ভারতীয় বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো।
প্রতিটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব অসীম। ব্যক্তিস্বাধীনতার সংরক্ষণ, আইনভঙ্গকারীকে শাস্তি দেওয়া, সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা করা ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে বিচার বিভাগ গণতন্ত্রের স্বরূপ বজায় রাখে। তাই বলা হয়, বিচারব্যবস্থা যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয় তবে ন্যায়বিচার পদদলিত হবে এবং ন্যায়বিচারের বাতিটি নিভে গেলে 'গণতন্ত্র' কথাটি তত্ত্বকথায় পরিণত হবে। স্বভাবতই গণতন্ত্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অঙ্গ হিসেবে বিচার বিভাগের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
[i] অখণ্ড বিচারব্যবস্থা: সমগ্র ভারতের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ ও সংহত বিচারব্যবস্থার প্রচলন করা হয়েছে, একে অখণ্ড বিচারব্যবস্থা বলা হয়। এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় এরূপ একটি অখণ্ড বিচারব্যবস্থার প্রচলন থাকতে পারে। কিন্তু ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একটি অখণ্ড বিচারব্যবস্থার প্রচলন অভিনব।
[ii] পিরামিড-আকার বিচারব্যবস্থা: ভারতের বিচারব্যবস্থা পিরামিডতুল্য, যার সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে সুপ্রিমকোর্ট। পরবর্তী স্তরে রাজ্যের হাইকোর্টসমূহ। তার নীচের স্তরে প্রতিটি জেলায় জেলা ও জেলা দায়রা জজের আদালত রয়েছে। তারও নীচে রয়েছে বিচার বিভাগীয় জজ আদালত, মুনসেফ আদালত, নগর আদালত এবং সবচেয়ে নীচের স্তরে রয়েছে পঞ্চায়েত আদালত ও লোক আদালত।
[iii] দুর্বল বিচারব্যবস্থা: ভারতের সুপ্রিমকোর্ট মার্কিন সুপ্রিম- কোর্টের মতো অত শক্তিশালী নয়। ভারতের সুপ্রিমকোর্ট মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের মতো আইনের নীতি ও যৌক্তিকতা বিচার করতে পারে না। অর্থাৎ, ন্যায়নীতি বিরোধী কোনো আইনকে বাতিল করতে পারে না।
[iv] জুরি ব্যবস্থার অনুপস্থিতি: ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য জুরির সাহায্যে বিচারকার্য পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ভারতে জুরির সাহায্যে বিচারব্যবস্থার প্রচলন নেই।
[v] ভ্রাম্যমাণ আদালত নেই: ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত আছে। কিন্তু ভারতে ভ্রাম্যমাণ আদালত নেই।
[vi] মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ: ভারতের বিচার বিভাগের হাতে মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের অধিকার দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট রিটস (Writs) জারির মাধ্যমে মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করলে তার প্রতিবিধান করতে পারে।
[vii] দীর্ঘসূত্রতা: ভারতীয় বিচারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল দীর্ঘসূত্রতা। এখানে মামলার বিচারকার্য দীর্ঘদিন ধরে চলে এবং নিষ্পত্তি হতে বহুসময় লেগে যায়।
[viii] ব্যয়বহুল: ভারতীয় বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য যেমন দীর্ঘ সময় লাগে, ঠিক তেমনি উকিলের পেছনেও বহু টাকা ব্যয় করতে হয়। ফলে অনেক সময় দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণির লোক ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
[ix] সমগ্র ভারতে একই আইন: সমগ্র ভারতে একই দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন প্রচলিত আছে এবং বিচারালয় ওই আইনের সাহায্যেই বিচারকার্য সম্পন্ন করে।
[x] লোক আদালত: ভারতের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল লোক আদালতের অবস্থান। অল্পব্যয়ে ও কম সময়ে নাগরিকদের কাছে ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়াই হল লোক আদালতের প্রধান উদ্দেশ্য।
মূল্যায়ন: পরিশেষে বলা যায়, বিচার বিভাগের ভূমিকা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় লক্ষ করা যায় বিচার বিভাগ নিরপেক্ষতার আড়ালে বিদ্যমান শ্রেণি- সম্পর্ককে বজায় রাখার চেষ্টা করছে; যার ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সে কারণে ভারতের বিচারব্যবস্থার আরও প্রসারণ বাঞ্ছনীয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন