ভারতীয় সংবিধান সুপরিবর্তনীয়তা ও দুষ্পরিবর্তনীয়তার মিশ্রণ' ব্যাখ্যা করো।
ভারতের সংবিধান হল পৃথিবীর বৃহত্তম লিখিত সংবিধান। ভারতীয় সংবিধানের 368 নং ধারায় সংবিধানের সংশোধন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা আছে। সংবিধানের 368নং ধারা অনুযায়ী ভারতীয় সংবিধানকে তিনটি পদ্ধতিতে সংশোধন করা যায়।
[i] প্রথম পদ্ধতি: ভারতীয় সংবিধানের এমন কতকগুলি ধারা আছে, যেগুলির পরিবর্তনের জন্য বিশেষ কোনো পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজন হয় না। সংসদে সাধারণ বিল পাসের পদ্ধতিতে অর্থাৎ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে সংবিধানের ওইসব অংশের পরিবর্তন করা যায়। সংসদে গৃহীত হওয়ার পর সংশোধনী বিলটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়া গেলে তবেই তা কার্যকরী হয়। নতুন রাজ্যগঠন, রাজ্যের নাম, সীমানা পরিবর্তন; বিধান পরিষদের সৃষ্টি বা বিলোপ, দ্বিতীয় তপশিলের পরিবর্তন; সংসদের কোরাম সংক্রান্ত নিয়মের পরিবর্তন, সংসদ সদস্যদের বিশেষাধিকার, সাংসদদের বেতন, ভাতা, সুপ্রিমকোর্টের এক্তিয়ার সম্প্রসারণ, নাগরিকতা, ভাষা, নির্বাচনি এলাকার সীমা নির্ধারণ, তপশিলি জাতি ও উপজাতি অঞ্চলের প্রশাসন প্রভৃতি সংক্রান্ত ধারাগুলি প্রথম পদ্ধতিতে সংশোধন করা যায়।
[ii] দ্বিতীয় পদ্ধতি: সংবিধান সংশোধনের দ্বিতীয় পদ্ধতিতে সংবিধানের কিছু অংশের সংশোধন করা যায়। এই পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধন করার জন্য সংসদের প্রতিকক্ষের মোট সদস্যের অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। সংসদের সমর্থন লাভের পর রাষ্ট্রপতির সমর্থন পেলে সংশোধন পদ্ধতি কার্যকর হয়, এই পদ্ধতিতে মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্র- পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি এবং প্রথম ও তৃতীয় পদ্ধতিতে যেসব বিষয়ের সংশোধন করা যায় সেগুলি ছাড়াও সংবিধানের অন্যান্য বিষয়গুলি সংশোধন করা যায়।
[iii] তৃতীয় পদ্ধতি: সংবিধান সংশোধনের তৃতীয় পদ্ধতিটি বেশ জটিল। এই পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের প্রতিটি কক্ষের মোট সদস্যের অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পাওয়ার পর বিলটিকে কমপক্ষে অর্ধেক অঙ্গ- রাজ্য বিধানসভার সমর্থন পেতে হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে তবেই বিলটি কার্যকরী হয়। সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট সংক্রান্ত বিষয়, সংসদে রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত বিষয় ইত্যাদি সংশোধন করা যায়।
মূল্যায়ন: ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সাধারণত দুষ্পরিবর্তনীয় হয়। কিন্তু ভারতের সংবিধান সংশোধন - পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সংবিধানের অধিকাংশ বিষয় সংসদে সাধারণ আইন প্রণয়নের পদ্ধতিতে অর্থাৎ, সুপরিবর্তনীয় পদ্ধতিতে সংশোধন করা যায়। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলির ভূমিকা খুবই সীমিত। অর্থাৎ, সংবিধানের সামান্য অংশই সংশোধনের জন্য দুষ্পরিবর্তনীয় পদ্ধতির প্রয়োজন হয়। - সেই দিক থেকে বিচার করে বলা যায় যে, ভারতের সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি সুপরিবর্তনীয়তা ও দুষ্পরিবর্তনীয়তার মাঝামাঝি অবস্থান করে। তাই বলা যায় যে, ভারতের সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি হল সুপরিবর্তনীয়তা ও দুষ্পরিবর্তনীয়তার মিশ্রণ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন