অধিকার এবং কর্তব্য কীভাবে পরস্পর সংযুক্ত, তা দেখাও।
অথবা, "অধিকারের মধ্যেই কর্তব্য নিহিত আছে।” এই উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
[i]অধিকার: অধিকার এবং কর্তব্য হল একই মুদ্রার দুটি দিক। ইংরেজিতে একটি কথা আছে-Rights imply Duties। অর্থাৎ, অধিকার বললেই সঙ্গে সঙ্গে কর্তব্যের কথা ওঠে। একজনের যেমন ধর্মীয় উপাসনার অধিকার আছে, তেমনি অন্যের কর্তব্য হল অন্যকেও ধর্মীয় উপাসনায় বাধা না-দেওয়া। হবহাউস অধিকার ও কর্তব্যের সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে বলেছেন: আমার যেমন অধিকার • আছে রাস্তা দিয়ে হাঁটার; তেমনি তোমার কর্তব্য হল আমাকে রাস্তায় হাঁটতে বাধা না-দেওয়া। দেখা যাচ্ছে যে, একজনের অধিকার ভোগ অন্যের কর্তব্য পালনের ওপরে নির্ভর করে।
[ii] আইনগত কর্তব্যের সঙ্গে আইনগত অধিকারও জড়িত: প্রত্যেক নাগরিকেরই আইনগত অধিকার আছে রাস্তা দিয়ে স্বাধীনভাবে চলাচল করার। কিন্তু এই অধিকার নিশ্চিত হতে পারে অন্যান্য নাগরিকের আইনগত কর্তব্যপালনের দ্বারা।
স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করা ব্যক্তির আইনগত অধিকারের মধ্যে পড়ে। অন্যের আইনসংগত কর্তব্য হল ওই অধিকারে বাধা না-দেওয়া। কিন্তু কেউ যদি অন্য একজনের স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা দান করে, তাহলে ওই ব্যক্তির মত প্রকাশের অধিকার বজায় থাকতে পারে না। কোনো নাগরিক যদি কর্তব্যে অবহেলা করে, আইন না-মেনে চলে, কর না-দেয়-তবে সেই নাগরিকের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের থাকতে পারে না।
[iii] নৈতিক অধিকার ও নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক: কেবলমাত্র আইনসম্মত অধিকারের ক্ষেত্রে নয়, নৈতিক অধিকার ও নৈতিক কর্তব্য উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেমন-পিতা-মাতার নৈতিক কর্তব্য হল তার সন্তানকে যথাযথভাবে লালনপালন, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দ্বারা তাকে মানুষ করে তোলা। তেমনি পিতা- মাতার নৈতিক অধিকার আছে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছ থেকে আদরযত্ন, সেবা-শুশ্রুষা ও ভরণ-পোষণ পাওয়ার। পিতা-মাতা তাদের নৈতিক কর্তব্যপালন না-করে নৈতিক অধিকার দাবি করতে পারে না।
[iv] রাজনৈতিক অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক: নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রের যেমন কতকগুলি অধিকার আছে, রাষ্ট্রকেও তেমনি নাগরিকদের প্রতি কতকগুলি কর্তব্যপালন করতে হয়। নাগরিকের আনুগত্য ও সহযোগিতা রাষ্ট্র দাবি করতে পারে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রও নাগরিকের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি সুনিশ্চিত করার জন্য কর্তব্যপালন করবে। সমাজ নাগরিকদের স্বাধীন মত প্রকাশ, সম্পত্তি ভোগ, সংঘবদ্ধ হওয়া, পরিবার গঠন ইত্যাদি অধিকার দেয়। তেমনি নাগরিকদেরও সমাজের প্রতি কতকগুলি কর্তব্য রয়েছে। যেমন, সময়মত কর দেওয়া, রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলা, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দেখানো ইত্যাদি।
[V] অধিকার কর্তব্যের দ্বারা সীমাবদ্ধ: অধিকার অবাধ হতে পারে না। কারণ, অধিকার অবাধ হলে শক্তিমানেরাই যাবতীয় ক্ষমতা ভোগ করবে। দুর্বলের কোনো অধিকার থাকবে না। তাই দুর্বলরা যাতে অধিকার ভোগ করতে পারে তার জন্য সবলদের কিছু কর্তব্যবোধের দ্বারা গণ্ডিবদ্ধ করা দরকার।
[vi] সমাজের দিক থেকে সম্পর্ক: কেবলমাত্র স্বার্থসাধনের জন্য নাগরিক তার অধিকার ব্যবহার করবে না। তার অধিকার যাতে সামাজিক কল্যাণের বিরুদ্ধে না-যায়, তা-ও নাগরিকদের লক্ষ করা উচিত। কোনো ব্যক্তির অধিকার আছে-তার বাড়ির সামনে তার জায়গায় আবর্জনা ফেলার। কিন্তু ওই অধিকার প্রয়োগ করার ফলে যদি তার প্রতিবেশীর ক্ষতি হয় তবে তা সমাজকল্যাণের বিরোধী। এরূপ অধিকার প্রয়োগের ফলে সমাজের প্রতি আমার যে-কর্তব্য তা লঙ্ঘিত হয়।
মূল্যায়ন: উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, অধিকার এবং কর্তব্য উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। সেজন্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি তাদের লিখিত সংবিধানে অধিকারের পাশাপাশি কর্তব্যেরও উল্লেখ করেছে। ভারতের মূল সংবিধানে কর্তব্যের উল্লেখ না-থাকলেও 1976 খ্রিস্টাব্দের 42-তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দশটি কর্তব্য সংযোজিত করা হয়েছিল। বর্তমানে 2002 খ্রিস্টাব্দে 86-তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আরও একটি কর্তব্য সংযোজন করা হয়েছে। বর্তমানে মৌলিক কর্তব্যের সংখ্যা এগারো।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন