা দেয় আর ন্যায়বিচার তাকে দেয় মূল্য' বলেছেন—
A. বার্কার
B. অস্টিন
C. ল্যাস্কি
D. মিল
52. সংশোধনমূলক ন্যায়-এর কথা বলেন—
A. হ্যারল্ড পটার
B. হ্যারল্ড ল্যাস্কি
C. অ্যারিস্টটল
D. প্লেটো
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 1
1. ন্যায় কী ?
> ন্যায় হল একটি বিমূর্ত ধারণা। সাধারণত ন্যায়ের ধারণাটি প্রত্যেক ব্যক্তির যা প্রাপ্য তাকে সেটি দিয়ে দেওয়ার ধারণার সঙ্গে জড়িত।
2. প্রাচীন ভারতে ন্যায় বলতে কী বোঝাত ?
> প্রাচীন ভারতে ন্যায়ের ধারণাটি ধর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল। ধর্ম বলতে ন্যায়সংগত সামাজিক শৃঙ্খলাকে বোঝাত। রাজার প্রাথমিক কর্তব্য ছিল ন্যায়সংগত সামাজিক শৃঙ্খলাকে মেনে চলা।
3. ন্যায় ধারণার উৎসগুলি কী কী ?
> ন্যায় ধারণার উৎসগুলি হল—[I] ধর্ম, [ii] প্রকৃতি, [iii] অর্থশাস্ত্র ও [iv] নীতিশাস্ত্র।
4. গ্লাকোন এবং অ্যাডিমেন্টাস—এঁরা কারা ?
> গ্লাকোন এবং অ্যাডিমেন্টাস হলেন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস-এর শিষ্য ।
5. ইম্যানুয়েল কান্ট কোন্ দেশের দার্শনিক ছিলেন ?
> ইম্যানুয়েল কান্ট জার্মানির দার্শনিক ছিলেন।
6. ইম্যানুয়েল কান্ট-এর কাছে ‘ন্যায়'-এর অর্থ কী ?
> জার্মান দার্শনিক ইম্যানুয়েল কান্টের কাছে ন্যায়ের অর্থ হল প্রত্যেক ব্যক্তির তার ন্যায্য ও সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত না হওয়া।
7. 'ন্যায়' বা 'ন্যায়বিচার' শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ কী ?
> ‘ন্যায়' বা 'ন্যায়বিচার' শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Justice'।
8. ‘Justice' শব্দটি কোন্ শব্দ থেকে এসেছে ?
> ‘Justice' শব্দটি লাতিন শব্দ ‘জাস্টিসিয়া’ থেকে এসেছে।
9. ‘ন্যায়’-এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ কী ?
> লাতিন ‘Jurgere' অথবা, গ্রিক ‘Zeugnunai' শব্দ দুটি থেকে ‘ন্যায়’ বা ‘Justice' শব্দটির উৎপত্তি ।
10. একটি ভালো সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য কী ?
> ন্যায়বিচার একটি ভালো সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
11. অ্যারিস্টটল কোন্ শতাব্দীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ?
> অ্যারিস্টট্ল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
12. পৌর অধিকার মূলত কোন্ ধরনের শাসনব্যবস্থায় দেখা যায় ?
> উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় মূলত পৌর অধিকারগুলির সংযুক্তিকরণ ঘটেছে।
13. ন্যায় সম্পর্কে উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির একজন প্রবক্তার নাম লেখো ।
> ন্যায় সম্পর্কে উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির একজন প্রবক্তার নাম আর্নেস্ট বার্কার।
14. অ্যারিস্টট্ল কত প্রকার ন্যায়ের কথা বলেছেন ?
> অ্যারিস্টটল তিন প্রকার ন্যায়ের কথা বলেছেন।
15. ন্যায়বিচারের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যাকর্তার নাম কী ?
> জন রল্স হলেন ন্যায়বিচারের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যাকর্তা।
16. সামাজিক ন্যায় কী ?
> সামাজিক ন্যায় হল সামাজিক সুযোগসুবিধার সমতা।
17. রসের ন্যায়-এর ক-টি নীতি ছিল ?
> রসের ন্যায়-এর তিনটি নীতি ছিল।
18. রসের ন্যায়-এর বড়ো সমালোচক কে ?
> রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নোজিক রসের ন্যায়-এর বড়ো সমালোচক ।
19. Anarchy, State and Letopia গ্রন্থটির রচয়িতা কে ?
> Anarchy, State and Letopia গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন নোজিক ।
20. রসের মতে, ন্যায়বিচার কী ?
> রসের মতে, ন্যায়বিচার হল প্রাথমিক সামগ্রীর ন্যায্য বণ্টন।
21. জন রসের ন্যায়তত্ত্বের মূল বক্তব্যটি কী ?
> জন রসের ন্যায়তত্ত্বের মূল বক্তব্যটি হল— সামাজিক মূল্যগুলির ন্যায়সম্মত বণ্টন।
22. Veil of Ignorance বা 'অজ্ঞতার আচ্ছাদন' কী ?
> Veil of Ignorance বা অজ্ঞতার আচ্ছাদন হল এমন একটি কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ যেখানে ব্যক্তি যুক্তিসম্মত আচরণ করে বলে রস মনে করেছেন।
23. 'অজ্ঞতার আচ্ছাদন'-এ অবস্থানকালে মানুষ কীরকম আচরণ করে বলে রল্স মনে করেছেন ?
> ‘অজ্ঞতার আচ্ছাদন'-এ অবস্থানকালে মানুষ যুক্তিবাদী সত্তা হিসেবে আচরণ করে বলে রল্স মনে করেছেন।
24. ‘অজ্ঞতার আচ্ছাদন' (Veil of Ignorance)-এর ধারণাটি কি বাস্তব ধারণা ?
> রল্স বর্ণিত অজ্ঞতার আচ্ছাদন-এর ধারণাটি কোনো বাস্তব ধারণা নয়, বরং এটি হল একটি প্রতীকী ধারণা।
25. ধর্ম ও নীতিবোধের সঙ্গে সংযোগসূত্রে ন্যায় ধারণার সৃষ্টি হয়’—উক্তিটি কার ?
> 'ধর্ম ও নীতিবোধের সঙ্গে সংযোগসূত্রে ন্যায় ধারণার সৃষ্টি হয়’—উক্তিটি করেছেন অধ্যাপক বার্কার।
26. 'ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায়'-এর অর্থ কী ?
> 'ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায়'-এর অর্থ হল স্বাধীনতা ও সুযোগ, আয় ও সম্পদ এবং আত্মসম্মানের ভিত্তির মতো সমাজের যাবতীয় মূল্যবোধকে সকলের মধ্যে সমভাবে বণ্টন করা।
27. বণ্টনমূলক ন্যায়ের ধারণা কে প্রচার করেন ?
> বণ্টনমূলক ন্যায়ের ধারণা প্রচার করেন অ্যারিস্টল।
28. রাজনৈতিক ন্যায়-এর দুটি উদাহরণ দাও ।
> রাজনৈতিক ন্যায়-এর দুটি উদাহরণ হল—নির্বাচিত করা ও নির্বাচিত হওয়ার অধিকারের সমতা এবং সরকারি পদ ও সরকারি চাকুরি লাভের ক্ষেত্রে সমতা।
29. 'ন্যায়পূর্ণ সমাজ হল এরকম একটি সমাজ, যেখানে মর্যাদার ঊর্ধ্বমুখী ভাবনা এবং অপমানের নিম্নমুখী ভাবনা মিলিত হয়ে সহানুভূতিশীল সমাজের সৃষ্টি হয়। -অভিমতটি কে করেছেন ?
> প্রশ্নোক্ত অভিমতটি করেছেন ড. বি আর আম্বেদকর।
30. কোন্ দু-জন দার্শনিকদের সময়কালে দাসপ্রথা ছিল। ন্যায়সঙ্গত ?
> প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের সময়কালে দাসপ্রথা ছিল ন্যায়সঙ্গত।
31. ন্যায়-ধারণার প্রথম শর্ত কী ?
> ন্যায়-ধারণার প্রথম শর্ত হল স্বাধীনতা।
32. Political Justice গ্রন্থটি কার লেখা ?
> Political Justice গ্রন্থটি উইলিয়াম গডউইনের লেখা।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 2
1. ন্যায় সম্পর্কে কনফুসিয়াস-এর বক্তব্য কী ?
> চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াসের মতে ন্যায় হল অন্যায়কে না মেনে চলা বা মান্যতা না দেওয়া। সেক্ষেত্রে তিনি মন্তব্য করেছেন রাজার আবশ্যিক কর্তব্য যাঁরা অন্যায় করেছেন তাঁদের শাস্তি দেওয়া এবং যারা শ্রেষ্ঠ গুণের অধিকারী তাদের পুরস্কৃত করা। এইভাবে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন কনফুসিয়াস।
2. ন্যায়ের নীতিগুলি কী ?
> ন্যায়ের নীতিগুলি হল—
[i] সকলের প্রতি সমান ব্যবহার,
[ii] ন্যায়ের যথার্থ বণ্টন,
[iii] বিশেষ প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেওয়া।
3. জন রস কে ছিলেন ?
> জন রল্স একজন রাজনৈতিক দার্শনিক, যিনি ন্যায়তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মতে, সমাজে যারা বঞ্চিত তাদের প্রতি ন্যায় করা। এইভাবে তিনি সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠার কথা বলেন।
4. সক্রেটিস-এর কাছে ন্যায়ের অর্থ কী ছিল ?
> সক্রেটিস ন্যায় প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সকলেই যদি অন্যায় করে এবং নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নিজের স্বার্থে, সেক্ষেত্রে অন্যায়ের শাস্তি থেকে কেউই নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। অর্থাৎ, জনকল্যাণের আশীর্বাদ থেকে সকলেই বঞ্চিত হবে।
5. সকলের জন্য সমান ব্যবস্থা গ্রহণ বলতে কী বোঝো ?
> সকলের জন্য সমান ব্যবস্থা গ্রহণ বলতে বোঝায়, মানুষকে যেন জাতি, শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যের শিকার হতে না হয়। মানুষকে বিচার করতে হবে তার কর্ম ও কার্যকলাপের ভিত্তিতে।
6. বণ্টনমূলক ন্যায় (Distributive Justice) কাকে বলে ?
> বণ্টনমূলক ন্যায় বলতে বণ্টনের সেই নীতিকে বোঝায় যার দ্বারা সেবা, দ্রব্য, সম্মান ও পদ রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে বিতরিত করা হয়। কণ্টনমূলক ন্যায়কে অনেকসময় ‘সমানুপাতিক সমতার নীতি' বলা হয়ে থাকে। কারণ, রাষ্ট্রের প্রতিটি সদস্য সাধারণ জীবনের বাস্তবায়নে কিছু না কিছু অবদান রাখে। সুতরাং, তাদের অবদানের অনুপাতে দ্রব্য, সেবা, সম্মান ও পদ দলিত হয়।
7. সামাজিক ন্যায় বলতে কী বোঝো ?
> ন্যায়ের একটি রূপ বা ধরন হিসেবে সামাজিক ন্যায়ের ধারণাটি সমাজের সঙ্গে জড়িত। সামাজিক ন্যায় অসম করার দায়িত্বটি ব্যক্তির ওপর না ছেড়ে সমাজের ওপর অর্পণ করা উচিত। সামাজিক ন্যায়ের ধারণায় মনে করা হয় যে, ন্যায়প্রতিষ্ঠা ব্যক্তির একক প্রচেষ্টার দ্বারা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার হয় ন্যায় থেকে বঞ্চিত সংঘবন্ধ সামাজিক প্রচেষ্টা। সামাজিক পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করা হয়।
8. ‘অজ্ঞতার আচ্ছাদন' (Veil of Ignorance) বলতে কী বোঝো ?
> 'অজ্ঞতার আচ্ছাদন' হল একটি প্রতীকী ব্যাপার। এখানে ধরে নেওয়া হয় যে, আদি অবস্থান (Original Position)- এ মানুষ স্বার্থবুদ্ধি ও যুক্তিবোধসম্পন্ন হলেও অজ্ঞতার অবগুণ্ঠন বা আচ্ছাদনের আড়ালে থাকায় তাদের দেশ, কাল, সমাজ সম্পর্কে কোনো সচেতনতা থাকে না। নিজেদের শক্তি, বুদ্ধি ও সামর্থ্য সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা থাকে না। সমাজে নির্দিষ্ট স্থান, শ্রেণিগত অবস্থান বা মর্যাদা সম্পর্কেও তাদের কোনো জ্ঞান থাকে না। কিন্তু অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান ও ন্যায় সম্পর্কে একটি বোধও থাকে। তাই তারা তাদের কল্যাণকে সর্বাধিক করতে চায়।
9. ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় (Justice as Fairness) বলতে রল্স কী বুঝিয়েছেন ?
> ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বলতে সমাজের সকল মূল্যবোধ, স্বাধীনতা ও সুযোগ, আয় ও সম্পদ সম্মানের ভিত্তিতে সমভাবে বণ্টন হওয়াকে বুঝিয়েছেন। তবে বণ্টনের সময়ে দেখতে হবে যাতে সমাজের দুর্বল ব্যক্তিটিও যথাযথভাবে লাভবান হতে পারে এবং প্রাথমিক সামাজিক দ্রব্যগুলি কটনের সময় সবথেকে কম সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেন সবথেকে বেশি সুবিধা পায়।
10. 'সর্বাধিক নীতি' (Maximin Principle) কী ?
> রসের ন্যায়তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যাতে তারা যুক্তিসংগতভাবে সকলের সুবিধায় আসে এবং বিশেষ করে সর্বাধিক কম সুবিধাপ্রাপ্তদের সুবিধায় নিয়ে আসা যায়। এই নীতিটিকে ‘সর্বাধিক নীতি' (Maximum Principle) বলা হয়। এই নীতির মূল কথা হল সর্বনিম্ন সুবিধাভোগীদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণ।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 4
1. প্লেটোর মতানুসারে ন্যায়ের ধারণাটি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো ।
> প্লেটোর মতে, ন্যায় হল মানুষের জীবনকেন্দ্রিক। মানুষের জীবনের কার্যকরী বিশেষজ্ঞ অনুসারে ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি যে কাজে বিশেষজ্ঞ বা দক্ষ তার সেই কাজে ব্রতী হওয়ার মধ্যেই ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হবে।
[i] সামাজিক নির্দেশের সঙ্গে প্লেটো তাঁর ন্যায়ের ধারণাকে সংযুক্ত করার পক্ষপাতী। তিনি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠাকে তিনটি সূত্রের ওপর স্থাপন করেছেন। যথা—প্রজ্ঞা, শৌর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ।
[ii] সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, যেমন—উৎপাদক, সৈন্যবাহিনী এবং শাসক, এদের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের মধ্যে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
[iii] প্রতিটি শ্রেণি যখন অনধিকার চর্চা না করে নিজের কাজের প্রতি যত্নবান হয়, তখন ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই শ্রেণির স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়।
[iv] সমাজের বিভিন্ন দাবির মাধ্যমে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে ব্যক্তির প্রতি রাষ্ট্র ন্যায়প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
2. ন্যায় প্রসঙ্গে সক্রেটিস তাঁর শিষ্যদের কী বুঝিয়েছিলেন ?
> সক্রেটিসের শিষ্যদের সঙ্গে ন্যায়ের বিষয়ে আলোচনা চলাকালীন শিষ্যরা সক্রেটিসের কাছে জানতে চান, কেন ন্যায়প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন বা কেন আমরা ন্যায়কে মান্য করব? তাদের মতো সমাজে সকলেই নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য যত্নবান এবং যাঁরা সমাজে অন্যায় কাজের সঙ্গে লিপ্ত বা অন্যায়ভাবে জীবনযাপন করছে তারা অনেক বেশি ভালো আছে, তাহলে ন্যায়কে মান্য করার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? এ প্রসঙ্গে সক্রেটিস তাঁর শিষ্যদের যা বলেন তাই তাঁর ন্যায় প্রসঙ্গ তত্ত্বে গুরুত্ব পায়। তাঁর মতে, সকলেই যদি সমাজের প্রতি অন্যায় করে, তাহলে কেউই আর ন্যায়ের দাবি করতে পারবে না। সক্রেটিসের মতে, সমাজে যদি সকলেই নীতি লঙ্ঘন করে, সামাজিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে নিজের স্বার্থে, সেক্ষেত্রে কেউই জনকল্যাণের দাবি করতে পারে না এবং তাতে সকলেরই ক্ষতি হয়।
সুতরাং, সামগ্রিক বা ব্যক্তির স্বার্থের কথা ভেবে আমরা নিজেরাই সঠিক কাজ করব। অর্থাৎ, সক্রেটিসের মতে, নিজেদের বলে বা কল্যাণের স্বার্থে আমরা নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলব। সক্রেটিস তাঁর ছাত্রদের ন্যায়ের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ন্যায় কী বা এর গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের আগে উপলব্ধি করতে হবে। ন্যায়ের অর্থের গভীরতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারলেই ন্যায়কে মান্য করার কারণ সহজেই বোধগম্য হবে। ন্যায়ের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সক্রেটিস বলেছেন, সকলের মঙ্গল করার অর্থই হল ন্যায়। ন্যায় কেবল নিজেদের আত্মীয়বর্গ, বন্ধুর জন্য ভালো করব এবং শত্রুর প্রতি খারাপ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সকলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে ভালো করার মধ্যেই ন্যায়ের যথার্থতা। যেমন—চিকিৎসক রোগীদের সুস্থ করার জন্য নিঃস্বার্থভাবে চিকিৎসা করেন, ঠিক তেমনই প্রশাসক তাঁর রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে ব্রতী হবে। এর মাধ্যমেই সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে সক্রেটিস মন্তব্য করেছেন।
3. ন্যায়ের আধুনিক ধারণা ঠিক কী ?
> প্রাচীনকালে প্লেটো ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সকলকে সমান দেখার মাধ্যমে। সমাজে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, জাতি নির্বিশেষে সকলেই সমান পাওনার অধিকারী। প্লেটো ন্যায়-এর ব্যাখ্যা এভাবেই করেছেন। কিন্তু আধুনিক যুগে প্লেটোর ব্যাখ্যার যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। সাম্প্রতিককালেও সকলের প্রতি সমান আচরণকে ন্যায় বলা হয় ঠিকই কিন্তু জন্মসূত্রে বা যোগ্যতাসূত্রে সকলের পাওনা সমান নয়। যোগ্যতা বা দক্ষতানুযায়ী যার পাওনা যেমন, প্রত্যেক ব্যক্তিকে সেই নিরিখে তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এই হল আধুনিক কালের ন্যায়ের ধারণা। এ প্রসঙ্গে জার্মান দার্শনিক ইম্যানুয়েল কান্ট বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের একটি নিজস্ব সম্মান এবং সম্ভ্রম রয়েছে। প্রত্যেকের যদি সেই সম্মান রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতি পায়, তাহলে সকলেই যে যার সাধ্যমতো নিজের যোগ্যতা এবং ক্ষমতানুযায়ী প্রমাণ করতে পারবে। রাষ্ট্র কেবল প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য সম্মান বা অধিকারটুকু প্রদান করবে। ব্যক্তির কর্তব্য সেই অধিকারকে সঠিক পথে বা যথার্থভাবে ব্যবহার করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করা এবং রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত পাওনাটুকু বুঝে নেওয়া। আধুনিক যুগের ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এইভাবেই সম্ভব বলে দাবি করেছেন দার্শনিকরা।
4. ন্যায় প্রসঙ্গে উদারবাদীদের বক্তব্য কী সংক্ষেপে বলো।
> উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সকলের মধ্যে ব্যক্তির অধিকারগুলি যথার্থভাবে বণ্টিত হয় এবং অধিকার ভোগের ক্ষেত্রটিকে সংবিধানের সাহায্যে সুরক্ষিত করা হয়।
[i] উদারবাদী ব্যবস্থায় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা পরিলক্ষিত হয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বীকৃতি ও তাকে সংরক্ষণের মাধ্যমে।
[ii] উদারবাদীরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলিকে ভোগ করার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে ন্যায়ের বণ্টনকে সুরক্ষা করার আদর্শে ব্রতী হন।
[iii] উদারবাদীরা সমাজব্যবস্থাকে জনমতের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
[iv] উদারবাদীদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনমতের ভিত্তিতে সমাজ গঠিত হলে ব্যক্তি নাগরিকদের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটা সম্ভবপর হবে।
5. ন্যায় প্রসঙ্গে মার্কসবাদীদের মতটি সংক্ষেপে বলো।
মার্কসবাদীদের মতে, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টন ব্যবস্থার ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হলে ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। অর্থাৎ, মার্কসবাদীরা উদারবাদী ব্যাখ্যার থেকে সরে এসে শ্রেণিসংগ্রামের ধারণার আশ্রয় নিয়েছেন। মার্কসবাদীরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উৎপাদনের মালিকানার ধারণার পরিবর্তে শ্রেণিবৈষম্যের প্রতি অধিক গুরত্ব আরোপ করেছেন। শ্রেণিতে শ্রেণিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য যেদিন দূরীভূত হবে সমাজে তখনই ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মার্কসবাদীরা মনে করেন।
6. ‘সকলের জন্য সমান ব্যবস্থা’ অথবা, ‘সমকক্ষ লোকের প্রতি সম-আচরণ'- ব্যাখ্যা করো।
> সাম্প্রতিককালে সমাজে সকল মানুষের জন্য সমান গুরুত্ব— কথাটি ব্যাখ্যা করতে গেলে প্রথমেই যেটি বলা প্রয়োজন সকলের প্রয়োজনটুকু সঠিকভাবে উপলব্ধি করা। সকলের প্রয়োজনের মাপকাঠি নির্ধারণ করা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন বিষয়। এই বিষয়গুলিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে ন্যায়ের কতগুলি নীতির কথা বলা হয়। এই নীতিগুলি ব্যাখ্যার মাধ্যমেই ন্যায়ের বণ্টন যথার্থভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব। ‘সকলের জন্য সমান ব্যবস্থা' বা, ‘সমকক্ষ লোকের প্রতি সম-আচরণ'—এই বক্তব্যটি হল ন্যায়ের প্রথম নীতি।
এই নীতি অনুযায়ী বলা হয়, সমাজে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। সকলের প্রতি অর্থাৎ, শ্রেণি, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই ন্যায্য অধিকারের অধিকারী। প্রত্যেকেই ন্যায়ের বিচার পায় যে বা যার কর্মের নিরিখে। কর্ম যাই হোক, ন্যায্য মূল্য পাবে যে-কোনো ধর্মের বা বর্ণের বা লিঙ্গের মানুষ। অর্থাৎ, কোনো অফিসে সমান বয়সি এবং শিক্ষিত দু-জন নারী ও পুরুষ সমান কাজের জন্য বেতন সমান পাবে। পুরুষ বলে বেশি এবং নারী বলে কম এমনভাবে উপার্জনের বণ্টন অন্যায্য। উপার্জনের ন্যায্য বণ্টন হল সমান যোগ্যতা ও দক্ষতায় সমান কাজে সমান উপার্জন। আরও একটি উদাহরণের মাধ্যমে ন্যায্য বণ্টনের কথাটি ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন—একজন চিকিৎসক এবং একজন মুচির সন্তানের যদি সমান যোগ্যতা থাকে তাহলে উভয়েই সরকারি চাকুরির পরীক্ষায় উপস্থিত থাকতে পারবে। উভয়ের আর্থিক বৈষম্য কখনোই সরকারি চাকুরি পরীক্ষায় বসার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। রাষ্ট্র তা হতে দেবে না এবং এখানেই সকলের জন্য সমান আচরণের মাধ্যমে ন্যায্য বণ্টনকে সার্থক করে তুলবে রাষ্ট্র।
7. 'সমানুপাতিক ন্যায়বিচার' বলতে কী বোঝো ?
> ‘সমানুপাতিক ন্যায়বিচার' হল ন্যায়ের দ্বিতীয় নীতি। সকলকে সমান প্রাপ্যটুকু ন্যায়প্রতিষ্ঠার নীতি নয়। অর্থাৎ, সমান যোগ্যতার সকলের প্রতি কর্তৃপক্ষ ন্যায্যবিচার করবে, কিন্তু সেখানে যিনি বা যাঁরা যোগ্যতার অধিকারী তাঁরা সকলেই কিন্তু সমান দক্ষতা বা মেধার অধিকারী নয়। সুতরাং, যোগ্যতার নিরিখে কোনও একটি পরীক্ষায় বসার সুবিধা পাবে প্রত্যেকেই, যাঁরা ওই যোগ্যতার অধিকারী। কিন্তু পরীক্ষায় কে, কেমন ফলাফল করবে তা নির্ভর করবে সম্পূর্ণ ব্যক্তির দক্ষতা বা মেধার ওপর। এক্ষেত্রে ন্যায্যবিচার হবে তখনই যখন 100 জন সমান যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবে কিন্তু ফলাফল নির্ভর করবে তাঁদের মেধার ওপর। উদাহরণ সহযোগে বলা যায়, একাদশ শ্রেণির কলা বিভাগের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে 90 জন বার্ষিক পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবে—এটাই হল ন্যায্য বিচারের প্রথম নীতি। কিন্তু দ্বিতীয় নীতি প্রতিষ্ঠিত হবে তখনই যখন 90 জন নিজ দক্ষতা অনুসারে বা মেধা অনুসারে নম্বর পাবে। আবার কোনো একটি অফিসে বিভাগীয় পরীক্ষাতে উপস্থিত সকলের মধ্যে ন্যায্য বিষয়ের নিরিখে তিনিই কিন্তু বিভাগীয় উন্নতিলাভ করবেন যিনি মেধা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন।
8. ন্যায়বিচারের 'বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি' বলতে কী বোঝো ?
> ‘বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি' হল ন্যায়ের তৃতীয় নীতি। এই নীতির মাধ্যমে পুনরায় ন্যায্যবিচার সকলের জন্য সমানভাবে প্রযুক্ত করা সম্ভব নয় বা অন্যায্য তাই বোঝানো হয়েছে। প্রথম নীতিতে বলা হয়েছে সকলের প্রতি সমান ন্যায্যবিচার, দ্বিতীয় নীতিতে বলা হয়েছে সমান যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ন্যায্যবিচার কিন্তু মেধার প্রাধান্যকে অস্বীকার অন্যায্য। এই দুটি নীতির আরও একটু বিশেষীকরণ করা হয়েছে, ন্যায়ের তৃতীয় নীতিতে। এই নীতিতে বলা হয়েছে, জন্মগতভাবে যারা স্বাভাবিক নয় অর্থাৎ মানসিক বা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সুবিধাপ্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ন্যায়প্রতিষ্ঠা করবে। এক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের 'বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি' প্রদান করা হবে। কারণ, শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা কখনোই সমাজের সক্ষম ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনীয় নয় বা তুলনীয় হলেও তা অন্যায্য। তাই তাদের বিশেষ সুবিধাপ্রদানের মধ্যদিয়ে ন্যায়ের তৃতীয় নীতিটি প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ছাড়াও এই নীতির অন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন—বহুজাতিক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে নাইট শিফট চালু আছে, সেক্ষেত্রে নারীদের রাতে বাড়ি ফেরার জন্য বা অফিসেও কাজের জন্য কর্তৃপক্ষ বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নারীদের প্রতি ন্যায্যবিচার করেন। সুতরাং, শারীরিক অক্ষমতা বা নিরাপত্তার কারণে বিশেষ সুবিধাপ্রদানের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ ন্যায়প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে ন্যায়ের তৃতীয় নীতিটিকে স্বীকৃতি দেন। [ত' 'বণ্টনমূলক ন্যায়' বলতে কী বোঝো ?
9. ন্যায়ের তিন ধরনের নীতির প্রয়োগের পরেও অন্যায্য
> পরিলক্ষিত হতে পারে। সমাজে সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রাথমিকভাবে সরকারি নীতি ও আইনের বিষয়ে যত্নবান হলেও তা যথেষ্ট নয়। সামাজিক ন্যায়ের বিষয়ে যত্নবান হতে গেলে সমান বণ্টনের দিকেও যত্নবান হতে হয়। ‘বণ্টনমূলক ন্যায়' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সামাজিক ন্যায়ের পথ প্রসারিত হয়। সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠা, কেবল সামাজিক নীতি বা আইনের ক্ষেত্রে ন্যায়প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ না করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমবণ্টনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমবণ্টন বলতে এখানে উৎপাদিত দ্রব্য এবং সেবা জাতীয় বিষয়গুলির সমবণ্টনকে বোঝানো হয়েছে। এই বণ্টন সমাজে জাতি বা বিভিন্ন গোষ্ঠী বা ব্যক্তির মধ্যে হতে পারে। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বণ্টনে যদি সমতা না থাকে তাহলে ন্যায়প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্র পুনর্বণ্টন করতে পারে। যেমন—ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে জমি বেশিরভাগ জমিদারদের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পরে ভূমি- সংস্কার আন্দোলন এবং ভূমিসংস্কার আইনের দ্বারা জমিদার বা রাজন্যবর্গের জমি সরকার জমিহীন কৃষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করে।
এ ছাড়া সমাজে ব্যক্তিদের সরকারি নীতি বা আইনের দ্বারা প্রাপ্য ন্যায়টুকু যথেষ্ট নয়, তাদের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে ন্যায়প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। যেমন—সরকার সংবিধানে অস্পৃশ্যতার নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে মন্দিরে সকলের প্রবেশাধিকারে সমতা প্রতিষ্ঠা করে সকলের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।
10. সামাজিক ন্যায় বলতে কী বোঝো ? এর বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো ।
> সমাজে সকল মানুষ সমানভাবে বাঁচবে—এই ধারণার মধ্যেই সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠিত। এর বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
[i] প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের মতোকরে ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ পাওয়ার মধ্যেই সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠিত।
[ii] সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে বৈষম্যকে নিশ্চিহ্ন করা।
[iii] সমাজে যত্রতত্র সকলেই চলাফেরা করার অবাধ স্বাধীনতা পাবে। যেমন—পার্ক, সিনেমা হল, মন্দির ইত্যাদি স্থানে প্রত্যেকের প্রবেশ অবাধ।
11. ভারতে কীভাবে সামাজিক ন্যায়কে সুনিশ্চিত করা হয় ?
> নাগরিকদের মধ্যে যে-কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্যের দূরীকরণই হল সামাজিক ন্যায়। ভারত সামাজিক ন্যায়কে সুনিশ্চিত করেছে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলির মাধ্যমে—
[i] রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করেছে।
[ii] সংবিধানে স্বীকৃত শোষণের বিরুদ্ধে অধিকারের ও সাম্যের অধিকারের মাধ্যমে কোনো ক্ষেত্রেই সামাজিক বৈষম্যকে স্বীকার করা হয় না।
[iii] তা ছাড়া প্রস্তাবনায় সকলের জন্য ন্যায় উল্লেখ করে সামাজিক ন্যায়কে সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
12. সামাজিকভাবে কি চরম ন্যায়প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ? -ব্যাখ্যা দাও।
> পৃথিবীর প্রতিটি সমাজব্যবস্থাতেই কিছু না কিছু অসাম্য ও বৈষম্য দেখা যায়। এটি চরম বাস্তব ঘটনা, যাকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু সমাজে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পেলে তখনই সমাজের মধ্যে ন্যায়প্রতিষ্ঠা বাধাপ্রাপ্ত হয়। সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে প্রচুর সম্পদ তথা ক্ষমতা যদি কুক্ষিগত থাকে তাহলে বাকি মানুষদের হাতে কিছুই থাকে না। এমতাবস্থায় সমাজে অন্যান্য বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সরকারের উচিত সমাজের মধ্যে সম্পদগুলির ন্যায়সম্মত বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা করা। কোনো সরকারের পক্ষেই পরিপূর্ণ ন্যায়প্রতিষ্ঠা করা হয়তো সম্ভব হয় না। কিন্তু সমাজে মানুষের জীবনধারণের জন্য যদি ন্যূনতম প্রাথমিক চাহিদাগুলির সমবণ্টন করা যায়, যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ন্যূনতম বেতন কাঠামো, গৃহ, বিশুদ্ধ জল ইত্যাদির ন্যায়সম্মত বণ্টন তথা সমমানের সঙ্গে বসবাস করার সুযোগসহ সম্পদের সমকটনের ওপর সরকার যদি আন্তরিক হয় তাহলে সমাজে মানুষের মধ্যে অসাম্য-বৈষম্যের দূরত্ব হ্রাস পাবে। হয়তো সমাজের মধ্যে পুরোপুরি ন্যায় বা চরম ন্যায়প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না, কিন্তু সমাজে মানুষের মধ্যে আয়বৈষম্য, জীবনধারণের সুযোগসুবিধার বৈষম্যগুলি হ্রাস পাবে। যেটি একটি সুস্থ ও সফল গণতন্ত্রের লক্ষণ।
13. প্রকৃত ন্যায়প্রতিষ্ঠার অন্যতম নীতি হিসেবে বিশেষ সুযোগসুবিধা প্রদানের নীতিটি কতদূর যুক্তিসংগত
> সমাজে প্রকৃত ন্যায়প্রতিষ্ঠা করতে হলে সমাজের মধ্যে বসবাসকারী সবধরনের নাগরিকদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধাগুলির ন্যায়সম্মত বণ্টন করতে হবে। সমাজে কিছু মানুষ থাকে যারা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, শোষিত ও বঞ্চিত। এ ছাড়াও বয়স্ক নাগরিক তথা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল মানুষ যারা সমাজের মূলস্রোতের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান করতে পারে না। তাদের জন্য সরকারের উচিত অন্যান্য নাগরিকদের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু সুযোগসুবিধা প্রদান করা, যাতে সেই সুযোগের দ্বারা তারা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রক্রিয়াটি সচল রাখতে পারে। কারণ, এই শ্রেণির মানুষদের সমাজের সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের সঙ্গে জীবনধারণের প্রতিযোগিতায় এক সারিতে দাঁড়াতে হবে না। অন্যান্যদের তুলনায় কিছু অতিরিক্ত সুযোগসুবিধা প্রদান করে এই শ্রেণির মানুষগুলিকে স্বাভাবিক ও সম্মানের সঙ্গে জীবনধারণের প্রক্রিয়াটিকে সম্পন্ন করতে দিতে হবে।
14. অর্থনৈতিক ন্যায়ের দিকটি কী ?
> ন্যায় বণ্টনের অর্থনৈতিক দিকটি রাষ্ট্র নিম্নলিখিত উপায়ে রক্ষা করে—
[i] রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সমান কাজের জন্য সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার ভোগ করে এবং জীবিকা অর্জনের সুযোগ পান। পছন্দের জীবন অতিবাহিত করার মতো উপার্জন করার সুযোগ প্রদান করে রাষ্ট্র ।
[ii] সমাজে অনগ্রসর সংখ্যালঘুদের জন্য বৃত্তি, সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের আশু কর্তব্য।
[iii] সমান কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক পাওয়া উচিত।
[iv] জমি এবং উৎপাদন সামগ্রীর ওপর ব্যক্তিমালিকানার অনুপস্থিতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ করে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা মার্কসবাদীদের বক্তব্য ।
15. অর্থনৈতিক ন্যায় বলতে কী বোঝো ? এর বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
> উদারবাদী এবং মার্কসবাদীদের মধ্যে অর্থনৈতিক ন্যায়কে নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও, অর্থনৈতিক ন্যায়কে ব্যাখ্যা করলে বলা যায়, সমাজে সকলেই যদি নিজ নিজ যোগ্যতানুসারে জীবনধারণের জন্য উপার্জন করতে পারে, তাহলে সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অর্থনৈতিক ন্যায়ের বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ—
[i] সমাজের সকলের মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিক তাদের যোগ্যতার নিরিখে উপার্জন করতে পারার অধিকার ভোগ করবে এবং রাষ্ট্র নাগরিককে এই অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে বাধা দিতে পারে না। এইভাবেই সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা যায়। কোনোভাবেই কোনো নাগরিক অর্থনৈতিক বঞ্ছনার শিকার যাতে না হয় সেই দিকেও দৃষ্টিপাত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
[ii] কারখানা বা কোনো সরকারি অফিসে প্রত্যেক শ্রমজীবী সমান পারিশ্রমিক পাবে, সমান কাজের জন্য।
[iii] অর্থনৈতিক ন্যায়-এর অপর বৈশিষ্ট্য হল, যে-কোনো ব্যক্তি তার যোগ্যতার অনুপাতে দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ পাবে তথা রাষ্ট্র তাকে সেই সুযোগ দিতে বাধ্য এবং সেই অনুপাতে জীবনে সুখেস্বচ্ছন্দে দিনাতিপাত করতে পারার মতো পারিশ্রমিক অর্জন করবে।
16. ন্যায়ের রাজনৈতিক দিকটি কী ?
> ন্যায় একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। তথাপি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এই তিনটি ক্ষেত্রে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ন্যায্য এবং বাঞ্ছনীয়ও বটে। ন্যায়ের রাজনৈতিক দিকটি হল নিম্নরূপ—
[i] সাধারণ নাগরিক প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে।
[ii] সরকার রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের স্বার্থের প্রতি নজর দেয়।
[iii] সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার অধিকার ভোগ করে রাষ্ট্রের নাগরিক।
17. ন্যায়ের নৈতিক ধারণা কী ?
> কিছু প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক নীতির ওপর ভিত্তি করে ন্যায়ের নৈতিক ধারণাটি দাঁড়িয়ে আছে।
সাধারণভাবে ন্যায় বলতে ন্যায্যতাকে বোঝায়। ন্যায় হল—যে কোনো উচিত কাজ। অর্থাৎ, অনুচিত, অন্যায়, ভুল কাজের বিপরীত অবস্থান হল ন্যায়। ন্যায়ের নৈতিক ধারণাটি হল—[i] আদর্শবোধ ও বিশুদ্ধতা, [ii] চরম সত্য ও পরিপূর্ণতা, [iii] দয়া প্রদর্শন, [iv] প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, [v] উদারতা ইত্যাদি।
18. সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকার কী কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে ?
> ন্যায়ের ধারণার সঙ্গে ভারসাম্যের ধারণাটি সংযুক্ত। সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারসাম্যকে প্রতিষ্ঠা করাই হল রাষ্ট্রের লক্ষ্য। সমাজে সংখ্যালঘু পিছিয়ে পড়া শ্রেণি যারা সমাজে শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে আছেন তাদের সমাজের মূলস্রোতের সঙ্গে বা সমাজের প্রথম সারির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। সরকারের এহেন ইতিবাচক পদক্ষেপ সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় ফলপ্রসু হয়। পদক্ষেপগুলি হল নিম্নরূপ—
[i] তপশিলি জাতি, উপজাতি এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে সংরক্ষণ।
[ii] এই শ্রেণিকে বিশেষ সুবিধার আওতায় আনা যাতে সমাজের সকলের সঙ্গে সমানভাবে পা মেলাতে পারে।
[iii] এইভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থার দ্বারা সমাজে বৈষম্যকে দূর করা এবং ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকার সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
19. খোলাবাজার কাকে বলে ?
> উদারনীতিবাদের আদর্শে খোলাবাজার বা মুক্তবাজার -এর কথা বলা হয়। এই খোলা বা মুক্তবাজার নীতির মাধ্যমে উদারনীতিবাদীরা আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের অগ্রসরের পথ তৈরি করে। এর ফলে একটি প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা তৈরি হয় বিক্রেতাদের মধ্যে। খোলাবাজার নীতির মাধ্যমে প্রত্যেক বিক্রেতা তার নিজের পণ্য বিক্রয় করার সুযোগ পাচ্ছে, নিজের লাভ, পণ্যের দাম সবকিছুই বাকি বিক্রেতাদের সঙ্গে সামস্তাস্য রেখে এক্ষেত্রে করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিক্রির পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। শিল্প ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্ব-উদ্যোগকে বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে খোলাবাজারের মাধ্যমে। খোলাবাজারে বিক্রেতার স্ব-নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকছে, এক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ বাঞ্ছনীয় নয়। ফলে ব্যক্তি ভালোভাবে তার স্বাধিকারের সত্তা ভোগ করতে পারে।
20. খোলাবাজারের সুবিধাগুলি কী কী ?
> খোলাবাজারের সুবিধাগুলি হল নিম্নরূপ—
[i] খোলাবাজারে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না।
[ii] খোলাবাজারের ক্রেতা বা উপভোক্তাদের পছন্দ করার সুযোগ থাকে।
[iii] খোলাবাজারে প্রতিযোগিতা থাকার জন্য পণ্যের মান উন্নত ধরনের হয়।
[iv] সরকারি বাজারে প্রতিযোগিতার অভাবের জন্য পণ্যের মানোন্নয়নের প্রতি সরকারের নজর কম থাকে।
[v] খোলাবাজারে একই পণ্য বিভিন্ন জায়গায় পাওয়ার সুবিধার্থে ক্রেতারও বুঝে কেনার সুবিধা তৈরি হয়।
21. খোলাবাজার নীতির মাধ্যমে কীভাবে ন্যায়প্রতিষ্ঠা হবে ?
> সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সফল রূপায়ণ হয়েছে আমরা তখনই বলব যখন ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান হ্রাস পাবে। ন্যায়প্রতিষ্ঠার অর্থ কখনোই এমন নয় যে, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানকে বিলুপ্ত করা। অর্থাৎ, সমাজে নিখুঁতভাবে সামপ্রতিষ্ঠার কথা ন্যায়ের ধারণা প্রচার করে না। ন্যায়প্রতিষ্ঠার অর্থ হল সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধানকে যথাসম্ভব হ্রাস করা। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য এমন না হয় যাতে দেখে মনে হয় উভয় শ্রেণি সম্পূর্ণ ভিন্ন পৃথিবীতে বসবাস করে।
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর প্রশ্নমান 6
1. ন্যায়ের তিনটি নীতি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
> সাম্প্রতিককালে সমাজে 'সকল মানুষের জন্য সমান গুরুত্ব' কথাটি ব্যাখ্যা করতে গেলে প্রথমেই যেটি বলা প্রয়োজন, তা হল—সকলের প্রয়োজনটুকু সঠিকভাবে উপলব্ধি করা। সকলের প্রয়োজনের মাপকাঠি নির্ধারণ করা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন বিষয়। এই বিষয়গুলিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে ন্যায়ের কতগুলি নীতির কথা বলা হয় ।
[i] সমকক্ষ লোকের প্রতি সম-আচরণ,
[ii] সুপাত ন্যায়িক,
[iii] বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি—এই তিনটি নীতির দ্বারা ন্যায়ের আদর্শটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
ন্যায়ের নীতিসমূহ: ন্যায়ের নীতিগুলি হল নিম্নরূপ—
[i] সমকক্ষ লোকের প্রতি সম-আচরণ: সকলের জন্য সমান ব্যবস্থা এটি ন্যায়ের প্রথম নীতি। এই নীতি অনুযায়ী বলা হয় ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই সমান অধিকার ভোগ করার অধিকারী। রাষ্ট্রের কর্তব্য প্রত্যেককেই সমান অধিকার ভোগের সুযোগ করে দেওয়া, যাতে প্রত্যেকেই নিজের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। যেমন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা অনুসারে নির্দিষ্ট কর্মের অধিকারী। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র বর্ণ, ধর্ম, শ্রেণি বা লিঙ্গভেদে যদি সেই ব্যক্তিকে ওই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে তাহলে অসাম্য হবে। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গভেদে প্রতিটি ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার অধিকারী হয়, তাহলে ওই ব্যক্তি নির্দিষ্ট কাজটি করার সুযোগ পাবে। রাষ্ট্র তাকে সুযোগ দেবে। এইভাবেই ন্যায়ের প্রথম নীতিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন—সরকারি কাজের পরীক্ষায় যোগ্যতাসম্পন্ন সকলেই পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবে।
[ii] সমানুপাতিক ন্যায়: এটি হল ন্যায়ের দ্বিতীয় নীতি। এই নীতিটি আসলে প্রথম নীতির দ্বিতীয় ধাপ বলা যেতে পারে। সমানুপাতিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, ন্যায়ের প্রথম নীতিটি যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ, প্রথম নীতি অনুসারে, সকলেই যারা সরকারি চাকুরি বা কোনো চাকুরির বিভাগীয় পরীক্ষায় বসার যোগ্যতাসম্পন্ন তাদের ওই পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার দক্ষতা নাও থাকতে পারে। সুতরাং, রাষ্ট্র অবশ্যই পরীক্ষার্থীর দক্ষতার ওপরও নজর দেবেন। যিনি সঠিক দক্ষতার মাধ্যমে কৃতকার্য হচ্ছেন, চাকুরি বা চাকুরির বিভাগীয় উন্নতি যেন তাঁরই হয়। সেখানে যেন কোনোভাবেই দক্ষ ব্যক্তি বঞ্চিত না হন। এইখানেই ন্যায়ের দ্বিতীয় নীতির সার্থকতা এবং প্রথম নীতিটির সম্পূর্ণতা প্রতিষ্ঠা পায়।
[iii] বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি: ন্যায়ের তৃতীয় নীতিটি বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি। প্রথম নীতিতে সকলের জন্য সমান আচরণের মধ্যদিয়ে ন্যায়প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। দ্বিতীয় নীতিতে, প্রথম নীতির বিশেষীকরণ করা হয়। । সকলের জন্য সমান আচরণ করা হবে কিন্তু সকলের সমান যোগ্যতার সঙ্গে দক্ষতাও থাকতে হবে। আমরা জানি, দক্ষতা সকলের সমান হয় না। তাই সমান যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের দক্ষতা যেমন রাষ্ট্রের কাছে পাওনার মাপকাঠিও ঠিক তেমনই হবে। এইভাবে দুটি নীতির মাধ্যমে সমাজে রাষ্ট্র ন্যায়প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু সমাজে এমন বহু নাগরিক আছেন যাঁরা জন্মগতভাবে সকলের মতো নয়। অর্থাৎ, শারীরিক এবং মানসিক প্রতিবন্ধীরাও রাষ্ট্রের নাগরিক। এদের জন্য বিশেষ প্রয়োজনের কথা রাষ্ট্রের স্মরণ রাখতে হবে। এঁদের জন্য শিক্ষা বা কর্মের ক্ষেত্রে বিশেষ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন । এইভাবে সমাজের দুর্বল শ্রেণিকে সমাজের সবলদের সঙ্গে পা ফেলতে সাহায্য করে। এই দুর্বলদের মধ্যে কেবল শারীরিক এবং সামাজিক প্রতিবন্ধীরাই নেই, আছেন অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া শ্রেণিরাও। এদের জন্য রাষ্ট্র পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা না করে, শিক্ষা-সহ কর্মপ্রতিষ্ঠান সর্বত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে এবং তাকে আইনের স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে। আইনের স্বীকৃতির মাধ্যমে ন্যায়ের তৃতীয় নীতি অর্থাৎ, বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতিকে প্রণিধান দেওয়া হয়েছে। যেমন—তপশিলি জাতি, উপজাতি এবং সমাজের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণিদের জন্য সব ক্ষেত্রেই আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
2. বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি এবং সমকক্ষ লোকের প্রতি সমান আচরণের নীতি—এই দুটি নীতি কি একে অপরের বিরোধী ?– আলোচনা করো।
> ন্যায়ের প্রথম ও তৃতীয় নীতিটি একে অপরের বিরোধী নয়। নিম্নলিখিত যুক্তিসহযোগে তা প্রমাণিত হয়—
[i] সামাজিক ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে ন্যায়ের তৃতীয় নীতিতে ব্যক্তির অধিকার স্বীকৃত হয় বিশেষ চাহিদা বা প্রয়োজনের নিরিখে। অন্যদিকে, প্রথম নীতি অনুসারে, সমকক্ষের প্রতি সমান আচরণ করতে হবে। বৈষম্যকে দূর করতে এবং দক্ষতার মাপকাঠিতে পুরস্কৃত করতে হবে।
[ii] প্রথম নীতির সঙ্গে তৃতীয় নীতির কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কারণ, যারা সবার মতো বা সকলের মতো সবক্ষেত্রে সমান বা সমকক্ষ নয়, তাদের প্রতি বিশেষভাবে ব্যবস্থার কথা বলা হয়।
[iii] যারা শারীরিক বা মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী এবং যাদের বিশেষক্ষেত্রে সাহায্যের প্রয়োজন, কিন্তু কার বিশেষ সহযোগিতার প্রয়োজন তা বোঝা যদিও বেশ কঠিন।
[iv] শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, অশিক্ষা বা শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া ইত্যাদি বিষয়গুলির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বিশেষ প্রয়োজন বা চাহিদাকে স্বীকৃতি দেয়।
[v] ভারতে জাতপাতের ভিত্তিতে অশিক্ষা বা শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া ব্যক্তির শারীরিক অসুস্থতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় যেখানে ন্যায়ের তৃতীয় নীতিটিকে প্রয়োগ করা হয়।
[vi] সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া ব্যক্তি তথা তপশিলি জাতি, উপজাতিদের সরকারি চাকুরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভরতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সর্বোপরি বলা যায়, ন্যায়ের তৃতীয় নীতিটি যেহেতু রাষ্ট্র বিশেষ প্রয়োজনের স্বার্থে প্রয়োগ করে, অর্থাৎ, যারা কোনোভাবেই সমান যোগ্যতার আওতায় আসে না তাদের জন্য। তাই স্বাচ্ছন্দ্যে এটি বলাই যায়, ন্যায়ের প্রথম নীতির সঙ্গে তৃতীয় নীতির কোনো বিরোধিতাই নেই। কেবল তৃতীয় নীতি অনুসারে বিশেষ প্রয়োজন বা চাহিদা যাদের জন্য স্বীকৃত তাদের সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা কঠিন। অর্থাৎ, যারা যথার্থ বিশেষ প্রয়োজনের বা চাহিদার আওতায় পড়েন তাদের চিহ্নিত করা কঠিন। তাই সঠিক অর্থে তৃতীয় নীতিটির প্রয়োগ বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়ে।
3. ন্যায়ের বিভিন্ন রূপগুলি আলোচনা করো।
> বর্তমান সমাজে আমরা ন্যায়ের চারটি রূপ দেখতে পাই । যথা—
[a] সামাজিক ন্যায়: সামাজিক ন্যায় একটি ব্যাপক ধারণা। কোনো কৃত্রিম কারণে সামাজিক ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য না-করে সকলের জন্য সমান সামাজিক সুযোগসুবিধা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকে নিশ্চিত করা হল ন্যায়বিচার। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সমাজে অস্পৃশ্যতা হল সামাজিক ন্যায়বিচার বিরোধী। স্বাধীনতা ও সাম্যকে যুগ্মভাবে প্রয়োগ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। সমাজের দুর্বলতম শ্রেণির জন্য সমান সুযোগ ও মর্যাদা দান, বেগার শ্রম রোধ করা, সকলের জন্য সম সামাজিক নিয়ম ও শৃঙ্খলা কায়েম করা, নারী ও পুরুষের জন্য সমানাধিকার স্বীকার করা ইত্যাদি হল সামাজিক ন্যায়বিচারের উদাহরণ।
[b] রাজনৈতিক ন্যায়: সাধারণভাবে ন্যায় বলতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শিক্ষা, সম্পত্তি ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার ব্যবস্থা হল রাজনৈতিক ন্যায়বিচার। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ, সার্বিক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের কথা উল্লেখ করা যায়। রাজনৈতিক ন্যায় হল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বীকৃতি। উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, রাজনৈতিক ন্যায়ের অর্থ হল নির্বাচিত করা ও নির্বাচিত হওয়ার অধিকারের মধ্যে সমতা, সরকারি পদ ও সরকারি চাকুরিলাভের ক্ষেত্রে সমতা প্রভৃতি।
[c] আইনগত ন্যায়: আইনগত ন্যায় বলতে দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকে বোঝায়। রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকে সুনিশ্চিত করে। আইনগত ন্যায়ের মূল বক্তব্য হল—আইন ন্যায়কে অনুসরণ করে প্রণীত হবে এবং ন্যায় আইন অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হবে। আইনগত ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে দেশের বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন, নির্ভীক ও নিরপেক্ষ হতে হবে।
[d] অর্থনৈতিক ন্যায়: অর্থনৈতিক ন্যায় বলতে অর্থনৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বৈষম্যের অবসানকে বোঝায়। দ্রব্য উৎপাদন এবং দ্রব্য বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ উপকৃত হয়। অর্থনৈতিক ন্যায় ছাড়া সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠা অর্থহীন। উদারনীতিবাদীরা অর্থনৈতিক ন্যায় বলতে রাষ্ট্রের জনকল্যাণ- মূলক কাজকর্ম, অবাধ বাণিজ্য, উন্মুক্ত বাজারনীতি প্রভৃতিকে বুঝিয়েছেন। অপরদিকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, সমস্ত রকম ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও মালিকানার অবসান ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, শ্রেণিহীন ও শোষণহীন সমাজ ছাড়া অর্থনৈতিক ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
মূল্যায়ন: উপরোক্ত ন্যায়ের রূপগুলির মধ্যে বাস্তব জীবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে আইনগত ন্যায়। অথচ বাস্তবজীবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত অর্থনৈতিক ন্যায়ের। মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা অর্থনৈতিক ন্যায়ের সপক্ষে সর্বদাই সওয়াল চালিয়ে এসেছেন।
4. মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম চাহিদা কী ? সরকার সেই চাহিদা পূরণের স্বার্থে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে ?
> মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম চাহিদা বা প্রয়োজনগুলি হল নিম্নরূপ —
[i] যে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সমাজ নাগরিকদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজন জীবনের নিরাপত্তা প্রদান করে, সমান সুযোগসুবিধাপ্রদান করে যাতে ব্যক্তি তার নিজস্ব লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
[ii] গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কর্তব্য তার নাগরিকদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য ও ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন, যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যূনতম উপার্জন, পানীয় জল প্রভৃতির জোগান দেওয়া ।
[iii] তবে যে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বেশি সেই দেশে মৌলিক চাহিদার জোগান দেওয়া রাষ্ট্রের পক্ষে বেশ অসুবিধার কারণ হয়। অর্থাৎ, আমরা কোন পরিবার, কোন্ কোন্ জাতির, কোন সমাজ থেকে এসেছি তাও জানি না।
[iv] ন্যায়প্রতিষ্ঠার জন্য রস আরও বলেন, অজ্ঞতার অবগুণ্ঠনে থেকে নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ হয়ে সমাজ কেমন হবে, কীভাবে গঠিত হবে সেই বিষয়ে ভাবতে পারব, সেই ভাবনা সকলের মঙ্গলের স্বার্থে পরিলক্ষিত হবে। কারণ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানি না বলে, নিজের স্বার্থের কথা ভাবব না। বরং সমাজের সামগ্রিক ভালো নিয়ে ভাবব, যা সকলের ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।
[v] আমরা কে এবং আমাদের কীসে ভালো যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা জানব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সমাজকে চিত্রায়িত করব এমনভাবে যাতে তা সকলের প্রতি বা সকলের জন্য ভালো হয়। এমনকি যারা বিশেষ অবস্থার শিকার তাদের জন্য ও যেন রাষ্ট্র বিশেষ প্রয়োজনের স্বীকৃতি দেয় ।
[vi] অবগুণ্ঠনের আড়াল থেকে মুক্ত হওয়ার পর, যদি কোনো ব্যক্তি দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে রাষ্ট্র সেই দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য যুক্তিপূর্ণভাবে যা বিবেচনা করবে, সেই বিবেচনার সব দায়িত্ব রাষ্ট্রের কিনা এ বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। তথাপি ভারতের মতো বৃহদায়তন রাষ্ট্রে সকলের মৌলিক চাহিদার জোগান দেওয়ার উপায় নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র দার্শনিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের স্বল্প সংখ্যক মানুষই সুবিধা পেয়ে থাকে।
5. জন রলসের ন্যায়তত্ত্বটি আলোচনা করো।
> রাষ্ট্রের ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব, এ বিষয়ে জন রল্স তাঁর ন্যায়ের তত্ত্বটি প্রদান করেন। জন রস তাঁর তত্ত্বে “অজ্ঞতার আচ্ছাদনের কথা বলেন। Veil of Ignorance বা অজ্ঞতার আচ্ছাদন -এ যিনি মনুষ্য সমাজকে অজ্ঞতার আড়ালে রাখার কথা বলেছেন। এর অর্থ হল মনুষ্য সমাজকে তার যাবতীয় বর্তমান অবস্থা থেকে সরিয়ে রাখা, যেখানে ব্যক্তি তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে।
প্রথমত, এমন অজ্ঞতার মধ্যে থাকার ফলে ব্যক্তিরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনমতো অবস্থানকে পছন্দ করতে পারবে। যার সাহায্যে ব্যক্তিরা তাদের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে যখন অজ্ঞতার আড়াল থেকে তারা মুক্ত হবে। রসের মতে, যুক্তিবাদসম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রথমে স্বাধীনতাকে পছন্দ করবে। স্বাধীনতা থাকলে ব্যক্তি তার সুবিধা বা পছন্দমতো যা খুশি করতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, সে সাম্য চাইবে, সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, প্রত্যেক ব্যক্তির সমান সুযোগ পাওয়া উচিত। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গভেদে যেন সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য না থাকে।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিরা বিশেষ কিছু চাইতে পারে। যেমন—অজ্ঞতার আড়াল থেকে মুক্ত হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিবন্ধী হয় তাহলে সে বিশেষ সুবিধা চাইতে পারে রাষ্ট্রের কাছে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র তাকে সমাজের মূলস্রোতের সঙ্গে তাল মেলাতে যেটুকু সাহায্যের প্রয়োজন তা করবে।
জন রল্স এইভাবে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তিনি আসলে সুবিচার বা ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায়ের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, প্রাথমিক বিষয়াদির ন্যায্য বণ্টনের মধ্যে ন্যায়ের সমতা বর্তমান। অর্থাৎ, অধিকার, স্বাধীনতা, বিভিন্ন ক্ষমতা, সুযোগ ইত্যাদি হল প্রাথমিক বিষয়াদির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তাই এই বিষয়গুলির সঠিক পরিমাপমতো বণ্টন হলেই ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
6. জন রল্স কীভাবে অজ্ঞতার আড়াল (Veil of Ignorance) -এর মাধ্যমে ন্যায়প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন ?
> জন রল্স সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠার জন্য অজ্ঞতার অবগুণ্ঠন-এর কথা বলেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সমাজে সুবিধা বা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আর এটি সম্ভব করতে জন রল্স অজ্ঞতার অবগুণ্ঠন-এর কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান হ্রাস করতে বা সংক্ষেপে বলা যায়, সমাজের পিছিয়ে পড়া দুর্বল শ্রেণিকে খানিকটা সাহায্য করতে রাষ্ট্র খোলাবাজার নীতি গ্রহণ করতে পারে। খোলাবাজার নীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পৃথিবীজুড়ে আলোচনা চলছে। খোলাবাজার নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে সাহায্য করতে পারবে। যদিও খোলাবাজার নীতির উপকারিতা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে, তথাপি খোলাবাজার নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র যেভাবে সাহায্য করতে পারে তা নিম্নরূপ —
[i] খোলাবাজারে ব্যক্তি নিজের পণ্য বিক্রির সুযোগ পায়। শুধু তাই নয়, একে অপরের সঙ্গে পণ্যের বিক্রয়মূল্য, লাভ ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হতে পারে। খোলাবাজারে বিক্রেতারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও করতে পারে। এই হল খোলাবাজারের চরিত্র বা প্রকৃতি।
[ii] খোলাবাজারের সমর্থকরা মনে করেন, বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এতে বাজার থেকে প্রাপ্য লভ্যাংশের বণ্টন ন্যায়পূর্ণ হওয়া সম্ভব।
[iii] খোলাবাজারের প্রতিযোগিতায় মেধা এবং দক্ষতাকে পুরস্কৃত যেমন করা হয়, ঠিক তেমনই যারা এই দক্ষতা দেখাতে পারে না বা কম দেখাতে পারে তাদের পুরস্কারের হার বা মাত্রাও কম থাকে।
খোলাবাজার নীতি উদারনীতিবাদী ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য। উদারনীতিবাদীরা সমাজের সকল স্তরের মানুষদের সুবিধার্থে খোলাবাজার নীতির কথা বলেন। খোলাবাজার নীতি অনুযায়ী, মুক্তবাজারে অবাধ নীতি থাকবে, যেমন—সকলেই নিজের পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবে এবং ক্রেতারাও নিজেদের পছন্দমতো পণ্য ক্রয় করতে পারবে। খোলাবাজারে দ্রব্যসামগ্রীর আমদানি ও রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণমুক্তির কথা বলা হয় এবং পূর্ণ প্রতিযোগিতার কথাও বলা হয় । উদারনীতিবাদীরা খোলাবাজারের মাধ্যমে আর্থিক দিক থেকে বণ্টনে ভারসাম্য আনার কথা বলেন যার ফলে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব।







মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন