আমাদের কেন স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রয়োজন?
কার্ল মার্কসের মতামতকে সমর্থন করে বলা যায়, দ্বন্দ্ব না থাকলে সমাজব্যবস্থা টিকে থাকে না। যতদিন সমাজ থাকবে ততদিন দ্বন্দ্ব, হিংসা, বিবাদ এবং দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলবে। দ্বন্দ্ব ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, আবার ব্যক্তির সঙ্গে সরকারের হতে পারে। এই বিবাদ বা দ্বন্দ্বের সুষ্ঠু সমাধানের জন্য একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ দরকার। এই বিভাগ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট আইনের মাধ্যমে মীমাংসা হওয়া দরকার। এর জন্য দরকার যে-কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত স্বাধীন বিচারব্যবস্থা।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য হল বিচার বিভাগ যাতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার করতে পারে তার ব্যবস্থা করা। এর অর্থ এমন নয় যে, বিচার বিভাগের কার্যসম্পাদন সম্পর্কে কোনো মতামত প্রকাশ করা যাবে না। বিচার বিভাগ সংবিধানের নির্দেশ মতো তার কাজ করবে। সাংবিধানিক ক্ষমতা অনুযায়ী বিচার বিভাগ নিরপেক্ষভাবে কার্যসম্পাদন করবে।
বিচারপতিদের নিয়োগ
সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ সম্পর্কে সংবিধানের নির্দেশ হল-সুপ্রিমকোর্টের প্রত্যেক বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। এরূপ নিয়োগের পূর্বে সুপ্রিমকোর্ট এবং রাজ্য হাইকোর্ট- এর যেসব বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন বলে রাষ্ট্রপতি | মনে করবেন, তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করার পরই তিনি এরূপ নিয়োগ করতে সক্ষম। কিন্তু সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ করার পূর্বে রাষ্ট্রপতিকে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে অবশ্যই পরামর্শ করতে হবে [124(2) নং ধারা]। তত্ত্বগতভাবে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিরা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হলেও বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন।
সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগের ব্যাপারে দুটি প্রথা দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত হয়। সেগুলি হল-
[a] বিচারপতিদের মধ্যে একজন মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত হবেন।
[b] সুপ্রিমকোর্টের প্রবীনতম বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ করবেন।
বিচারপতিদের অপসারণ
সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিরা 65 বছর বয়স পর্যন্ত তাঁদের নিজেদের পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন। অবশ্য-
[i] কোনো বিচারপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে,
[ii] তাঁর মৃত্যু হলে, কিংবা
[iii] তাঁকে পদচ্যুত করা হলে কার্যকাল সমাপ্তির পূর্বেই বিচারপতির পদ শূন্য হতে পারে।
এমনকি অসদাচরণ বা অসামর্থ্য-এর কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারপতিকে পদচ্যুত করতে পারেন। কোনো বিচারপতিকে পদচ্যুত করতে হলে পার্লামেন্টের উভয়কক্ষের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই তৃতীয়াংশ-এর ভোটাধিক্যে অপসারণের প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
ভারতে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিরা যাতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ- ভাবে বিচারকার্য সম্পাদন করতে পারেন, সেজন্য সংবিধানে কয়েকটি ব্যবস্থা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সেগুলি হল-
[i] কেবল প্রমাণিত অসদাচরণ কিংবা অসামর্থ্য ছাড়া অন্য কোনো কারণে সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারপতিকে পদচ্যুত করা যায় না। কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচারণ কিংবা অসামর্থ্য-এর কোনো অভিযোগ থাকলে তা প্রস্তাব আকারে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের কাছে পেশ করতে হয়। সেই প্রস্তাব পার্লামেন্টে গৃহীত হতে গেলে উভয় কক্ষের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং উপস্থিত ও ভোটপ্রদানকারী সদস্যদের দুই- তৃতীয়াংশ-এর সমর্থন প্রয়োজন। এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের সেই বিচারপতিকে সহজে অপসারণ করতে পারেন।
[ii] পার্লামেন্টে বিচারপতিদের কোনো রায়ের যৌক্তিকতা নিয়ে কোনোরূপ প্রশ্ন তোলা বা আলোচনা করা যায় না [121 নং ধারা]।
[iii] অবসর গ্রহণের পর সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারপতি ভারতের কোনো আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে পারেন না।
[iv] সাধারণ অবস্থায় সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারপতিদের কার্যকালে বেতন, ভাতা ইত্যাদি হ্রাস করা যায় না।
[v] সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের বেতন, ভাতা ইত্যাদি সংক্রান্ত ব্যয় পার্লামেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষ নয়। ভারতের সঞ্চিত তহবিল থেকে ওইসব ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
বিচার বিভাগের গঠন কাঠামো
ভারতীয় বিচারব্যবস্থার গঠন ঠিক মিশর-এর পিরামিডের মতো। ভারতের অখণ্ড বিচারব্যবস্থার শীর্ষে ধর্মাধিকরণ বা সুপ্রিমকোর্টের অবস্থান।
গঠন: মূল সংবিধানে বলা হয়েছিল যে, পার্লামেন্ট যতদিন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতির সংখ্যা স্থির না করবে, ততদিন পর্যন্ত একজন প্রধান বিচারপতি এবং অনধিক 7 জন বিচারপতিদের নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট গঠিত হবে [(124(1)নং ধারা]। পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত আইনে (2011 খ্রিস্টাব্দ) বলা হয়েছে যে, সুপ্রিমকোর্টের মোট বিচারপতির সংখ্যা হবে সর্বাধিক 31 জন।
এ ছাড়াও সংবিধানে অস্থায়ী বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে। অনুপস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি নিজ কর্তব্য সম্পাদন করতে অক্ষম হলে সুপ্রিমকোর্টের অন্য বিচারপতিদের মধ্যে থেকে যে-কোনো একজনকে রাষ্ট্রপতি 'কার্যনির্বাহী প্রধান বিচারপতি' হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন।
বিচারপতিদের যোগ্যতা: সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি হতে গেলে নিম্নলিখিত যোগ্যতাবলি থাকা একান্ত প্রয়োজন-
[i] প্রার্থীকে অবশ্যই ভারতীয় নাগরিক হতে হবে;
[ii] তাঁকে অন্যূন 5 বছর এক বা একাধিক হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে অথবা অন্তত 10 বছর একাদিক্রমে কোনো-না-কোনো হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ করতে হবে; কিংবা রাষ্ট্রপতির মতে, তাঁকে একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ হতে হবে [124(3) নং ধারা]।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট
ভারতের হাইকোর্ট
ভারতের জেলা আদালত
ভারতের অধস্তন আদালত
সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা
সুপ্রিমকোর্টের কার্যক্ষেত্রকে প্রধানত নিম্নলিখিত চারভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যথা- [a] মূল এলাকা, [b] আপিল এলাকা, [c] পরামর্শদান এলাকা, [d] নির্দেশ, আদেশ ও লেখ জারি করার এলাকা।
মূল এলাকা: আইনগত অধিকারের প্রশ্নে-
[i] কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এক বা একাধিক রাজ্য সরকারের বিরোধ দেখা দিলে কিংবা,
[ii] কেন্দ্রীয় সরকার এবং এক বা একাধিক রাজ্য সরকারের সঙ্গে অন্য কয়েকটি বা একটি রাজ্য সরকারের বিরোধ বাধলে অথবা,
[iii] দুই বা ততোধিক রাজ্য সরকারের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ দেখা দিলে একমাত্র সুপ্রিমকোর্টই ওইসব বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারে।
রাষ্ট্রপতি কিংবা উপরাষ্ট্রপতির নির্বাচন সংক্রান্ত যে-কোনো প্রশ্ন বা বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা সুপ্রিমকোর্টের মূল এলাকার অন্তর্ভুক্ত [71(1) নং ধারা]। এরূপক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের রায়ই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।
আপিল এলাকা: সুপ্রিমকোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত। এই আদালতের আপিল এলাকাকে প্রধানত চারভাগে ভাগ করা যায়। যথা- [a] সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত আপিল, [b] দেওয়ানি আপিল, [c] ফৌজদারি আপিল এবং [d] বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে আপিল।
[a] সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত আপিল: দেওয়ানি, ফৌজদারি বা অন্য যে-কোনো একটি মামলা সম্বন্ধে হাইকোর্ট যদি এই মর্মে শংসাপত্র দেয় যে, সংশ্লিষ্ট মামলার সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত আছে, তাহলে সেই মামলার বিচারের জন্য সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায়।
[b] দেওয়ানি আপিল: বর্তমানে,
[i] কোনো দেওয়ানি মামলার সঙ্গে আইনের সাধারণ প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রশ্ন জড়িত আছে বলে হাইকোর্ট শংসাপত্র দিলেই তা সুপ্রিমকোর্টে আপিলযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
[ii] তা ছাড়া, কোনো দেওয়ানি মামলার বিচার সুপ্রিমকোর্টে হওয়া উচিত বলে হাইকোর্ট মনে করলে সেই মামলা সম্বন্ধে সুপ্রিমকোর্ট-এ আপিল করা যায়। [133(1) নং ধারা]।
[c] ফৌজদারি আপিল: ফৌজদারি মামলার ব্যাপারে তিনটি ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায়, ডিক্রি বা চূড়ান্ত নির্দেশ-এর বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায়। সেগুলি হল-
[i] নিম্ন আদালতের বিচারে নির্দোষ বলে প্রমাণিত কোনো ব্যক্তিকে যদি হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে কিংবা,
[ii] নিম্ন আদালতে বিচার চলাকালীন কোনো মামলা নিজের হাতে তুলে নিয়ে হাইকোর্ট যদি অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রাণদণ্ডের আদেশ দেয়, অথবা,
[iii] হাইকোর্ট কোনো মামলাকে সুপ্রিমকোর্টের কাছে আপিলযোগ্য বলে যদি শংসাপত্র প্রদান করে [134(1) নং ধারা]।
[d] বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে আপিল: উপরিউক্ত তিনটি ক্ষেত্র ছাড়াও অন্য একটি ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায়। ভারতের যে-কোনো আদালত অথবা ট্রাইব্যুনালের যে-কোনো রায়, আদেশ বা দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার বিশেষ অনুমতি সুপ্রিমকোর্ট প্রদান করতে পারে।
পরামর্শদান সংক্রান্ত ক্ষমতা: কয়েকটি আইনসংক্রান্ত প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শদান সংক্রান্ত ক্ষমতাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
[a] রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে, আইন বা তথ্য সংক্রান্ত কোনো সর্বজনীন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উদ্ভব ঘটেছে বা ঘটার সম্ভাবনা আছে, তাহলে তিনি সে বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। [143(1) নং ধারা]।
[b] সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার পূর্বে সম্পাদিত সন্ধি, চুক্তি, অঙ্গীকারপত্র, সনদ প্রভৃতির মধ্যে যেগুলি সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার পরও বলবৎ রয়েছে। সেইসব বিষয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন।
নির্দেশ, আদেশ, ক্ষমতার লেখ জারি করা: ভারতীয় গণতন্ত্র রক্ষায় সুপ্রিমকোর্ট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। সংবিধানের তৃতীয় অংশে লিপিবদ্ধ মৌলিক অধিকারগুলিকে বলবৎ ও কার্যকর করার জন্য নাগরিকরা সুপ্রিমকোর্টের কাছে আবেদন করতে পারে। সুপ্রিমকোর্ট এইসব অধিকার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ, পরমাদেশ, প্রতিষেধ, অধিকার পৃচ্ছা, উৎপ্রেষণ প্রভৃতি লেখ, নির্দেশ বা আদেশ জারি করতে পারে (32 নং ধারা)।
উপরোক্ত ক্ষমতাবলি ছাড়াও সুপ্রিমকোর্টের অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাও রয়েছে, যথা-
[i] সংবিধান সুপ্রিমকোর্টকে অভিলেখ আদালত হিসেবে কাজ করার অধিকার প্রদান করেছে (129নং ধারা)।
[ii] সুপ্রিমকোর্ট বিভিন্ন মামলায় নিজের দেওয়া যে-কোনো রায় বা আদেশ পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
[iii] নিজের অবমাননার জন্য সুপ্রিমকোর্ট অবমাননাকারীর শাস্তিবিধানের ব্যবস্থা করতে পারে।
[iv] সুপ্রিমকোর্ট নিজ ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে যে-কোনো বিষয়ে পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ডিক্রি বা আদেশ জারি করতে পারে।
বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তা
স্বাধীনোত্তর ভারতে 1950 খ্রিস্টাব্দের পর থেকে বিচার বিভাগ, - বিশেষত সুপ্রিমকোর্ট সাংবিধানিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মামলার = নিষ্পত্তিকরণের ক্ষেত্রে একটি সাবেকি আদালতের ভূমিকা পালন করতে থাকে। কিন্তু 1979 খ্রিস্টাব্দের পর থেকে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ একটি নতুন ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করে। জনস্বার্থমূলক মামলার হাত ধরে ভারতে বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তার আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটেছে এবং প্রধানত বিশ শতকের নব্বই-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তা ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তা বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে সংবিধান- বিশেষজ্ঞ, বিচারপতি, রাজনীতিবিদ প্রমুখের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। এরূপ মতবিরোধের জন্য বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তার কোনো একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নির্দেশ করা যথেষ্ট কঠিন। যখন বিচারপতিরা পরিবর্তিত সমাজের চাহিদাপূরণের জন্য সচেতনভাবে 'বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা' চূড়ান্তভাবে প্রয়োগ করেন, তখন তাকে বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তা বলা হয়। এরূপ সক্রিয়তা [a] নেতিবাচক এবং [৮] ইতিবাচক-এই দুধরনের হতে পারে। আদালত যখন কেবল সংবিধান অনুযায়ী কোনো আইন কিংবা শাসন বিভাগীয় কোনো নির্দেশ, আদেশ প্রভৃতির বৈধতা বিচার করে, তখন তাকে ইতিবাচক সক্রিয়তা বলা হয়। বর্তমান ভারতে বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তা বলতে সংবিধান প্রদত্ত এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে উচ্চ আদালতগুলি, বিশেষত সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগ-এর এক্তিয়ারের মধ্যে অনুপ্রবেশ করাকে বোঝায়। এরূপ সক্রিয়তা হল নেতিবাচক বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তা।
বিচার বিভাগ এবং অধিকারসমূহ
ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সুপ্রিমকোর্টের ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সংবিধানের 13 নং ধারায় মৌলিক অধিকারগুলিকে আইনসভার স্বেচ্ছাচারিতার হাত থেকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, মৌলিক অধিকারগুলির সঙ্গে সংগতিবিহীন প্রচলিত সব আইনই বাতিল বলে গণ্য হবে [13(1) নং ধারা]। তা ছাড়া রাষ্ট্র মৌলিক অধিকারগুলিকে ক্ষুণ্ণ করে কোনো আইন প্রণয়ন করলে সেই আইনও বাতিল হয়ে যাবে। [13(2) নং ধারা]। এইভাবে বিভিন্ন সময়ে মৌলিক অধিকার বিরোধী বলে কয়েকটি আইনকে বাতিল করে দিয়ে সুপ্রিমকোর্ট নাগরিক অধিকার রক্ষায় বিশেষ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
বিচার বিভাগ এবং পার্লামেন্ট বা সংসদ
মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে অনেক সময় পার্লামেন্টের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ উপস্থিত হয়েছে। এই মতবিরোধ চরম আকার ধারণ করে 1967 খ্রিস্টাব্দে গোলকনাথ মামলায় সুপ্রিমকোর্টের প্রদত্ত রায়কে কেন্দ্র করে, এই মামলায় সুপ্রিমকোর্ট রায় দেয় যে, অতীতে যাই ঘটুক না কেন, সংবিধান কর্তৃক নিশ্চিতভাবে গ্যারান্টি প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলিকে সংকোচন অথবা বাতিল করার উদ্দেশ্যে ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা পার্লামেন্টের নেই।
কিন্তু 1976 খ্রিস্টাব্দে পার্লামেন্টে 42 তম সংবিধান সংশোধনী আইন প্রণয়ন করে কেশবানন্দ ভারতীয় মামলার রায়কে অতিক্রম করার চেষ্টা করে। এই সংশোধনী আইনের ১নং ধারায় বলা হয়েছে যে, পার্লামেন্ট যে-কোনো একটি বা সবগুলি নির্দেশমূলক নীতির কার্যকর করার জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করলে আদালত তার বৈধতা বিচার করতে পারবে। 55নং ধারা অনুসারে পার্লামেন্ট সংবিধানের যে-কোনো বিষয় সংশোধন করতে পারবে এবং সেই সংশোধন সম্পর্কে আদালতে কোনোরূপ প্রশ্ন তোলা যাবে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন