সঠিক উত্তরটি বাছাই করো। 1 × 10 = 10
1. সমাধিস্থল থেকে তামার দর্পণ পাওয়া যায়—
(a) হরপ্পা অঞ্চল থেকে
(b) কালিবঙ্গান থেকে
(c) লোখালে
(d) রোপার অঞ্চল থেকে
উত্তর: (a) হরপ্পা অঞ্চল থেকে।
2. অশোকের লিপি প্রথম পঠিত হয়—
(a) 1737 খ্রিস্টাব্দে
(b) 1738 খ্রিস্টাব্দে
(c) 1837 খ্রিস্টাব্দে
(d) 1838 খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: d 1838 খ্রিস্টাব্দে।
3. মহাভারতের শ্লোকসংখ্যা হল—
(a) এক লক্ষ
(b) দশ লক্ষ
(c) এক লক্ষের বেশি
(d) দশ লক্ষের বেশি
উত্তর: (c) এক লক্ষের বেশি।
4. জৈন শব্দটি যে শব্দটি থেকে উদ্ভূত, তা হল—
(a) জীব
(b) জিন
(c) জিও
(d) জড়
উত্তর: (b) জিন।
5. আল-বিরুনী ভারতে এসেছিলেন—
(a) দ্বাদশ শতকে
(b) একাদশ শতকে
(c) ত্রয়োদশ শতকে
(d) পঞ্চদশ শতকে
উত্তর: (b) একাদশ শতকে।
6. বিখ্যাত নটরাজের মূর্তি হল—
(a) চোল স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন
(b) বেঙ্গী স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন
(c) পল্লব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন
(d) চালুক্য স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন
উত্তর: (a) চোল স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন।
7. মহানবমী দিব্যভবনে যে সময় বাৎসরিক অনুষ্ঠান হত—
(a) বর্ষাকালে
(b) শরৎকালে
(c) হেমন্তকালে
(d) শীতকালে
উত্তর: (d) শরৎকালে।
৪. সম্পত্তির ওপর মহিলাদের অধিকার ছিল—
(a) উড়িষ্যায়
(b) পাঞ্জাবে
(c) মহারাষ্ট্রে
(d) বিহারে
উত্তর: (b) পাঞ্জাবে।
9. দাক্ষিণাত্য বিদ্রোহ মহারাষ্ট্রের যে অঞ্চলে প্রথম সংগঠিত হয়েছিল—
(a) রত্নাগিরি
(c) নাগপুর
(b) বোম্বে
(d) পুনা
উত্তর: (d) পুনা।
10. A Bunch of Old Letters-এর সম্পাদনা করেন—
(a) গান্ধিজি
(b) ডি জি তেন্ডুলকর
(c) পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু
(d) রাজেন্দ্র প্রসাদ
উত্তর: (c) পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু।
নীচের প্রশ্নগুলি একটি শব্দে / পূর্ণাঙ্গ বাক্যে উত্তর দাও। 1 x 20 = 20
11. ড. পুসলকর হরপ্পার সমাজকে ক-টি ও কী কী ভাগে ভাগ করেছেন ?
উত্তরঃ ড. পুসলকর হরপ্পার সমাজকে 4টি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা—শিক্ষিত সম্প্রদায়, যোদ্ধা, বণিক এবং কারিগর।
12. ভারতের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ কোনটি ?
উত্তর: ভারতের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ ঋকবেদ ।
13. হরপ্পা কোথায় অবস্থিত ?
উত্তর: হরপ্পা পাঞ্জাবের ইরাবতী বা রাভী নদীর তীরে মন্টোগোমারি জেলায় অবস্থিত।
14. মৌর্য যুগে কলিঙ্গের রাজধানী কোথায় ছিল ?
উত্তর: মৌর্য যুগে কলিঙ্গের রাজধানী ছিল তোষালি ।
15. নিউমিসম্যাটিক শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর: নিউমিসম্যাটিক শব্দের অর্থ হল মুদ্রা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা বা গবেষণা ।
16. কুন্তী ও নিষাদী গ্রন্থের রচয়িতা কে ?
উত্তর: কুন্তী ও নিষাদী গ্রন্থের রচয়িতা হলেন মহাশ্বেতা দেবী।
17. বৌদ্ধধর্মে 'হীনযান' বলতে কী বোঝো ?
উত্তর: বৌদ্ধধর্মে প্রাচীনপন্থী বা রক্ষণশীল সম্প্রদায়কে বলা হয় 'হীনযান'।
18. কাদের 'নগর শেঠ' বলা হত ?
উত্তর: মধ্যযুগে (সুলতানি যুগ) ভারতের শহুরে বণিক গোষ্ঠীকে বলা হত নগর শেঠ।
19. বনবাসী ভিল সম্প্রদায় গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে কী কাজ করত ?
উত্তর: বনবাসী ভিল সম্প্রদায় গ্রীষ্মকালে মাছ ধরত এবং বর্ষাকালে মাছ চাষ করত।
20. কিতাব-উল-হিন্দ কয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত ?
উত্তর: কিতাব-উল-হিন্দ আশিটি অধ্যায়ে বিভক্ত।
21. 'গরিব নওয়াজ' বলা হত কাকে ?
উত্তর: খাজা মইনউদ্দিন চিস্তিকে 'গরীব নওয়াজ' বলা হত।
22. বিরূপাক্ষ মন্দির কে নির্মাণ করেন ?
উত্তরঃ বিরূপাক্ষ মন্দির লক্কন (Lakkan) দানদেশ নামে বিজয়নগরের এক নায়ক বা সেনাপ্রধান নির্মাণ করেন।
23. পোদ্দন কে ছিলেন ?
উত্তর: পোদ্দন ছিলেন বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের সভাকবি।
24. স্ক্রিপটোরিয়াম বলতে কী বোঝো ?
উত্তর: স্ক্রিপটোরিয়াম হল এমন একটি জায়গা যেখানে নতুন পাণ্ডুলিপি লেখা হত, পাণ্ডুলিপি নকল করা হত এবং সংগ্রহ করা পাণ্ডুলিপি রাখা হত।
25. আকবর কেন তামাক চাষে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন ?
উত্তর: আকবর তামাক চাষ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, কারণ জাহাঙ্গির তামাকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
26. সাঁওতাল বিদ্রোহ কবে শুরু হয়েছিল ?
উত্তর: সাঁওতাল বিদ্রোহ 1855 খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল।
27. রাজমহলের পাহাড়ের পাদদেশে কারা বসবাস করত ?
উত্তর: রাজমহলের পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়িয়ারা বসবাস করত।
28. অবধ সরকারিভাবে কবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয় ?
উত্তর: 1861 খ্রিস্টাব্দে অবধ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
29. প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের ডাক কে দেন ?
উত্তর: প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের ডাক দেন মোহম্মদ আলি জিন্নাহ ।
30. খসড়া কমিটির দুজন অসামরিক কর্মী কে ছিলেন যারা সংবিধান রচনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন ?
উত্তরঃ খসড়া কমিটির দুজন অসামরিক কর্মী ছিলেন বি এন রাও এবং এস এন মুখার্জি, যারা সংবিধান রচনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।
নীচের প্রতিটি প্রশ্ন 20টি শব্দের মধ্যে লেখো। 2 x 5 = 10
31. ইণ্ডিকা কী ?
উত্তর: মৌর্য যুগের ইতিহাস জানতে হলে মেগাস্থিনিস রচিত ইন্ডিকা গ্রন্থটি হল এক নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক উপাদান। এই গ্রন্থ থেকে মৌর্য যুগের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের বহু খুটি-নাটি তথ্য জানতে পারি। এই গ্রন্থ থেকেই জানতে পারি পাটলিপুত্র তথা রাজধানী নগরীর সমৃদ্ধির কথা। জানতে পারি বিকেন্দ্রীভূত মৌর্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ব্রোচ, সোপারা, তাম্রলিপ্ত প্রভৃতি বন্দর থেকে বহির্বাণিজ্যের কথা ৷
32. বিজয়নগর সাম্রাজ্যে কোন্ কোন্ বিদেশি পর্যটক ভারতে আসেন ?
উত্তর: বিজয়নগর সাম্রাজ্যে যেসকল বিদেশি পর্যটক ভারতে আসেন তারা হলেন— ইটালির পর্যটক নিকোলো কন্টি, পারস্যের আব্দুর রেজ্জাক, রাশিয়ার আফানাসি নিকিতিনি, পোর্তুগালের বারবোসা, নুনিজ, কোসিংগ ডুয়ার্তে প্রমুখ ।
33. গাল্লাবকস বলতে কী বোঝো?
উত্তর: আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল জমির উৎপাদিকা শক্তি অনুযায়ী তিন ধরনের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা চালু করেন। তার মধ্যে গাল্লাবকস হল অন্যতম। এই ভূমি ব্যবস্থায় জমি জরিপ করা হত না। কেবলমাত্র উৎপন্ন ফসলের % অংশ রাজস্ব হিসেবে নির্ধারিত হত।
34. নানাসাহেব কে ছিলেন ?
উত্তর: সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব হলেন নানাসাহেব। যিনি মারাঠা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তক পুত্র ছিলেন। দ্বিতীয় বাজিরাও-এর মৃত্যুর পর গভর্নর জেনারেল ডালহৌসি নানাসাহেবের ভাতা বন্ধ করে দেন। নানাসাহেবের দাবি নাকচ হয়ে গেলে তিনি অন্যোপায় না দেখে কানপুরে সৈন্য জোগাড় করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শামিল হন।
35. কংগ্রেসের চরমপন্থী এবং নরমপন্থীদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল ?
উত্তর: নরমপন্থীরা আবেদন-নিবেদনের নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে পূর্ণ স্বাধীনতার বদলে ডোমিনিয়ান স্ট্যাটাস বা স্বশাসনের দাবি করতেন।
চরমপন্থীরা ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পূর্ণ স্বরাজ অর্জনের পক্ষপাতী ছিলেন।
নীচের প্রতিটি প্রশ্ন 60টি শব্দের মধ্যে লেখো। 3x3 = 9
36. মহাভারত কি শুধুমাত্র একজন লেখকের রচনা হতে পারে ? তিনটি যুক্তি দাও।
উত্তর: উপরের বক্তব্যটির নানা মত প্রচলিত আছে।
[i] এটি অনেকের ধারণা যে, আসল মহাভারত রচনা করেন সারথি-কবিরা, যাঁদের বলা হত মৃত (Sutas)। তাঁরা সাধারণত ক্ষত্রিয় যোদ্ধাদের সারথি ছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁরাই যোদ্ধার রথ পরিচালনা করতেন, তাঁরা যুদ্ধবিজয়ের কাহিনি অবলম্বন করে যে বীরগাথা রচনা করেন, তার সংকলিত রূপ হল মহাভারত।
[ii] অনেকের বিশ্বাস যে, মহাভারত রচনার আগে এর কাহিনিগুলি দীর্ঘকাল ধরে মানুষের মুখে গল্পাকারে প্রচারিত হত। পণ্ডিত ও পূজারিরা এসব কাহিনি পুরুষানুক্রমে বহন করে চলেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে ব্রাক্ষ্মণরা সেই গল্পগুলিকে নিয়ে মহাভারত রচনার কাজ শুরু করেন।
[iii] আবার কেউ কেউ মনে করেন, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব 200 অব্দ থেকে 200 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মহাভারত রচনার কাজ পর্যায়ক্রমে শেষ করা হয়। এইসময় ভারতবর্ষে বৈষ্ণবধর্মের সূচনা হয় এবং বিন্নু দেবতা হিসেবে পূজিত হন। খুব সম্ভবত কৃয়কেই ভগবান বিষ্ণুর অভিন্ন রূপ হিসেবে ধরা হয়।
37. সুফি পরম্পরার বে-শরিয়া এবং বা-শরিয়ার মধ্যে তিনটি সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলি লেখো।
উত্তর: নীচে বে-শরিয়া ও বা-শরিয়া আদর্শের মধ্যে পরিলক্ষিত সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলি আলোচনা করা হল :
সাদৃশ্য
(i) বে-শরিয়া ও বা-শরিয়া উভয়েই ছিল দুই সুফি সম্প্রদায়। আবার এই দুই আদর্শের মূল ভিত্তি ছিল ইসলাম ধর্ম ।
(ii) এই দুই সুফি মতাদর্শেই ইসলামের পালনীয় কর্তব্যগুলি পালন করা হত। তাঁরা রোজা রাখতেন, নামাজ পড়তেন, কৃচ্ছসাধন করতেন।
(iii) এ ছাড়া এই দুই মতাদর্শের মধ্যে অপরাপর যে সাদৃশ্যগত বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়, তা হল – উভয় আদর্শেই কঠোরভাবে একেশ্বরবাদ স্বীকৃত ছিল। তাঁরা উভয়েই কাউকে ধর্মান্তরিত করার পক্ষে ছিলেন না, তাঁরা অনাড়ম্বর জীবনযাপনে বিশ্বাসী ছিলেন ইত্যাদি।
বৈসাদৃশ্য
(i) বা-শরিয়ার ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। তাঁরা ইসলামীয় রীতিনীতি, আইনকানুন কঠোরভাবে পালন করতেন। কিন্তু বে-শরিয়ারা ছিলেন সে তুলনায় অনেকটা উদার প্রকৃতির।
(ii) বা-শরিয়ারা বিভিন্ন সিলসিলা বা সম্প্রদায়ে (যেমন— চিসতি, সুরাবর্দি) বিভক্ত ছিলেন। কিন্তু বে-শরিয়াদের কোনো সিলসিলা বা সম্প্রদায় গড়ে তোলার ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।
(iii) ভারতের জনজীবনে বা শরিয়াদের প্রভাব ছিল বেশি। সে তুলনায় বে-শরিয়াদের তেমন প্রভাব চোখে পড়ে না।
38. ফ্রান্সিস বুকানন পাহাড়িয়াদের সম্পর্কে প্রতিবেদনে কী লিখেছিলেন ? তার প্রতিবেদনে কোম্পানি কীভাবে উ- পকৃত হয় ?
উত্তর: ফ্রান্সিস বুকাননের প্রতিবেদন: ফ্রান্সিস বুকানন রাজমহল পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঘুরে সেখানকার পাহাড়িয়া মানুষদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন রচনা করেন। তাতে বলা হয়—এখানে পাহাড়িয়া নামে এক উপজাতি বসবাস করে। তারা শিকার ও জুমচাষ করে জীবিকানির্বাহ করত। এরা যে-কোনো আগন্তুক দেখলে ভয় পেত। তার সঙ্গে পাহাড়িয়ারা শত্রুতাপূর্ণ ব্যবহার করত। বিশেষ করে ইংরেজ কোম্পানির আধিকারিকদের দেখলে ভীষণ ভয় পেত। তাদের এড়িয়ে চলত। নানা কারণে তারা বাড়িঘর ও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেত।
• কোম্পানির উপকার: এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ইংরেজ কোম্পানি উৎসাহীত হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ওই এলাকার পতিত জমি চাষযোগ্য করে তোলা। এই উদ্দেশ্যে স্থানীয় জোতদারদের উৎসাহ দেওয়া হয়। 1770-এর দশকে কোম্পানি সেখানে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বনাঞ্চল পরিষ্কার করবার কাজ শুরু হয়। পাহাড়িয়ারা বাধা দিলে তাদের ওপর কঠোর দমন পীড়ন করা হয়।
নীচের প্রতিটি প্রশ্ন ৪০টি শব্দের মধ্যে লেখো। 4x4 = 16
39. বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম একসময় ভারতে অনেক ব্যাপ্তি অর্জন করলেও পরবর্তী সময়ে কী কী কারণে (4টি কারণ এই ধর্মমত সমূহ তাদের গৌরব হারিয়ে ফেলে ?
উত্তর: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রতিবাদী ধর্মমত হিসেবে ভারতে বৌদ্ধধর্মের উদ্ভব হয়। পরবর্তী সময়ে এই ধর্ম ধীর গতিতে ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বেশ কয়েকটি কারণে বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে ভারতে জনপ্রিয়তা হারায়। নিজ জন্মভূমি থেকে বৌদ্ধধর্মের এই ক্রম-অপসারণের অন্যতম কয়েকটি কারণ হল—
[i] রাজ অনুগ্রহের অভাব: মৌর্যদের পর ভারতবর্ষের নানা স্থানে যে-সমস্ত রাজা ও রাজবংশের আবির্ভাব ঘটে, তাদের অধিকাংশই ছিল ব্রাক্ষ্মণ্যধর্মের পৃষ্ঠপোষক। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য গুপ্ত রাজারা। ফলে রাজ অনুগ্রহের অভাবে বৌদ্ধধর্ম জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি।
[ii] বৌদ্ধধর্মে বিভাজন: গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধধর্ম নানা শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে, যেমন—মহাযান, হীনযান ইত্যাদি। এসব কারণে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অন্যদিকে এই ধর্মের পালনীয় দিকগুলিও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। পরবর্তী সংঘ নেতাদের এক-এক জন এক এক রকমভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন। সংঘ নায়কদের এই মতভেদের কারণে নানা দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। ফলে সংঘ দুর্বল হয়ে পড়ে।
[iii] ব্রাক্ষ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থান: গুপ্তযুগে নানা ভাবে এবং নানা দিক দিয়ে ব্রাক্ষ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থান ঘটে। রচিত হয় নানাবিধ ধর্মসাহিত্য। স্বাভাবিকভাবেই এই সময় থেকে হিন্দুধর্মের প্রাবল্য ও প্রবাহের চাপে বৌদ্ধধর্ম ম্লান হয়ে পড়ে।
[iv] নৈতিকতার অবক্ষয়: হীনযান ও থেরাবাদীরা তাদের রক্ষণাত্মক ও গোঁড়া আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। ফলে বুদ্ধের সহজ সরল ধর্মীয় নীতিগুলি সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় কোন্দল বৌদ্ধধর্মকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
40. কোন্ কোন্ স্থাপত্যরীতির দ্বারা বিজয়নগরের স্থপতিগণ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ? তারা কীভাবে এই রীতিগুলিকে পরিবর্তন করেছিলেন ?
উত্তর: বিজয়নগরের স্থপতিরা প্রথাগত হিন্দু স্থাপত্যরীতি যেমন অনুসরণ করেছিলেন, তেমনই তাঁদের স্থাপত্যশিল্পে স্থান পেয়েছিল নতুন নতুন ভাবনা। সেক্ষেত্রে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার খামতি ছিল না।
[i] বিজয়নগরের স্থপতিরা মন্দিরস্থাপত্যে যে নতুন আঙ্গিক যোগ করেছিলেন, তা হল—
[a] গোপুরম বা তোরণ।
[b] তারা মন্দিরের চূড়া বা মিনার বা শিখরগুলি এমনভাবে তৈরি করত যাতে সেগুলি দূর থেকে দেখা যায়।
[c] মন্দিরের মূল মণ্ডপের চারিধারে সম্প্রসারিত দালান তৈরি করা হত। দালানগুলিতে থাকত যূথবদ্ধ অনেক থাম।
[d] স্থপতিরা পল্লব মন্দিরস্থাপত্যের অনুকরণে রথের আদলে কয়েকটি মন্দির তৈরি করে। গোপুরম থেকে মন্দিরে প্রবেশ করার জন্য তারা একটি সরল রাস্তা নির্মাণ করত। রাস্তাগুলি চৌকো পাথরখণ্ড দ্বারা ঢাকা হত।
[a] নবম-দশম শতকে বিরূপাক্ষ মন্দিরটি নির্মিত হয়। কিন্তু বিজয়নগরের শ্রেষ্ঠ শাসক এই মন্দিরের আকার- আয়তন ও গঠনে পরিবর্তন আনেন। তাঁর আমলে এই মন্দিরের সম্মুখভাগে একটি বড়ো দালান বা হলঘর নির্মিত হয়। হলঘরটির মূল নান্দনিক বৈশিষ্ট্য ছিল নানা নকশা ও কারুকাজ করা থাম। এ ছাড়া তিনি মন্দিরের পূর্বদিকে একটি গোপুরম তৈরি করেছিলেন।
[b] বিজয়নগরের আর-একটি আকর্ষণীয় মন্দির ছিল বিটল মন্দির। মূল মন্দিরের সামনে রথের আদলে একটি স্থাপত্যকর্ম গড়ে তোলা হয়েছে। এই মন্দিরের উপাস্য দেবতা ছিলেন বিন্নু, যিনি বিটল নামে পরিচিত।
41. উদাহরণ সহকারে মহাবিদ্রোহের জনপ্রিয় প্রকৃতি উল্লেখ করো ।
উত্তর: মহাবিদ্রোহের জনপ্রিয় প্রকৃতিগুলি হল—
[i] উত্তর এবং মধ্য ভারতে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের আগুন সঞ্চারিত করেছিল। তির, ধনুক, বল্লম, কাস্তে বা গাদা বন্দুক ইত্যাদি যা হাতে পেয়েছিল তাই নিয়ে তারা বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিল।
[ii] বহু জায়গায় সাধারণ মানুষ সিপাহিরা বিদ্রোহ করার আগেই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে।
[iii] কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, জমিদার, তালুকদারদের অংশগ্রহণের ফলে মহাবিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। যে কারণে এই বিদ্রোহকে দেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম' হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ।
[iv] যে সমস্ত অঞ্চলে বিদ্রোহের প্রসার সেভাবে ঘটেনি, সেখানকার মানুষও বিদ্রোহীদের সহানুভূতি দেখিয়েছিল।
[v] বিদ্রোহীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের ধ্বংস করা। তাই গোরা সিপাহিদের সঙ্গে সবরকমভাবে অসহযোগিতা করে এবং তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়।
[vi] ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এবং সহাবস্থানের এত ভালো চিত্র আর কোনো আন্দোলনে চোখে পড়েনি। [vii] বিদ্রোহীদের থামাতে ব্রিটিশ সরকার নির্মমভাবে তাদের হত্যা করে, বিনা বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয়, নির্বাসিত করা হয়। এই সমস্ত কিছু বিদ্রোহের ব্যাপকতাকে নির্দেশ করছে।
42. কোন্ কোন্ ঐতিহাসিক শক্তি সংবিধানের দর্শনকে রূপায়িত করেছিল ?
উত্তর: নিম্নলিখিত ঐতিহাসিক শক্তি সংবিধানের দর্শনকে রূপায়িত করেছিল—
[i] নেহরু রিপোর্ট (1928 খ্রিস্টাব্দ) : সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতীয়রা বিক্ষোভ দেখালে ভারত সচিব বার্কেনহেড ব্যঙ্গ করে বলেন, সংবিধান রচনা করার যোগ্যতা ভারতীয়দের নেই। এরপর মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে এক সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়, যে কমিটি কংগ্রেসের লখনউ অধিবেশনে সংবিধানের খসড়া পেশ করে, যা নেহরু রিপোর্ট নামে পরিচিত হয়। এই রিপোর্ট অনুসারে—
[a] ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা গঠন করে পূর্ণ ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা দিতে হবে;
[b] যাবতীয় ক্ষমতা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আইনসভার হাতে থাকবে;
[c] সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে তবে কোনো পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী থাকবে না;
[d] প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে (পাঞ্জাব ও বাংলা বাদে) জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের 10 বছরের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখতে হবে;
[e] কেন্দ্র ও প্রদেশগুলিতে দায়িত্বশীল সরকার গড়ে তুলতে হবে এবং প্রদেশগুলিতে এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে।
[ii] কংগ্রেসের করাচি প্রস্তাব (1931 খ্রিস্টাব্দ) : সর্দার প্যাটেলের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনে মৌলিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক নীতি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যার মাধ্যমে দলের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রতিফলিত হয়, যা করাচি প্রস্তাব নামে পরিচিত। প্রস্তাবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—
[a] সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা ইত্যাদি প্রাথমিক অসামরিক অধিকার; আইনের চোখে সকলের সমান অধিকার; সর্বজনীন ভোটাধিকার; বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষা; নারী, কৃষক এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা; শ্রমিকদের সঠিক বেতন প্রদান, কর্মক্ষেত্রের অবস্থার উন্নয়ন এবং কাজের সময় কমানো; শিল্প, খনি এবং পরিবহণের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ স্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
[iii] ভারত শাসন আইন (1935 খ্রিস্টাব্দ) : সাইমন কমিশনের (1928 খ্রিস্টাব্দ) সুপারিশ এবং লন্ডনে অনুষ্ঠিত গোল টেবিল বৈঠকের (1930-1932 খ্রিস্টাব্দ) সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে 1935 খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন জারি করা হয়। এই আইনের দুটি প্রধান প্রস্তাব হল—
[a] দেশীয় রাজ্যগুলি এবং ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ নিয়ে একটি সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং
[b] প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন কাঠামো গঠন।
[iv] অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি : 1789 খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের সাম্য, মৈত্রী এবং স্বাধীনতার আদর্শ, গ্রেট ব্রিটেনের সংসদীয় ব্যবস্থা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিল অব রাইটস এবং রুশ বিপ্লবের আদর্শ ভারতীয় সংবিধানের দর্শনকে প্রভাবিত করেছিল।
অথবা, ভারতে গণপরিষদ গঠনে কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের ভূমিকা উল্লেখ করো ।
উত্তর: ভারতীয় গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে 1946 খ্রিস্টাব্দের 9 ডিসেম্বর। এই গণপরিষদ বা সংবিধান সভা গঠনে কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দ এক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। (i) প্রথম দিকে সমাজতন্ত্রবাদীরা সংবিধান সভায় যোগ দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না । তাদের যুক্তি ছিল যেহেতু গণপরিষদ ব্রিটিশদের দ্বারা সৃষ্ট। ফলস্বরূপ গণপরিষদে 82 শতাংশ অর্থাৎ 389 জন সদস্যদের মধ্যে 300 জনই ছিলেন কংগ্রেসের সদস্য। কংগ্রেসের অভ্যন্তরে আলোচ্য বিষয় নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও এঁদের মধ্যে 6 জন সদস্যই মূলত প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এঁরা হলেন জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রমুখ। নেহরু উদ্দেশ্য সংক্রান্ত প্রস্তাবের উত্থাপন-সহ ভারতের জাতীয় পতাকার নকশা তৈরি, তার আনুপাতিক গঠন, রং ও নীল রঙের চক্রের অবস্থানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
[i] সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আড়ালে থেকেও কয়েকটি খসড়া তৈরি এবং বিভিন্ন মতামতের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
[ii] গণপরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ সমস্ত সদস্যকে মতপ্রকাশের সুযোগ দিয়ে গঠনমূলক পথে আলোচনা পরিচালিত করেন।
[iii] কংগ্রেসের এই ত্রয়ী ছাড়া অপর উল্লেখযোগ্য সদস্য ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও অর্থনীতিবিদ ড. বি আর আম্বেদকর। পদাধিকারবলে তিনি সংবিধানের খসড়া কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সঙ্গে আরও দুজন আইনজীবী ছিলেন, গুজরাটের কে এম মুন্সি এবং অপরজন মাদ্রাজের আল্লাদি কৃষ্ণস্বামী আয়ার।
[iv] এই ছ-জন সদস্যকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেন দুজন অসামরিক কর্মী। একজন হলেন বি এন রাও—ইনি ছিলেন সাংবিধানিক উপদেষ্টা, যিনি অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিবিড় অধ্যয়নের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।
অন্যদিকে এস এন মুখার্জি ছিলেন মুখ্য খসড়া রচনাকারী। যিনি প্রস্তাবগুলির স্পষ্ট আইনি ভাষায় ব্যাখ্যা প্রদান করেন। বলাই বাহুল্য ড. আম্বেদকর ছিলেন সংবিধানের খসড়া পরিচালনার দায়িত্বে। এইভাবে গণপরিষদের আলোচনার নথি 11টি খণ্ডে মুদ্রিত হয়েছিল। অবশেষে তৈরি হল বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত সংবিধান। যার পশ্চাতে ছিল গণপরিষদের উচ্চস্থানীয় ব্যক্তিসকলের নিরলস প্রচেষ্টা; যদিও সমগ্র প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হলেও তা ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়—এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
নীচের প্রতিটি প্রশ্ন 120টি শব্দের মধ্যে লেখো। 5 x2 = 10
43. পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন হতে হরপ্পা অর্থনীতির কোন্ দিকগুলির পুনর্নির্মাণ সম্ভব হয়েছে ?
উত্তরঃ হরপ্পা সভ্যতা খনন করে একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া গেছে, যা সে সময়কার এক উন্নত অর্থনীতির সাক্ষ্য বহন করে।
[i] সেখানে পাওয়া গেছে অনেক কৃষি সরঞ্জাম, যেমন—কাস্তে, নিড়ানি, খুরপি জাতীয় বস্তু। যেগুলি নিশ্চিতভাবে বলে যে, সে যুগের মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি।
[ii] কুটিরশিল্পে কাজ করে মানুষ যে জীবিকানির্বাহ করত তার নমুনা পাওয়া গেছে চানহুদারোতে। যেখানে গড়ে উঠেছিল একটি পুঁতি কারখানা। এ ছাড়া পাওয়া গেছে নানা ধরনের অলংকার।
[iii] প্রাপ্ত বাটালি, তুরপুন ও র্যাদাজাতীয় যন্ত্র প্রমাণ করে সে যুগের মানুষ আসবাবশিল্পে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত।
[iv] বহু মানুষ বাস্তু নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তার প্রমাণ হরপ্পা সভ্যতায় প্রাপ্ত ঘরবাড়ি, স্নানাগার, শস্যভাণ্ডারগুলি।
[v] হরপ্পার বণিকরা যে বৈদেশিক বাণিজ্যে সিদ্ধহস্ত ছিল তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। পশ্চিমি এশীয় সভ্যতাগুলিতে হরপ্পার অনেক সিল পাওয়া গেছে। আবার সুমেরীয় সিলমোহর, খোদাই করা পাত্র, দীপাধার ইত্যাদি সিন্ধু সভ্যতা খনন করে পাওয়া গেছে।
[vi] গুজরাটের লোথালে প্রাপ্ত জাহাজঘাটা ও জাহাজের মডেলটি প্রমাণ করে সে যুগে সিন্ধু বণিকরা লোথাল বন্দর দিয়ে সমুদ্রপথে বৈদেশিক বাণিজ্য করত। [vii] পাওয়া গেছে পোড়ামাটির তৈরি একটি পশুবাহিত গাড়ির মডেল। এর থেকে মনে করা হয় যে, সে যুগে পণ্য পরিবহণের জন্য গোরুর গাড়ি ব্যবহার করা হত।
অথবা, হরপ্পা সভ্যতায় শাসকদের ভূমিকা কেমন ছিল ? তোমার নিজের ভাষায় লেখো ।
উত্তর: সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার রাজনৈতিক জীবন কেমন ছিল তা নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে আজও পৌঁছোনো যায়নি। তবে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভিত্তিতে পণ্ডিতগণ এ বিষয়ে আলোকপাত করে থাকেন।
• সিন্ধু সভ্যতার রাজনৈতিক জীবন :
[i] কেন্দ্রীয় শাসক: পণ্ডিতগণ মনে করেন, সেখানে যে একটি কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী ও একটি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র গড়ে উঠেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঐতিহাসিক ডি ডি কোশাম্বীর মতে, সেখানে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে উঠেছিল। তা না হলে এমন পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা এবং একই ধরনের ওজন, পরিমাপ ও সিলমোহরের প্রচলন সম্ভব হত না।
[ii] পুরোহিত রাজা: ঐতিহাসিক মার্টিমার হুইলারের মতে, সিন্ধু উপত্যকা ছিল একটি সাম্রাজ্য। সেখানে খুব সম্ভবত পুরোহিত রাজার শাসন চালু ছিল।
[iii] পৌরশাসন: অনেকেই মনে করেন সিন্ধু সভ্যতায় কেন্দ্রীভূত পৌরশাসন ব্যবস্থা চালু ছিল। তা না-হলে এমন একটি পরিকল্পিত নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে ওঠা কখনোই সম্ভব হত না। সেখানকার অধিবাসীরা পৌর প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য থাকত এবং প্রতিটি নগরের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, পয়ঃপ্রণালী ইত্যাদি বিষয়ে পৌরবিধি মেনে নির্মিত হত।
[iv] রাষ্ট্রের ধারণা: বিভিন্ন ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, হরপ্পা সভ্যতায় একজনমাত্র শাসক বা একটি শাসকগোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকলেও রাষ্ট্রের ধারণা ছিল সুস্পষ্ট। একইরকম নগর পরিকল্পনা, ইটের ব্যবহার ও তার অনুপাত প্রভৃতি প্রমাণ করে হরপ্পা সভ্যতার বিভিন্ন নগরগুলির মধ্যে একই ধরনের শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রচলিত ছিল যা রাষ্ট্রধারণার সূচক।
[v] দুর্গনগরীর ক্ষমতা: রামশরণ শর্মার মতো ঐতিহাসিকেরা এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল যে, দুর্গনগরী হরপ্পা সভ্যতার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। মনে করা হয়, শাসনব্যবস্থার প্রতিটি কাজ ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হত এই দুর্গনগরীতেই। অর্থাৎ, হরপ্পাবাসীদের রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রস্থল ছিল এই দুর্গনগরীগুলি।
[vi] রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: হরপ্পা সভ্যতায় শাসকের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিষয়টি সম্বন্ধে বিতর্ক থাকলেও বর্তমানের ঐতিহাসিকগণ যেমন রণবীর চক্রবর্তী স্বীকার করেছেন যে, সিন্ধুসভ্যতার শাসকেরা রাজ্যবিস্তারের চেয়ে অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের ওপর বেশি জোর দিতেন। সিন্ধুসভ্যতার ব্যাবসাবাণিজ্য এই বিষয়ে সমর্থন জানায়।
44. অসহযোগ আন্দোলনের কারণগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
. উত্তর: ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে 1920 খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্দি পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলন ছিল একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কারণ, অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে এই প্রথম কংগ্রেস স্বরাজ অর্জনের লক্ষ্যে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়।
[i] অর্থসংকট : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশ জুড়ে এক চরম অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রকট হয় কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির চাপা অসন্তোষ।
[ii] প্রতিশ্রুতিভঙ্গ : বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন বিভিন্ন উপনিবেশগুলিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্পণের কথা বলেন। ভারত এ ব্যাপারে উৎসাহিত হলেও যুদ্ধশেষে ব্রিটিশ সরকার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।
[iii] সংস্কার আইনের ব্যর্থতা : 1919 খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। ফলে ভারতবাসী আশাহত হয়।
[iv] রাওলাট আইন : ভারতীয়দের বিপ্লবাত্মক প্রয়াস ও সমস্ত ধরনের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার জন্য সরকার 1919 খ্রিস্টাব্দে দমনমূলক রাওলাট আইন ঘোষণা করে। [v] জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড : এরূপ পরিস্থিতিতে 1919 খ্রিস্টাব্দে জালিয়ানওয়ালাবাগের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনায় ঘৃতাহুতি দিয়েছিল।
• আন্দোলনের সূচনা : বস্তুত জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের পর ব্রিটিশ জাতি সম্পর্কে গান্ধিজির মোহভঙ্গ হয় । মর্মাহত গান্ধিজি 1920 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব রাখেন। ওই বছরই কংগ্রেসের বাৎসরিক নাগপুর অধিবেশনে এই আন্দোলনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ফলস্বরূপ ওই বছরের 1 অক্টোবর অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা হয়।
অথবা, ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে একটি গণ আন্দোলনে পরিণত হয়— আলোচনা করো ।
উত্তর: বড়োলাট লর্ড লিনলিথগোর ‘আগস্ট প্রস্তাব' (1940) এবং ‘ক্লিপসের প্রস্তাব ব্যর্থ হলে ভারতীয়দের বুঝতে দেরি হয়নি যে, ইংরেজরা ভারতীয়দের সাংবিধানিক সংস্কারের ব্যাপারে যথেষ্টই উদাসীন। ভারতকে অনাবশ্যক বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়া এবং জাপান কর্তৃক ভারত আক্রমণের সম্ভাবনা তথা নিরাপত্তার অভাব গান্ধিজিকে বিচলিত করে। অন্যদিকে যুদ্ধের সময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দুব্যের আকাল সাধারণ মানুষকে ক্ষুদ্ধ করে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সামনে সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা ছিল না।
• প্রস্তাব গ্রহণ : ক্রিপসের প্রস্তাব ব্যর্থ হলে মহাত্মা গান্ধি নতুন করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কথা ভাবতে থাকেন। 1942 খ্রিস্টাব্দের 26 এপ্রিল তিনি ‘হরিজন' পত্রিকায় 'ভারত ছাড়ো' নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। ওই বছর 14 জুলাই কংগ্রেসের ওয়ার্থা অধিবেশনে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ৪ আগস্ট কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সমিতি এই প্রস্তাবকে স্বীকৃতি দিলে 9 আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলনের দিন ধার্য হয়। গান্ধিজি দেশবাসীকে এই আন্দোলনে শামিল হতে ডাক দিলেন। তিনি বললেন, 'করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে' অর্থাৎ আমরা করব অথবা মরব।
• আন্দোলনের সূচনা : কিন্তু 9 আগস্ট ভোর হতে না হতেই গান্ধিজি, বল্লভভাই প্যাটেল, জওহরলাল নেহরুসহ অন্যান্য কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। গান্ধিজির গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং সারা দেশে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের আপামর জনসাধারণ ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
নেতৃত্বহীন জনতা নিজেদের মতো করে আন্দোলন পরিচালনা করে। শুরু হয় হরতাল। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও কলকারখানায় ধর্মঘট পালিত হল। ক্রমে এই আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের লাইন বিনষ্ট করা। থেকে শুরু করে রেললাইন, থানা, রেলস্টেশন ও ডাকঘর ধ্বংসকরণের প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল।
• আন্দোলনের বিস্তার ও বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ : ভারত ছাড়ো আন্দোলন মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, পাঞ্জাব, বাংলা, বিহার, ওড়িশা, অসম, মাদ্রাজ প্রভৃতি স্থানে বিস্তৃত হয়েছিল। বিহারের প্রায় ৪০ শতাংশ থানা জনতার দখলে। যায়। উত্তরপ্রদেশের বালিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় সরকার। সাতারায় প্রতিষ্ঠত হয় 'প্রতিসরকার'। উত্তরপ্রদেশে হিন্দুস্থান সোসালিস্ট' ও 'রিপাবলিক দল' এবং বাংলায় 'যুগান্তর' ও 'অনুশীলন সমিতি' এই আন্দোলনে চরমপন্থী বিপ্লবী ভাবধারা এনেছিল। জয়প্রকাশ নারায়ণ, নরেন্দ্র দেব, অরুণা আসফ আলি, রামমনোহর লোহিয়া, সুচেতা কৃপালনি প্রমুখ সমাজবাদী নেতৃবৃন্দ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
• বাংলায় আন্দোলন : ভারত ছাড়ো আন্দোলন বাংলায় ব্যাপক ও সর্বাত্মকরূপে সংঘটিত হয়েছিল। মেদিনীপুরের কাঁথি, তমলুক, পটাশপুর, ভগবানপুর, সুতাহাটা, নন্দীগ্রাম, মহিষাদল এবং দিনাজপুরের বালুরঘাটে আন্দোলনের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মেদিনীপুরে ‘দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল কৃষক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এক সংগ্রামী পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন।
আবার এর মধ্যে তমলুকের আন্দোলন ছিল দৃষ্টান্তমূলক। 1942 খ্রিস্টাব্দের 29 সেপ্টেম্বর 73 বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা, রামচন্দ্র বেরাকে সঙ্গে নিয়ে 20 হাজার মানুষের মিছিল করে তমলুকের আদালত ও থানা ঘেরাও করেন। কিন্তু পুলিশ এই শান্ত মিছিলের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। মাতঙ্গিনী হাজরা পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। এ ছাড়া বহু মানুষ হতাহত হয়। ফলে বিদ্রোহ ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। কাঁথি মহকুমার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা হয়। সরকারি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। 1942 খ্রিস্টাব্দের 17 ডিসেম্বর অজয় মুখার্জি, সুশীল ধাড়া (এই বিপ্লবী এখনও জীবিত আছেন) ও সতীশ সামন্তের নেতৃত্বে 'তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার' প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সরকারের অধীনে গড়ে তোলা হয় 'বিদ্যুৎবাহিনী” ও ‘ভগিনীবাহিনী'।
• উপসংহার : এইভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলন গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাতে দেশের জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাতে বাদ যায়নি নারী, ছাত্র, যুব, কৃষক, শ্রমিক সমাজও। এ কারণে এই আন্দোলনকে অনেকেই একটি গণ আন্দোলন বলে মনে করেন। এমন অভিমত ছিল ড. সুমিত সরকার ও ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের। জওহরলাল নেহরু এই আন্দোলনকে এক স্বতঃস্ফূর্ত গণ অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করেছেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন