পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর অঞ্চলগুলিতেই নকশাল আন্দোলন গড়ে ওঠার কারণ কী ?
উত্তর: নকশাল আন্দোলন দেশের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলা যেতে পারে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে নকশালপন্থীদের উত্থান হয়, মূলত নকশাল আন্দোলনের কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক কারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশের যেসকল রাজ্যগুলিতে প্রধানত অর্থনৈতিক কারণে সমাজের সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি সেই সকল রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এর অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়।
[i] অর্থনৈতিক কারণ : নকশাল আন্দোলনের কারণ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক অনুন্নয়নকে দায়ী করা হয়। নকশাল আন্দোলন-এর এলাকাগুলিতে দরিদ্র কৃষক এবং উপজাতি মানুষগুলি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকটাই দরিদ্র। তাদের জীবনধারণ করার মতো আর্থিক সামর্থ্যও প্রায় ছিল না। তারপর ওইসব অঞ্চলের সাধারণ, সহজ, সরল মানুষগুলিকে দিয়ে জোরপূর্বক বেগার খাটানো হত। ফলত সেখানকার মানুষ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়।
[ii] মহাজনদের নিপীড়ন : দরিদ্র এলাকায় মানুষদের উপর ইচ্ছাকৃত অত্যাচার ছাড়াও, সেখানকার মহাজনদের অত্যাচার-এর ঘটনা আরও করুণ। কারণ, মহাজনরা দরিদ্র মানুষগুলির সহজ সরলতার সুযোগ নিয়ে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করত। প্রয়োজনে জোর করে তাদের জমিজমা দখল করত। সবচেয়ে বড়ো কারণ হল, কোনো গরিব মানুষ যদি মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিত তাহলে তা কোনোদিন শোধ হত না। ঋণের জালে জড়িয়ে এই অশিক্ষিত সহজ সরল মানুষগুলিকে নিঃস্ব হয়ে যেত। দিনের পর দিন এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়।
[iii] অরণ্যের অধিকার : আদিবাসী ও উপজাতি অঞ্চলের মানুষদের কাছে সবচেয়ে নিকটজন হল তাদের বন- জঙ্গল। তারা এই বন-জঙ্গলকে মা হিসেবে মনে করেন। এই ভূমির ওপর নির্ভর করেই তাদের জীবন ও জীবিকা প্রতিপালিত হয়। তাই এই জঙ্গলের অধিকারে যখন সরকার হস্তক্ষেপ করল তখন তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়ল যা ব্রিটিশ রাজত্বকালেও ঘটেছিল। কারণ বনকে জাতীয় বা দেশের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, সরকারের অনুমতি ছাড়া এই অঞ্চলের অধিবাসীরা বনজ সম্পদের ওপর অধিকার দাবি করবে না। তাই সাধারণ মানুষ তাদের জীবনের অধিকারের সঙ্গে জড়িত অরণ্যের অধিকারকে ফিরিয়ে পেতে আন্দোলনের রাস্তা গ্রহণ করে।
[iv] CPI (ML)-এর উদ্ভব : 1969 খ্রিস্টাব্দে আন্দোলনকারীরা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) সংক্ষেপে CPI(ML) নামে নতুন একটি দল গঠন করে। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে নতুন দলটি গঠিত হয়। এই দলটি মূলত উপজাতি অঞ্চলের মানুষদের চরমপন্থী আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত করে। সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার কথা বলে। এদের মূল কথা ছিল অধিকার কেউ দেয় না, অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। তাই মানুষের অধিকার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান নিজেকে ছিনিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে অস্ত্র ধরতে হবে, তবুও নিজেদের স্থানচ্যূত হওয়া যাবে না। এই আদর্শের নিরিখে সকল সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে শামিল হয়েছিল চারু মজুমদারের নেতৃত্বে। যা মূলত নকশাল আন্দোলন বলে পরিচিতি পায়। পরবর্তীকালে এই দলটিকে সরকার শত্রু হিসেবে গণ্য করে এবং গেরিলা সংগ্রামের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিপ্লবের অধ্যায় শুরু করে যা প্রধানত ছিল। সশস্ত্র আন্দোলন ।
[v] বিস্তার : বর্তমানে নয়টি রাজ্যের 75টি জেলায় নকশালবাদী সহিংস কার্যকলাপ চলছে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং এর সংলগ্ন এলাকায় এই আন্দোলন সম্প্রসারিত হয়েছে। কৃষকদের ন্যায্য পাওনা, অর্থনৈতিক অসাম্য এবং জমির পুনর্বণ্টনকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন