উচ্চমাধ্যমিক সাজেশন-2023
ইট, পুঁতি ও অস্থিসমূহ (হরপ্পা সভ্যতা)
সঠিক উত্তরটি বাছাই করো। প্রশ্নমান 1
1. নিম্নোক্ত যে-খাদ্যশস্যটি হরপ্পা সভ্যতার সঙ্গে মানানসই নয়, তা হল—
(a) গম
(b) ভুট্টা
(c) বাজরা
(d) জোয়ার
উত্তর: (b) ভুট্টা।
2. সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে বড়ো কেন্দ্র ছিল—
(a) হরপ্পা
(b) মহেন-জো-দারো
(c) কালিবঙ্গান
(d) দামাইবাদ
উত্তর: (b) মহেন-জো-দারো।
3. হরপ্পা সভ্যতায় ধানের চিহ্ন পাওয়া গেছে—
(a) রায়পুর ও রোপার কেন্দ্রে
(b) কালিবঙ্গান ও হরপ্পায়
(c) রংপুর ও লোখালে
(d) মহেন-জো-দারো ও রোজদিতে
উত্তর: (c) রংপুর ও লোথালে।
4. ভারতের প্রথম নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা ছিল—
(a) মেহেরগড় সভ্যতা
(b) সিন্ধু সভ্যতা
(c) কোটদিজি সভ্যতা
(d) হেলমান্দ সভ্যতা
উত্তর: (b) সিন্ধু সভ্যতা।
5. হরপ্পা সভ্যতার মহেন-জো-দারো কেন্দ্রটি আবিষ্কৃত হয়—
(a) 1920 খ্রিস্টাব্দে
(b) 1921 খ্রিস্টাব্দে
(c) 1922 খ্রিস্টাব্দে
(d) 1923 খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: (c) 1922 খ্রিস্টাব্দে।
6. যে প্রত্নকেন্দ্রটিতে কৃত্রিম জলাধারের নমুনা পাওয়া গেছে—
(a) হরপ্পা
(b) রোপার
(c) রোজদি
(d) ধোলাভিরা
উত্তর: (d) ধোলাভিরা।
7. হরপ্পা সভ্যতায় পুঁতির মালা তৈরির কারখানা আবিষ্কৃত হয়েছে—
(a) লোখালে
(b) সোথিসিসওয়ালে
(c) আম্রিনালে
(d) চানহুদারোতে
উত্তর: (d) চানহুদারোতে।
৪. কার্নোলিয়া পাথরটি হল—
(a) সুন্দর রক্তবর্ণের
(b) সুন্দর মুক্তবর্ণের
(c) সুন্দর কাঁচাহলুদ বর্ণের
(d) সুন্দর বাদামি বর্ণের
উত্তর: (a) সুন্দর রক্তবর্ণের।
9. রাজস্থানের ক্ষেত্রি বিখ্যাত ছিল—
(a) তামার জন্য
(b) সোনার জন্য
(c) হিরের জন
(d) লোহার জন্য
উত্তর: (a) তামার জন্য।
10. সিলমোহরগুলিতে খোদাই করা হত—
(a) পুরোহিত রাজার ছবি
(b) লিপি ও প্রতীক চিহ্ন
(c) স্নানাগারের চিত্র
(d) দেবীমূর্তি
উত্তরঃ (b) লিপি ও প্রতীক চিহ্ন।
11. হরপ্পা অধিবাসীরা ব্যাবসাবাণিজ্যে ব্যবহার করত—
(a) পাথরের তৈরি মুদ্রা
(b) তামার মুদ্রা
(c) সিল
(d) সিন্ধম
উত্তর: (c) সিল।
12. সম্ভবত মেসোপটেমিয়ার গ্রন্থে মেলুহাকে বলা হত—
(a) বণিকদের দেশ
(b) কৃষকদের দেশ
(c) নাবিকদের দেশ
(d) জমিদারদের দেশ
উত্তর: (c) নাবিকদের দেশ।
13. হরপ্পায় খননকাজ শুরু করেন—
(a) রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
(b) দয়ারাম সাহানি
(c) ফ্রাঁসোয়া জারিজ
(d) জি এফ ডেইলস্
উত্তর: (b) দয়ারাম সাহানি।
14. পৃথিবীতে নব্য প্রস্তর যুগের সূচনা হয় প্রায়—
(a) 12 হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে
(b) 10 হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে
(c) 7 হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে
(d) 6 হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে
উত্তর: (b) 10 হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
নীচের প্রশ্নগুলি একটি শব্দে / পূর্ণাঙ্গ বাক্যে উত্তর দাও। প্রশ্নমান 1
1. হরপ্পা কোথায় অবস্থিত ?
উত্তর: হরপ্পা পাঞ্জাবের ইরাবতী বা রাভী নদীর উপত্যকার মন্টোগোমারি জেলায় অবস্থিত।
2. লাঙলের পোড়ামাটির প্রতিরূপ কোথায় পাওয়া গেছে ?
উত্তর: চোলিস্থান ও বানাওয়ালিতে লাঙলের পোড়ামাটির প্রতিরূপ পাওয়া গেছে।
3. সিটাডেলে কারা বসবাস করত ?
উত্তর: খুব সম্ভবত সিটাডেলে বসবাস করত শাসক ও উচ্চশ্রেণির মানুষেরা।
4. সিন্ধু সভ্যতায় ব্যবহৃত ইটের পরিমাপের অনুপাত কী ছিল ?
উত্তর: সিন্ধু সভ্যতায় ব্যবহৃত ইটগুলির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার অনুপাত ছিল 4:2:1 ।
5. মহেন-জো-দারোতে আবিষ্কৃত স্নানাগারটির আয়তন কত ?
উত্তরঃ মহেন-জো-দারোতে আবিষ্কৃত স্নানাগারটির আয়তন 180 × 108 বর্গফুট।
6. প্রত্ন-উদ্ভিদতত্ত্ববিদ কাদের বলা হয় ?
উত্তর: যারা প্রাচীন উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ বিশ্লেষণ করার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ, তারা প্রত্ন-উদ্ভিদতত্ত্ববিদ নামে পরিচিত।
7. নাগেশ্বর ও বালাকোট কী ধরনের জিনিসের অন্যতম কেন্দ্র ছিল ?
উত্তর: নাগেশ্বর ও বালাকোট ঝিনুক দ্বারা তৈরি বিভিন্ন বস্তু যেমন চুড়ি, হাতা, রত্নখচিত জিনিস ইত্যাদির অন্যতম কেন্দ্র ছিল।
৪. হরপ্পা সভ্যতার কয়েকটি কেন্দ্রের নাম লেখো।
উত্তরঃ হরপ্পা সভ্যতার কয়েকটি কেন্দ্র ছিল হরপ্পা, মহেন-জো-দারো, কালিবঙ্গান, লোথাল, বানাওয়ালি, রোজদি, রোপার, ধোলাভিরা প্রভৃতি স্থান।
9. চানহুদারো কেন বিখ্যাত ছিল ?
উত্তর: হরপ্পা সভ্যতার একটি ছোটো নগরী ছিল চানহুদারো। এখানে কারিগরি শিল্পোৎপাদন, যেমন—পুঁতি তৈরি, ঝিনুক, কাটা ধাতব শিল্প, সিলমোহর, ওজনের যন্ত্রাদি তৈরি করা হত ।
10. কে মেহেরগড় সংস্কৃতি আবিষ্কার করেন ?
উত্তরঃ মেহেরগড় সংস্কৃতি আবিষ্কার করেন ফ্রাঁসোয়া জারেজ।
11. The Mythical Massacre at Mohenjodaro গ্রন্থটির লেখক কে ?
উত্তর: জি এফ ডেইলস্ হলেন The Mythical Massacre at Mohenjodaro গ্রন্থটির লেখক।
12. ক্যানিংহাম কোন্ দেশের অধিবাসী ছিলেন ?
উত্তর: ক্যানিংহাম ব্রিটেনের অধিবাসী ছিলেন।
13. কোন্ পুরাতত্ত্ববিদ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার ছিলেন ?
উত্তর: পুরাতত্ত্ববিদ মাটিমার হুইলার সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার ছিলেন।
14. পিক্টোগ্রাফ কী ?
উত্তর: হরপ্পা সিলে ব্যবহৃত চিত্রলিপিকে পিক্টোগ্রাফ বলা হয়।
15. টেরাকোটা কী
উত্তর: টেরাকোটা দুটি লাতিন শব্দের একত্রিতকরণের ফলে সৃষ্ট, যার অর্থ Terra (মাটি) + Cotta (পোড়া) অর্থাৎ পোড়া মাটি।
নীচের প্রতিটি প্রশ্ন 120টি শব্দের মধ্যে লেখো। প্রশ্নমান 5
1. হরপ্পা সমাজে শাসকদের সম্ভাব্য কার্যকলাপ বর্ণনা করো।
উত্তর: হরপ্পা সমাজে কোনো শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল কি না, তা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে অনেকেই এই মতের পক্ষে রায় দিয়েছেন এবং তাঁদের সম্ভাব্য কার্যকলাপের একটি রূপরেখা দিয়েছেন, যেমন—
[i] ড. কৌশাম্বী হরপ্পা সমাজে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তির কথা বলেছেন। যার ফলে — সিন্ধু উপত্যকায় কেউ নাগরিকবিধি লঙ্ঘন করতে পারত না, তারা যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণ করতে এবং ডাস্টবিন ছাড়া অন্যত্র আবর্জনা ফেলতে পারত না। এসব উদাহরণ নিশ্চিতভাবে একটি শক্তিশালী পৌর প্রশাসন তথা প্রশাসকের অস্তিত্বের পক্ষে রায় দেয় ।
[ii] সেযুগে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রচলন ছিল। বণিকরা তাদের পণ্যের মান ঠিক রাখতে ও বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন সিল ব্যবহার করত। এসব সম্ভব হত না যদি তখন একটি কেন্দ্রীয় শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর অস্তিত্ব না থাকত ।
[iii] সেযুগে চাষবাস, ব্যাবসাবাণিজ্য, শিল্প প্রভৃতির উন্নতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেক্ষেত্রেও একজন রাজা বা শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছাড়া এসব সম্ভব হত বলে মনে হয় না।
[iv] তাঁরই নেতৃত্বে ও পরিচালনায় নির্মিত হত শস্যাগার, দুর্গ, প্রাসাদ এবং খাল, পুকুর ও স্নানাগার।
উপরিউক্ত যুক্তিগুলিকে সমর্থন করে মাটিমার হুইলার হরপ্পায় প্রাপ্ত একটি পোড়ামাটির মূর্তিকে ‘পুরোহিত রাজা' বলে দাবি করেছেন। যিনি বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও তার আচার সম্পন্ন করতেন। তিনিই ছিলেন প্রভূত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী।
2. হরপ্পাবাসীরা কৃষিকাজে কীরূপ উন্নতির স্বাক্ষর রেখেছিল ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: হরপ্পা সভ্যতার কৃষিকাজ সম্পর্কে বিশদ কিছু জানা যায় না, তবে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভিত্তিতে পণ্ডিতগণ তখনকার কৃষিজীবনের ওপর কিছুটা আলোকপাত করেছেন।
[i] তামা ও ব্রোঞ্জের তৈরি কাস্তে, নিড়ানিজাতীয় অনেক কৃষি সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। যা থেকে অনুমান করা হয়, সিন্ধুবাসীদের একটি অন্যতম জীবিকা ছিল চাষবাস। কালিবঙ্গানে প্রাপ্ত কাঠের লাঙল সেকথাই প্রমাণ করে।
[ii] জমিতে জলসেচ দেওয়ারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারণ সোর্তুগাইতে একটি খাল আবিষ্কৃত হয়েছে। মনে করা হয় কূপের জল তুলে জমিতে সরবরাহ করা হত। এ ছাড়া ধোলাভিরায় একটি জলাধার আবিষ্কৃত হয়েছে, যা চাষের কাজে ব্যবহার করা হত ।
[iii] প্রাপ্ত জাঁতাগুলি দেখে অনুমান করা হয়, সে যুগের মানুষ গম, যব জাতীয় খাদ্যশস্য তাতে পেষাই করত। এর থেকে মনে করা হয় যে, সে যুগে চাষিরা গম, যব জাতীয় দানাশস্যের চাষ করত।
[iv] সে যুগে কার্পাস বা তুলোর চাষ হত। সিন্ধুবাসীরা কার্পাসকে সিন্ধম বলত, যা পশ্চিম এশীয় সভ্যদেশগুলিতে রফতানি করা হত ।
[v] জমি চাষের জন্য কর্ষণ করা হত। কালিবঙ্গানে পুরাতত্ত্ববিদগণ কর্ষিত জমির নিদর্শন পেয়েছেন। এ ছাড়া প্রাপ্ত সিলমোহর ও টেরাকোটা স্থাপত্য দেখে মনে করা হয়, জমি কর্ষণের জন্য হরপ্পাবাসীরা ষাঁড় ব্যবহার করত।
[vi] জমিতে লাঙল ব্যবহারের সঙ্গে এটিও প্রমাণিত হয় যে, দুটি ভিন্ন জাতের শস্য একই জমিতে উৎপন্ন করা হত। কেন-না জমিতে লাঙল দ্বারা পৃথককৃত জমির অংশগুলি পরস্পর সমকোণে অবস্থিত থাকত।
3. সিন্ধুবাসীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে আলোচনা করো ।
উত্তরঃ সিন্ধুবাসীরা যে তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন ছিল তা প্রমাণিত হয় সেখানে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি দেখে। যেমন—
• সিন্ধুবাসীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা :
[i] তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাড়িঘর তৈরি করত। ঘরের ভিতর বায়ু চলাচলের জন্য ঘরের উপরদিকে ঘুলঘুলি রাখা হত।
[ii] সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত কূপ ও স্নানাগারগুলি দেখে মনে হয় সিন্ধুবাসীরা স্নান পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিল। প্রতিটি বাড়ির উঠোনেই পাওয়া গেছে কূপ। কেবলমাত্র মহেন-জো-দারোতেই 700টি কূপ পাওয়া গেছে।
[iii] সেসময় তারা এক উন্নত জলনিকাশি ব্যবস্থা অনুসরণ করত।
[iv] তারা যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলত না। তার প্রমাণ দেয় প্রতিটি বাড়ির সামনে প্রাপ্ত ডাস্টবিনগুলি। [v] আর্নেস্ট ম্যাকে তাঁর লেখায় সোকপিট বা নিষ্কাশন কূপের উল্লেখ করেছেন, যা সিন্ধু সভ্যতার উন্নত পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার সূচক।
[vi] তারা কখনোই নগরনির্মাণ রীতি লঙ্ঘন করত না। রাস্তার দু-ধারে নির্মিত বাড়িঘরগুলিই তার প্রমাণ।
4. সিন্ধু সভ্যতার হস্তকলা শিল্পের সম্বন্ধে আলোচনা করো ।
উত্তর: হস্তকলা শিল্পে সিন্ধুর অধিবাসীরা তাদের শৈলী দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলে। এই হস্তকলা শিল্পের কতকগুলি বৈশিষ্ট্য হল—
[i] দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত সামগ্রীগুলি প্রধানত পাথর বা কাদা দিয়ে তৈরি করা হত। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জাঁতা, মৃৎপাত্র, ছুঁচ এবং চামড়া কাটার বস্তু।
[ii] দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত মৃৎপাত্রগুলি মূলত হরপ্পার সকল প্রত্ননগরেই পাওয়া যায়।
[iii] বিলাসবহুল দ্রব্যসামগ্রীগুলি সর্বত্র পাওয়া যেত না এবং এর ব্যবহারও ছিল সীমিত।
[iv] বিলাসবহুল দ্রব্যসামগ্রীগুলি জটিল কারিগরি প্রযুক্তিতে তৈরি হত। যেমন— চিনামাটির ক্ষুদ্র পাত্রকে বালু বা সিলিকার সঙ্গে রং ও গঁদ মিশিয়ে বানানো হত।
[v] বিলাসবহুল দুষ্প্রাপ্য দ্রব্যসামগ্রী মূলত হরপ্পা ও মহেন-জো-দারোতে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ছোটো অঞ্চলগুলিতে বিলাসবহুল দ্রব্য তেমন জনপ্রিয় ছিল না।
[vi] হস্তশিল্পগুলির মধ্যে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বানানোর কাজও চলত। যেমন— কুঠার, ছুরি এবং বর্শা, যা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হত।
হরপ্পা সভ্যতার হস্তকলা শিল্পের এই শ্রেণিবিভাজনের ফলে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা হরপ্পার সামাজিক জীবন এবং সামাজিক ভিন্নতার বিষয়ে বুঝতে পেরেছেন।
5. হরপ্পাবাসীরা কী ধরনের মাপ ও বাটখারা ব্যবহার করত সে সম্পর্কে আলোচনা করো।
উত্তর: সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের পর এখানকার বিভিন্ন প্রত্নকেন্দ্র থেকে বস্তুর মাপবিষয়ক বেশকিছু প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া গেছে। এইসব উপাদানের ভিত্তিতে সেযুগে ব্যবহৃত বিভিন্ন রৈখিক, কিউবিক ও ওজনের মাপ বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
[i] রৈখিক মাপ: পাওয়া গেছে ধাতব পাত, যাতে রৈখিক মাপ চিহ্নিত আছে। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, সিন্ধুবাসীরা দৈর্ঘ্য মাপার জন্য ফুট মানাঙ্ক ব্যবহার করত। অনেকে মনে করেন যে, সিন্ধুবাসীরা বস্তুর দৈর্ঘ্য মাপার ক্ষেত্রে তৃতীয় ভগ্নাংশ ও দশমিক পদ্ধতির আশ্রয় নিত।
[ii] কিউবিক মাপ: ইটগুলি তৈরি হত নির্দিষ্ট মাপে অর্থাৎ 4 : 2 : 1 (দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা) অনুপাতে। এর থেকে অনুমান করা হয় যে, তারা বস্তুর আয়তন বোঝাতে ঘনএকক ব্যবহার করত।
[iii] ভর-এর মাপ: বস্তুর ভর মাপার জন্য তারা দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা ব্যবহার করত। বাটখারাগুলি তৈরি হত নানান আকার ও ওজনের। এগুলি তৈরি হত পাথর দিয়ে। সাধারণত দুয়ের ঘাতবিশিষ্ট (binary) অর্থাৎ 1, 2, 4, 8, 16, 32 ইত্যাদি নানান মাপ ছিল ।
[iv] জ্যামিতিক মাপ: ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সবকিছুরই নির্দিষ্ট মাপ ছিল। যেমন, জানা যায় প্রধান সড়কগুলি 6-10 মিটারের বেশি চওড়া হত এবং তা সমান ও সমান্তরালভাবে গড়ে তোলা হত।
পুঁতির হারগুলি সাক্ষ্য দেয় যে, মালাগুলিতে যে দামি পাথর গাঁথা হত তারও নির্দিষ্ট মাপ ছিল।
6. হরপ্পা সভ্যতার প্রাচীনত্ব নির্ণয় করো। এই সভ্যতার স্রষ্টা কারা ছিল বলে মনে হয় ?
উত্তর: পণ্ডিতগণ সিন্ধু সভ্যতা তথা হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল ধরেছেন খ্রিস্টপূর্ব 3000-1500 খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে।
• হরপ্পা সভ্যতার সমসাময়িক দুটি সভ্যতা ছিল— (a) মিশরীয় সভ্যতা ও (b) সুমেরীয় সভ্যতা।
সিন্ধু সংস্কৃতি কারা সৃষ্টি করেছিল এ নিয়ে পণ্ডিতমহলে বিতর্ক আছে। অনেকের মতে, মেহেরগড় সভ্যতা যারা সৃষ্টি করেছিল, তারাই সিন্ধু সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। মাটিমার হুইলার, গর্ডন চাইল্ড প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, মেসোপটেমীয় বা সুমেরীয়গণ সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা। আবার রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ঐতিহাসিক মনে করেন যে, প্রাক-বৈদিক যুগের দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠীর মানুষ সিন্ধু সভ্যতা গড়ে তোলেন। অন্যদিকে ড. ব্যাসাম ও কে এম পানিক্করের মতে, সিন্ধু সংস্কৃতি ভারতীয়দেরই সৃষ্টি।
7. হরপ্পাবাসীর ধর্মীয় জীবনের ওপর আলোকপাত করো ।
উত্তর: সিন্ধু উপত্যকা থেকে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলি (যেমন—সিল ও সমাধি) দেখে সে যুগের মানুষের ধর্মীয় জীবনের ওপর কিছুটা আলোকপাত করা যায়।
• হরপ্পাবাসীর ধর্মীয় জীবন:
[i] বর্তমানে ধর্ম ও ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত মন্দির স্থাপত্যগুলি। তবে সে যুগে কোনো মন্দির আবিষ্কৃত হয়নি। তাই অনেকে মনে করেন, সে যুগের মানুষ মন্দিরে গিয়ে উপাসনা করত না।
[ii] সিন্ধু উপত্যকায় পোড়ামাটির তৈরি অথবা ধাতুর তৈরি অনেক নারীমূর্তি পাওয়া গেছে। এগুলি দেখে অনুমান করা হয় যে, সিন্ধুবাসীরা মাতৃপূজায় বিশ্বাসী ছিল।
[iii] কিছু সিন্ধু সিলে স্বস্তিকা চিহ্নের নিদর্শন পাওয়া যায়। তা দেখে অনেকে দাবি করেছেন যে, সে যুগে সূর্য-পূজার প্রচলন ছিল। সিলে প্রাপ্ত বিভিন্ন চিত্র দেখে অনুমান করা হয় যে, সে যুগের মানুষ আগুন, জল, সাপ, লিঙ্গ, গাছ, পাথর ও বিভিন্ন পশুপাখির পূজা করত। এ প্রসঙ্গে অনেকেরই দাবি যে, সিন্ধুবাসীরা দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য পশুবলি দিত এবং ধূপ জ্বালাত।
[iv] একটি সিলে প্রতিকৃতিরূপে পশুদলবেষ্টিত যোগাসনে তিন মাথা ও শৃঙ্গবিশিষ্ট শিরোভূষণ পরিহিত এক পুরুষদেবতার পরিচয় পাওয়া যায়। স্যার জন মার্শাল একে আদি শিব বলে দাবি করেছেন।
৪. পুরাতত্ত্ববিদগণ অতীতের ইতিহাস কীরূপে পুনর্গঠন করেন তা আলোচনা করো।
উত্তরঃ হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কারের পর সেখানে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের ভিত্তিতে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ হরপ্পা সভ্যতা সম্পর্কে অনেক অজানা কাহিনি তুলে ধরেছেন।
[i] প্রাপ্ত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি (যেমন— বাটালি, র্যাদা) থেকে মনে করা হয়, হরপ্পা সভ্যতার ছুতোর মিস্ত্রিরা খাট, চেয়ার, টুল জাতীয় বিভিন্ন আসবাব তৈরি করত।
[ii] হরপ্পার প্রত্ননগর থেকে পাওয়া গেছে মাটি, পাথর ও ব্রোঞ্জনির্মিত বিভিন্ন তৈজসপত্র, যা সে যুগের উন্নত শিল্পের সাক্ষ্য বহন করে।
[iii] সেখানে পাওয়া গেছে আংটি, নূপুর, দুল, বালা, হার প্রভৃতি অলংকার। যা সে যুগের উন্নত অলংকার শিল্পের কথা স্মরণ করায়। চানহুদারোতে পুঁতি তৈরির কারখানাটি এই শিল্পের জ্বলন্ত উদাহরণ।
[iv] পোড়ামাটির তৈরি নারীমূর্তিগুলি দেখে অনুমান করা হয় যে, তারা মাতৃপূজায় বিশ্বাসী ছিল।
[v] সিন্ধু সভ্যতায় ব্যবহৃত অনেক সিল পাওয়া গেছে, যাতে নানান দেবদেবী, জন্তু-জানোয়ার, সূর্য ইত্যাদির প্রতিকৃতি আঁকা ছিল। তা থেকে সে যুগের মানুষের ধর্মভাবনার কথা জানা যায়। যেমন—একটি সিলে স্বস্তিক চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়, যা সূর্যপূজার প্রচলনের ইঙ্গিত দেয়। আর একটি সিলে পশুদলবেষ্টিত যোগাসনে ত্রিমূর্তি ও শৃঙ্গবিশিষ্ট শিরোভূষণ পরিহিত এক পুরুষ-দেবতার পরিচয় পাওয়া গেছে, যাকে স্যার জন মার্শাল আদি শিব বলে অভিহিত করেছেন।
[vi] পাওয়া গেছে মানুষের কঙ্কাল, দাঁত প্রভৃতি। সেগুলির রেডিয়ো কার্বন-14 পরীক্ষা দ্বারা প্রত্নতাত্ত্বিকগণ সিন্ধু সভ্যতার প্রাচীনত্ব (3000-1500 খ্রি.পূ.) নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
[vii] সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত সমাধিগুলিতে প্রাপ্ত মৃতদেহের কঙ্কাল ও সৎকার পদ্ধতি দেখে সে যুগের মানুষের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। শবাধারগুলির পাশে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারসামগ্রী থেকে মনে করা হয়, সে যুগের মানুষ পারলৌকিকতাবাদে বিশ্বাসী ছিল।
[viii] সেখানে পাওয়া গেছে কিছু খেলনা গাড়ি ও জাহাজের মডেল, যা দেখে মনে হয় সিন্ধুবাসীরা গাড়ির ব্যবহার জানত। জাহাজের মডেলটি দেখে পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, সে যুগে বণিকরা জাহাজে করে বৈদেশিক বাণিজ্য চালাত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন