ভারতীয় সংবিধানে স্বাধীনতার অধিকারটি আলোচনা করো।
ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশে উল্লিখিত 12 থেকে 35নং ধারায় মৌলিক অধিকারগুলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। উল্লিখিত মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে 19 থেকে 22নং ধারায় স্বাধীনতার অধিকারটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
[i] 19নং ধারা: মূল সংবিধানের 19নং ধারায় সাত প্রকার স্বাধীনতার উল্লেখ ছিল। পরবর্তীকালে 1978 খ্রিস্টাব্দে 44 তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সম্পত্তি অর্জন, দখল ও হস্তান্তরের স্বাধীনতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে 19নং ধারায় ছ-প্রকার স্বাধীনতা রয়েছে। সেগুলি হল-
[a] বাক্ স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা [19(1)(a)],
[b] শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্রভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার [19(1)(b)],
[c] সংগঠন ও সমিতি গঠনের স্বাধীনতা [19(1)(c)],
[d] ভারতের সর্বত্র স্বাধীনভাবে যাতায়াতের স্বাধীনতা [19(1)(d)],
[e] বসবাসের স্বাধীনতা [19(1)(e)],
[f] বৃত্তি ও পেশার স্বাধীনতা [19(1)(f)]।
ব্যতিক্রম: সংবিধানের 19নং ধারায় বর্ণিত অধিকার- গুলির ওপর রাষ্ট্র যুক্তিসংগত বাধানিষেধ আরোপ করতে পারে। যেমন-ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা, জনশৃঙ্খলা, মানহানি, আদালত অবমাননা, নৈতিকতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে।
[ii] দোষী সাব্যস্ত করা ও শাস্তিদানের ব্যবস্থাদি: সংবিধানের 20নং ধারা অনুযায়ী আইনভঙ্গের অপরাধে দোষী ব্যক্তিকে অপরাধকালীন সময়ের আইন অনুসারে শাস্তি প্রদান করতে হবে। 20 (b) ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে একই অপরাধের জন্য একাধিকবার অভিযুক্ত করা এবং শাস্তি দেওয়া যাবে না। 20(c) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অপরাধীকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে বাধ্য করা যাবে না।
[iii] জীবন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও শিক্ষার অধিকার: সংবিধানের 21 নং ধারায় বলা হয়েছে, আইন নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছাড়া কাউকে তার জীবন ও দৈহিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। 2002 খ্রিস্টাব্দের 86-তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে 21(a) নং ধারা সংযোজিত করে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র 6-14 বছর বয়স্ক প্রতিটি শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করবে।
[ iv] গ্রেফতার ও আটক সম্পর্কিত নিয়মাবলি: সংবিধানের 22 নং ধারা অনুযায়ী যুক্তিসংগত কারণ না-দেখিয়ে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যাবে না। গ্রেফতার করার পর 24 ঘণ্টার মধ্যে নিকটবর্তী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থিত করতে হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, নিবর্তনমূলক আটক আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে উপরিউক্ত এই নিয়ম কার্যকরী হয় না। নিবর্তনমূলক আটক আইনগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- MISA, NSA, TADA, ESMA প্রভৃতি।
মূল্যায়ন: দুর্গাদাস বসু স্বাধীনতার অধিকারের 19নং ধারাকে সমগ্র মৌলিক অধিকারের নির্যাস বলে উল্লেখ করেছেন। তা সত্ত্বেও সংরক্ষিত স্বাধীনতার অধিকারের মধ্যে কোনো আর্থিক স্বাধীনতা স্থান পায়নি। তাই আমাদের স্বাধীনতা আর্থিক ক্ষেত্রে অপূর্ণ থেকে গিয়েছে। আবার স্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে বিনা বিচারে আটক রাখার আইন কেন সংবিধানে রয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে না।
ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় এই অধিকারকে সার্থক করে তোলার জন্য জনগণের রাজনৈতিক চেতনাবৃদ্ধি, আইনের অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকা একান্ত আবশ্যক।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন