ভক্তি ও সুফিবাদের ঐতিহ্য ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিবর্তন এবং ভক্তিমূলক গ্রন্থ (আনুমানিক অষ্টম শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত)
সঠিক উত্তরটি বাছাই করো। প্রশ্নমান 1
1. দক্ষিণ ভারতে আলভারের নেতৃত্বে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়—
(a) 15 শতকে
(b) 16 শতকে
(c) 17 শতকে
(d) 18 শতকে
উত্তর: (b) 16 শতকে।
2. রোবার্ট রেডফিল্ড ছিলেন একজন—
(a) আর্কিয়োলজিস্ট
(b) ঐতিহাসিক
(c) সমাজতত্ত্ববিদ
(d) ধর্মতত্ত্ববিদ
উত্তর: (c) সমাজতত্ত্ববিদ।
3. দক্ষিণ ভারতে যাযাবর ভিক্ষু সন্ন্যাসীরা যে-নামে পরিচিত ছিল—
(a) জপ্পাত
(b) জঙ্গম
(c) লিঙ্গায়ত
(d) আলভার
উত্তর: (b) জঙ্গম।
4. সুফি খানকাহগুলির শিক্ষাগুরুদের বলা হত—
(a) পির
(b) শেখ
(c) মুরশিদ
(d) সবগুলিই ঠিক
উত্তর: (d) সবগুলিই ঠিক।
5. উরস হল—
(a) পিরদের জন্মবার্ষিকী
(b) পিরদের মৃত্যুবার্ষিকী
(c) পিরদের দীক্ষিত হওয়ার দিন
(d) কোনোটিই নয়
উত্তর: (b) পিরদের মৃত্যুবার্ষিকী ।
6. খাজা মইনউদ্দিন চিস্তির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়—
(a) আনুমানিক দ্বাদশ শতকে
(b) আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকে
(c) আনুমানিক চতুর্দশ শতকে
(d) আনুমানিক পঞ্চদশ শতকে
উত্তরঃ (c) আনুমানিক চতুৰ্দশ শতকে।
7. মসনভি হল—
(a) সুফিবাদের নৈতিক বিধান
(b) ছোটো কবিতা
(c) সুফি দীর্ঘ কবিতা
(d) কাব্যসংগীত
উত্তর: (c) সুফি দীর্ঘ কবিতা ।
৪. সুফি দরগাগুলি মানুষের অযাচিত দানে গড়ে উঠত। এই দানকে বলা হত—
(a) ফতেয়া
(b) ফতুর
(c) ফুতুহ
(d) ফুতুর
উত্তর: (c) ফুতুহ ।
9. পঞ্চম শিখ গুরু ছিলেন—
(a) গুরু তেগ বাহাদুর
(b) গুরু গোবিন্দ সিং
(c) গুরু অর্জুন
(d) গুরু রামদাস
উত্তর: (c) গুরু অর্জুন।
10. ভগবতী ধর্ম হল—
(a) চৈতন্যদেবের উপদেশাবলি
(b) শঙ্করদেবের উপদেশাবলি
(c) বাবা ফরিদের উপদেশাবলি
(d) মীরাবাইয়ের উপদেশাবলি
উত্তর: (b) শঙ্করদেবের উপদেশাবলি ।
নীচের প্রশ্নগুলি একটি শব্দে / পূর্ণাঙ্গ বাক্যে উত্তর দাও। প্রশ্নমান 1
1. কারইক্কাল আম্মাইয়ার কে ছিলেন ?
উত্তর: কারইক্কাল আম্মাইয়ার ছিলেন দক্ষিণ ভারতের নায়নার সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তিবাদী এক সাধিকা; তিনি নানা কবিতা রচনা করেন।
2. অডাল কে ছিলেন ?
উত্তর: 12 জন বিশিষ্ট আলভার সম্প্রদায়ের ভক্তদের অন্তর্গত এক মহিলা ভক্ত ছিলেন অন্ডাল।
3. বাসাবন্না কে ছিলেন ?
উত্তর: বাসাবন্না ছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীর একজন খ্যাতনামা দার্শনিক, কবি ও ভক্তিবাদী নেতা; যিনি দক্ষিণ ভারতের লিঙ্গায়ত আন্দোলনের সূচনা করেন।
4. 'জাকাত' কী ?
উত্তর: ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে একজন মুসলমান তার সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ গরিবদের দান করবে, এই দানকেই বলা হয় 'জাকাত'।
5. খোজকি লিপি কী ?
উত্তর: ইসমাইলি (শিয়া) সম্প্রদায়ের একটি ছোটো শাখা হল খোজা। এরা কোরানের ধারণাগুলি স্থানীয় খোজকি লিপিতে নথিভুক্ত করে জ্ঞানের আদানপ্রদান করত। এ ছাড়াও বাণিজ্যিক সংক্রান্ত কাজে এই লিপি ব্যবহার করা হত।
6. 'শেখ' ও 'মুরিদ' কাদের বলা হয় ?
উত্তর: সুফিবাদে শিক্ষাগুরুদের বলা হত 'শেখ' এবং তাঁর শিষ্যদের বলা হত 'মুরিদ'।
7. 'বা-শরিয়া' বলতে কী বোঝো ?
উত্তর: যেসব সুফি সম্প্রদায় ইসলাম নির্দেশিত সামাজিক ও ধর্মীয় আচারবিচার এবং আইনকানুন কঠোরভাবে মেনে চলে, তাদেরই বলে 'বা-শরিয়া'। যেমন—চিসতি ও সুরাবর্দি সিলসিলা ।
৪. একজন ভক্ত সুফিসন্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় কীভাবে সম্বোধন করতেন ?
উত্তর: প্রথমে তিনি সুফিসন্তের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতেন, তারপর তার পদযুগল চুম্বন করে তার আনুগত্য সম্ভের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করতেন।
9. 'খালসা' কী ?
উত্তর: গুরু গোবিন্দ সিং শিখদের নিয়ে যে সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, তাকে বলা হয় 'খালসা’।
10. গুরুনানকের মৃত্যুর পর কে তাঁর উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন ?
উত্তরঃ গুরুনানকের মৃত্যুর পর তাঁর এক শিষ্য অঙ্গদ গুরু হিসেবে তাঁর উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন।
11. কবিরের বাণীসমূহ যে-গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে, তার নাম লেখো।
উত্তর: কবিরের বাণীসমূহ সংকলিত হয়েছে কবির বিজক এবং কবির গ্রন্থাবলিতে।
12. 'গুরুবাণী' বলতে কী বোঝো ?
উত্তর: গুরুনানক, গুরু অর্জুন, বাবা ফরিদ, গুরু রামদাস ও কবিরের বাণীসমূহ আদিগ্রন্থসাহেব-এ সংকলিত করা হয়—এদের একত্রে ‘গুরুবাণী' বলা হয়।
13. গুরুনানকের মতে পরম বা 'রব' কী ?
উত্তর: গুরুনানক ‘রব্’ বলতে বুঝিয়েছেন, নিরাকার ঈশ্বরকে এবং সরলপথে তাঁর উপাসনা এবং নিরস্তর নামজপের মাধ্যমে 'রব' বা ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব।
14. নির্গুণ ভক্তি পরম্পরা বলতে কী বোঝো ?
উত্তরঃ যে ভক্তি পরম্পরায় ভগবানের নিরাকার তথা বিমূর্ত রূপের উপাসনা করা হয়, তাকে নির্গুণ ভক্তি পরম্পরা বলা হয় ।
15. হাদিস কী ?
উত্তর: ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মোহম্মদের বাণী-সংকলিত গ্রন্থকে বলা হয় হাদিস, যা আরবি ভাষায় লেখা।
নীচের প্রতিটি প্রশ্ন 60টি শব্দের মধ্যে লেখো। প্রশ্নমান 3
1. সুফি ধর্মগুরুদের সঙ্গে দিল্লির সুলতান ও মোগল বাদশাহদের কীরূপ সম্পর্ক ছিল ?
উত্তর: সুফিসন্তদের ধর্মনিষ্ঠা, পাণ্ডিত্য এবং তাঁদের অলৌকিক ক্ষমতার ওপর জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়। এসমস্ত কারণে শাসকগণও তাঁদের সমর্থন লাভ করতে চাইতেন।
মোহম্মদ-বিন-তুঘলক খাজা মইনউদ্দিন চিস্তির দরগায় প্রথম আসেন। পনেরো শতকে মালাবারের সুলতান গিয়াসউদ্দিন খলজি, মইনউদ্দিন চিত্তির সমাধিতে ইমারত নির্মাণের জন্য অর্থসাহায্য দেন। মোগল সম্রাট আকবর আজমিরে অবস্থিত এই দরগায় প্রায় 14 বার যাত্রা করেন এবং প্রচুর অর্থসাহায্য করেন; যা রাজকীয় দলিলে নথিভুক্ত হয়ে আছে।
অনেকেই মনে করতেন, সুফিসাধকরা সাধারণ মানুষের পার্থিব এবং আধ্যাত্মিক অবস্থার উন্নতির জন্য ঈশ্বরের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে পারতেন। সম্ভবত এই কারণেই শাসকরা সুফি দরগা এবং সুফিসন্তদের নিকটবর্তী অঞ্চলে নিজেদের সমাধিক্ষেত্র নির্মাণ করতে চাইতেন।
মোগল সম্রাট আকবর সুফিবাদকে বেশ মর্যাদা দিতেন। জানা যায় তিনি আজমিরের দরগা মোট 14 বার দর্শন করেন। প্রত্যেকবারই তিনি সেখানে কিছু না কিছু দান খয়রাত করতেন। 1568 খ্রিস্টাব্দে তিনি এখানকার লঙ্গরখানায় একটি সুবিশাল ডেকচি দান করেছিলেন। এ ছাড়া দরগা বন্দরে একটি মসজিদও নির্মাণ করেছিলেন।
2. তামিলনাড়ুর আলভার এবং নায়নারের সঙ্গে রাষ্ট্রের কীরূপ সম্পর্ক ছিল তা আলোচনা করো।
[i] আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীতে ভক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আলভাররা (বিষ্ণুর উপাসক) এবং নায়নাররা (শিবের উপাসক)। তারা একস্থান থেকে অন্যস্থানে ভ্রমণ করতে করতে তামিল ভাষায় ভগবানের স্তবগান করতেন।
[ii] আলভার এবং নায়নাররা কয়েকটি পুণ্যভূমিকে তাদের ইষ্টদেবতার নিবাসস্থল হিসেবে বাছাই করেছিলেন। এই পুণ্যভূমিতেই পরবর্তীকালে বৃহদাকারের মন্দির নির্মাণ হতে দেখা যায় এবং এগুলি তীর্থকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।
[iii] সেখানকার শাসকরা ব্রাহ্মণ্য এবং ভক্তিবাদের সমর্থক ছিলেন। তাঁরা বিন্নু এবং শিব মন্দির নির্মাণের জন্য ভূমিদান করতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চিদাম্বরম, তাঞ্জাভুর, গঙ্গাইকোণ্ডচোলপুরমের শিবমন্দির চোল শাসকদের অর্থানুকূল্যে গড়ে উঠেছিল। এই সময়ে ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যে শিবের কিছু দর্শনীয় মূর্তি তৈরি হয়। নিঃসন্দেহে নায়নার সাধকদের দর্শনগুলি কারুশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
3. ভক্তি আন্দোলন কীভাবে নারীসমাজকে প্রভাবিত করেছিল ?
উত্তর: ভক্তি আন্দোলনের উদার মনোভাব নারীসমাজকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করে। শুধু উদারতা নয় এর সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সামাজিক ঐক্যবোধের আদর্শ। এর বহুল প্রভাব লক্ষ করা যায় সমাজ ও রাজনীতিতে নারীর অবস্থানগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
• নারীসমাজ :
[i] ভক্তি ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজে মহিলাদের উপস্থিতি। এই ধারায় মহিলারা আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশের সুযোগ পায় ।
[ii] মহিলারা ধর্মচর্চা ও ধর্মপ্রচারে এগিয়ে আসে এবং প্রকাশ্যেই নিজেদের ভগবানের প্রেয়সী বলার সাহস অর্জন করে। উদাহরণস্বরূপ মীরাবাই।
[iii] অনেক মহিলারা কঠোর তপস্যা ও কৃচ্ছসাধনের পথ বেছে নেয়। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইক্কাল অন্মাইয়ার। মহিলাদের এই কৃচ্ছ্রসাধনের পথ বেছে নেওয়ার অর্থ ছিল নারীদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা প্রদান ।
4. চিতি ও সুরাবর্দি সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনটি মূল পার্থক্য কী ছিল ?
উত্তর: সুফি সম্প্রদায় মূলত দুটি প্রধান সিলসিলায় বিভক্ত ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই দুটি সম্প্রদায়ের মতপার্থক্য ছিল, যেমন—
[i] চিতিপন্থীরা রাজনীতির ধার ধারতেন না। তাঁরা মনে করতেন, রাজনীতি মানুষকে আধ্যাত্মিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। অন্যদিকে সুরাবর্দি সম্প্রদায় মনে করতেন, রাজনীতি ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না।
[ii] সুরাবর্দিপন্থীরা সমকালীন সুলতান ও স্থানীয় প্রশাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে ছিলেন। তাঁরা সরকারি দান সাদরে গ্রহণ করতেন। কিন্তু চিতিপন্থীরা এর পরিপন্থী ছিলেন।
[iii] সুরাবর্দি সম্প্রদায় ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও সংযমী জীবনযাত্রায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই তাঁরা সরকারি ও বেসরকারি দান তথা অর্থ গ্রহণ করতেন। অন্যদিকে চিত্তিপথীরা তা করতেন না।
5. মধ্যযুগের ভারতে বিভিন্ন ভক্তিবাদী সাধকের উল্লেখ পাওয়া যায়, তার কয়েকটি উল্লেখ করো ।
উত্তর: বিভিন্ন ভক্তিবাদী সাধক: মধ্যযুগে ভারতে একাধিক ভক্তিবাদী সাধকের আবির্ভাব ঘটে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—
[i] রামানন্দ: রামানন্দ উত্তর ভারতের ব্রাক্ষ্মণ হয়েও জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরোধী ছিলেন। তিনি বৈশ্বব সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন।
[ii] কবির: কবির ধর্মীয় ভেদাভেদ মানতেন না।
[iii] গুরু নানক: নানক জাতিভেদ প্রথা ও মূর্তি পূজোয় বিশ্বাস করতেন না। কবির শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
[iv] চৈতন্যদেব: জাতিভেদ প্রথার ঘোর বিরোধী ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম প্রবর্তন করেন।
[v] বল্লভাচার্য ও ভক্তদাদু: বল্লভাচার্য ও ভক্তদাদু ছিলেন একেশ্বরবাদী ভক্তিবাদী সাধক। তাঁরা ধর্মীয় ভেদাভেদ অস্বীকার করেন।
[vi] নামদেব: নামদের ছিলেন ভক্তিধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক। পঞ্চদশ শতকে মহারাষ্ট্রে ভক্তিধর্ম প্রচারে তিনি ছিলেন অগ্রণী। তিনি যাগযজ্ঞ ও মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী ছিলেন।
[vii] সুরদাস: সুরদাস ছিলেন পঞ্চদশ শতকে ভক্তিবাদী প্রচারক ও বল্লভাচার্য সম্প্রদায়ের এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তিনি সংগীতের মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রতি মানবিক ভাব ও তাঁর দার্শনিক তত্ত্বগুলি তুলে ধরেন। তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদী সাধক।
6. ভক্তিবাদের উৎপত্তির তিনটি কারণ উল্লেখ করো।
উত্তর: ভক্তিবাদের উৎপত্তির তিনটি কারণ হল—
[i] হিন্দুধর্মের কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ মধ্যযুগে ভারতে ভক্তিবাদের উৎপত্তি ঘটে।
[ii] ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাবে নারীর মর্যাদা দারুণভাবে খর্ব হয়। তাদের শাস্ত্রপাঠের অধিকার ছিল না, কিন্তু ভক্তিবাদী মহিলারা ধর্মের বিশ্লেষণে অংশ নিতে পারত এবং স্বাধীন জীবনযাপন করতে সমর্থ হত। এরা নারী-পুরুষকে সমান চোখে দেখতেন।
[iii] ভক্তিবাদী সাধকরা অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় ঈশ্বর আরাধনার কথা বলতেন। ভক্তিবাদে বর্ণভেদ ও জাতিভেদ প্রথার কোনো স্থান ছিল না। তাঁদের কাছে সকল মানুষই সমান, উচ্চ বা নিচ বলে কিছু নেই। ফলে সাধারণ মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়।
7. ভারতের সমাজ জীবনে সুফিবাদের কি কোনো প্রভাব পড়েছিল ? সংক্ষেপে লেখো ।
উত্তর: ভারতে সুফিবাদের প্রভাব : এই সুফি আন্দোলন ভারতীয় সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। যেমন—
[i] উভয় ধর্মে (হিন্দু-মুসলিম) যৌথ দেবদেবীর উদ্ভব ঘটে, যথা—বনবিবি, ওলাবিবি, সত্যপির, মানিকপির, জয়পির প্রভৃতি।
[ii] এই সময় সুফি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে অনেকটাই সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে ওঠে।
[iii] ভারতের মধ্যযুগে হিন্দি ভাষায় উন্নতি ও কাওয়ালি সংগীতের উদ্ভব ঘটে সুফি আন্দোলনের প্রভাবেই।
[iv] সুফিদের খানকাহগুলিতে ধর্মচর্চার পাশাপাশি বিদ্যাচর্চার পরিবেশ গড়ে ওঠে। এসময় এগুলি নিয়মিত বিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
[v] সুফি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতে ইসলামের প্রসার ঘটে। ফলে বহু মুসলমান শাসক সেসময় এই ভাবধারায় প্রভাবিত হন।
৪. ভক্তিবাদ ও সুফিবাদের সাদৃশ্যগুলি সংক্ষেপে লেখো ।
উত্তর: ভক্তি আন্দোলন ও সুফি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগীয় ভারতে হিন্দু ও মুসলমান—এই দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এক সমন্বয়কারী যোগসূত্র গড়ে ওঠে। উভয় ভাবধারার মধ্যেই কিছু সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়, যেমন—
[i] ভক্তিবাদ যেমন হিন্দু ধর্মের কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল তেমনই সুফিবাদ ইসলামীয় সমাজের ধর্মগুরু খলিফাদের ক্রমবর্ধমান বিষয়াসক্তির প্রতিবাদস্বরূপ গড়ে উঠেছিল।
[ii] উভয় মতবাদেরই মূলকথা ছিল ঈশ্বর এক ও অভিন্ন। তিনি নিরাকার।
[iii] ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করে তাঁকে লাভ করা যায়।
[iv] উভয় মতবাদেই ধর্মীয় আচার আচরণ, জাতিভেদপ্রথা ও মূর্তিপূজার কোনো স্থান নেই।
[v] উভয় মতবাদে ঈশ্বর ভজনার অঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত ছিল সংগীত, নৃত্য ও ভজনা।
[vi] সুফি ও ভক্তিবাদী সাধকরা মূলত এসেছিলেন সমাজের দরিদ্র ও অবহেলিত অংশ থেকে।
9. ভক্তি আন্দোলনের তিনটি মূলশিক্ষা আলোচনা করো ।
উত্তর: মধ্যযুগীয় ভারতে একাধিক ভক্তিবাদী সাধকের আবির্ভাব ঘটে। তাঁদের হাত ধরে ভারতে ভক্তি আন্দোলনের জোয়ার আসে। এই আন্দোলনের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক ছিল, যেমন—
[i] একেশ্বরবাদ : ভক্তিবাদের মূলকথা ছিল একেশ্বরবাদ। তাঁরা প্রচার করেন ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তবে তাঁকে মানুষ নানা নামে ডেকে থাকে। তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বত্র বিরাজমান। তিনিই জগৎস্রষ্টা ও জীবস্রষ্টা। একাধারে তিনি সৃষ্টি করেন এবং অন্যদিকে ধ্বংস করেন।
[ii] গুরুবাদে বিশ্বাস : ভক্তিবাদী সাধকগণ গুরুবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা বলতেন, গুরু ছাড়া ঈশ্বরলাভ সম্ভব নয়। গুরু হলেন সেই শক্তি যিনি ঈশ্বর ও তাঁর ভক্তের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে তোলেন। অন্যভাবে বলা যায় যে, গুরুর মাধ্যমেই আত্মা ও পরমাত্মার মিলন ঘটে।
[iii] ধর্মীয় আচারের বিরোধিতা : ভক্তিবাদী সাধকরা হিন্দুধর্মে প্রচলিত প্রথা ও আচার-আচরণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। সেই তালিকায় রয়েছে—মূর্তিপূজা, আড়ম্বরপূর্ণ পূজাপাঠ অর্থাৎ যাগযজ্ঞ, উপবাস, তীর্থযাত্রা, পবিত্র স্নানযাত্রা, সমাধিস্থল পূজা ইত্যাদি। এসবের বদলে তাঁরা শুদ্ধ ও পবিত্র জীবনযাপনের ওপর জোর দেন।
• উপসংহার : মধ্যযুগে ভারতের এই ভক্তিবাদী আন্দোলনের প্রবর্তকগণ মানবতাবাদী ধর্মের আদর্শই প্রচার করে গেছেন। তাঁরা হিন্দুদের বর্ণভেদ প্রথার কঠোরতা কিছুটা হলেও হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই তাঁদের সাম্প্রদায়িক ঐক্যের বাণী ভারতবাসীর মনে এক নতুন প্রেরণার সঞ্চার করেছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে খুবই প্রাসঙ্গিক।
10. গুরুনানকের মুখ্য উপদেশগুলি কীভাবে প্রসারিত হয়েছে ?
উত্তরঃ গুরুনানক : গুরুনানক ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভক্তিবাদী সাধক। তিনি হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের ভালো দিকগুলি চয়ন করে তার সমন্বয়সাধন করেন। তিনি হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের ধর্মীয় প্রথাগুলি অস্বীকার করেন। তিনি প্রচার করেন ঈশ্বর এক ও অভিন্ন এবং তিনি নিরাকার। তিনি হিন্দুধর্মের জাতিভেদপ্রথা ও মূর্তিপূজায় বিশ্বাস করতেন না। ধর্মের বাহ্যিক আচার-আচরণ গুলির ওপরও তাঁর কোনো আস্থা ছিল না।
তিনি উপাসনার জন্য সরলপথের নির্দেশ করেন। তা হল নাম জপ করা; যা স্তবগানের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা পাঞ্জাবিতে উপস্থাপনা করেন। গুরু নানক ও তাঁর চার উত্তরাধিকারী, যথা— গুরু অর্জুন, বাবা ফরিদ, রবিদাস এবং কবিরের বাণীসমূহ আদি গ্রন্থসাহেব-এ সংকলিত হয়; যা গুরুবাণী নামে পরিচিত। সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে দশম শিখগুরু গোবিন্দ সিং নবম শিখগুরু তেগবাহাদুরের রচনাসমূহ-এর অন্তর্ভুক্ত করেন, যা গুরু গ্রন্থসাহেব নামে পরিচিতি লাভ করে।
এই দুই মহান ভক্তিবাদী মনীষী কর্তৃক প্রচারিত মতবাদগুলি ছিল যেমন সহজ-সরল, তেমনই সমন্বয়বাদী ও মানবিক। স্বভাবতই সেযুগে বহু মানুষ তাঁদের অনুগামী হয় এবং তাঁদের অনুসৃত অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা ও ধর্মীয় পথ অনুসরণ করে। সেই ধারা আজ অবধি থেমে থাকেনি। দেশবাসী এঁদেরকে এখনও শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে স্মরণ করে।
11. ভক্তিদের উৎস সম্পর্কে কী জানো ?
উত্তর: মধ্যযুগীয় ভারতে একশ্রেণির মানবতাবাদী হিন্দু সাধন-মার্গের মনীষীগণ হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি, রক্ষণশীলতা, অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদপ্রথার বিরুদ্ধে এবং মানুষের ইহলৌকিক মুক্তিকল্পে ভারতীয় সমাজজীবনে যে-ধর্মীয় আলোড়ন সৃষ্টি করেন, তাকে বলা হয় ভক্তি আন্দোলন; আর তাঁদের অনুসৃত পথ ও মতই হল ভক্তিবাদ।
• ভক্তিবাদের উৎস: 'ভক্তি' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ভজ' ধাতু থেকে। আর ‘ভজ' থেকে এসেছে 'ভজন' থেকে। ভজন মানে ঈশ্বরের ভজনা বা আরাধনা। ভক্তিবাদের উৎস খুঁজতে গিয়ে ঐতিহাসিক মহলে মতপার্থক্যের শেষ নেই। ঐতিহাসিক গিয়ারসন মনে করেন, খ্রিস্টানধর্ম থেকেই ভক্তিবাদের ধারণার উৎপত্তি হয়েছে। ঐতিহাসিক ইউসুফ হাসানের মতে, ইসলাম ধর্মই হল ভক্তিবাদের মূল উৎস। কেউ কেউ মনে করেন যে, ভারতে প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকেই ভক্তিবাদের ধারণা পরিপুষ্ট হয়েছে। আবার গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ভক্তিবাদের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে, জ্ঞান, ভক্তি ও কর্ম—এই তিনটি মার্গ দ্বারাই মুক্তিলাভ করা যায়। এই ভক্তিবাদী আন্দোলন সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকে প্রথম দক্ষিণ ভারতে গড়ে ওঠে দুই সাধনমার্গের মনীষী নায়নার ও আলভারের হাত ধরে। তাঁরা এখানে সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা, অর্থাৎ শিব ও বিষ্ণুর পুজো দ্বারা ভক্তি আন্দোলনের সূচনা করেন।
.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন