যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা কাকে বলে? যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার বলতে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে সংবিধান দ্বারা যাবতীয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় সরকার ও কতকগুলি আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে বণ্টিত হয়ে থাকে। এই দু-ধরনের সরকার পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে এবং সংবিধানে উভয় ধরনের সরকারের ক্ষমতা নির্দিষ্ট থাকে এবং প্রত্যেক সরকারই নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করে। যেমন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইটজারল্যান্ড প্রভৃতি হল এরূপ শাসনব্যবস্থার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রে বৈশিষ্ট্য: যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় এমন কতক- গুলি বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাকে অন্যান্য শাসনব্যবস্থা থেকে পৃথক করেছে। সেগুলি হল-
[i] দ্বৈত সরকার: যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় দু-ধরনের সরকার থাকে-কেন্দ্রীয় সরকার ও আঞ্চলিক বা অঙ্গ- রাজ্যের সরকার। সমগ্র দেশের শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থাকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। অন্যদিকে বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনের দায়িত্ব থাকে বিভিন্ন আঞ্চলিক বা অঙ্গরাজ্যের সরকারের হাতে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা > কেন্দ্রীয় সরকার > রাজ্য সরকার
[ii] ক্ষমতার বণ্টন: সংবিধান অনুসারে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতাকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ জড়িত আছে এমন বিষয়গুলি কেন্দ্রের হাতে থাকে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক স্বার্থ জড়িত আছে এমন বিষয়গুলি রাজ্যের হাতে থাকে।
[iii] লিখিত সংবিধান: যুক্তরাষ্ট্রে দু-ধরনের সরকার থাকে এবং এই দু-প্রকার সরকারের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষমতা বণ্টন হওয়া দরকার। তা না-হলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ দেখা দিতে পারে। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লিখিত হয়।
[iv] দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান: যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয় হয়। যাতে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকার- গুলির স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে নিজেদের স্বার্থে যখন-তখন সংবিধান পরিবর্তন করতে না-পারে।
[v] সংবিধানের প্রাধান্য: যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় সংবিধানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানই হল সকল ক্ষমতার একমাত্র উৎস। কেন্দ্রীয় এবং আঞ্চলিক সরকার সংবিধান নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ক্ষমতাভোগ ও নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন।
[vi] যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত: যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে নানা বিষয়ে বিরোধ দেখা দিতে পারে। এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্যেই যুক্তরাষ্ট্রে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত থাকা অপরিহার্য।
[vii] দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা: অনেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইন- সভাকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন। আইনসভার জনপ্রতিনিধি কক্ষ দেশের সামগ্রিক স্বার্থ দেখবে এবং অঙ্গরাজ্যগুলির প্রতিনিধি সমন্বিত উচ্চকক্ষ অঙ্গরাজ্যগুলির স্বার্থ দেখবে। তবে উচ্চকক্ষ অঙ্গরাজ্য- গুলি থেকে সমপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে গঠিত হওয়া উচিত।
[viii] দ্বৈত নাগরিকতা: দ্বৈত নাগরিকতা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোনো কোনো যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের জন্য আলাদা বা পৃথক নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এরূপ দ্বিনাগরিকতা আছে। ভারতে এরূপ দ্বিনাগরিকতা নেই। অবশ্য দ্বৈত নাগরিকত্বকে অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বলে স্বীকার করা হয় না।
মূল্যায়ন: সংবিধানের 1(1) নং ধারায় ভারতকে 'রাজ্যসমূহের একটি ইউনিয়ন' বলে বর্ণনা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় মূল বৈশিষ্ট্যগুলি এখানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসসব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য এ কথাই প্রমাণ করে যে, এই শাসনব্যবস্থাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলি নিজেদের অস্তিত্ব বিসর্জন না-দিয়েও পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন