ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলির বৈশিষ্ট্য- সমূহ আলোচনা করো।
অধিকার বলতে সমাজজীবনের এমন সব শর্তাবলিকে বোঝায় যেগুলির অভাবে কোনো মানুষের পক্ষেই তার অন্তর্নিহিত গুণাবলি বিকশিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু সব অধিকার মৌলিক নয়। মৌলিক অধিকার হল সেইসব অধিকার, যেগুলি মানুষের মৌল প্রয়োজন পূরণ করে। একারণেই ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে 12 থেকে 35 নম্বর ধারায় নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত মৌলিক অধিকার-গুলির বৈশিষ্ট্যসমূহকে এইভাবে বর্ণনা করা যায়-
[i] অধিকারগুলি মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক: ভারতীয় সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারগুলির প্রথম বৈশিষ্ট্য হল অধিকারগুলির চরিত্রগত দিক থেকে মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর কোনো গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি।
[ii] অধিকারগুলি অবাধ নয়: ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত নয়। সামাজিক শৃঙ্খলা, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি, বিদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা, জনস্বার্থ ইত্যাদি কারণে মৌলিক অধিকারের ওপর বাধানিষেধ আরোপ করা যায়।
[iii] অধিকারগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য: সংবিধানের 32 ও 226 নং ধারা অনুসারে ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য।
[iv] জরুরি অবস্থায় কার্যকর হয় না: দেশে জরুরি অবস্থা জারি হলে নাগরিকগণ মৌলিক অধিকার ভোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
[v] সকল মৌলিক অধিকার সকলের জন্য নয়: ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত মৌলিক অধিকারের কতকগুলি কেবলমাত্র ভারতীয় নাগরিকরাই ভোগ করতে পারে। যেমন-মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, চাকুরির ক্ষেত্রে সমানাধিকার ইত্যাদি। আবার কতকগুলি মৌলিক অধিকার আছে যেগুলি নাগরিক ও অনাগরিক নির্বিশেষে সকলেই ভোগ করতে পারে, যেমন-আইনের চোখে সমানাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার প্রভৃতি।
[vi] অধিকারগুলি সংশোধনযোগ্য: ভারতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি সংশোধনযোগ্য, অলঙ্ঘনীয় নয়।
[vii] ধর্মনিরপেক্ষতা: ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার- গুলি অসাম্প্রদায়িক। স্বীকৃত অধিকারসমূহের মাধ্যমে কোনো বিশেষ ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অনুকূলে বৈষম্যমূলক আচরণের ব্যবস্থা করা হয়নি।
[viii] সংখ্যালঘু ও অনুন্নত সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা: ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক অধিকারের অধ্যায়ে সংখ্যালঘু ও অনুন্নত শ্রেণির জন্য বিশেষ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। তপশিলি জাতি, উপজাতি, অন্যান্য অনুন্নত সম্প্রদায় ও ইঙ্গ-ভারতীয় সম্প্রদায়ের জন্য এই সুযোগ প্রসারিত করা হয়েছে।
[ix] ইতিবাচক ও নেতিবাচক: ভারতীয় সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারগুলিকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক- এই দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। ইতিবাচক অধিকার বলতে সেই অধিকারগুলিকে বোঝায় যেগুলির মাধ্যমে জনগণকে কিছু সুযোগসুবিধা দেওয়া হয়েছে।
মূল্যায়ন: উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলা যায় যে, ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারসমূহের প্রকৃতি মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক অধিকারের কোনো স্বীকৃতি নেই। অর্থনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি ছাড়া অধিকারের ধারণা সম্পূর্ণ হতে পারে না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন