সুপরিবর্তনীয় সংবিধানের গুণাগুণ আলোচনা করো।
যে-সংবিধানকে অতিসহজে সাধারণ আইন পাসের মাধ্যমে সংশোধন করা যায়, তাকে বলে সুপরিবর্তনীয় সংবিধান। এখানে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য বিশেষ পদ্ধতির প্রয়োজন হয় না। যেমন-ব্রিটেনের সংবিধান।
সুপরিবর্তনীয় সংবিধানের গুণ: সুপরিবর্তনীয় সংবিধানের কতকগুলি গুণ লক্ষ করা যায়। এগুলি হল-
[i] প্রয়োজনের উপযোগী: সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনশীল। এই সংবিধান সহজে পরিবর্তন করা যায় বলে সংবিধান সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সহজে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, ফলে পরিবর্তনশীল সমাজের চাহিদা মেটাতে পারে।
[ii] জরুরি অবস্থার উপযোগী: দেশে কোনো সংকট অবস্থা দেখা দিলে তাকে মোকাবিলা করার জন্য সংবিধান যথেষ্ট পরিমাণে নমনীয় হওয়া প্রয়োজন। সংবিধান সুপরিবর্তনীয় হলে সংকটকালে দ্রুততার সঙ্গে সংবিধান সংশোধন করে ওই অবস্থার মোকাবিলা করা সম্ভব।
[iii] বিপ্লবের সম্ভাবনা কম: এই সংবিধান সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সহজে তাল মিলিয়ে চলতে পারে বলে জনসাধারণের মনে ক্ষোভ জমে না। ফলে বিপ্লবের সম্ভাবনা কমে যায়।
[iv] গণতন্ত্রের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ: সরকার পরিবর্তন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ। সরকার পরিবর্তন মানে কেবলমাত্র কয়েকজন ব্যক্তির পরিবর্তন নয়-বিকল্প নীতি ও কর্মসূচির প্রতিষ্ঠা। ওই বিকল্প নীতি ও কর্মসূচিকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সংবিধান নমনীয় হলে এ ব্যাপারে কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। তাই নমনীয় সংবিধান গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় কাম্য।
[v] গতিশীল: আমাদের এই সমাজ, রাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ইত্যাদি স্থির বা স্থিতিশীল নয়। তেমনি কোনো দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা বা সংবিধান গতিহীন হতে পারে না। গতিশীলতা সংবিধানের ধর্ম। যে-সংবিধান গতিশীল নয়, তা ধীরে ধীরে বর্জনীয় হয়ে ওঠে। সুপরিবর্তনীয় সংবিধানের প্রধান গুণ হল এর গতিশীলতা।
সুপরিবর্তনীয় সংবিধানের দোষ: সুপরিবর্তনীয় সংবিধানের কিছু সুবিধা থাকলেও এর অসুবিধাগুলিকে অস্বীকার করা যায় না। এর অসুবিধা বা দোষগুলি হল-
[i] দলীয় স্বার্থসিদ্ধি: সংবিধান সহজে পরিবর্তন করা গেলে ক্ষমতাসীন দল নিজেদের স্বার্থে প্রয়োজন মতো সংবিধানকে পরিবর্তন করে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানতে পারে।
[ii] সংবিধানের মর্যাদা ও পবিত্রতা ব্যাহত হয়: সংবিধান দেশের মৌলিক আইন হিসেবে বিশেষ মর্যাদা ও পবিত্রতার অধিকারী। দেশের মৌলিক আইন হিসেবে জনগণ সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। কিন্তু সংবিধান নমনীয় হলে তা এত সহজে পরিবর্তন করা যায় বলে বারবার সংশোধিত হয়। এর ফলে সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা ও পবিত্রতা ব্যাহত হয় এবং সংবিধানের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা ও আস্থা হ্রাস পায়।
[iii] যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সহায়ক নয়: যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়। সংবিধান অতিসহজে পরিবর্তন করার সুযোগ থাকলে কেন্দ্র রাজ্যের ওপর হস্তক্ষেপ করবে। তাতে রাজ্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে।
[iv] মৌলিক অধিকার ও সংখ্যালঘুদের স্বার্থউপেক্ষিত: সংবিধান পরিবর্তন অতি সহজসাধ্য হওয়ায় ক্ষমতাসীন দল ইচ্ছামতো নিজেদের স্বার্থে যে-কোনো সময় তা পরিবর্তন করতে পারে। ফলে জনগণের মৌলিক অধিকার ও সংখ্যালঘুদের স্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে।
[v] দুর্বল বিচার বিভাগ: এই সংবিধান বিচার বিভাগকে দুর্বল করে দেয়। কারণ, আইনের ইচ্ছামতো পরিবর্তনে আদালত অসহায় হয়ে পড়ে।
[vi] বৃহত্তর স্বার্থের বিরোধী: সুপরিবর্তনীয় শাসনব্যবস্থা নমনীয় হওয়ায় শাসকগোষ্ঠী প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ ও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে কাজ করে। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বৃহত্তর স্বার্থের বিরোধী হয়। নাগরিক সুবিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
মূল্যায়ন: পরিশেষে বলা যায়, একটি সংবিধান ভালো কী মন্দ, সংবিধানটি সুপরিবর্তনীয় না দুষ্পরিবর্তনীয় তার ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে সংবিধানের প্রকৃতি, চরিত্র এবং যে-আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সংবিধানটি রচনা করা হয়েছে তার ওপর। সংবিধান রক্ষার ভার যাদের হাতে থাকে, তারাই তাদের স্বার্থে সংবিধান ব্যাখ্যা করে থাকে। সেখানে সংবিধান সুপরিবর্তনীয় না দুষ্পরিবর্তনীয় তা কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন