ভারতের সুপ্রিমকোর্টের বিচারকগণ কীভাবে নিযুক্ত হন এবং কীভাবে তাঁদের পদচ্যুত করা যায়?
ভূমিকা: গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত হল যে, বিচারালয় এবং বিচারকগণকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। এই স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা ছাড়া বিচারকগণের পক্ষে নির্ভয়ে ও সমদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে ন্যায়বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণেই বিচারকদের নিয়োেগ, পদচ্যুতি এবং কাজের শর্তাদি এরূপভাবে স্থির করা উচিত যাতে বিচারকগণ সরকারের সর্বপ্রকার নিয়ন্ত্রণের হাত থেকে মুক্ত হয়ে সুষ্ঠুভাবে বিচারকার্য সম্পাদন করতে সক্ষম হয়। এই দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিয়েই ভারতীয় সংবিধানে বিচারকদের নিয়োেগ, অপসারণ ইত্যাদির যথাযথ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সুপ্রিমকোর্টের বিচারক পদপ্রার্থীর যোগ্যতা: ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হওয়ার জন্য ব্যক্তির কয়েকটি - বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন হয়; যথা-[i] ব্যক্তিকে ভারতের নাগরিক হতে হবে; এবং [ii] তাঁর অন্তত পাঁচ বছর হাইকোর্টের বিচারপতিরূপে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে; অথবা অন্তত 10 বছর কোনো হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, অথবা রাষ্ট্রপতির মতে, তাঁকে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ বলে বিবেচিত হতে হবে।
নিয়োগপদ্ধতি: সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের বিচারক- গণকে নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। নিয়োগের সময় বিচারকগণকে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ বাক্য পাঠ করতে হয়। প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগের সময় রাষ্ট্রপতি রাজ্যগুলির হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টের যেসব বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন মনে করেন সেইসব বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে থাকেন। তবে অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগের সময় রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করতে বাধ্য থাকেন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ভারতে বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করেই এইকাজ সম্পাদন করে থাকে। কোনো প্রকার দলীয় স্বার্থ যাতে বিচারপতিদের স্বাধীনতা ব্যাহত করতে না-পারে সেজন্য গুণগত যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারটি সম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে এস্থলে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বিচারপতিগণ রাষ্ট্রপতিকে যে-পরামর্শ দান করবেন, রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করতে বাধ্য নন।
ভারতের সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ পদ্ধতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনের বিচারপতি নিয়োগ পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট-সভার অনুমোদন ক্রমে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের নিযুক্ত করে থাকেন। গ্রেট ব্রিটেনের প্রধান বিচারালয়-লর্ডসভার বিচারপতিগণ শাসন কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিযুক্ত হয়ে থাকেন।
বিচারপতিদের অপসারণ পদ্ধতি: সুপ্রিমকোর্টের বিচার- পতিদের নিয়োগের জন্য সংবিধানে কোনো নিম্নতম বয়সসীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। তবে বিচারপতিগণ 65 বছর বয়স পর্যন্ত আপন পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন। অবশ্য তারা সেচ্ছায় ওই সময়ের মধ্যে পদত্যাগও করতে পারেন। আবার রাষ্ট্রপতি আদেশ প্রদান করে অসদাচার বা অক্ষমতা প্রমাণিত হওয়ার জন্য বিচার- পতিদের পদচ্যুত করতে পারেন। তবে বিচারপতিদের পদচ্যুত করার জন্য একটি 'বিশেষ পদ্ধতি' অনুসৃত হয়ে থাকে। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের মোট সদস্যসংখ্যার অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ দ্বারা যদি কোনো বিচারপতির অসদাচরণ বা অযোগ্যতা সম্পর্কে প্রস্তাব পাস হয় এবং উক্ত প্রস্তাবটি রাষ্ট্রপতির সমক্ষে উপস্থাপিত হলে তিনি সেই বিচারপতিকে আদেশ প্রদান করে পদচ্যুত করতে পারেন।
মূল্যায়ন: এস্থলে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইংল্যান্ডের বিচারপতিগণ শাসন কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিযুক্ত হলেও যদি কোনো বিচারপতিকে পদচ্যুত করা হোক, এই মর্মে আইনসভা রাজা বা রানির কাছে আবেদন করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিচারপতিকে পদচ্যুত করা যায়। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিগণকে 'ইমপিচমেন্ট' পদ্ধতি ছাড়া পদচ্যুত করা যায় না। প্রথমে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধিসভা বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনবে এবং পরে সিনেটসভা সেই অভিযোগের বিচার করবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন