সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ত্রিপুরা রাজ্য কিভাবে স্বাধীন ভারতের সাথে যুক্ত হয় ?

 How did Tripura Join as a State of Independent India? ত্রিপুরা রাজ্য কিভাবে স্বাধীন ভারতের সাথে যুক্ত হয় ? ভূমিকা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর ৩৯ বছর বয়সে পরলোক গমন করলে তার পুত্র কিরীট বিক্রম কিশোর দেববর্মন মানিক্য বাহাদুর ত্রিপুরা রাজ্য ও চাকলা রোশনাবাদের জমিদারি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হন। তিনি নাবালক থাকায় ভারত সরকারের পরামর্শ অনুযায়ি রাজমাতা মহারাণি কাঞ্চনপ্রভা দেবীর নেতৃত্বে রাজপ্রতিনিধি শাসন পরিষদ বা কাউন্সিল অব রিজেন্সি গঠিত হয়। মহারাণি কাঞ্চনপ্রভা দেবী এই পরিষদের প্রেসিডেন্ট এবং রাজকুমার ব্রজেন্দ্র কিশোর দেববর্মন বাহাদুর ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। মেজর বঙ্কিম বিহারী দেববর্মন ও মন্ত্রী রাজরত্ন সত্যব্রত মুখার্জি এই পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন। (২) পাকিস্তানের ত্রিপুরা আক্রমনের ষড়যন্ত্র ভারত স্বাধীনতা লাভের অল্পদিনের পরেই ত্রিপুরা রাজ্য এক গভীর সঙ্কটের সম্মুখীন হয়। ত্রিপুরা সীমান্তস্থিত কুমিল্লার মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের উদ্যোগে ও আগরতলার কতিপয় ব্যক্তির সহযোগিতায় পাকিস্তান ত্রিপুরা আক্রমনের পরিকল্পনা করে। ত্রিপুরার রা...

সংবিধান কি স্থিতিশীল?

সংবিধান কি স্থিতিশীল?

এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয় যে, একটি দেশের সংবিধান পরিবর্তিত পরিস্থিতির ফলে বা পরিবর্তিত ধ্যানধারণা তথা রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবিধান তার 74 বছরের ইতিহাসে 4 বার পরিবর্তিত হয়েছে (1918, 1924, 1936 এবং 1977 খ্রিস্টাব্দ)। 1991 খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া 1993 খ্রিস্টাব্দে নতুন সংবিধান তৈরি করে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখে। কিন্তু ভারতের সংবিধান 1949 খ্রিস্টাব্দের 26 নভেম্বর গৃহীত হয় এবং কার্যকর হয় 1950 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি। 69 বছর ধরে একই সাংবিধানিক কাঠামোতে আমাদের দেশে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। তা হলে কি আমরা ধরে নেব যে, আমাদের সংবিধান খুবই উচ্চমানের ভালো সংবিধান যে তার কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। আমাদের সংবিধানের প্রণেতারা কি এতই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং জ্ঞানী ছিলেন যে, তাঁরা ভবিষ্যতে আগত সমস্ত পরিবর্তনগুলি দেখে সংবিধানে সেগুলি লিপিবদ্ধ করে গেলেন? কিছু অর্থে উপরিউক্ত উভয় উত্তরই সঠিক। এটি সত্যি যে, আমরা একটি আদর্শ সংবিধান পেয়েছি। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (Basic Structure)-র ধারণাটি আমাদের দেশের পক্ষে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি সর্বদা সত্য যে, সংবিধান প্রণেতারা ভবিষ্যতের অনেক সমস্যারই সমাধান করে গেছেন। কিন্তু কোনো সংবিধানই সব প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না।

- তাহলে একই সংবিধান কীভাবে দেশকে দীর্ঘদিন ধরে তার প্রয়োজন পূরণ করে চলেছে? এর উত্তরে বলা যায়,

প্রথমত, আমাদের সংবিধান সমাজের পরিবর্তিত প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তনশীলতাকে গ্রহণ করেছে।

দ্বিতীয়ত, সংবিধানকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় রায় ও রাজনৈতিক বাস্তবতা উভয়েই পরিণত মনস্কতার পরিচয় রেখেছে।

একটি সংবিধান কখনোই বিকল্পহীন নথি হতে পারে না। এটি হল এমন একটি দলিল যা মানবীয় উপাদানের দ্বারা তৈরি হয় এবং সংশোধন, পরিবর্তন ও পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়। এটি সত্যি যে, একটি সংবিধান সংশ্লিষ্ট সমাজের স্বপ্ন ও আশা- ভরসার প্রতিফলন ঘটায়।

সংবিধান প্রণেতারা সংবিধান প্রণয়নের সময় একটি ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সংবিধানের বেশ কিছু অংশকে নমনীয় রেখেছেন যাতে করে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে পরিবর্তিত সময়ের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। আবার সংবিধানের বেশ কিছু অংশকে অনমনীয় করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সংকটের ফলে বৃহৎ কোনো বিপদের মোকাবিলা করা সহজ হয়।

সংবিধান কীভাবে সংশোধন করা যায়?

আমরা পূর্বেই অবগত হয়েছি যে, আমাদের সংবিধান প্রণেতারা সংবিধান প্রণয়নের সময় একটি ভারসাম্য বজায় রেখে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কিন্তু বারংবার ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংশোধন | করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, সংবিধান প্রণেতারা একইসঙ্গে সংবিধানকে নমনীয় (Flexible) ও দুষ্পরিবর্তনীয় (Rigid) করার চেষ্টা করেছেন। নমনীয় বলতে বোঝায় যে, সংবিধানকে • পরিবর্তন বা সংশোধন করা সহজ এবং দুষ্পরিবর্তনীয় বলতে বোঝায়, সেই সংবিধান যা পরিবর্তন বা সংশোধন করা কঠিন। সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতিগত দিক থেকে বিচার করে সংবিধানগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলি হল- [a] সুপরিবর্তনীয় বা নমনীয় সংবিধান, [b] মিশ্র সংবিধান ও [c] দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান। ভারতীয় সংবিধানেও সংশোধন পদ্ধতির দিক থেকে বিচার করলে আমরা দেখতে পাই যে, এই তিনটি পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়েছে। যেমন-

[a] সংবিধানের এমন কতকগুলি ধারা রয়েছে, যেগুলির পরিবর্তন বা সংশোধনের জন্য কোনো বিশেষ পদ্ধতির অনুসরণ করার প্রয়োজন হয় না। পার্লামেন্ট বা কেন্দ্রীয় আইনসভায় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থনে এইসব অংশের পরিবর্তন করা যায়। উদাহরণ হিসেবে নতুন রাজ্যের সৃষ্টি, পুরাতন রাজ্যের সীমানা বা নাম পরিবর্তন, বিধান পরিষদের সৃষ্টি বা বিলোপ প্রভৃতি বিষয়ের কথা বলা যায়।

[b] সংবিধানের কিছু অংশকে পরিবর্তন বা সংশোধন করতে হলে পার্লামেন্টের উভয়কক্ষের মোট সদস্যের অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যের 2/3 অংশের সমর্থন একান্ত প্রয়োজন। মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি প্রভৃতি সংবিধানের বেশিরভাগ অংশই এই পদ্ধতি অনুসারে সংশোধিত হতে পারে।

[c] আবার বেশ কিছু বিষয় পার্লামেন্টের উভয়কক্ষের মোট সদস্যের অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যের 2/3 অংশের দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। এইভাবে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের সমর্থন লাভের পর প্রস্তাবটিকে রাজ্যগুলির আইনসভার সম্মতিলাভের জন্য প্রেরণ করা হয়। রাজ্যগুলির অন্তত অর্ধেক সমর্থন লাভ করলেই এই সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেমন-রাষ্ট্রপতির নির্বাচন ব্যবস্থা, কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতা বণ্টন, সুপ্রিমকোর্ট সংক্রান্ত বিষয় ইত্যাদি।

উপরিউক্ত তিন প্রকার সংশোধনের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ছাড়া কোনো সংশোধনী প্রস্তাব কার্যকর হতে পারে না।

বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা

পূর্বোক্ত অধ্যায়গুলিতে যেমন-নির্বাচন, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ ইত্যাদিতে আমরা বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যাপারটি পেয়েছি। এখন প্রশ্ন হল বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কী? কিন্তু তার পূর্বে আমরা জেনে নেব সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কী? সাধারণত আইনসভায় কোনো সাধারণ বিল পাস করাতে হলে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়, যেমন-কোনো বিল পাসের সময় হয়ত 247 জন সদস্য উপস্থিত আছেন। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়মানুযায়ী 124 জন সদস্য সমর্থন করলে বিলটি ওই কক্ষে পাস হয়ে যায়। কিন্তু সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে এই নিয়মে সংশোধনী বিল পাস হয় না। বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়। বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা 2 রকম পদ্ধতি অনুসরণ করে, যথা-

[a] যে কক্ষে বিলটি উত্থাপন হয় সেই কক্ষের মোট সদস্যের অর্ধেকের সমর্থন প্রয়োজন।

[b] ভোটের দিন উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে অন্তত 2/3 অংশের সমর্থন প্রয়োজন। পার্লামেন্টের উভয়কক্ষেই একই পদ্ধতিতে যে-কোনো সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়ে থাকে।

প্রাদেশিক সরকারসমূহের দ্বারা অনুমোদন

ভারতীয় সংবিধানে কিছু ধারা আছে, যেগুলির জন্য বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়। যখন কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন সংক্রান্ত ধারা বা প্রতিনিধিত্বের সংক্রান্ত ধারাগুলির সংশোধনের ব্যাপারটি চলে আসে, তখন রাজ্যগুলির সমর্থনের ব্যাপারটি চলে আসে। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যেহেতু কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে ক্ষমতার বণ্টনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তাই রাজ্যগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের উপগ্রহ নয়। আইনগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যাপারে রাজ্যেরও অধিকার রয়েছে। তাই সংবিধানের মধ্যে ধারা বা অংশ সংশোধন করতে গেলে রাজ্যের আইনসভাগুলির সম্মতির প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতির নির্বাচনব্যবস্থা, কেন্দ্ররাজ্যের ক্ষমতার বণ্টন, কেন্দ্রশাসিত ও রাজ্যগুলির হাইকোর্ট সংক্রান্ত বিষয়, সুপ্রিমকোর্ট সংক্রান্ত বিষয়, সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাব পার্লামেন্টের উভয়কক্ষের মোট সদস্যের অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যের 2/3 অংশের দ্বারা সমর্থিত হওয়ার পর প্রস্তাবটিকে রাজ্যগুলির আইনসভার নিকট প্রেরণ করা হয়। রাজ্যগুলির অন্তত অর্ধেকের সমর্থন লাভ করলে তবেই শুধুমাত্র সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হতে পারে।

এত বেশি সংশোধন কেন?

2018 খ্রিস্টাব্দের 26 জানুয়ারি ভারতীয় সংবিধানের বয়স 68 বছর পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যেই এই সংবিধান 103 বার সংশোধন হয়েছে। ভারতের সংবিধানের বেশিরভাগ অংশ দুষ্পরিবর্তনীয় হওয়া সত্ত্বেও সংশোধনের সংখ্যা এত বেশি কেন? এর জন্য আমরা দেখে নেব সংবিধান সংশোধনীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের দিকে। প্রথমেই আমরা দেখে নেব প্রতি 10 বছর বা দশকে সংবিধান সংশোধনের সংখ্যার বিষয়টিকে এবং দ্বিতীয়টিতে আমরা দেখতে পাব যে প্রতিটি 10টি সংশোধনীর সময় সীমাটি। 1970-1990 এই দুই দশকে বিরাট সংখ্যক সংশোধনী সম্পূর্ণ হয়েছে। আবার দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে 1974-1976 এই তিন বছরের সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে 10টি করে সংশোধনী হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে লক্ষ রাখলে আমরা দেখতে পাই যে, উপরিউক্ত দুটি সময়সীমা ২টি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় থাকার সময় ঘটেছে। প্রথমটিতে অর্থাৎ, 1970-1990 এই সময়ের মধ্যে কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে ক্ষমতায় ছিল এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অর্থাৎ, 2001-2003 এই সময়ে বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন NDA জোট ক্ষমতায় আসীন ছিল। সুতরাং, এর থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, সংবিধানের সংশোধনের বিষয়টি শাসক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে না।

এ পর্যন্ত প্রণীত সংশোধনের বিষয়বস্তু

বিষয়বস্তুর প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে সংশোধনীগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

[a] কিছু সংবিধান সংশোধনীর প্রকৃতি হল কৌশলগত বা প্রশাসনিক ধরনের। যেগুলিতে সংবিধানের মূল অংশের ব্যাখ্যা, সংশোধন এবং ছোটো ছোটো রূপান্তর স্থান লাভ করে থাকে। এই ধরনের সংশোধনগুলি আইনগতভাবে দেখা হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, 15-তম সংশোধনীর মাধ্যমে হাইকোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স 60 থেকে 62 করা হয়। একইরকম ভাবে সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টিও 55-তম সংশোধনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়।

[b] আবার বেশ কিছু সংবিধান সংশোধনী আছে যেগুলি বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণের ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়। যখন এই দুই বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় তখন সরকার পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিচার বিভাগের দেওয়া ব্যাখ্যাকে সংশোধন করে পরিবর্তন করে দেয়। যখন সরকার বিচার বিভাগের দেওয়া কোনো ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারে না তখন সংবিধানের বিশেষ অংশের সংশোধন করে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা প্রদান করার চেষ্টা করে থাকে। 1970-1975 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শাসন বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের দ্বন্দ্বের ফলে এইরূপ পরিস্থিতির উৎপত্তি ঘটেছিল।

[c] অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলির ঐক্যমতের ভিত্তিতে সংবিধানের একটি বৃহৎ অংশের সংশোধন হয়েছে। সমাজের রাজনৈতিক দর্শন ও আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলির ঐক্যমতের ভিত্তিতে এই পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে। 1984 খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে এই ধারাটি অনুসরণ করে সংবিধানের বহু সংশোধনী হয়েছে। 52-তম সংশোধনীর মাধ্যমে দলত্যাগ বিরোধ আইনের মাধ্যমে শুরুর পর অনেকগুলি সংশোধনী হয়েছে রাজনৈতিক ঝঞ্ঝাটের সময়ে। সংবিধানের 52-তম সংশোধনীর পর 61-তম সংশোধনীর মাধ্যমে ভোটাধিকার অর্জনের বয়স 21-18 করা হয় সংবিধানের 73-তম ও 74-তম সংবিধান সংশোধনীর কথা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে যত সংবিধান সংশোধনী হয়েছে তার সবই যে, বাধাহীনভাবে সুসম্পন্ন হয়েছে এমন নয়। এমন বেশকিছু সংবিধান সংশোধনী হয়েছে অতীতে সেগুলি নিয়ে বিতর্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বিশেষ করে 1970 থেকে 1980 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রচুর আইনগত ও রাজনৈতিক বিতর্কমূলক সংশোধনী হয়েছিল। বিশেষ করে সংবিধানের 38-তম, 39-তম ও 42-তম সংশোধনীগুলি ছিল খুবই বিতর্কমূলক সংশোধনী এবং এই তিনটি সংশোধনী হয়েছিল এমন একটি সময়ে যখন দেশের মধ্যে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি ছিল। এর মধ্যে 42-তম সংশোধনীর প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারি। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের দেওয়া রায়কে অতিক্রম করার প্রচেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকি লোকসভার কার্যকালের মেয়াদ 5 বছর থেকে বৃদ্ধি করে 6 বছর করা হয়। সুপ্রিমকোর্টের বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে 1977 খ্রিস্টাব্দের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস সরকার পরাজয়ের পর যে নতুন সরকার গঠিত হয় সেই সরকার ক্ষমতায় এসে 38, 39 ও 42-তম সংবিধান সংশোধনীগুলিকে 44-তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংশোধন করে পূর্বেকার অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

মূল কাঠামো এবং সংবিধানের বিবর্তন

সংবিধানের 368নং ধারানুযায়ী সংবিধানের যে-কোনো অংশের পরিবর্তন বা সংশোধন করা যায় কিনা? এই প্রশ্নের উত্তরে কেশবানন্দ ভারতী মামলায় সুপ্রিমকোর্ট এই রায় দেন যে-কোনো ভাবেই সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা কাঠামোগুলির সংশোধন করা যাবে না। কারণ, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোগুলি হল - সংবিধানের ভিত্তিস্বরূপ। সুতরাং যদি এই ভিত্তিস্বরূপ মৌলিক - কাঠামোগুলির পরিবর্তন বা সংশোধন করা হয় তা হলে সংবিধানের কাঠামোটির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে।

সংবিধান একটি গতিশীল ও জীবন্ত দলিল

একটি প্রাণবন্ত জীবের মতো ভারতীয় সংবিধান যুগের ও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের মধ্যে দিয়ে নিজেকে একদিকে টিকিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মাধ্যমে সে নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলেছে নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যার মোকাবিলার ক্ষেত্রে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটেছে। সমাজের এই পরিবর্তনের সঙ্গে সংবিধানও নিজেকে পূর্বের থেকে গতিশীল করে তুলে নতুন প্রজন্ম সমাজব্যবস্থার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে নিয়েছে। একটি সংবিধান যে গণতন্ত্রকে রক্ষা করে চলেছে একই সঙ্গে নাগরিক সমস্যার সমাধান করে নাগরিকদের কাছে সম্মান আদায় করে নিচ্ছে। স্বাধীনতালাভের পর থেকে 6টি দল ভারতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে সবথেকে ক্ষুদ্রতর যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে সেটি হল, সংসদের বা পার্লামেন্টের সার্বভৌমিকতার জায়গাটি। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ বা পার্লামেন্টেই জনগণের প্রতিনিধিদের জায়গা এবং এটা আশা করা হয় যে, পার্লামেন্ট বা সংসদ শাসন ও বিচার বিভাগের ওপরে অবস্থান করবে। কিন্তু গণতন্ত্র শুধুমাত্র জনগণের ভোটে নির্বাচনের ব্যাপার নয় বরং আইনের অনুশাসনের নীতিটির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে গণতন্ত্রের ধারণাটি। তাই বলা যায়, গণতন্ত্রে সংবিধানের কাজই হল একদিকে যেমন জনগণের অধিকারকে সুরক্ষা প্রদান করা তেমনি অন্যদিকে, সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাগুলির কাজকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাখা এবং উভয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রাখা।

বিচার বিভাগের অবদান

দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া মানুষদের প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করা বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করে পার্লামেন্ট। পার্লামেন্টকে এইসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করে বিচার বিভাগ। এমনকি কোনো অপ্রয়োজনীয় আইন রোধে বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।

ভারতীয় সংবিধানের কাজকর্মের সফলতা নির্ভর করে কোনো সমস্যা সমাধানের মধ্যে। সংবিধান পড়লে বোঝা যায় যে, সংবিধানে মৌলিক কাঠামো শব্দটি কোথাও ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ, মৌলিক কাঠামো শব্দটি হল বিচার বিভাগের আবিষ্কার। তবে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আদালত মৌলিক কাঠামো শব্দটিকে কেন গুরুত্ব দিয়েছে? উত্তরে বলা যায় মৌলিক কাঠামো ছাড়া সংবিধান অস্তিত্বহীন। সংবিধানের আক্ষরিক অর্থ এবং অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের এটি হল এক নজিরবিহীন ঘটনা।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারদর্শিতা

উপরোক্ত আলোচনা একটি নতুন বিষয় উন্মোচন করেছে। পার্লামেন্ট ও শাসন বিভাগ 1967 এবং 1973 খ্রিস্টাব্দের তীব্র বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে উপলব্ধি করেছেন যে, এ বিষয়টির একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সূত্র খুঁজে বের করা দরকার। কেশবানন্দ ভারতী মামলার রায়ে সুপ্রিমকোর্ট বিষয়টি নিয়ে পুনঃবিবেচনার কথা বললেও ব্যর্থ হয়। এর ফলে 42-তম সংশোধনীর মাধ্যমে পার্লামেন্টের কর্তৃত্ব প্রায় নিশ্চিত করে।

আমাদের দেশের সংবিধান গঠনকালে দেশের নেতৃবৃন্দ এবং জনগণের একটি সাধারণ দর্শন ছিল। গণপরিষদের সকল নেতৃবৃন্দ এই দর্শনের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেন, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মর্যাদা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্য, সকল মানুষের কল্যাণসাধন এবং একতা-এগুলি জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় নেতাগণ এবং ভারতবাসীরা এই দর্শনের ওপর সম্পূর্ণভাবে আস্থা রেখেছিলেন। আমাদের সংবিধান এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়েছে। তাই বলা যায় অর্ধশতক অতিক্রম করলেও এটি সমান মর্যাদাও কর্তৃত্বের অধিকারী।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আগামী' কবিতাটি 'ছাড়পত্র' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

আগামী Class 12 Bengali Question 2023 সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো (MCQ)  প্রশ্নমান ১ class 12 bengali mcq question answer ১. “ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই”-বক্তা কে ? (ক) বৃক্ষ শিশু (খ) বনস্পতি (গ) বটবৃক্ষ (ঘ) সদ্য অঙ্কুরিত বীজ উত্তর: (ঘ) সদ্য অঙ্কুরিত বীজ। ২. অঙ্কুরিত বীজের ক্ষুদ্র শরীরে বাজে— (ক) ঝড় (খ) বৃষ্টি (গ) ভূমিকম্প (ঘ) তুফান উত্তর: (ক) ঝড়। ৩. অঙ্কুরিত বীজের শাখায় প্রত্যাহত হবে— (ক) পত্রমর্মর (খ) মর্মরধ্বনি (গ) পাখির কূজন (ঘ) বিচিত্রধ্বনি উত্তর: (খ) মর্মরধ্বনি । ৪. অঙ্কুরিত বৃক্ষশিশু অরণ্যের বিশাল চেতনা অনুভব করে— (ক) পত্রে (খ) পুষ্পে (গ) শিকড়ে (ঘ) শাখায় উত্তর: (গ) শিকড়ে। ৫. “জানি তারা মুখরিত হবে”—কীভাবে ? (ক) নব শতকের গানে (খ) নতুন দিনের গানে (গ) নব তারণ্যের গানে (ঘ) নব জীবনের গানে উত্তর: (গ) নব অরণ্যের গানে। ৬. অঙ্কুরিত বৃক্ষশিশু নব অরণ্যের গানে মিশে যাবে— (ক) বসন্তে (খ) বর্ষায় (গ) গ্রীষ্মে (ঘ) শীতে উত্তর: (ক) বসন্তে। ৭. অঙ্কুরিত বীজ কোথায় মিশে যাবে ? (ক) অরণ্যের দলে (খ) বৃহতের দলে (গ) ক্ষুদ্রের দলে (ঘ) মহীরুহ-র দলে উত্তর: (খ) বৃহতের দলে। ৮. অঙ্কুরিত বীজ নিজেকে বলেছে— (ক) ভ...

বীরচন্দ্র মানিক্য থেকে বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য পর্যন্ত ত্রিপুরার আধুনিকীকরণ সম্পর্কে আলোচনা কর।

 Discuss the modernization of Tripura from Birchandra Manikya to Bir Bikram Kishor Manikya. বীরচন্দ্র মানিক্য থেকে বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য পর্যন্ত ত্রিপুরার আধুনিকীকরণ সম্পর্কে আলোচনা কর।  ত্রিপুরায় আধুনিক যুগের সূচনা হয় মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্যের শাসনকালে। তিনি ব্রিটিশ ভারতের শাসন পদ্ধতির অনুকরণে ত্রিপুরার শাসন ব্যবস্থার সংস্কার করেণ এবং লিখিত আইন কানুন প্রনয়নের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থাকে সুসংবদ্ধ ও সুসংগঠিত করেণ। মোটের উপর বীরচন্দ্রমানিক্য (১৮৬২-১৮৯৬ খ্রি:) তাঁর আমলে ত্রিপুরা রাজ্য এক নতুন রূপ লাভ করে। ১) মিউনিসিপ্যালিটি গঠন তিনি ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে আগরতলা মিউনিসিপ্যালিটি গঠন করেন। তবে নাগরিক জীবনের সুযোগ সুবিধা বিধানে কিংবা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসাবে দীর্ঘকাল কোনো কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহণে আগরতলা মিউনিসিপ্যালিটি ছিল ব্যর্থ। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুলাই ডবলিউ. বি. পাওয়ার সাহেব ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম পলিটিক্যাল এজেন্ট নিযুক্ত হন।  ২) বিচার সংক্রান্ত সংস্কার প্রাচীনকাল হতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি সংক্রান্ত বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি মহারাজ স্বয়ং সম্পাদন করতেন। ১৮৭২ খ্রিস্টা...

বীরচন্দ্র মানিক্যের পূর্ববর্তী সময়ে ত্রিপুরার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর।

 Discuss the social and economic condition of Tripura before the accession of Birchandra Manikya. বীরচন্দ্র মানিক্যের পূর্ববর্তী সময়ে ত্রিপুরার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর। ভূমিকা ত্রিপুরার মাণিক্য উপাধিকারী রাজন্যবর্গের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন আত্মমর্যাদাজ্ঞানহীন, ক্ষমতালোভী ও ষড়যন্ত্রী। এসব ক্ষমতালোভী ও ষড়যন্ত্রীরা মুঘল ফৌজদারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অধিক সংখ্যক হাতি, নিয়মিত উচ্চ হারে খাজনা, নজরানা ইত্যাদি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজত্বের সনদ লাভ করতেন। এটা ত্রিপুরার দুর্বল অর্থনীতির উপর এক বিরাট আঘাত ও স্থায়ী ক্ষতস্বরূপ ছিল। তবে এ সময়ের শুভদিক হল ত্রিপুরায় ব্রিটিশ ভারতের অনুকরণে আইন প্রণয়নের সূত্রপাত, প্রশাসনিক বিধিব্যবস্থার প্রবর্তন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের উন্মেষ ও সামাজিক সংস্কার। Economic Condition ১) চাষাবাদ ও কৃষি ত্রিপুরার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা হল কৃষি। কৃষিজ উৎপাদনের মধ্যে ধান, গম, আলু, আখ, সরিষা, ডাল জাতীয় শস্য, কার্পাস, তুলো, কচু, আদা, তরমুজ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিকার ও পশুপালন করেও তারা জীবিকা নির্বাহ করত। এখানকার চাষযোগ্য সমতল জমির সাথে ...