ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত সাম্যের অধিকার আলোচনা করো।
মার্কিন, ফরাসি ও আইরিশ সংবিধানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সংবিধান রচয়িতারা ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশে 12 থেকে 35 নং ধারায় নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি লিপিবদ্ধ করেছেন। বর্তমানে মৌলিক অধিকারের সংখ্যা 6টি। তাদের মধ্যে অন্যতম হল সাম্যের অধিকার (14-18নং ধারা)।
সাম্যের অর্থ: সাম্য বলতে বোঝায় ধনী-নির্ধন, স্ত্রী-পুরুষ, জাতিবর্ণধর্মনির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষকে তার আত্মবিকাশের সমান সুযোগসুবিধা প্রদান।
শ্রেণিবিভাগ: ভারতের সংবিধানে 14নং থেকে 18নং- এই পাঁচটি ধারায় সাম্যের অধিকারকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
[i] আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও আইন কর্তৃক সমভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার: ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত সাম্যের অধিকারের প্রাণ হল 14নং ধারা। এই ধারায় বলা হয়েছে-ভারতের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিকে-প্রথমত, Equality before the law, অর্থাৎ, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং দ্বিতীয়ত, Equal protection of the laws, অর্থাৎ, আইনের দ্বারা সমানভাবে রক্ষিত হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না।
ব্যতিক্রম: এই ধারার কিছু ব্যতিক্রম আছে। সেগুলি হল:
[a] রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপাল তাদের কাজের জন্য আদালতের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।
[b] স্বপদে থাকাকালীন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায় না ইত্যাদি।
[ii] জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে সমানাধিকার: 15নং ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র কোনো মতেই ধর্ম, বর্ণ, জাতি, জন্মস্থান, স্ত্রীপুরুষ ভেদে নাগরিকদের প্রতি কোনোরূপ বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না।
উপরোক্ত কারণগুলির জন্য দোকান, হোটেল, স্নানাগার, জলাশয় প্রভৃতি ব্যবহার থেকে কোনো নাগরিককে বঞ্চিত করা যাবে না।
ব্যতিক্রম
[a] জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে রাষ্ট্র উপরোক্ত স্থানগুলিতে ছোঁয়াচে রোগীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে পারে।
[b] আবার তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য রাষ্ট্র বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
[iii] সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে সমানাধিকার: 16নং ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে সকল নাগরিকের সমান সুযোগসুবিধা থাকবে। জাতি-ধর্মবর্ণ, স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে সকলেই যোগ্যতা অনুসারে সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হতে পারবে। এই নিয়ম বেতন, পদোন্নতি ও পেনশন প্রভৃতি ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে।
ব্যতিক্রম
[a] ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে ওই ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত হতে পারে।
[b] রাষ্ট্র অনুন্নত শ্রেণির নাগরিকদের জন্য চাকরির ক্ষেত্রে পদ সংরক্ষণ করতে পারে।
[iv] অস্পৃশ্যতা বর্জন: গান্ধিবাদের আদর্শকে গ্রহণ করে সাম্যের অধিকারে 17নং ধারাটি সংযোজিত হয়েছে। উক্ত ধারায় যে-কোনো ধরনের অস্পৃশ্যতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অস্পৃশ্য বলে কাউকে সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করা বা অসম্মান করা হলে আইনত শাস্তি পেতে হবে। এই নির্দেশ কার্যকর করার জন্য ভারতীয় সংসদে 1955 খ্রিস্টাব্দে 'অস্পৃশ্যতা (অপরাধ)' আইন প্রণীত হয়। তবে এটি দন্ডনীয় অপরাধ হলেও ভারতীয় সমাজ এখনও এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার প্রভৃতি রাজ্যে এখনও অস্পৃশ্যতামূলক আচরণ লক্ষ করা যায়।

[v] উপাধিগ্রহণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ: সংবিধানের 18নং ধারায় বলা হয়েছে-শিক্ষাগত যোগ্যতা বা সামরিক গুণের পরিচায়ক নন এমন কোনো খেতাব রাষ্ট্র অর্পণ করতে পারবে না। উল্লেখযোগ্য যে, ভারত সরকার ভারতরত্ন, পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী প্রভৃতি পদবিতে নাগরিকদের ভূষিত করে। এগুলি খেতাব হিসেবে বিবেচিত হবে না; এগুলিকে সম্মান বা পুরস্কার হিসেবেই দেখতে হবে।
মূল্যায়ন: গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতীয় সংবিধানে সাম্যের অধিকারের ঘোষণা এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে ভারতীয় সংবিধানে সাম্যের অধিকারের প্রকৃতি মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক; কিন্তু অর্থনৈতিক সাম্য ছাড়া রাজনৈতিক সাম্য কার্যকর হয় না। তবুও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভিত্তি রচনায় ভারতীয় সংবিধানে সাম্যের অধিকার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন