ভারতের যে-কোনো অঙ্গরাজ্যের হাইকোর্টের কার্যাবলি আলোচনা করো।
রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত হল হাইকোর্ট। ভারতীয় সংবিধানের 214নং ধারা অনুসারে প্রতিটি রাজ্যের জন্য একটি করে হাইকোর্ট থাকবে। তবে সংসদ আইন প্রণয়ন করে দুই বা ততোধিক রাজ্যের জন্য একটি হাইকোর্ট স্থাপন করতে পারে [231(1) নং ধারা]। যেমন, কলকাতা হাইকোর্টের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। বর্তমানে আমাদের 28টি অঙ্গ- রাজ্যের মধ্যে 24টি হাইকোর্ট রয়েছে।
ক্ষমতা ও কার্যাবলি: ভারতীয় সংবিধানে হাইকোর্টের ক্ষমতা এবং কার্যাবলি সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। সংবিধানের 225 নং ধারায় হাইকোর্টের কাজকর্মের এক্তিয়ার সম্পর্কে শুধুমাত্র বলা হয়েছে যে, সংবিধান কার্যকর হওয়ার সময়ে হাইকোর্টের কাজকর্মের যে-এক্তিয়ার ও ক্ষমতা ছিল, হাইকোর্ট সেগুলি ভোগ করবে। হাইকোর্টের কাজকর্মের এক্তিয়ার ও ক্ষমতাকে নিম্নলিখিতভাবে আলোচনা করা যেতে পারে-
[i] মূল এলাকা: [a] রাজস্বসংক্রান্ত সব বিষয়-এর মূল এলাকার অন্তর্ভুক্ত। [b] অনেক ক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাকেও এর অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়।
তবে সব হাইকোর্টের মূল এলাকাভুক্ত ক্ষমতা নেই। কেবল কলকাতা, মুম্বই ও চেন্নাই হাইকোর্ট এই ক্ষমতার অধিকারী। 1973 খ্রিস্টাব্দের ফৌজদারি দণ্ডবিধি পরিবর্তনের ফলে এর ফৌজদারি মামলাসংক্রান্ত মূল এলাকাভুক্ত ক্ষমতার বিলোপসাধন করা হয়েছে। এই তিনটি শহরে ফৌজদারি মামলার বিচার 'নগর দায়রা আদালতে' সম্পাদিত হয়।
[ii] আপিল এলাকা: রাজ্যের সর্বোচ্চ আপিল আদালত হল হাইকোর্ট। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে-
[a] জেলাজজ এবং অধস্তন জেলাজজের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায়।
[b] হাইকোর্টের কোনো বিচারকের একক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায়।
[c] ফৌজদারি মামলায় দায়রা জজ এবং অতিরিক্ত দায়রা জজ কোনো ব্যক্তিকে 7 বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলে সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায়।
[iii] মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত: নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের গুরুদায়িত্ব হাইকোর্টের হাতে অর্পণ করা হয়েছে। হাইকোর্ট নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি সংরক্ষণের জন্য বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ, পরমাদেশ, প্রতিষেধ, অধিকারপৃচ্ছা ও উৎপ্রেষণ-এই লেখ, নির্দেশ বা আদেশ জারি করতে পারে [226(1) নং ধারা]। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার, অন্য যে-কোনো উদ্দেশ্যে হাইকোর্ট লেখ জারি করতে পারে, কিন্তু এই ক্ষমতা ভারতের সুপ্রিমকোর্টের হাতে অর্পণ করা হয়নি।
[iv] তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত ক্ষমতা: রাজ্যের অধস্তন আদালত- গুলিকে তত্ত্বাবধান করতে পারে হাইকোর্ট। সংবিধানের 227 নং ধারা অনুসারে হাইকোর্ট নিজ এলাকার অন্তর্ভুক্ত সামরিক আদালত ও ট্রাইবিউনাল ছাড়া অন্যান্য আদালত এবং ট্রাইবিউনাল সমূহের তত্ত্বাবধান করতে পারে। এইজন্য প্রয়োজনীয় দলিলপত্র ও নথিপত্র দাখিল করার জন্য অধস্তনীয় আদালতগুলিকে নির্দেশ দিতে পারে।
[v] আইনের বৈধতা বিচারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য আইনের বৈধতা বিচারের ক্ষমতা ভোগ করে হাইকোর্ট। 1976 খ্রিস্টাব্দের 42 তম সংবিধান সংশোধন করে হাইকোর্টের এই ক্ষমতার বিলোপসাধন করা হলেও 1978 খ্রিস্টাব্দের 44 তম সংবিধান সংশোধন করে 'দেশাই সরকার' তা আবার ফিরিয়ে আনেন। সাম্প্রতিক 2012 খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে কলকাতা হাইকোর্ট পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসরকারের বিধানসভা প্রণীত 'সিঙ্গুর জমি পুনর্বাসন ও উন্নয়ন আইন' বাতিল করে দিয়েছে।
[vi] মামলা অধিগ্রহণের ক্ষমতা: অধস্তন কোনো আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলার সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত আছে বলে মনে করলে সংশ্লিষ্ট মামলাটির বিচারের দায়িত্ব হাইকোর্ট স্বহস্তে গ্রহণ করতে পারে।
[vii] নিয়ন্ত্রণ: রাজ্যে সর্বোচ্চ বিচারালয় হিসেবে অধস্তন আদালতগুলির ওপর হাইকোর্ট নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। জেলা- জজদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ব্যাপারে রাজ্যপাল হাইকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করেন।
[viii] অভিলেখ আদালত: সুপ্রিমকোর্টের মতো ভারতে হাইকোর্টও অভিলেখ আদালত হিসেবে কাজ করে।
[ix] অন্যান্য কাজ
[a] আদালত অবমাননার জন্য অবমাননাকারীকে শাস্তি দিতে পারে।
[b] রাজ্যের অধস্তন আদালতগুলিকে খাতাপত্র এবং হিসাবপত্র রক্ষা করার নির্দেশ দিতে পারে।
[c] হাইকোর্ট বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মাবলি তৈরি করার অধিকারী।
মূল্যায়ন: হাইকোর্টের উপরোক্ত ক্ষমতা ও কার্যাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে হাইকোর্ট প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত অপেক্ষা কম ক্ষমতা ভোগ করে। কারণ-
[i] ভারতে হাইকোর্টগুলির ওপরে সুপ্রিমকোর্ট এবং কেন্দ্রের সর্বব্যাপী প্রাধান্য লক্ষ করা যায়।
[ii] দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে রাষ্ট্রপতি আদেশ জারির মাধ্যমে 20 ও 21 নং ধারায় প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলি ছাড়া অন্য সব মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎ করার জন্য হাইকোর্টের কাছে আবেদন করার অধিকার বাতিল করে দিতে পারেন।
[iii] রাষ্ট্রপতির নামে কেন্দ্রীয় সরকার হাইকোর্টের বিচার- পতিদের নিয়োগ ও বদলি করেন।
[iv] হাইকোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। আবার সামরিক আদালত ও ট্রাইবিউনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায় না। এইসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে হাইকোর্টকে চলতে হয় বলে রাজ্যের সর্বোচ্চ আপিল আদালত হিসেবে যে-মর্যাদা পাওয়ার কথা, হাইকোর্টগুলি তা পায় না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন