ভারতের সুপ্রিমকোর্টের গঠন ও কার্যাবলি আলোচনা করো।
ভূমিকা: ভারতের পিরামিডতুল্য অখণ্ড বিচারব্যবস্থার শীর্ষস্থানে রয়েছে সুপ্রিমকোর্ট। সুপ্রিমকোর্ট হল দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত।
ভারতের সুপ্রিমকোর্টের গঠন: মূল সংবিধানে 1 জন প্রধান বিচারপতি ও অনধিক 7 জন বিচারপতি নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট গঠন করার কথা বলা হয়েছিল। 2011 খ্রিস্টাব্দে প্রণীত একটি আইন অনুসারে বর্তমানে 1 জন প্রধান বিচারপতি এবং 30 জন অন্যান্য বিচারপতি অর্থাৎ, মোট 31 জন বিচারপতি নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট গঠিত। তবে বর্তমানে (2019)-এর কার্যকরী বিচারপতির মোট সংখ্যা 29।
নিয়োগ: সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ করেন।
যোগ্যতা: সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি পদপ্রার্থী হতে হলে তাকে [i] ভারতীয় নাগরিক হতে হবে; [ii] কমপক্ষে 5 বছর কোনো হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে কাজ করতে হবে; অথবা, [iii] 10 বছর একাদিক্রমে কোনো হাইকোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ করতে হবে; অথবা, [iv] রাষ্ট্রপতির মতে, তাঁকে একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ হতে হবে।
মেয়াদ: সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিগণ 65 বছর বয়স পর্যন্ত বিচারপতি পদে আসীন থাকতে পারেন।
অপসারণ: প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের অভিযোগের ভিত্তিতে পার্লামেন্টের উভয়কক্ষের উপস্থিত ও ভোট- প্রদানকারী সদস্যদের ভাগ সদস্যদের সমর্থনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি বিচারপতিদের পদচ্যুত করতে পারেন।
ভারতের সুপ্রিমকোর্টের কার্যাবলি
সুপ্রিমকোর্টের কার্যক্ষেত্রকে চার ভাগে ভাগ করা যায়-[a] মূল এলাকা; [b] আপিল এলাকা; [c] পরামর্শদান এলাকা; [d] নির্দেশ, আদেশ বা লেখ জারির এলাকা।
[a] মূল এলাকা: মূল এলাকার মধ্যে পড়ে-
[i] কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এক বা একাধিক অঙ্গ- রাজ্যের সরকারের মধ্যে বিরোধ;
[ii] কেন্দ্রীয় সরকার এবং এক বা একাধিক অঙ্গরাজ্যের সরকারের সঙ্গে অপর কয়েকটি বা একটি অঙ্গ- রাজ্যের সরকারের বিরোধ;
[iii] দুই বা ততোধিক অঙ্গরাজ্যের সরকারের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তার বিচার হয় সুপ্রিমকোর্টের মূল এলাকায়;
[iv] রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি করে সুপ্রিমকোর্ট -এটিও মূল এলাকার মধ্যে পড়ে।
[b] আপিল এলাকা: ভারতের সর্বোচ্চ আপিল আদালত হল সুপ্রিমকোর্ট। আপিল এলাকা বলতে বোঝায় যে-কোনো অধস্তন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের আপিল গ্রহণ করার ক্ষমতা। সুপ্রিমকোর্টে যে-চার ধরনের আপিল করা যায়, তা হল-
[i] সংবিধানের ব্যাখ্যাসংক্রান্ত আপিল: দেওয়ানি বা ফৌজদারি বা অন্য কোনো মামলায় হাইকোর্ট যদি প্রমাণপত্র দেয় অথবা সুপ্রিমকোর্ট মনে করে মামলাটির সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত প্রশ্ন জড়িত আছে তাহলে সেই বিষয়টি সুপ্রিমকোর্টে মীমাংসার জন্য পাঠানো হয়।
[ii] দেওয়ানি আপিল: দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট যদি প্রমাণপত্র দেয় যে, মামলাটির সঙ্গে আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত, তাহলে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায়।
[iii] ফৌজদারি আপিল: ফৌজদারি মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে তিনটি ক্ষেত্রে আপিল করা যায়-
নিম্ন আদালতে নির্দোষ বলে প্রমাণিত কোনো ব্যক্তিকে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড দিলে;
নিম্ন আদালতে বিচার চলাকালীন কোনো মামলাকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে;
হাইকোর্ট যদি প্রমাণপত্র দেয় যে, মামলাটি সুপ্রিমকোর্টে আপিলযোগ্য।
[iv] বিশেষ অনুমতি সূত্রে আপিল: ভারতের যে-কোনো আদালতের যে-কোনো রায়, আদেশ ও দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার বিশেষ অনুমতি সুপ্রিমকোর্ট দিতে পারে। ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সুপ্রিমকোর্ট এরূপ অনুমতি দান করে।
[c] পরামর্শদান এলাকা: সংবিধানের 143(1) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন সংক্রান্ত কোনো প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ চাইলে সুপ্রিমকোর্ট পরামর্শ দিয়ে থাকে।
[d] নির্দেশ, আদেশ বা লেখ জারি করার এলাকা: ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য সুপ্রিমকোর্ট 5 ধরনের লেখ জারি করতে পারে। এগুলি হল [i] বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ; [ii] পরমাদেশ; [iii] প্রতিষেধ; [iv] অধিকার- পৃচ্ছা; [v] উৎপ্রেষণ।
অন্যান্য কাজ
[i] সুপ্রিমকোর্ট হল সর্বোচ্চ অভিলেখ আদালত। কারণ, এখানে আইন সংক্রান্ত এবং বিচার বিভাগীয় কার্যবিবরণী- সংক্রান্ত সকল নথিপত্র সংরক্ষিত থাকে।
[ii] সুপ্রিমকোর্টকে অবমাননার জন্য কোর্ট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শাস্তিপ্রদান করতে পারে।
[iii] নিজের কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা সুপ্রিমকোর্টের হাতে অর্পণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিমকোর্ট বিবিধ কার্য করে থাকে।
মূল্যায়ন: পরিশেষে বলা যায়, মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের মতো শক্তিশালী না-হলেও ভারতের সুপ্রিমকোর্ট ব্রিটেনের বিচার বিভাগের মতো দুর্বলও নয়। সাম্প্রতিককালে জনস্বার্থ সম্পর্কিত মামলায় সুপ্রিমকোর্টের ঐতিহাসিক রায়দানের পরিপ্রেক্ষিতে তার ভূমিকা আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। সেই সঙ্গে জন- প্রতিনিধি ও আমলাদের দুর্নীতি রুখতে সুপ্রিমকোর্টের ভূমিকা জনসাধারণ কর্তৃক অভিনন্দিত হয়েছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন