ভূমিকা
ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশ (Part-III)-এ 12-35নং ধারার মধ্যে মৌলিক অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু মৌলিক অধিকার বলতে কী বোঝায় তা এককথায় বলা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সাধারণত নাগরিকদের অধিকারগুলির মধ্যে যেগুলি ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে একান্ত প্রয়োজন বলে বিবেচিত হয়, সেগুলিকে মৌলিক অধিকার বলা হয়। এ ছাড়াও শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের কর্তৃত্বের বাইরে এইসব অধিকারগুলি রয়েছে বলে এগুলিকে মৌলিক অধিকার বলা হয়।
মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অন্যান্য অধিকারের। পার্থক্যসমূহ
মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অন্যান্য অধিকারের পার্থক্যগুলি হল নিম্নরূপ-
*[1] দেশের সাধারণ আইন নাগরিকদের সাধারণ আইনগত অধিকারগুলিকে সংরক্ষণ করে, কিন্তু মৌলিক অধিকারগুলি রাষ্ট্রের সংবিধানের দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়।
[II] মৌলিক অধিকার সংবিধানের দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয় বলে আইন বিভাগ দ্বারা প্রণীত কোনো আইন ও শাসন বিভাগের কোনো আদেশ, নির্দেশ এগুলির বিরোধী হলে আদালত সেগুলিকে বাতিল করে দিতে পারে। কিন্তু সাধারণ অধিকারের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয়।
[III] মৌলিক অধিকারগুলির পরিবর্তন করতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন। কিন্তু সংবিধান সংশোধন ছাড়াই পার্লামেন্ট সাধারণ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সাধারণ অধিকারগুলির পরিবর্তন করতে পারে।
[iv] মৌলিক অধিকারগুলি আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য। কিন্তু সাধারণ অধিকারগুলি আদালতের দ্বারা বলবৎযোগ্য নয়।
অধিকারের গুরুত্ব
অধিকার হল যথাসম্ভব সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযোগী সর্বাধিক পরিমাণ বাহ্যিক সুযোগ-সুবিধা যেগুলি রাষ্ট্রকর্তৃক অনুমোদিত ও সংরক্ষিত হয়। অন্যভাবে বলা যায়, অধিকার হল ব্যক্তিত্বের সার্বিক বিকাশের জন্য সমাজজীবনে অপরিহার্য সেই সকল সুযোগ সুবিধা যা সমাজ কল্যাণের শর্ত হিসেবে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং সংরক্ষিত হয়। তাই বলা যায় মৌলিক অধিকারের গুরুত্ব অপরিসীম। যে রাষ্ট্রে জনগণের অধিকার স্বীকৃত হয়নি, সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকতে পারে না। গণতন্ত্রে অধিকার একান্ত প্রয়োজনীয়। অধিকারহীন জনগণ পশুর ন্যায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। এরূপ অবস্থায় ধনীরা গরীবদের লাগামহীন শোষণ করে। পাঠ্যপুস্তক অনুযায়ী আমরা মাচাল লালুঙ-এর কথা এখানে উল্লেখ করতে পারি। মাচাল এক ফৌজদারি কেসে অভিযুক্ত হন এবং 54 বছর তিনি বিচারাধীন বন্দি ছিলেন। অথচ ঠিকমতো দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা থাকলে তাকে এতদিন জেলে বন্দি অবস্থায় থাকতে হত না। তাই দেখা যায় অধিকারের গুরুত্ব যেমন রয়েছে তেমনি সেইগুলিকে বাস্তবে কার্যকরী করতে হবে। নইলে তা কাগজে কলমেই থেকে যাবে। জনগণের কোনো উপকারে আসবে না।
অধিকার সংক্রান্ত আইন
গণতন্ত্রে জনগণের কতগুলি সুনির্দিষ্ট অধিকার থাকা আবশ্যিক এবং সরকার সবসময় সে সকল অধিকারগুলিকে মান্যতা দিতে বাধ্য। একারণে পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই নাগরিকদের অধিকারের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা সংবিধানে সুরক্ষিত থাকে। এই অধিকারগুলি যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় তা দেখার বা ক্ষুণ্ণ হলে তার বিচারের দায়িত্ব স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারালয়ের ওপর ন্যস্ত করা থাকে। সুতরাং, বলা যায় অধিকার সংক্রান্ত আইন হল একধরনের নিশ্চয়তা প্রদান, যা আমরা পেয়ে থাকি।
ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক অধিকার)
ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশে 12-35নং ধারায় ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলিকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। মূল সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলিকে সাতটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। কিন্তু 1978 খ্রিস্টাব্দে 44তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকারের অংশ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় নাগরিকরা ছয়টি মৌলিক অধিকার ভোগ করেন।
সাম্যের অধিকার
ভারতীয় সংবিধানের 14-18নং ধারায় সাম্যের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। সংবিধানের 14নং ধারায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিকে 'আইনের দৃষ্টিতে সমতা' (Equality before the Law) ও 'আইনের দ্বারা সমভাবে রক্ষিত' (Equal protection of law) হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না। 'আইনের দৃষ্টিতে সমতার' অর্থ হল আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আবার 14নং ধারার দ্বিতীয় অংশে বর্ণিত আইনের দ্বারা সমানভাবে রক্ষিত হওয়া বলতে বোঝায়-সমান অবস্থায় সমপর্যায়ভুক্ত সব ব্যক্তির প্রতি আইন সমান দৃষ্টিতে দেখবে।
সংবিধানের 15 নং ধারায় বলা হয়েছে যে, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, স্ত্রী-পুরুষ, জন্মস্থান ইত্যাদি কারণে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না।
16 নং ধারানুযায়ী সরকারি চাকুরি বা পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান সুযোগসুবিধা থাকবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ স্ত্রী- পুরুষ বংশ, জন্মস্থান ইত্যাদি কোনো কারণে কোনো নাগরিককে অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে না।
17 নং ধারানুযায়ী, অস্পৃশ্য বলে কোনো ভারতীয় নাগরিককে কোনো সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করা বা অসম্মান করা হলে আইনত শাস্তি পেতে হয়। এর জন্য 1955 খ্রিস্টাব্দে অস্পৃশ্যতা (অপরাধ) আইন প্রণীত হয়।
18 নং ধারানুযায়ী নাগরিকদের মধ্যে সাম্যনীতির সঠিক বাস্তবায়নের জন্য যে-কোনোরূপ উপাধি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধুমাত্র সামরিক ও শিক্ষাগত উপাধি ছাড়া রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিকে অন্য কোনো উপাধি প্রদান করবে না।
স্বাধীনতার অধিকার
স্বাধীনতার অধিকার একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। সংবিধানের 19-22 নং ধারায় স্বাধীনতার অধিকারটি স্বীকৃতিলাভ করেছে। সংবিধানের 19নং ধারায় ভারতীয় নাগরিকদের ছয়টি স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হয়েছে। এগুলি হল [a] বাক্ স্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের অধিকার,
[৮] শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্রভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার,
[c] সংঘ ও সমিতি গঠনের অধিকার,
[d] ভারতের সর্বত্র যাতায়াত করার অধিকার,
[e] ভারতের যে-কোনো অঞ্চলে স্বাধীনভাবে বসবাস করার অধিকার এবং
[f] যে-কোনো বৃত্তি, পেশা বা ব্যাবসাবাণিজ্য করার অধিকার।
সংবিধানের 20(1) নং ধারানুসারে, আইনভঙ্গের অপরাধে কোনো ব্যক্তিকে শুধুমাত্র প্রচলিত আইন অনুসারে শাস্তি প্রদান করতে হবে।
20(2) নং ধারানুসারে, কোনো ব্যক্তিকে একই অপরাধের জন্য একাধিকবার শাস্তি দেওয়া যাবে না।
20(3) নং ধারানুসারে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না।
সংবিধানের 21 নং ধারানুসারে 'আইন নির্দিষ্ট পদ্ধতি' (Procedure Established by Law) ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। 2002 খ্রিস্টাব্দে 86তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে 21(a) নং ধারাটি যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা দান করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র 6-14 বছর বয়স্ক প্রতিটি শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করবে।
সংবিধানের 22 নং ধারানুসারে, যুক্তিসংগত কারণ না দেখিয়ে কোনো ব্যক্তিকে আটক করা যাবে না। আটক ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। আটক করার - 24 ঘণ্টার মধ্যে নিকটবর্তী আদালতে হাজির করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া কোনোভাবেই অতিরিক্ত সময় আটক করে রাখা যাবে না।
শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার
শোষণ, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু। সংবিধানের 23- 24নং ধারায় নাগরিকদের শোষণের বিরুদ্ধে অধিকারটি স্বীকৃতি লাভ করেছে। সংবিধানের 23 নং ধারায় মানুষ নিয়ে ব্যাবসা অর্থাৎ, মানুষ ক্রয়বিক্রয়, বেগার পরিশ্রম করানো সহ বলপূর্বক শ্রমদানে বাধ্য করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 24 নং ধারানুসারে, 14 বছরের কম বয়স্ক শিশুদের খনি, কারখানা ও অন্য কোনো বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার
ভারতীয় সংবিধানের 25-28 নং ধারায় জনগণের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃতি লাভ করেছে। 25 নং ধারানুসারে, প্রতিটি ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্মস্বীকার, ধর্মপালন ও ধর্মপ্রচারের স্বাধীনতা রয়েছে। ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সংবিধান কতকগুলি অধিকার প্রদান করেছে। 26নং ধারানুসারে, প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায় বা তার কোনো অংশ ধর্ম বা দানের উদ্দেশ্যে সংস্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে, নিজ ধর্মবিষয়ক কার্যকলাপ নিজেরাই পরিচালন করতে, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন ও ভোগদখল করতে এবং আইনানুসারে সম্পত্তি পরিচালনা করতে পারবে। 27নং ধারানুসারে, কোনো বিশেষ ধর্ম বা ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রসার বা রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তিকে কর প্রদানে বাধ্য করা যায় না। 28নং ধারায় বলা হয়েছে যে, সম্পূর্ণভাবে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানে ধর্মবিষয়ক শিক্ষাদান করা যাবে না। এ ছাড়াও আংশিক-ভাবে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের বিনা অনুমতিতে ধর্ম শিক্ষাদান বাধ্যতামূলক করা যাবে না।
সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক অধিকার
29 ও 30নং ধারায় সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক অধিকারটিকে স্থান দেওয়া হয়েছে। 29নং ধারানুযায়ী, সবশ্রেণির নাগরিক নিজ নিজ ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার অধিকারী এবং রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার থেকে কোনো ব্যক্তিকে ধর্ম, বংশ, জাতি বা ভাষার অজুহাতে বঞ্চিত করা যাবে না। 30 নং ধারানুসারে ধর্ম বা ভাষা- ভিত্তিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলি নিজেদের পছন্দমতো শিক্ষা- প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করতে পারবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না।
শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকার
ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি রক্ষার জন্য সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার সংবিধানের 32 ও 226নং ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সংবিধানের 32 নং ধারানুযায়ী মৌলিক অধিকারগুলি কার্যকর করার জন্য বন্দিপ্রত্যক্ষীকরণ, পরমাদেশ, প্রতিষেধ, অধিকারপৃচ্ছা এবং উৎপ্রেষণ প্রভৃতি লেখ (Writ), নির্দেশ (Direction) বা আদেশ (Order) জারি করতে পারেন। একইরকমভাবে 226 নং ধারানুসারে অঙ্গরাজ্যগুলির হাইকোর্ট আদেশ, নির্দেশ ও লেখ জারি করতে পারেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
মানবাধিকার ও অন্যান্য অধিকার সবই আমাদের সমাজে একান্ত প্রয়োজন। মানুষ হিসেবে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও জীবন- যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সুযোগ সুবিধাগুলিকেই এককথায় মানবাধিকার ও অধিকার বলা হয়। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধীনে মানবাধিকার সংক্রান্ত কমিশন গঠিত হয় 1946 খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে। এই কমিশন সুদীর্ঘ আড়াই বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, অনেক ঝড় ঝাপটা সামলে মানবাধিকার সম্পর্কিত বিশ্বজনীন ঘোষণার খসড়া প্রস্তুত করে। 1948 খ্রিস্টাব্দের 10 ডিসেম্বর মানবাধিকার সম্পর্কিত বিশ্বজনীন ঘোষণার খসড়াটি গৃহীত হয়। অনুরূপভাবে মানবাধিকার | সুরক্ষার জন্য 1993 খ্রিস্টাব্দে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) গঠিত হয়।
সুপ্রিমকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও একজন বিচারপতি হাইকোর্টের একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং মানবাধিকার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুজন সদস্য নিয়ে মানবাধিকার কমিশন (NHRC) গঠিত হয়।
মানবাধিকার কমিশনে প্রতি বছর প্রচুর অভিযোগ জমা পড়ে। যেমন-বন্দি অবস্থায় মৃত্যু, ধর্ষণ, নিখোঁজ, পুলিশি নির্যাতন, মহিলাদের প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শন ইত্যাদি। আজ পর্যন্ত মানবাধিকার কমিশন বহু মামলায় তদন্ত ও বিচারকার্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।
কমিশনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার করার কোনো ক্ষমতা নেই। কমিশন শুধু তদন্ত করে, তার ওপর ভিত্তি করে রচিত সুপারিশগুলি আদালতে বা সরকারের কাছে ন্যায্য বিচার সম্পন্ন করার জন্য উপস্থিত করতে পারে।
রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি)
ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ অংশে (Part-IV) রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে স্থান দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ অংশের 36-51 নং ধারার মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলি বর্ণনা করা হয়েছে। প্রকৃত জনকল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব নীতিগুলি অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজন এবং সেগুলি যাতে সরকার অনুসরণ করে সেইজন্য প্রদত্ত নির্দেশগুলিকে রাষ্ট্র- পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি বলা হয়। এই নির্দেশমূলক নীতি- গুলিকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়ে থাকে- [a] অর্থনৈতিক, [b] সামাজিক, [c] আইন ও শাসন-ব্যবস্থার সংস্কার বিষয়ক এবং [d] আন্তর্জাতিক নীতির আদর্শ সংক্রান্ত।
ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক কর্তব্যসমূহ
1976 খ্রিস্টাব্দের 42তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ অংশের সঙ্গে 4(a) [(IV)-A] নামক - একটি নতুন অংশ যোগ করা হয়। এই অংশের 51(a) নং ধারায় ভারতীয় নাগরিকদের দশটি মৌলিক কর্তব্য পালনের কথা বলা হয়েছে। এরপর 2002 খ্রিস্টাব্দে 86 তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে 51 (a) নং ধারাটির মধ্যে একটি নতুন মৌলিক কর্তব্য সংযোজন করা হয়। ফলে বর্তমানে ভারতীয় নাগরিকদের পালনীয় মৌলিক কর্তব্যের সংখ্যা দশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে এগারোটি। এই মৌলিক কর্তব্যগুলি সংবিধানের তৃতীয় অংশের পরিবর্তে চতুর্থ অংশে নির্দেশমূলক নীতির সঙ্গে স্থান পেয়েছে, ফলে এগুলি অমান্য করা হলে আদালতে প্রতিকার পাওয়া যায় না।
✔ মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতির সম্পর্ক তর)
ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে নাগরিকের 6টি মৌলিক
অধিকার লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে এই অধিকারগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য। কিন্তু সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত নির্দেশমূলক নীতিগুলির কোনো আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি বলে এগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎ যোগ্য নয়। সেদিক থেকে উভয়েও মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট সম্পর্কও রয়েছে। সংবিধান চালু হওয়ার পর থেকে নির্দেশমূলক নীতি এবং মৌলিক অধিকারের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকারকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হত। কিন্তু 1971 খ্রিস্টাব্দে সংবিধানের 31C ধারায় সংশোধন, 1973 খ্রিস্টাব্দে কেশবানন্দ ভারতী মামলায় সুপ্রিমকোর্টের রায় এবং 1976 খ্রিস্টাব্দে 42- তম সংবিধান সংশোধনী আইনের ফলে নির্দেশমূলক নীতিগুলি মৌলিক অধিকারের চেয়ে অধিক গুরুত্ব লাভ করেছে। অবশ্য পরবর্তীকালে মিনার্ভা মিলস মামলায় নির্দেশমূলক নীতির ও মৌলিক অধিকারের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলা হয়।
সম্পত্তির অধিকার
ভারতের মূল সংবিধানে সম্পত্তির অধিকার একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু 1978 খ্রিস্টাব্দে 44-তম সংবিধান সংশোধনে সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে 300A ধারায় সম্পত্তির অধিকার একটি বিধিবদ্ধ অধিকার হিসেবে স্থান লাভ করেছে। উক্ত ধারায় বলা হয়েছে যে, আইনের নির্দেশ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা চলবে না। অবশ্য জাতীয় স্বার্থে সরকার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে, তবে সরকার ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলে তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন