ভারতীয় সংসদ বা পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন পদ্ধতি আলোচনা করো।
অথবা, ভারতীয় পার্লামেন্টে সাধারণ বিল পাসের পদ্ধতি আলোচনা করো।
পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য নতুন নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হয়। আর এই দায়িত্ব পালন করে আইনসভা। আইন প্রণয়নের খসড়া প্রস্তাবকে বিল বলে। সাধারণত দু-ধরনের বিল লক্ষ করা যায়-[a] সরকারি বিল এবং [b] বেসরকারি বিল।
বিলের প্রকারভেদ > সরকারি > বেসরকারি > সাধারণ বিল > অর্থবিল
সরকারি বিলগুলিকে আবার দু-ভাগে ভাগ করা যায়- [a] সাধারণ বিল এবং [b] অর্থবিল। মন্ত্রীগণ যেসব বিল উত্থাপন করেন, সেগুলি হল সরকারি বিল। আর পার্লামেন্টের সাধারণ সদস্যগণ যে সকল বিল উত্থাপন করেন, সেগুলি হল বেসরকারি বিল। সাধারণ বিলকে আইনে পরিণত হতে সাতটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়।
[i] বিল উত্থাপন ও বিলের প্রথম পাঠ: কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাধারণ বিল পার্লামেন্টের যে-কোনো কক্ষে উত্থাপিত হতে পারে। বিলটি উত্থাপনের জন্য সভার অনুমতির প্রয়োজন হয়। এই পর্যায়ে কেবল বিলটির শিরোনাম (Title) পাঠ করা হয়। এই পর্যায়ে বিলের ওপর কোনো আলোচনা বা বিতর্ক হয় না।
[ii] বিলের দ্বিতীয় পাঠ: বিলটি উত্থাপিত হওয়ার পর উত্থাপনকারী ব্যক্তি নিম্নলিখিত চারটি পন্থার যে-কোনো একটি অবলম্বনের জন্য প্রস্তাব রাখতে পারেন:
[a] বিলটি সম্পর্কে কক্ষে সরাসরি আলোচনা হোক, অথবা,
[b] বিলটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হোক, অথবা,
[c] বিলটি উভয় কক্ষের যুক্ত কমিটির কাছে পাঠানো হোক, অথবা,
[d] জনগণের মতামত জানার জন্য বিলটি প্রচার করা হোক। এই পর্যায়ে বিলের অন্তর্নিহিত নীতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা হয়।
[iii] কমিটি পর্যায়: উপরোক্ত চারটি প্রস্তাবের মধ্যে যদি প্রথমটি গৃহীত হয়, সেক্ষেত্রে বিলটি আলাপ-আলোচনার জন্য দিন ধার্য করা হয় এবং আলোচনার সময় বিলটির বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজনে বিলটি সংশোধনও করা হয়। বিলটি যদি সিলেক্ট কমিটিতে বা উভয়কক্ষের যুক্ত কমিটির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে কমিটি বিলের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার- বিশ্লেষণ করে। প্রয়োজন মনে করলে কমিটি বিলের কোনো অংশ সংশোধনের জন্য সুপারিশ করতে পারে। আর বিলটিকে যদি জনগণের মতামত জানার জন্য প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে বিলটিকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় প্রকাশ করে জনগণের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।
[iv] রিপোর্ট পর্যায়: এই পর্যায়ে বিলের প্রতিটি ধারা, উপধারা প্রভৃতি নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলাপ-আলোচনা ও তর্ক- বিতর্ক চলে। বিলের ওপর সংশোধনী প্রস্তাব যে-কোনো সদস্য আনতে পারে। অবশেষে, ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রতিটি ধারা, উপধারা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এইভাবে বিলের দ্বিতীয় পাঠের পরিসমাপ্তি ঘটে।
[v] বিলের তৃতীয় পাঠ: বিলটির ওপর বিস্তৃত আলোচনা, ভোটগ্রহণ শেষ হলে তৃতীয় পাঠের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এই পর্যায়ে বিলটির কোনো ধারা বা উপধারার আলোচনা হয় না, বিলটিকে সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করা বা প্রত্যাখান করার প্রশ্নে আলোচনা ও ভোটাভুটি চলে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য সমর্থন লাভ করলে বিলটি গৃহীত হয়, অন্যথায় বিলটি পরিত্যক্ত হয়।
[vi] অন্য কক্ষের অনুমোদন: পার্লামেন্টের এক কক্ষে বিলটি অনুমোদিত হলে সেটিকে অন্য কক্ষের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। প্রথম কক্ষ যে পদ্ধতিতে বিলটিকে অনুমোদন করেছিল ঠিক সেই পদ্ধতিতে ও পর্যায়ে যদি অপর কক্ষে অনুমোদিত হয়, তবে সেটি উভয়কক্ষে গৃহীত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।
[vii] রাষ্ট্রপতির সম্মতি: পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে অনুমোদিত হওয়ার পর বিলটিকে রাষ্ট্রপতির সম্মতিলাভের জন্য তাঁর কাছে পাঠানো হয়। তাঁর সম্মতি পেলেই বিলটি আইনে পরিণত হয়। আবার রাষ্ট্রপতি কোনো বিলকে পুনর্বিবেচনার জন্য পার্লামেন্টে ফেরত পাঠাতে পারেন। তবে বিলটি দ্বিতীয়বার উভয়কক্ষ থেকে গৃহীত হলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দিতে বাধ্য।
মূল্যায়ন: আমাদের পার্লামেন্টে বিল পাসের পদ্ধতি ব্রিটেনের অনুকরণে গৃহীত হয়েছে। তবে ব্রিটেনে বিল পাসের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ যতখানি দুর্বল, আমাদের উচ্চকক্ষ ততটা দুর্বল নয়। কারণ, সাধারণ বিল পাসের ক্ষেত্রে উভয়কক্ষ সমান ক্ষমতা ভোগ করে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন