ভারতীয় পার্লামেন্টে বা সংসদে অর্থবিল পাসের পদ্ধতি আলোচনা করো।
আইনসভার মুখ্য কাজ হল আইনপ্রণয়ন করা। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধানের জন্য আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হয়। আইন প্রণয়নের খসড়া প্রস্তাবকে 'বিল' বলা হয়।
বিল সাধারণত দু-ধরনের হয়-সাধারণ বিল ও অর্থবিল। সংবিধানের 110নং ধারা অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিষয়গুলির মধ্যে যে-কোনো একটি বা একাধিক বিষয়ের উল্লেখ কোনো বিলে থাকলে, তাকে অর্থবিল বলে। বিষয়গুলি হল: [I] কোনো কর ধার্য, বিলোপ, পরিহার, পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণ।
[ii] ভারতের সঞ্চিত তহবিল (Consolidated Fund) বা আকস্মিক ব্যয় তহবিল (Contingency Fund) থেকে অর্থগ্রহণ বা প্রদান।
[iii] সঞ্চিত তহবিল থেকে অর্থ বিনিয়োগ ইত্যাদি।
আইনে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য অর্থবিলকে কয়েকটি পর্যায় বা স্তর অতিক্রম করতে হয়। যেমন-
[i] বিল উত্থাপন ও বিলের প্রথম পাঠ: অর্থবিল কেবলমাত্র লোকসভাতেই উত্থাপিত হতে পারে। অর্থবিল উত্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশ প্রয়োজন। অর্থবিল সরকারি বিল হওয়ায় কেবলমাত্র মন্ত্রীরাই এই বিল উত্থাপন করেন। বিল উত্থাপনের পর কেবল বিলটির শিরোনাম পাঠ করা হয়। তবে উত্থাপক ইচ্ছে করলে বিলটির উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু কথা বলতে পারেন। নিয়মানুযায়ী উত্থাপনের পর বিলটিকে সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়।
[ii] বিলের দ্বিতীয় পাঠ: বিল উত্থাপনের পর উত্থাপক প্রস্তাব করতে পারেন যে, কক্ষ বিলটির বিচারবিবেচনা করুক; বা বিলটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হোক; বা বিল সম্পর্কে জনমত যাচাইয়ের জন্য বিলটিকে প্রচার করা হোক। উত্থাপকের উপরোক্ত প্রস্তাবগুলির ওপর সংশোধনী প্রস্তাব আনা যায়। এই পর্যায়ে বিলটির নীতি ও বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু বিলটি নিয়ে কোনো খুঁটিনাটি আলোচনা হয় না। ওপরের তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে যদি প্রথমটি সভায় গৃহীত হয়, তাহলে বিলটি নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি গৃহীত হলে বিলটি বিচারবিবেচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। তৃতীয় প্রস্তাবটি গৃহীত হলে বিলটিকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় প্রকাশ ও জনমত গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।
[iii] কমিটি পর্যায়: বিলটিকে সিলেক্ট কমিটির কাছে পাঠানোর প্রস্তাব গৃহীত হলে উত্থাপক কক্ষ থেকে কমিটির সদস্যদের নাম প্রস্তাব করেন এবং কক্ষ তা সাধারণত মেনে নেয়। কমিটি পর্যায়ে বিলটির বিভিন্ন ধারা-উপধারা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা হয়। তবে বিলটির মূলনীতি ও উদ্দেশ্যের কোনো পরিবর্তন করা যায় না।
[iv] রিপোর্ট পর্যায়: এইভাবে বিলটির বিচারবিবেচনার পর কমিটি তার রিপোর্ট রচনা করে এবং কমিটির চেয়ারম্যান ওই রিপোর্টকে সংশ্লিষ্ট কক্ষের নিকট পেশ করেন। তখন বিলটির উত্থাপক প্রস্তাব পেশ করতে পারেন: কমিটি কর্তৃক প্রেরিত বিলের বিচারবিবেচনা করা হোক; বা বিলটিকে পুনরায় সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হোক; বা জনসাধারণের মতামত জানার জন্য বিলটিকে প্রচার করা হোক। কমিটির রিপোর্ট বিচারবিবেচনার জন্য প্রস্তাব গৃহীত হলে বিলের বিভিন্ন ধারা-উপধারা সম্পর্কে আলোচনা চলে। এই পর্যায়ে সংশোধনী প্রস্তাব আনা যায়। তবে সংশোধনী প্রস্তাব আনার জন্য অন্তত 1 দিন আগে নোটিশ দিতে হয়। এইভাবে আলাপ-আলোচনা ও ভোটগ্রহণের মাধ্যমে বিলের দ্বিতীয় পাঠ শেষ হয়।
[v] বিলের তৃতীয় পাঠ: এই পর্যায়ে বিলটির কোনো খুঁটিনাটি আলোচনা হয় না এবং কোনো সংশোধনী প্রস্তাবও উত্থাপন করা যায় না। এই পর্যায়ে উত্থাপক প্রস্তাব করেন যে, বিলটিকে পাস করা হোক। বিলটি যদি সভায় সংখ্যাধিক্যে অনুমোদিত হয়, তাহলে বিলটি সংশ্লিষ্ট কক্ষে পাস হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।
[vi] বিলের শেষ পর্যায়: অর্থবিল লোকসভায় গৃহীত হওয়ার পর স্পিকারের সার্টিফিকেটসহ বিলটিকে রাজ্যসভায় পাঠানো হয়। রাজ্যসভা অর্থবিল নিয়ে আলোচনা করতে পারে; কিন্তু বিলের কোনো অংশকে সংশোধন করতে পারে না। বিলটি পাওয়ার পর রাজ্যসভা 14 দিনের মধ্যে বিলটি ফেরত না-পাঠালে রাজ্যসভায় বিলটি অনুমোদিত হয়েছে ধরে নিয়ে বিলটিকে রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেয়ে বিলটি আইনে পরিণত হয়।
মূল্যায়ন: উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, অর্থবিলের ক্ষেত্রে লোকসভা ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। রাজ্যসভা এমনকি রাষ্ট্রপতিও লোকসভার সিদ্ধান্তকে নাকচ করতে পারে না। লোকসভার ওই ধরনের ক্ষমতা অন্য কোথাও নেই। লোকসভাকে এই ক্ষমতা দেওয়ার কারণ হল-'লোকসভা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভা'।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন