ভারতের সংবিধান রচনার জন্য গণপরিষদ গঠনের ইতিবৃত্ত আলোচনা করো।
সংবিধান হল কোনো দেশের সর্বোচ্চ আইন। প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রেই জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত একটি সংস্থা সংবিধান রচনার কাজ করে থাকে। অনুরূপভাবে ভারতেও জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত একটি সংস্থা সংবিধান রচনা করে, যা গণপরিষদ নামে পরিচিত।
1906 খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে স্বরাজের দাবির মধ্যেই গণপরিষদের দাবি নিহিত ছিল। গান্ধিজি 1922 খ্রিস্টাব্দে গণপরিষদের প্রয়োজনীয়তার কথা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন। 1923 : খ্রিস্টাব্দের জাতীয় সম্মেলনে মানবেন্দ্রনাথ রায় গণপরিষদ গঠনের জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন। স্বরাজ দলও কেন্দ্রীয় আইনসভার ভিতরে ও বাইরে পৃথক সংবিধানের দাবি জানাতে থাকে। 1933 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কেন্দ্রে 'দ্বৈতশাসন' ও প্রদেশগুলিতে দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা চালু করতে চেয়ে একটি 'শ্বেতপত্র' প্রকাশ করে। 1934 খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি শ্বেতপত্রকে প্রত্যাখ্যান করে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে সংবিধান রচনার দাবি করে। 1938 খ্রিস্টাব্দে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ঘোষণা করলেন, কংগ্রেস স্বাধীন ভারতের জন্য একটি সংবিধান চায়, যা রচনা করবে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত একটি গণপরিষদ, যেটি বাহ্যিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হবে।
[i] আগস্ট ঘোষণা ও ক্লিপস মিশন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে ব্রিটিশ সরকার ভারতের সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হয়। 1940 খ্রিস্টাব্দের 7 আগস্ট ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো তাঁর বিখ্যাত 'আগস্ট ঘোষণা'-য় সর্বপ্রথম স্বীকার করেন যে, ভারতের সংবিধান রচনা একান্তভাবেই ভারতীয়দের নিজস্ব ব্যাপারে। পরবর্তীকালে ভারতের সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্য ক্লিপসকে ভারতে পাঠান। ক্লিপস প্রস্তাব করেন যে, যুদ্ধ শেষ হলে ভারতের সংবিধান রচনার উদ্দেশ্যে একটি নির্বাচিত সংস্থা গঠন করা হবে। নির্বাচক সংস্থা হিসেবে কাজ করবে প্রাদেশিক আইনসভার নিম্নকক্ষ। গণপরিষদের সদস্যসংখ্যা হবে নির্বাচক সংস্থার এক-দশমাংশ। গণপরিষদের সদস্যগণ সমানানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে প্রাদেশিক আইনসভা দ্বারা নির্বাচিত হবেন। দেশীয় রাজ্যগুলিও তাদের জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে গণপরিষদে প্রতিনিধি পাঠাতে পারবে। কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ উভয়েই ক্লিপস প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
[ii] কুপল্যান্ড পরিকল্পনা: ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ সরকার 1945 খ্রিস্টাব্দে কুপল্যান্ডকে ভারতে পাঠান। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ নীতির বদলে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কয়েক- জনকে নিয়ে গণপরিষদ গঠনের প্রস্তাব দেন। যা কুপল্যান্ড পরিকল্পনা নামে পরিচিত। এই পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়।
[iii] ওয়াভেল পরিকল্পনা: ক্রিপশ মিশন ব্যর্থ হলে লর্ড ওয়াভেল 1945 খ্রিস্টাব্দের 14 জুন একটি পরিকল্পনা পেশ করেন, যা ওয়াভেল পরিকল্পনা নামে খ্যাত। এতে বলা হয় যে, প্রাদেশিক আইনসভাগুলির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর ও সংবিধান রচনার কাজ শুরু করবে এবং নতুন সংবিধান রচিত না-হওয়া পর্যন্ত ভারতীয়দের নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে। এই বিষয়ে আলোচনার জন্য লর্ড ওয়াভেল সিমলায় একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকেন।। কিন্তু জিন্নাহ 'পাকিস্তান'-এর দাবিতে অটল থাকায় সিমলা বৈঠক ব্যর্থ হয়। ফলে ওয়াভেল পরিকল্পনাও বিফল হয়।
[iv] ক্যাবিনেট মিশন: এই সময় ইংল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনে শ্রমিক দল জয়লাভ করে। শ্রমিক দলের প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি উপলব্ধি করেন যে, ভারতকে স্বাধীনতা দিতেই হবে। সুতরাং, তিনি ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার তিন সদস্য-লর্ড পেথিক লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্লিপস এবং এ ভি আলেকজান্ডারকে ভারতে পাঠান, যা ক্যাবিনেট মিশন বা মন্ত্রীমিশন নামে পরিচিত। এই মিশন 1946 খ্রিস্টাব্দের 24 মার্চ ভারতে এসে পৌঁছোয়। তারপর দীর্ঘ সাত সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ও গণপরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু ভারতীয় নেতৃবৃন্দ ঐকমত্যে পৌঁছোতে ব্যর্থ হন। কারণ, মুসলিম লিগ নেতা জিন্নাহ সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি ড. আম্বেদকর প্রমুখ গণপরিষদ গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল এরূপ গণপরিষদ গঠিত হলে বর্ণ হিন্দুদের প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। জাতীয় নেতৃবৃন্দ ঐকমত্যে পৌঁছোতে ব্যর্থ হলে 1946 খ্রিস্টাব্দের 16 মে ক্যাবিনেট মিশন তার প্রস্তাব পেশ করে। ওই প্রস্তাবে মিশন ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান রচনা ও গণপরিষদ সম্বন্ধে তার সুচিন্তিত মতামত পেশ করে। প্রস্তাবানুযায়ী ভারতীয় প্রদেশগুলিকে 'A', 'B' ও 'C'-এই তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয়। 'A', বিভাগে
ভারতীয় প্রদেশ
A হিন্দুপ্রধান প্রদেশ
B পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত
C বাংলা ও আসাম
রাখা হয় হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলিকে, 'B' বিভাগে রাখা হয় মুসলমানপ্রধান পাঞ্চাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশকে এবং 'C' বিভাগে রাখা হয় বাংলা ও অসমকে। প্রস্তাবে আরও বলা হয় প্রত্যেক বিভাগের সদস্যগণ আলাদা আলাদাভাবে বা মিলিত হয়ে তাদের ইচ্ছামতো সংবিধান রচনা করতে পারবে।
[v] গণপরিষদের গঠন: ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুসারে চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে ভারতীয় গণপরিষদ গঠনের ব্যবস্থা হয়। নীতিগুলি হল-
[a] প্রত্যেক প্রদেশ ও প্রত্যেক দেশীয় রাজ্য তাদের জন- সংখ্যার অনুপাতে (দশ লক্ষ জনসংখ্যার জন্য একজন) গণপরিষদে আসন পাবে। ঠিক হয় প্রদেশ- গুলির আসনসংখ্যা হবে 292 এবং দেশীয় রাজ্য- গুলির আসনসংখ্যা হবে সর্বাধিক 93।
[b] প্রত্যেক প্রদেশের আসন সংখ্যা সাধারণ, মুসলমান ও শিখ-এই তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে বিভক্ত হবে।
প্রদেশের আসন বিভাজন
সাধারণ
মুসলমান
শিখ
[c] প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সদস্যগণ একক হস্তান্তরযোগ্য সমানানুপাতিক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে নিজ নিজ প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করবে।
[d] দেশীয় রাজ্যগুলি থেকে প্রতিনিধি মনোনয়নের পদ্ধতি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে স্থির হবে।
ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুসারে গণপরিষদের মোট সদস্যসংখ্যা স্থির করা হয় 389 জন। এর মধ্যে প্রদেশগুলি থেকে সাধারণের জন্য 210টি, মুসলমানদের জন্য 7৪টি এবং শিখদের জন্য 4টি মোট 292টি আসন নির্দিষ্ট হয়। চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশগুলি-দিল্লি, আজমির, মারওয়ারা, কুর্গ ও বালুচিস্তানের জন্য স্থির হয় 4টি আসন এবং দেশীয় রাজ্যগুলির জন্য স্থির হয় 93টি আসন। গণপরিষদ গঠনের জন্য 1946 খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে প্রদেশগুলির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। প্রদেশগুলির সাধারণ (মুসলমান ও শিখ বাদে)-এর জন্য নির্দিষ্ট আসনের মধ্যে কংগ্রেস লাভ করে 203টি। এ ছাড়া কংগ্রেস টিকিটে 4 জন মুসলমান ও 1 জন শিখ প্রার্থী নির্বাচিত হন। ফলে প্রদেশগুলি থেকে মোট - 292 জন নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে কংগ্রেসের নির্বাচিত প্রার্থীর - সংখ্যা 208 জন। মুসলিম লিগ লাভ করে 73টি আসন। বাকি আসনগুলি ছোটো ছোটো গোষ্ঠী, যেমন-কমিউনিস্ট, তপশিলি জাতি ফেডারেশন, নির্দল ও অন্যান্যরা লাভ করে।
মূল্যায়ন: গণপরিষদে বহুবিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ড. বি আর আম্বেদকর, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, তেজবাহাদুর সপ্রু, সি রাজা গোপালাচারি, কে এম মুনশি, আল্লাদি কৃষ্ণস্বামী আয়ার প্রমুখ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন